দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী, বন্ধু ভারত ও জবাব দিন ভৌমিক

(Last Updated On: সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১৭)

পীর হাবিবুর রহমান,যে কোনো বিষয়ে মতামত দিলে সেটি প্রিন্ট মিডিয়ার কলাম, টকশোর বক্তব্য কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের স্ট্যাটাসই হোক; নিজেদের মতের সঙ্গে না মিললেই একচোখা, দলকানারা রীতিমতো হামলে পড়েন। নাম-পরিচয়হীন আজব আজব তথাকথিত নিউজ পোর্টাল বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হিংস্র শকুনের মতো আঁচড়ে আঁচড়ে ক্ষত-বিক্ষত করে।

ঈর্ষাপরায়ণরা এই মনস্তাত্ত্বিক বিকৃতি দেখে উল্লাস করে।   কয়েক দিন আগে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শাহাদাত হোসেন, সাবেক পররাষ্ট্রসচিব মহিউদ্দিন আহমেদ, মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুব-উল আলম হানিফ, বিএনপির মাহবুব উদ্দিন খোকনের সঙ্গে রোহিঙ্গা ইস্যুতে নিউজ২৪ টিভি চ্যানেলের টকশোতে অংশ নিয়েছিলাম। একটি প্রাণবন্ত আলোচনা হয়েছিল সামিয়া রহমানের দক্ষ উপস্থাপনায়। কিন্তু যে কোনো টকশোতে আওয়ামী লীগ আর বিএনপি থাকলেই যেটি হয়; সেটিও হয়েছে। অর্থাৎ স্থান, কাল, বিষয়ের বাইরে গিয়ে নিজেদের কৃতিত্ব, কর্তৃত্ব দেখাতে অহেতুক তর্কের সূত্রপাত।

এসব চিরচেনা তর্কের শ্রোতা হলে শরীর ও মনে ক্লান্তি আসে। যাক, নানা কথায় ড. শাহাদাত বলেছিলেন কিছু দিন আগে লেখা তার একটি কলাম নিয়ে যেখানে তিনি লিখেছেন, আমরা কি

মানসিক রোগী হয়ে যাচ্ছি? একটি অস্থির, অশান্ত, মূল্যবোধহীন সমাজের চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেছিলেন। বিশেষ করে সিরিজ ধর্ষণের যে ভয়াবহ চিত্র ও রূপ উঠে আসছে সেটি নিয়েই তিনি মন্তব্য করেছেন। পশ্চিমা দুনিয়ায় উচ্চশিক্ষিত সভ্য, গণতান্ত্রিক সমাজের নাগরিকগণ নিয়মিত শারীরিক চেকআপের পাশাপাশি যেমন বিভিন্ন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন, তেমনি মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের কাছেও যান।

আমাদের দেশে কাউকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দেখাতে বললে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। মনে হয় যেন তাকে কেউ পাগল বলে চিহ্নিত করছে। কেউ পাগল হতে নারাজ। মনোরোগ নিয়ে বাস করতে রাজি, কিন্তু পাগলামি ছাড়তে রাজি নয়। তথাকথিত ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা, দায়িত্বহীন, বিভিন্ন ব্যক্তিনির্ভর, অপ্রাতিষ্ঠানিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের টাইমলাইনগুলো গভীরভাবে মনোযোগ দিলে বিনোদনই পাওয়া যায় না, পাগলামির চিত্রই উঠে আসে না; অনেকের মনস্তাত্ত্বিক বিকৃতির রূপও উন্মোচিত হতে দেখা যায়। কারও মতামত নিয়ে যুক্তিনির্ভর ভিন্ন মত রুচির সঙ্গে উপস্থাপন না করে নোংরা গালাগালি, অশ্রাব্য ভাষায় অশালীন মন্তব্য করে অনেককে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে দেখা যায়। নানা মতে অন্ধ, দলকানা, দলদাসরা এখানে সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছেন। তাদের রাজনৈতিক নেতাদের ব্যর্থ নেতৃত্বের সমালোচনা, আত্মসমালোচনা বা আত্মশুদ্ধির পথ না নিয়ে অন্যকে গালাগালি করে সান্ত্বনা খোঁজার চেষ্টায় ব্রত হন তারা।

