Babui Pakhir Basa pic

বিলুপ্তির পথে শিল্পশৈলী চেতনাবোধ কারীগর বাবুই পাখি

(Last Updated On: জুলাই ১৯, ২০১৭)

সেলিম চৌধুরী হীরা :
‘‘ বাবুই পাখিরে ডাকি বলছে চড়ই
কুড়ের ঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই,
আমি থাকি মহা সুখে অট্টালিকার পরে
তুমি কত কষ্ট পাও রোদ বৃষ্টি ঝড়ে।
বাবুই হেসে কহে সন্দেহ কি তাই
কষ্ট পায় তবু থাকি নিজের বাসায়,
পাকা হক তবু, ভাই পরের বাসা
নিজ হাতে মোর কাঁচা ঘর খাসা।
অমর এ কবিতার প্রসঙ্গ আসলেই মনের ভিতর ভেসে উঠে, তাল গাছের মাথায় বাবুই পাখির কারুকাজ করা শত শত বাসা ঝুলে থাকার দৃশ্য আর পাখি কিচির মিচির। কিন্তু বর্তমান শিশুদের কাছে মনে হবে এসব কাল্পনিক। মেঝো মেয়ে সারিয়া স্কুল থেকে পরীক্ষা দিয়ে প্রশ্ন হাতে এসে বলল, পরীক্ষায় বাবুই পাখির উত্তর খাতায় লিখেছি কিন্তু বাবুই পাখি কোনটি আমি চিনি না। মেয়ের প্রশ্নের বাস্তব জবাব দিতে নেমে পড়লাম বাবুই পাখির সন্ধানে। লাকসাম, মনোহরগঞ্জ, নাঙ্গলকোট ৩টি উপজেলার কোথাও চোখে পড়লনা সেই চিরচেনা বাবুই পাখির বাসা ও পাখির। প্রায় ১ মাসপর দেখতে পেলাম সেই কাংখিত বাবুই পাখির বাসা। লাকসাম উপজেলা ৩নং কান্দিরপাড় ইউনিয়নের ছনগাঁও গ্রামের বিস্তৃন্ন ফসলের মাঠ। এক কোনে এক পায়ে দাড়ানো একটি মাত্র তাল গাছ, যাতে ঝুলে রয়েছে ৪০-৫০টি বাবুই পাখির বাসা।
গ্রাম বাংলায় এখন আর মতো দেখা যায় না বাবুই পাখির দৃষ্টিনন্দন বাসা। এক সময় গ্রামবাংলার প্রায় সব উঁচু তাল গাছের মাথায় দেখা যেতো কারুকাজ খঁচিত বাবুই পাখির বাসা। কালের বিবর্তন আর পরিবেশ পির্যয়ের কারনে আজ আমরা হারিয়ে ফেলতে বসেছি বাবুই পাখি। সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতির ঐতিহ্য শিল্পি, স্থপতি ও সামাজিক বন্ধনের কারিগর, বাবুই পাখি ও তাদের বাসা।
বাবুই পাখিরা সাধারনত তাল গাছের কঁচিপাতা, খড়, কাশবনের লতাপাতা ও হোগলা পাতা ব্যবহার করে উঁচু তাল গাছের মাথায় নিপুর দক্ষতায় তৈরী করতো দৃষ্টি নন্দন বাসা। সে বাসা দেখতে যেমন আকর্ষনীয় তেমনি মজবুত। শত ঝড় বৃষ্টিতেও ভেঙ্গে পড়ত না। ঝড়ের সময় দোলনী আরও মুদ্ধকর। শক্ত বুননের এ বাসা টেনে ছেড়াও কষ্টকর। বাবুই পাখির অর্পূব শিল্প শৈলীতে মুদ্ধ হতো সকল শ্রেণি পেশার মানুষ। বর্তমানে শিশু শিক্ষার্থীরা শুধু মাত্র বয়ের কবিতা পড়েই বাবুই পাখির শিল্প কর্মের কথা জানতে পারছে। চোখে দেখার সুযোগ হচ্ছে না বাবুই পাখির দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য শৈলীর। এদের মধ্যে কী অপূর্ব বিজ্ঞান সম্মত শিল্প শৈলীর চেতনাবোধ। নিজ চোখে দেখা থেকে বি ত হচ্ছে আজকের শিশু শিক্ষার্থীরা।
এক সময় যে দৃশ্য ছিলো নান্দনিক। নিজ চোখে না দেখলে সেই দৃষ্টি নন্দন দৃশ্যের কথা কাউকে বুঝানো সম্ভভ নয়। তাই আজকের শিক্ষার্থীদের বইয়ের কবিতা দিয়ে সেই চিত্তাকার্ষক শিল্প শৈলী বুঝানো যাবেনা।
কথিত আছে- পুরুষ বাবুই বাসা তৈরীর পরেই কেবল সঙ্গি পায়। বাসা তৈরীর কাজ অর্ধেক হলে কাঙ্খিত স্ত্রী বাবুইকে সে বাসা দেখায়। বাসা পছন্দ হলেই কেবল দুইজনের সম্পর্ক তৈরী হয়। স্ত্রী বাবুই বাসা পছন্দ করলে বাকী কাজ শেষ করে স্ত্রী বাবুইকে ঘরে তোলে।
বিলুপ্তির কারন ঃ- ‘‘ তাঁতী পাখি খ্যাত’’ বাবুই পাখি কুমিল্লা দক্ষিনাঞ্চলে এখন বিলুপ্ত প্রায়। এ বিলুপ্তির কারন হিসাবে অভিজ্ঞজননা মনে করেন, ৮০ দশকের শেষ দিকে ও ৯০ দশক থেকে কৃষি জমিতে এবং ফসলে কীটনাশক ব্যবহারের কারনে- কীটনাশকযুক্ত ফসল আর বিষাক্ত মৃত পোকামাকড় খাওয়াই বাবুই পাখি বিলুপ্তির প্রধান কারন। পাশাপাশি তাল গাছ নিধন, বাসা তৈরীর উপকরণ যেমন- হোগলা, কাঁশবন কমে যাওয়া, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারনেও হারিয়ে যেতে বসেছে প্রকৃতির এক অপরূপ শিল্পশৈলীর কারিগর। বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে প্রকৃতির শিল্পী স্থপতি এবং সামাজিক বন্ধনের কারিগর ও তাঁতী পাখি হিসাবে পরিচিত গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের বাহক বাবুই পাখি।
প্রতিবছর ঘটা করে কত দিবস পালন করা হয়। প্রকৃতি সংরক্ষন দিবস, প্রানী সংরক্ষন দিবস, বনায়ন দিবস, ঐতিহ্য দিবস, পরিবেশ দিবস, জীব বৈচিত্রদিবস।এত দিবস পালন করেও আমরা পারিনা- পেরে উঠি না। কারন আমরা শুধু দিবস পালনের মাধ্যমে দায়িত্ববোধ শেষ করি। স্মরন রাখতে হবে সত্যিকার অর্থে দিবস পালনের মাধ্যমে দায়িত্ববোধ শেষ হয়ে যায় না। তাই গবেষনার মাধ্যমে সরকারী-বেসরকারী ভাবে বাবুই পাখি প্রজাতিকে রক্ষার উদ্যোগ নিতে হবে।

Print Friendly

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.