সর্বশেষ সংবাদ

ধরাছোঁয়ার বাইরে গড ফাদাররা লাকসামে এখন সহজলভ্য মাদক

(Last Updated On: April 24, 2017)

সেলিম চৌধুরী হীরা, লাকসাম :‘‘কত লাকসাম কত বাতি খ্যাত ’’ লাকসাম যার বুক চিরে বহবান ডাকাতিয়া নদী। উপমহাদেশের একমাত্র মহিলা নবাব নওয়াব ফয়জুন্নেছা স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহ্যের ধারকবাহক ঐতিহ্যময় লাকসামে এখন মাকড়সা জালের মত ছড়িয়ে আছে মরনঘাতক মাদক। সহজলভ্য হিসাবে হাত বাড়ালে পাওয়া যাচ্ছে যে কোন ধরনের মাদক। সীমান্তবর্তী ইউনিয়ন গ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে যত্রতত্র গড়ে উঠেছে মাদকের ষ্পট, সময়ের ব্যবধানে বাড়ছে এর বিস্তৃতি।
বেশি লাভজনক, সহজলভ্য ও সহজে বহন করার সুবিধার কারনে এ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে মহিলা ও শিশুরা। অসৎ সঙ্গ ও সহজ প্রাপ্তি হওয়ায় দিনদিন সেবনে জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন স্কুল কলেজের পড়–য়া শিক্ষার্থীরা, সখে বসে অসৎ সঙ্গে পড়ে সেবন করছে ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল ও দেশীয় তৈরী চোলাই মদ। পুলিশ বিজিবি, র‌্যাব ও ডিবির অভিযানে,ছোটখাটো এসব মাদক ব্যবসায়ীরা ধরা পড়েছে আবার জামিনে বেড়িয়ে এসে পুনরায় শুরু করছে মাদক ব্যবসা।
থানা সূত্রে জানা যায়, মাদক ব্যবসায় ২০১৬ সালের ১ বছরে  মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন আইনে মামলা হয়েছে ১১১ জনের বিরুদ্ধে।  চলতি বছরে ২০১৭ সালে জানুয়ারী থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত ৪৭ জনের মধ্যে ৪জনকে ডিবি পুলিশ ও বাকী ৪৩ জনকে বেঙ্গল পুলিশের অভিযানে আটক করে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতরাই  কয়েকদিন পর আইনের ফাঁকে জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। গত ৩ মাসে উপজেলা লক্ষীপুর গ্রামে মিলন নামে এক মাদক ব্যবসায়ীকে জংশন এলাকা থেকে ৫’শ পিচ ফেনসিডিল, বিজরা এলাকার নিজ বাড়ী থেকে ১২০ পিচ ইয়াবাসহ রোজিনা আক্তার, নরপাটি এলাকা থেকে ৬০ কেজি গাঁজাসহ শাহপরান ও জয়নাল আবদীন, কামড্ডা গ্রামে নিজ বাড়ী থেকে ইউপি সদস্য জামাল উদ্দিনে ছোট ভাই কামাল উদ্দিন ও মোশারফ হোসেনকে ১০০ পিচ ইয়াবা, ঠাকুরপাড়া আমুদা মাদ্রাসার পিছন থেকে ২ কেজি গাজাসহ রুবেল মিয়াকে, রাজঘাট এলাকা থেকে ইমরান হোসেন ২০ পিচ ইয়াবা, জয়শ্রী এলাকা থেকে ইলিয়াছ মিয়াকে ১ কেজি গাজা, সুমন রেষ্ট হাউজের সামনে থেকে আবুল হোসেনকে ২০ পিচ ইয়াবা, গন্ডামারা এতিম খানা সামনে থেকে রুবেল মিয়াকে ১৫ পিচ ইয়াবা, তিশা কাউন্টার থেকে রেজাউল শেখকে ৬ কেজি গাজা, দৌলতগঞ্জ রেলষ্টেশন থেকে ইউনুছ মিয়াকে ১০ পিচ ইয়াবা, উত্তরকুল নিজ বাড়ী থেকে রহিমকে ৫০০ গ্রাম গাজা, নোয়াগাঁও এলাকা থেকে ফতেপুরের সামছুল আজমকে ২০ পিচ ইয়াবা, সুমন রেষ্টহাউজ সামনে থেকে মনি বেগম কে ৬ বোতল ফেনসিডিল, বাইপাস থেকে সেলিম মিয়াকে ২০ পিচ ইয়াবা, হাউজিং এলাকা থেকে শামীম ও মোশারফকে ৩০ পিচ ইয়াবা, সাতবাড়িয়া পেট্রোল পাম্প থেকে বেল্লাল হোসেনকে ১ লিটার দেশী মদ, নশরতপুর এলাকা থেকে আবদুর রহমানকে ১ কেজি গাঁজাসহ  আটক করেছে পুলিশ। গত ৩ মাসে ৪৭ জনকে থানা পুলিশ বিভিন্ন অভিযানে মাদক ব্যবসায়ীদের আটক করে জেলহাজতে প্রেরণ করলেও গড ফাদাররা রয়েছে ধরাছোয়ার বাইরে। ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙ্গিয়ে কিছু নামধারী নেতাকর্মী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানায়। এ দিকে মাদক নিয়ন্ত্রনে জন্য সরকারের আইন প্রয়োগের পাশাপাশি ওয়ার্ড ভিত্তিক কমিউনিটি পুলিশিং কমিটির মাধ্যমে সামাজিক ভাবে মাদক বয়কট করার জন্য বিভিন্ন সভা-সমাবেশে ব্যবসায়ী ও সেবনকারীদের সতর্ক করা হলেও গুরুত্ব দিচ্ছেন না কেউ। জানা গেছে  গত কয়েক বছর পূর্বে পৌর শহরে মাত্র ১০/১৫টি চিহ্নিত মাদক ষ্পট থাকলেও এখন তা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়ে ছড়িয়ে পড়ছে গ্রামা লসহ অলিগলিতে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে পৌর ও উপজেলায় বিভিন্ন স্পটগুলোতে খুচরা ও পাইকারী মাদক ব্যবসায়ীদের ষ্পটগুলো। পৌরএলাকাগুলো জংশনের সুইপার কলোনী, জংশন বাজারস্থ ১৪নং কলোনী, কাঠাল বাগান কলোনী, ট্রাফিক কলোনী ও নিউ কলোনীসহ পরিত্যাক্ত রেলওয়ে বিল্ডিং ও বগি, গাজীমুড়া, দক্ষিণ গাজীমুড়া খাল পাড়, ছিলোনিয়া পুল,গুন্তি জবাইখানা, সাতবাড়িয়া রেলগেইট, বউ বাজার বড় ব্রিজ, গন্ডামারা, রাজঘাট, ঠাকুরপাড়া, পাইকপাড়া, খুনতা, দৌলতগঞ্জ রেলষ্টেশন, কুমার পট্টি, উত্তরকুল, বাইপাস, দক্ষিণ লাকসাম,পশ্চিমগাঁও, চারআনি পাড়া, বাগবাড়ী, চাঁদপুর রেলগইট, হাউজিং এষ্টেট, নশরতপুর, সুমন রেষ্ট হাউজ সন্মুখে, ফতেপুর, মিশ্রি।
উপজেলা বিভিন্ন ইউনিয়নগুলো ১নং বাকই- বিজরা, পরানপুর, কৈত্রা,আশরা, শিকারীপাড়া, পাঁচপাড়া, বড় বিজরা, জয়শ্রী, গাজীপুর, কোঁয়ার, হরিশ্চর, নূরপুর। ২নং মুদাফরগঞ্জ- নগরীপাড়া, বোয়ালিয়া, চিকোনিয়া দোকান, বাজার ব্রিজ, আক্কাছ টাওয়ার, জবাইখানা, সিএনজি ষ্ট্যান্ড, নাকঝাটিয়া জোরপুল, চিতোষী বাজার, হলুদিয়া, শ্রীয়াং বাজার, রাজাপুর, কাগৈয়া বড় ব্রিজ। ৩নং কান্দিরপাড়- চুনাতি, খুন্তা, কামড্ডা, নৈরপাড় টাওয়ার, ইরুয়াইন বাদামগাছ তলা, সালেপুর, চারআনি পুল, ভাকড্ডা পুল, আমুদা মাদ্রাসা পাশে, অশ্বতলা, হামিরাবাগ। ৪নং গোবিন্দপুর- মোহাম্মদপুর, সাতঘর, ইছাপুর বাজার, জোরপুল, বাতাখালী, পশ্চিমপাড়া।  ৫নং উত্তরদা- বাটিয়াভিটা, খিলা, মনপাল পুল, নোয়াপাড়া, চন্দনা বাজার, ব্রিক ফিল্ড রেলমোড়। ৬নং আজগরা- আজগরা বাজার, কালিয়া চৌঁ, ঘাটার নোয়াগাঁও, আমদুয়ার। ৭নং পূর্ব লাকসাম-নরপাটি, দাশপাড়া, উত্তর নরপাটি, জেলেপাড়া, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জামতলি, গাইনের ডহরা, টেকেরচরসহ ছোট বড় হাটবাজার বাসা বাড়ীতে বিভিন্ন রকম মাদকদ্রব্যের ব্যবসা চলছে হরদমছে।
বিজরা বাজারে আওয়ামীলীগের নেতা আবুল বাশার বলেন, প্রতিদিন নিত্যপন্য বাজারের পাশাপাশি সন্ধ্যা হলে মাদকের হাট বসে। বাজারের অলিগলিতে চোখ দিলেই মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীদের দেখা যায়। দু’উপজেলা সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ার কারনে মাদক ব্যবসায়ীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়, কারন এক উপেেজলা আইন শৃঙ্খলা বাহিনী তাড়া করলে পাশের উপজেলায় ঢুকে পড়ে। তারপরও মাননীয় এমপি মহোদয়ের নির্দেশে আমরা এই এলাকার জনগণ সবসময় মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আসছে।
মুদাফরগঞ্জ বাজারের যুবলীগের নেতা শাহীন বলেন, ৩টি উপজেলা ট্রানিং পয়েন্ট থাকাতে মাদক ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। যদি ওই পয়েন্টে পুলিশ ফাড়ি দেওয়া যেতো তাহলে এ ইউনিয়নে মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীদের নিয়ন্ত্রন আনা সম্ভব হতো। মাননীয় এমপি মহোদয়ের নির্দেশে আমরা সবসময় মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করছি। তবে সামাজিক সচেতনতার কোন বিকল্প নেই।
এ ব্যাপারে লাকসাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল্লাহ আল মাহফুজ জানান, আমি এ থানায় যোগদানের পর থেকে মাদক নিয়ন্ত্রনে জরালো ভাবে কাজ করে যাচ্ছি। প্রতিনিয়ত সকল স্পটে মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীদের বিরুদ্ধে এবং উপজেলা সীমান্তবর্তী ফাঁড়িগুলোর সাথে সমন্বয় করে অভিয়ান অব্যাহত আছে। গত ৩ মাসে ৩৪ জন মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.