গোয়েবলসীয় কায়দায় মিথ্যাচারের কদর্য রূপ কতটা বীভৎস, এদের তৎপরতায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যারা নিয়মিত চোখ রাখেন তারা সেটি দেখতে পান। সরকার ৫৭ ধারা যেন বহাল রেখেছে পেশাদার সংবাদকর্মীদের জন্য। অন্যদিকে আবেদন গ্রহণ করার পরও নিউজ পোর্টালগুলোর লাইসেন্স না দিয়ে তথাকথিত মিথ্যাচারের নাম-পরিচয়হীন অনলাইনগুলোকে জিইয়ে রেখেছে। সরকারবিরোধী জঘন্য মিথ্যাচারের দেশি-বিদেশি সাইটগুলো বন্ধ করতেও পারছে না।

রাজনৈতিক খবরাখবরে অনেক সময় অনেক সত্য এ টু জেড পাওয়া গেলেও কারও স্বীকারোক্তিমূলক মন্তব্য পাওয়া যায় না। তবে এ ধরনের রিপোর্ট নিয়ে কোনো প্রতিবাদ হয় না। দায়িত্বশীল সূত্রগুলো নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক থাকেন এ কারণে যে, দলীয় ফোরামে তারা কোনো প্রশ্নের মুখোমুখি হতে চান না। ২০০১ সালে জাতীয় নির্বাচনের আগে ভোটযুদ্ধে অযোগ্য ঘোষিত হয়ে কারামুক্ত জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ চারদলীয় জোট থেকে বেরিয়ে একক নির্বাচন করেন। সেই নির্বাচনের আগে এক সন্ধ্যায় আমার সোর্স জানালেন, রাতেই আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে এরশাদের বৈঠক হতে যাচ্ছে। নির্বাচনের সময় সুধা সদনে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের ভিড়, নেতা-কর্মীদের আনাগোনার কারণে সে রাতে বৈঠক হয়নি।

কিন্তু পরদিন ফজরের নামাজের পর সুধা সদনে শেখ হাসিনার সঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদের বৈঠকটি হয়ে যায়। এরশাদের সঙ্গে ছিলেন তার ভাই জিএম কাদের। যেভাবেই হোক রাজনৈতিক বিটের রিপোর্টিংয়ে তখন দিনরাত্রি আমি ছুটে বেড়াতাম চতুর্দিকে। তখন যুগান্তরের সম্পাদক গোলাম সারওয়ার। রিপোর্ট হাতে পেয়ে ভিতরে খুশি, বাইরে বিচলিত। সংবাদ নিয়ে খেলা, ভাষা নিয়ে ঘুঙুরের মতো শব্দ বাজানো এবং একটি সংবাদের ট্রিটমেন্ট কোথায় এবং তার পরিবেশনাগত পরিমিতিবোধ বিচারে বাংলাদেশের সংবাদপত্র জগতে তার পর আর কোনো বার্তাকক্ষের প্রধান জন্ম নেননি। সম্পাদক হওয়ার পরও বার্তা প্রধানের কাজ তিনি করে যান ক্লান্তিহীন। একেকটি খবরকে অসীম ধৈর্য নিয়ে সম্পাদনাই নয়, রীতিমতো তরতাজা খবর বানানোর কারিগর সংবাদপত্র শিল্পে এখনো তার বিকল্প কেউ হতে পারবেন, এমনটি দেখা যাচ্ছে না।

সেই রিপোর্ট প্রকাশ হওয়ার পর সর্বত্র হৈচৈ, কোথাওবা ঈর্ষা। রাজনীতির অন্দরমহলে নিশ্চিত হওয়ার দৌড়ঝাঁপ ছিল লক্ষণীয়। অসংখ্য রাজনৈতিক স্কুপ নিউজ প্রকাশের ঘটনা এখনো আমাকে আনন্দ দেয়, বেদনা দেয় রিপোর্টিং বয়স এবং সময়ের তাগিদে ছেড়ে আসার জন্য। গোলাম সারওয়ারের মতো বার্তা প্রধান যখন বার্তাকক্ষে বা সংবাদপত্রে সম্রাট হয়ে ওঠেন তখন পরিশ্রমী রিপোর্টাররা হয়ে যান গণমাধ্যমের রাজপুত্র।

