বৈশাখী কে খুঁজছি!

(Last Updated On: মে ১৭, ২০১৭)

ডঃ আব্দুস সাত্তার:কোটি কোটি বছর ধরে তোমাকে খুঁজছি। এই সত্য কথাটি বন্ধুরা সবাই জানে বলেই ২০১০ সালে নিউইয়র্ক থেকে ফকির সেলিম ভাই ফোন করে বললেন সাত্তার ভাই চলে আসেন আপনার বৈশাখী ওজন পার্কে আসতেছে। এতবছর পর বৈশাখী আসবে আমি দেখতে যাব না তা কি করে হয়। সাথে সাথে গাড়ি হাঁকিয়ে পাঁচ ঘণ্টা ড্রাইভ করে সেলিম ভাইয়ের বাসায় পোঁছই। তখন রাত প্রায় ১০টা। বসায় ঢুকে দেখি কাজী সামছু ভাই ও সেখানে। তাদের সাথে সারারাত কথা বলার পর সবাই ঘুমিয়ে পড়ল। কিন্তু আমার চোখে কোন ঘুম নেই ।আমি জেগে জেগে শুধু বৈশাখী কে নিয়ে ভাবছি।আর ভাবছি। ভাবতে ভাবতেই চলে গেলাম আমার জন্মস্থান চাঁদপুরে। যেখানে আমি কোটি বছর আগে জন্মেছি আর এই জন্মের পর থেকেই বৈশাখী’র সাথে হেঁসে খেলে বড় হয়েছি। প্রবাস আসার পূর্বে বৈশাখী’র সাথে শেষ আড্ডা  হয় চাঁদপুর কলেজ মাঠে। সারাদিন সব বন্ধুরা মিলে চুকিয়ে আড্ডা চলে এক সময় বৈশাখী বলে চল আজ সারা শহর ঘুরে আমি আমাকে দেখাব। তারপর কলেজ থেকে বেড়িয়ে চিত্রলেখা সিনেমা হলের সামনে কিছুসময় আড্ডা দেওয়ার পর রিকসায় করে চলে আসি বড় ষ্টেশনে দুই নদীর মিলন মেলা দেখার জন্য। দুইটি নদী একসাথে মিলন হয়েছে অথচ দুইটি নদীর পানি দুই রকমের। উপরওয়ালার কি অপূর্ব সৃষ্টি। ওখান থেকে বৈশাখী ট্রেনে করে নিয়ে চলে আসে কালি বাড়ি। সেখানে এসে বলে তুমি এসেছ আমার কাছে তোমাকে মিষ্টি খাওয়াব ওয়ান মিনিট থেকে। মিষ্টির ব্যাগ হাতে নিয়ে দুজনে খেতে খেতে ছায়াবানী সিনেমা হলের সামনে দিয়ে এসে রেল লাইনের উপর দিয়ে দুজনে হেঁটে আবার চাঁদপুর কলেজে। তারপর সচরাচর যা হয় বেশাখী চলে গেল তাঁর বাসায় আর আমি আমার। সেই হারানো দিনগুলোকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে একসময় গুন গুনাইতে লাগলাম মান্নাদের সেই প্রিয় গানটিঃ

 

