গৌরবের বিজয়ের মাস শুরু

(Last Updated On: ডিসেম্বর ১, ২০১৭)
শান্তা মারিয়া,‘শাবাশ বাংলাদেশ/এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়/জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার/তবু মাথা নোয়াবার নয়।’ ডিসেম্বর বাঙালির জীবনে গৌরবের মাস। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিশ্ব মুগ্ধ হয়ে শুনেছিল বাঙালির অপরিসীম বীরত্বের অমর সংগীত। বিশ্ব মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটেছিল নতুন এক রাষ্ট্রের। বাংলার মুক্ত আকাশে উড়েছিল লাল-সবুজ পতাকা। বাঙালি জাতির ইতিহাসে এ এক অবিস্মরণীয় গৌরব।

বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ বাংলাদেশ। নদীবিধৌত এ পললভূমিতে সুপ্রাচীনকাল থেকেই মানববসতি গড়ে ওঠে। মহাভারতে বঙ্গদেশের উল্লেখ রয়েছে। বঙ্গের রাজা তার হস্তিবাহিনী নিয়ে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। গাঙ্গেয় ভূমিতে গঙ্গাহৃদি বা গঙ্গাহৃদয় নামে রাজ্যের কথা গ্রিক ঐতিহাসিকদের লেখায় পাওয়া যায়। এ রাজ্যের অধিবাসীরা অর্থাৎ গঙ্গারাইডিসরা ছিল দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। দিগি¦জয়ী আলেকজান্ডারও সেই গঙ্গারাইডিসদের ভয়ে এ অঞ্চল জয় করতে সাহসী হননি। প্রাচীন যুগে উত্তরবঙ্গে গড়ে ওঠে পু-্রনগরী। পু-্রবর্ধনের সভ্যতা প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরনো। পাহাড়পুর, ময়নামতিতেও বাংলাদেশের প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন পাওয়া যায়। বাংলাদেশ নামক যে ভূখ-ে আমাদের বসতি প্রাচীন যুগে, তা ছোট ছোট সামন্তরাজ্যে বিভক্ত ছিল। রাঢ়, সমতট, গৌড়, হরিকেল, পু-্র, বঙ্গ, চন্দ্রদ্বীপ ইত্যাদি বেশ কয়েকটি রাজ্য ছিল। চন্দ্রকোট নামের প্রাচীন দুর্গনগরীর কথা রয়েছে ইতিহাসে।

পাল আমলে বাংলার জনগণ বেশ শান্তি ও সমৃদ্ধির মধ্যে ছিল। বাংলার পাঠান বা তুর্কি সুলতানরাও ছিলেন স্বাধীন। সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ, ফখরুদ্দিন মোবারক শাহের আমলে বাংলাদেশ স্বাধীন ছিল। পরবর্তীকালে মোগল শাসনের বিরুদ্ধে বাংলার বারোভূঁইয়া বা সামন্ত নৃপতিরা সংগ্রাম করেছেন। মোগল ও ইংরেজ আমলে সুবে বাংলা ও বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি ছিল বিদেশি শাসকের অধীনে। ১৯৪৭ সালে ইংরেজ বিদায় হলেও নতুন প্রভু হয়ে আসে পশ্চিম পাকিস্তানিরা। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার জনগণের ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর যেমন ক্রমাগত আঘাত হানে, তেমনি তারা অর্থনৈতিক শোষণও চালাতে থাকে। ১৯৪৮ ও ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ষাটের দশকে ছয় দফা আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলার মানুষ পাকিস্তানি শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে থাকে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে উত্তাল হয়ে ওঠে পূর্ব বাংলা। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পরও পাকিস্তানি সামরিক জান্তা বাঙালির প্রাণের নেতা বঙ্গবন্ধুকে সরকার গঠন করতে দেয়নি। ন্যায্য দাবিতে দানা বাঁধে আন্দোলন।

৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার জন্য বাঙালিকে প্রস্তুত করে তোলেন। বাঙালিকে নিশ্চিহ্ন করতে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে বাংলার নিরস্ত্র বেসামরিক জনগণের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। অপারেশন সার্চলাইট নামে বিশ্বের নিষ্ঠুরতম গণহত্যা শুরু হয়। পোড়ামাটির নীলনকশা অনুযায়ী সারা পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানি সেনারা ব্যাপক হারে চালায় হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ ও ধ্বংসযজ্ঞ। বাঙালি নারীকে গণধর্ষণের মাধ্যমে তারা নতুন পাকিস্তানি গোলামের জাতি তৈরির উদ্ভট প্রক্রিয়ায় মেতে ওঠে। ঘরে ঘরে ঢুকে হত্যা করা হয় জনসাধারণকে। বঙ্গবন্ধুকে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে।
এদিকে মাতৃভূমি রক্ষায় বাংলার জনগণ জনযুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। গঠিত হয় মুজিবনগর সরকার। গঠিত হয় মুক্তিবাহিনী। সীমান্তের দিকে নামে শরণার্থীদের ঢল। মুক্তিবাহিনীর পাল্টা আক্রমণে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী পরাজিত হতে থাকে। কলকাতায় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার বহির্বিশ্বের কাছে তুলে ধরে পাকিস্তানি বাহিনীর অপকর্ম। আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে ওঠে বাঙালির পক্ষে। গঠিত হয় ভারত-বাংলাদেশ মিত্রবাহিনী। ডিসেম্বরের শুরু থেকেই পাকিস্তানি দখলদাররা পরাজিত হতে থাকে। মুক্ত হতে থাকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল।

পাকিস্তানি ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামসের ঘাতক-জল্লাদরা ডিসেম্বরে মরণ আঘাত হানে বাংলায়। তারা এ দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে। তবে ঘাতক বাহিনীর শত পৈশাচিক কর্মকা-েও মুক্তিকামী বাঙালিকে দমিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়ায় নতুন রাষ্ট্র স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। হাজার বছরের পরাধীনতার পর বাঙালি পায় তার নিজস্ব স্বাধীন দেশ। আবার এ মাসেই জাতি হারায় তার শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের। ডিসেম্বর তাই আমাদের গৌরবের ও বেদনার মাস। সর্বোপরি ডিসেম্বর বাঙালির ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় ও বরণীয় মাস। এই মাস আমাদের মুক্তির, বিজয়ের। জাতি তাই পরম শ্রদ্ধায় বিজয় দিবসে স্মরণ করে ত্রিশ লাখ শহীদ এবং দুই লাখ যুদ্ধাহত নারীকে। স্মরণ করে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও চার জাতীয় নেতাকে। জাতি শ্রদ্ধা জানায় মুক্তিযোদ্ধাদের অসীম বীরত্ব ও আত্মত্যাগের প্রতি।

আমাদের সময় ।

Print Friendly

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.