বাংলাদেশ প্রতিদিন ছেড়ে আসার পর প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান আমাকে ডেকে নিয়ে রিপোর্টিংয়ে কাজ করার প্রস্তাব দিলে বিনয়ের সঙ্গে না বললেও রিপোর্টিংয়ের লোভ সংবরণ করতে আমার কষ্টই হয়েছে। রিপোর্টারদের খবর আহরণের জন্য যেমন পরিশ্রমী হওয়া দরকার তেমনি এলসেসিয়ান কুকুরের মতো গন্ধ শুঁকে শুঁকে অগ্রসর হতে হয়। সোর্স থাকতে হয় চারদিকে। রাজনীতির খবরের বারান্দায় আমার তিনটিই ছিল। আমি তৃপ্ত, আমার কমনসেন্স বা লেখার স্রষ্টা প্রদত্ত শক্তির ওপর। আমার রিপোর্টিং জীবনে কখনো সিন্ডিকেট রিপোর্টিং করিনি। আওয়ামী লীগের সর্বশেষ ২২তম জাতীয় সম্মেলনকে কেন্দ্র করে সবার আগে পূর্বপশ্চিমবিডি.নিউজ খবর প্রকাশ করেছিল ‘শেখ হাসিনার রানিংমেট হচ্ছেন ওবায়দুল কাদের। ’ তখনো আমাদের কম গালমন্দ সহ্য করতে হয়নি। তবে আমরা আমাদের অবস্থানে অনড় ছিলাম।

যাক, সেদিন বন্ধুবরেষু মঞ্জুরুল ইসলামের আমন্ত্রণে বেসরকারি টেলিভিশন ডিবিসির টকশোতে গিয়েছিলাম। সঙ্গে ছিলেন অগ্রজ জাকারিয়া কাজল। অনুষ্ঠান শুরুর মিনিট দশেক আগে হাজির হয়ে চাঞ্চল্যকর খবর পাই। ২৪ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের গণতন্ত্রের নেত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর মতো হত্যার একটি ষড়যন্ত্র বানচাল হয়েছে। রিপোর্টটি ওই দিন ভারতের নিউজ১৮-এ প্রচারিত হয়েছে। রিপোর্ট করেছেন এক সময়ের বিবিসির সাংবাদিক সুবীর ভৌমিক। নিউজ১৮-এর আগে মিয়ানমারের মিজিমা নিউজ নামের অনলাইন পোর্টালে তিনি এ খবর প্রকাশ করেন। মিয়ানমার শাসকরা গণহত্যা শুরু করেছিল ২৪ আগস্ট। সুবীর ভৌমিক তখন সেখানে। নিউজ১৮-এ যখন খবর প্রকাশ হয় তখন তিনি কলকাতায়। কিন্তু সেই সন্ধ্যায়

দেশের অনেক ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট ও অনলাইন মিডিয়ার সঙ্গে আমরা পূর্বপশ্চিমবিডি.নিউজ পোর্টালেও সে খবর প্রকাশ করি। এই খবর প্রকাশ করার নেপথ্যে যেটি কাজ করছে সেটি হচ্ছে, এ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ২১ বারের মতো হত্যার চেষ্টা হয়েছে। ২১ শের গ্রেনেড হামলা ছিল প্রকাশ্য দিবালোকে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর, নৃশংস হামলা। যেখানে আইভি রহমানসহ ২২ জনের প্রাণ গেছে, শত শত পঙ্গু হয়েছেন। বিদেশি গণমাধ্যমের খবর যাচাই-বাছাই ছাড়াই আমাদের এখানে গণমাধ্যম যেমন গ্রহণ করে তেমনি ভারতীয় গণমাধ্যমও পশ্চিমা গণমাধ্যমের খবর লুফে নেয়। কিন্তু নানা মহলে এ খবরের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে আমরা খবর নিউজ পোর্টাল থেকে মুছে ফেলি।

কিন্তু রাত ১২টায় সরকার সমর্থিত বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ৭১-এ সরাসরি লাইভ টকশোতে এ খবর ও তার রিপোর্টারের সাক্ষাৎকার প্রচার করলে আমরা আবার সেটি প্রকাশ করি। একই সঙ্গে খবরের বিশ্বস্ততা যাচাইয়ের জন্য এখনো পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য প্রাচীন দৈনিক ইত্তেফাকেও সেটি প্রকাশ হয়েছিল। পরদিন সকালে ষড়যন্ত্রের পক্ষে একজন মন্ত্রী ইঙ্গিতবহ মন্তব্য করেন। কিন্তু শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু এ খবরকে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত এক বৈঠক শেষে ভুয়া বললে সর্বত্র ফের প্রশ্ন দেখা দেয়। দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে প্রেস উইং এ খবরকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বললে কারও মনে আর কোনো দ্বিধা থাকে না যে আসলেও এর কোনো ভিত্তি নেই এবং দায়িত্বশীল সংবাদিকতার তাগিদে আমরা সেটি মুছে ফেলি।