                                              খুব জানতে ইচ্ছে করে

                                            খুব জানতে ইচ্ছে করে
তুমি কি সেই আগের মতই আছ
নাকি অনেকখানি বদলে গেছ।

                                                                    
 ঠিক সেই সময় কাজী ভাই এসে বলে কি সাত্তার এতো তাড়াতাড়ি উঠে গেছো। চল হাত মুখ ধুয়ে নাস্তা সেরে বেরিয়ে পড়ি। ওমা! কাজী ভাইও দেখি বৈশাখী কে আমার মতোই ভালোবাসে। সকালের নাস্তা সেরে কাজী ভাই,সেলিম ভাই সহ চলে গেলাম ওজন পার্কে বৈশাখী  কে দেখার জন্য। ওজন পার্কে পোঁছেই চমকিয়ে গেলাম হরেক রকমের সাজ দেখে। একটু সামনে যেয়েই দেখি বৈশাখী।ওয়াও! একটু ও বদলায়নি সেই আগের মতোই আছে। ঠোটে সেই লাল লিপিস্টিক কপালে সেই লাল টিপ হাতে লাল ছুড়ি পায়ে নুপুর। আমি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম একযুগ সময় ধরে। বৈশাখী হাত ধরে বলে আর কত যুগ ধরে তাকিয়ে থাকবে চল একটু ঘুরে বেড়াই।দুজনে জনসমুদ্রের মাঝখানেই হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে মুডি  চানাচুর পেয়াজু সিঙ্গারা চটপটি চা পান সাথে বৈশাখী’র নুপুরের ও চুড়ির ঝনঝন আওয়াজ। অনেক যুগ হাঁটার পর ক্লান্ত বৈশাখী গাছের ছায়ায় বসে পড়ল। সেখানে বসে দুজনার সুখ দুঃখের কথাগুলো মিলিয়ে নেবার সাথে সাথে পান্তা ইলিশ সাথে হরেক রকমের ভর্তা দিয়ে দুপুরের খাবার সেরে নিলাম। কিছুক্ষন পর আবার হেঁটে চলা এবার চুড়ির দোকান শাড়ীর দোকান লাল টিপের দোকান ঘুরে গানের আসরে পোঁছতেই iমঞ্চে গাইতে শুরু করলঃ
                                                                                   এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ।
                                                                                    তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,

                                                                                    বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক॥

দুপুর থেকে সন্ধ্যা অবধি গান আর আর নাচের সাথে হেঁসে খেলে দিনটিকে উপভোগ করছি আর  দেখছি। দুরন্ত বৈশাখী একটু ও পাল্টায়নি। আজকের দিনটি যেন শুরু না হতেই শেষ হতে চলছে। এক্ষুনি আন্ধকার চলে আসবে আমার বৈশাখী চলে যাবে এই কথা ভাবতেই বুকের বাম পাশটায় মোচড় দিয়ে উঠল। কিন্তু করার কিছুই নাই অন্ধকার আসার সাথে সাথেই বৈশাখী  চলে গেল। আমি পথিক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাঁর চলে যাওয়া দেখলাম আর গুন গুনাইতে লাগলাম মান্নাদের গাওয়া আমার প্রিয় গানটি ;

 আবার হবে তো দেখা
এ দেখাই শেষ দেখা নয়তো।

 কি চোখে তোমায় দেখি
বোঝাতে পারিনি আজো হয়তো
এ দেখাই শেষ দেখা নয়তো

 যাবার বেলায় আজ
কেন যে কেবলি মনে পড়ে গো
অসময়ে নীল আকাশে কতদিন কত মেঘ ধরে গো
শপথের মালাতেও মাঝে মাঝে কাটা জেগে রয় তো
এ দেখাই শেষ দেখা নয় তো।

সময় তাঁর গতিতেই চলতে থাকে যুগ পেরিয়ে যায় আমার বৈশাখী আর আসেনা। এরই মাঝে রুমি ভাই ২০১৪ সালে ফোন দিয়ে বলে সাত্তার ভাই বৈশাখী  ম্যাসন পার্কে আসবে চলে আসবেন।  ফোন পাবার পর পায়জামা পাঞ্জাবী পড়ে চলে গেলাম বৈশাখী কে দেখার জন্য। ম্যাসন পার্কে পোঁছেই দেখি বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রাক্তন এম্বাসেডর আকরামুল কাদের সেখানে। ওমা! জনাব এম্বাসেডর সাহেব ও দেখি বৈশাখী কে অনেক ভালোবাসে। রুমি ভাই সাবিকে নিয়ে পার্কে ঘুরে ফুল ছিটিয়ে ডোল  বাজিয়ে বৈশাখী’র আগমন বার্তা জানিয়ে দিল। তারপর জনাব এম্বাসেডর সহ আমরা সবাই গাইলামঃ

এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ।
তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক॥
যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে-যাওয়া গীতি,
অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক॥

                                                                                               
মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,
অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।