৩৭ বছরের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা নিয়ে একজন খবরের মানুষ সুবীর ভৌমিক সমালোচনার মুখে পড়েন পাঠকের কাছে। যখন গণহত্যা শুরু হয়েছে, বাংলাদেশ শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছে, চীন-ভারত-রাশিয়া

মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বাংলাদেশের জনগণ সব আবেগ অনুভূতি নিয়ে শরণার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৬ কোটি মানুষের সঙ্গে প্রায় ৯ লাখ শরণার্থীর খাবার ও আশ্রয়ের নিশ্চয়তা দিয়ে জাতিসংঘসহ এই গণহত্যার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে, কফি আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন করে শরণার্থীদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিয়ে নিরাপত্তা ও শান্তি নিশ্চিত করতে উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।

সেখানে মিয়ানমারের অনলাইনে কাজ করা সুবীর ভৌমিক অতীতে বিভিন্ন ঘটনায় বিতর্কের মুখে পতিত নিউজ১৮-এ কেন এমন ভয়ঙ্কর, চাঞ্চল্যকর খবর ঘটনার এক মাস পর দিলেন? কেন তিনি মাঝেমধ্যে বিবিসিতে সংবাদ দিলেও এটি দেননি? এ ঘটনায় তার সারা জীবনের সাংবাদিকতাই প্রশ্নবিদ্ধ করেননি, যাচাই-বাছাই ছাড়া আমরা যারা এটি প্রকাশ করেছি, আমাদের গণমাধ্যমও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে পূর্বপশ্চিম নিউজ পোর্টালে এ ধরনের খবর প্রচার করায় আমি ব্যথিত এবং সব পাঠক ও দায়িত্বশীলের কাছে দুঃখ প্রকাশ করছি। সুবীর ভৌমিক রিপোর্টে যে সময়কে শেখ হাসিনার হত্যার ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন রিপোর্টে সেই বিকালে প্রধানমন্ত্রী তার কার্যালয়েই ছিলেন না। ছিলেন একুশের গ্রেনেড হামলায় নিহত আইভি রহমানের মিলাদ মাহফিলে। সুবীর ভৌমিক পরে জীবিত মানুষকে নিহত বানিয়ে দেবেন। কেন?

পেশাগত জীবনে অনেক সময় অনেক ঘটনা দেখা যায়, জানা যায় তা খবর করে পাঠকের কাছে দেওয়া যায় না। অনেক সময় কিছু কিছু ঘটনা যেটি দৃশ্যমান হয়, সেটি সত্য নয়। যেটি সত্য সেটি অনেক সময় দেখা যায় না, অনেক পরে জানা যায়। তখন সে খবর বাসি হয়ে যায়। বন্ধুবরেষু নঈম নিজাম যথার্থই বলেছেন, সরকারের তরফ থেকে এ খবর আসার সঙ্গে সঙ্গে বলা উচিত ছিল এটি অসত্য, মিথ্যা নতুবা এটি সত্য কিন্তু সেই চক্রান্ত নস্যাৎ করে চক্রান্তকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?

রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীসহ ভিআইপিদের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা দিয়ে আসছেন দায়িত্বশীল নিরাপত্তা কর্মীরা। গোটা দেশ এবং দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী সরকারের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ দমনই নয়; প্রাকৃতিক দুর্যোগেও এক হয়ে কাজ করছে।

মিয়ানমারের গণহত্যার বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সাহসী ভূমিকা ও নেতৃত্ব বিশ্ব মানবতার কাছে প্রশংসিত হয়েছে, অভিনন্দিত হয়েছে। পশ্চিমা গণমাধ্যম তাকে মানবিক মা বা মানবতার জননী বলছে। শুরু থেকে মুজিব কন্যার এই দৃঢ় অবস্থানের প্রশংসা করে লিখতে গিয়ে নিউজ পোর্টাল থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দলকানা, মানসিক, বিকারগ্রস্তদের নোংরা গালাগালি ও তাদের অখ্যাত পোর্টালে নোংরা অপপ্রচারের শিকার হয়েছি, এখনো হচ্ছি। কুকুর পা কামড়াচ্ছে। কুকুরের কাজ কুকুর করবে। বিষয়টি এমনভাবেই গ্রহণ করেছি। সত্য সে যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম কারণ সে করে না বঞ্চনা— কবিগুরুর এই বাণী বহু আগে লালন করেছি। সরকারের একতরফা অন্ধের মতো সমালোচনা করে গেলেই বাহবা পাব এমনটি কখনো ভাবি না। তেমনি বিরোধী দল ছাড়া গণতন্ত্র হয়, এটাও বিশ্বাস করি না।

হূদয় থেকে যে সত্য উচ্চারিত হয়, সেটি বলেছি, বলছি এবং আগামীতেও বলার চেষ্টা করব। কোনো শাসক বা সরকারের কাছে কোনো ধরনের ব্যক্তিগত অনুকম্পা বা করুণা লাভ করিনি। এককথায় একখানি প্লট, একটি বিদেশ সফর কিংবা একটি রাজনৈতিক নিয়োগের ক্ষুদ্র ইচ্ছা কখনই লালন করিনি। ফেরেশতা নই, ভুল হতে পারে। মতের সঙ্গে দ্বিমত থাকতে পারে। সরকারে গেলেই রাজনৈতিক শক্তি ভুল করে, বিরোধী দলে থাকলেই ফেরেশতা হয়ে যায়, এমনটা বিশ্বাস করি না। আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক মূল্যবোধ নির্বাসিত হওয়ার পেছনে কমবেশি সবারই ব্যর্থতা রয়েছে। ৯০-উত্তর দীর্ঘ পথপরিক্রমায় সবাই সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক পথ নিলেও রাজনৈতিক শক্তির ব্যর্থতায় এখনো আমাদের একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আহাজারি শুনতে হয়। এখনো গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়নি, শক্তিশালী করা হয়নি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো। এই দায় রাষ্ট্র পরিচালনায় নিয়োজিত সব রাজনৈতিক নেতৃত্বের। যখন যারা ক্ষমতায় যান তখনই তারা মানুষকে দেওয়া অঙ্গীকার থেকে সরে যান। ক্ষমতাবানদের উল্টো পথে গাড়ি চালানো বন্ধ করে সোজা পথে চালাতে দুদক চেয়ারম্যানকে ট্রাফিককে সাহায্য করতে হয়।

যেদিন একটি মিথ্যা খবরের পেছনে আমরা সময় ব্যয় করেছি, সেদিনই আমাদের প্রত্যাশাকে লালন করে, আমাদের ইচ্ছাকে ধারণ করে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দেখভালের দায়িত্ব দিয়েছে সরকার। আমাদের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী সুমহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গৌরবের মুকুট পরেই উঠে আসেনি; প্রতিটি সংকটে ঐতিহাসিক ভূমিকাই রাখেনি; শান্তিরক্ষী বাহিনীতে পৃথিবীর দেশে দেশে নজিরবিহীন দক্ষতা দেখিয়ে প্রশংসাই কুড়ায়নি, আত্মোৎসর্গও করেছে মানবতার সেবায়। সম্প্রতি মালিতে তো জীবন দিয়েছেনই। এই সেদিন অতি বৃষ্টিতে পাহাড় ধসে মৃত্যুর হাত থেকে মানুষ বাঁচাতে গিয়ে নিজেদের জীবন দিয়েছেন। শরণার্থীদের দায়িত্ব দেওয়ার পর সুশৃঙ্খলভাবে ত্রাণ বিতরণ থেকে সব কাজ সম্পন্ন হচ্ছে। যেখানে জাকাতের কাপড় দিতে গিয়ে ৫-১০ হাজার মানুষের ভিড়ে গরিব লাশ হয়ে ফিরে সেখানে লাখ লাখ শরণার্থীর ত্রাণে সেনাবাহিনী ও কক্সবাজারের প্রশাসন দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে। এ জন্য অভিনন্দন দিতেই হয়।