সারাদিন নাচ গানের সাথে সাথে বৈশাখী’র হাঁসিমাখা মুখখানি দেখলাম আর পুরো পার্ক চসে বেডালাম। আন্ধকার আসার সাথে সাথেই বৈশাখী কে বিদায় দিয়ে বাসায় চলে আসলাম। চতকী পাখির মতো বৈশাখী’র আগমনের অপেক্ষায় বসে আছি। সে আসবে তাঁর  সাথে সারাদিন নেচে গেয়ে ঘুরে বেড়াব। এইতো সেদিন সেতু ভাই ফোন করে বলে সাত্তার ভাই বৈশাখী’ কে দেখতে চলে আসেন  কলেজে। যার জন্য এতো অপেক্ষা সে আসবে। কলেজে পোঁছে দেখি সেতু ভাই সামনে দাঁড়ানো। আমি জানতে চাইলাম বৈশাখী কোথায়? সেতু ভাই বললেন আসেন ভিতরে দেখতে পাবেন। কলেজের ভিতরে ডুকে এদিক সেদিক দেখলাম কিন্তু আমার বৈশাখী’কে  পেলাম না। আনমনে অনেক্ষন দাঁড়িয়ে রইলাম। আর ভাবলাম এই ভ্যাঁপসা গরমে কি করে সে আসবে। সেতু ভাই বললেন ঐ দেখা যাচ্ছে বৈশাখী আসতেছে। সেতু ভাই বারবার বলতেছে। দেখেন সাত্তার ভাই পিছনে ফিরে দেখেন। সেতু ভাই বলার পর থেকে আমি শুনতেছি ঘোড়ার আওয়াজ। ঠক ঠক করে হেঁটে আসছে। আমি পিছনে ঘুরতেই দেখি মিনি সট পেন্ট ও মিনি ফতুয়া পড়া কপালে সানগ্লাস, ঠোঁটে চিকচিকমরুভূমির বালি। আমি কিছু বলার আগেই সেতু ভাই বললেন এই সেই আপনার বৈশাখী। আমি বললাম আমার বৈশাখী না। সেতু ভাই বললেন বৈশাখীএখন আধুনিক হয়্যেছে। এই কথা শুনার পর আমি আর এক মুহূর্ত ওখানে থাকি নি সোজা বাসায় চলে আসি।এরপর থেকে কত জায়গায় খুঁজেছি কিন্তু আমার সেই বৈশাখী’কে  আর পাইনি। আজ আশরাফ ভাইয়ের বাসায় গেলে সে বলে তুমি নাকি বৈশাখী’কে খুঁজে পাচ্ছ না। তিনি হ্যারিকেন জ্বালিয়ে হাতে দিয়ে বলে এইবার খুঁজে দেখ।
 
বৈশাখী পরিবারের কাছে আবেদন থাকবে আমার বৈশাখী’কে স্কুলকলেজ বা বড় বড় হোটেলে নিয়ে তাঁর সুনাম কে নষ্ট করবেন না। বৈশাখী কে ছেড়ে দিন প্রকৃতির কাছে। জন্ম থেকেই ও সবার সাথে হেঁসে খেলে বড় হয়েছে। ওকে এভাবেই থাকতে দিন। আপনার ওকে যত নগ্ন করবেন ততই আপনাদের কাছ থেকে হারিয়ে যাবে। 
 
বৈশাখী জানি তুমি অনেক কষ্টে আছ। আমিও তোমার মতই আছি। আজ তোমার পরিবার তোমার পরিবেশ আমাদের প্রকৃতির ভালোবাসা কে মেনে নিতে পারছে না। আমার এতটুকু বিশ্বাস আছে তুমি আবার আমার কাছে ফিরে আসবে। তখন আমরা সেই আগের মতো একসাথে গাইবঃ
 
 
                                                                                    মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাই না?

                                                                                   কেন মেঘ আসে হৃদয়-আকাশে, তোমারে দেখিতে দেয় না?।

                                                                                  ক্ষণিক আলোকে আঁখির পলকে তোমায় যবে পাই দেখিতে

                                                                                   হারাই-হারাই সদা হয় ভয়, হারাইয়া ফেলি চকিতে ॥

                                                                                  কী করিলে বলো পাইব তোমারে, রাখিব আঁখিতে আঁখিতে।

                                                                                এত প্রেম আমি কোথা পাব নাথ, তোমারে হৃদয়ে রাখিতে?

                                                                                  আর কারো পানে চাহিব না আর, করিব হে আমি প্রাণপণ–

                                                                                  তুমি যদি বল এখনি করিব বিষয়বাসনা বিসর্জন ॥

ডঃ আব্দুস সাত্তার
সাংবাদিক ও লেখক
ওয়াশিংটন ডিসি
Print Friendly, PDF & Email

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.