মিয়ানমার ইস্যুতে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা দিল্লিকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন বাংলাদেশের পাশে থাকতে। আমি সব সময় বলি, আমার একজন নেতা আছেন, তার নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আমার একটি দল আছে— তার নাম মানুষ। আমার একটি স্বপ্ন আছে— একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও শোষকমুক্ত বাংলাদেশ। আগে আমার দেশ তারপর আমার বন্ধু। আমার বন্ধুর নাম ভারত। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে রক্তে লেখা আত্মার বন্ধন আমাদের সংস্কৃতি, ভৌগোলিক সীমারেখা এটিকে জীবন্ত করেছে। আমাদের দেনদরবার থাকবে। বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতকেও উপলব্ধি করতে অধিকারহারা বাঙালির বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের শোষণ বৈষম্যের অত্যাচার, নির্যাতন ও গণহত্যার বিরুদ্ধে আমরা রুখে দাঁড়িয়েছিলাম আমাদের মহান নেতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে। আমাদের মহাদুর্দিনে ভারতবাসী আমাদের আশ্রয়ই দেননি, শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী ভারতের নেতা হিসেবে বিশ্বনন্দিত হয়েছিলেন পাশে দাঁড়িয়ে। অস্ত্র, ট্রেনিং দিয়ে সাহায্যই করেননি, বিশ্ব জনমত গড়েছিলেন। মানবতার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আমাদের বন্ধুত্ব রচিত হয়েছিল। ভারত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, আমরা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা মুছে দিলেও আমরা একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে হিন্দুত্ববাদের স্লোগান, গরু খাওয়া নিষিদ্ধের স্লোগান যেমন তার রাষ্ট্রীয় চরিত্রের উজ্জ্বলতাকে ধূসর করে তেমনি এখানেও ধর্মান্ধ শক্তি জিহাদি ডাক, সংখ্যালঘু নির্যাতন মুক্তিযুুদ্ধের অহঙ্কারকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। সন্ত্রাসবাদ ও ধর্মান্ধ শক্তির বিরুদ্ধে আমাদের উভয়ের যে লড়াই সেটি শুধু মানবতারই নয়, আমাদের জন্মের ঐতিহ্য রক্ষার লড়াই।

একাত্তরের পরাজিত পাকিস্তান একটি ধর্মান্ধ, সন্ত্রাসকবলিত ব্যর্থ রাষ্ট্র। আমাদের পাওনা ফিরিয়ে দেয়নি। ২০ লাখ বিহারি শরণার্থী ফিরিয়ে নেয়নি। এখানে সন্ত্রাসবাদের জন্ম দিতে চেয়েছে, যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সীমা লঙ্ঘন করেছে। মিয়ানমারের গণহত্যার বিরুদ্ধে এরদোগান পত্নী এমিনি অশ্রুজলে চোখ-মুখ লাল করলেও তুরস্ক সেদিন পাকিস্তানের পক্ষেই যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে আর্তনাদ করেছে। পাকিস্তান ও তুরস্ক আমার বন্ধু নয়। দেনদরবার যতই থাকুক, গলাগলিতে ভারতই আমার দিন শেষে গোধূলি বেলার বন্ধু। এ কথা বললে কার শরীর পুড়ে, কার মনে জ্বালা ধরে; তাতে কিছু যায় আসে না। মহান বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে উত্থান সেখান থেকেই বাংলাদেশ আমার মাতৃভূমি। মায়ের প্রতি সন্তানের প্রেম প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে না। যারা সেদিন পাকিস্তান চেয়েছিলেন তাদের উত্তরসূরিদের আত্মদান আসতে পারে। তাতেও কিছু যায় আসে না। শরণার্থীদের পাশে দেশ দাঁড়িয়েছে। এই মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিচ্ছেন। একাত্তরে বিশ্ব মোড়লরা আমাদের পাশে ছিল না। পাশে ছিল ভারত ও রাশিয়া। আর ছিল বিশ্বের মানবতাকামী মানুষ। আজকে এটি যুদ্ধ নয়, দানব শক্তির বিরুদ্ধে, মানব শক্তির অবস্থান। এখানে ভারত ও রাশিয়াকে পাশে টানতে কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার করা জরুরি। হাল ছাড়লে চলবে না। এই শরণার্থীদের মিয়ানমারের সামরিক শাসনবিরোধী নেত্রী অং সান সু চিকে আপসের পথ ছেড়ে ফিরিয়ে নেওয়ার অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হতেই হবে।   আর এমন এক পরিস্থিতিতে সুবীর ভৌমিক কেনই বা তার বন্ধুপ্রতিম দেশের রাষ্ট্রনায়কের নিরাপত্তা কর্মীদের নিয়ে এমন মিথ্যাচার খবর ছড়িয়ে দিলেন?  কার হয়ে খেললেন? সে জবাব তাকেই দিতে হবে।   ভারতের গণমাধ্যমকেই দিতে হবে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

বাংলাদেশ প্রতিদিন থেকে।

 

Print Friendly

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.