দেশব্যাপী চাপা উত্তেজনা, খালেদার মামলার রায়

(Last Updated On: ফেব্রুয়ারি ৭, ২০১৮)

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় ঘোষণা করা হবে আগামীকাল ৮ ফেব্রুয়ারি  বৃহস্পতিবার। চলতি বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত হবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। জাতীয় এই নির্বাচনের আগে বিএনপির শীর্ষনেত্রীর রায় ঘিরে দেশজুড়ে বিরাজ করছে চাপা উত্তেজনা। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর রায় ঘিরে সারা দেশে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। এদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও বিএনপিকে প্রতিহত করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রধান দুই প্রতিপক্ষের পাল্টাপাল্টি এই অবস্থানের মধ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যারপরনাই তৎপর হয়ে উঠেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ইতোমধ্যে সারা দেশ থেকে বিএনপির সহস্রাধিক নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে। সব মিলিয়ে গোটা দেশে এক ধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। রাজধানীর প্রতিটি প্রবেশমুখে বসানো হয়েছে তল্লাশি চৌকি। এছাড়া নগরীর আবাসিক হোটেলগুলোতেও চলছে অর্ভিযান।
এদিকে গতরাতে সর্বশেষ প্রাপ্ত সংবাদ থেকে জানা গেছে, বিএনপির নয়াপল্টনস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয় ঘিরে রেখেছে পুলিশ। ভেতরে অবরুদ্ধ অবস্থায় আছেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
আগামীকাল রাজধানীর বকশিবাজারে বিশেষ জজ আদালত ৫-এ খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার কথা রয়েছে। বকশিবাজারসহ পুরো ঢাকা শহরে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। রায় কেন্দ্র করে নাশকতা এড়াতে ঢাকা শহরের বিভিন্ন চেকপয়েন্টে বেড়েছে পুলিশি তল্লাশি। গত কয়েক দিনে বিএনপির হাজারখানেক নেতাকর্মীকে আটকও করেছে পুলিশ। জেলা প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, রায় কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে সাতক্ষীরায় ১২৬, রাজশাহীতে ৯৫, কুমিল্লায় ৮০, খাগড়াছড়িতে ৩২, নেত্রকোনায় ২৩, সুনামগঞ্জে ২১, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১৮, রাঙামাটিতে ১৮, গাইবান্ধায় ১৬, চুয়াডাঙ্গায় ১৬, সিলেটের বালাগঞ্জে ১৬, জামালপুরের ইসলামপুরে ৪ ও সরিষাবাড়ীতে ২, বগুড়ার সান্তাহারে ১২, গাজীপুরের শ্রীপুরে ৮, শেরপুরের শ্রীবরদীতে ২, যশোরের চৌগাছায় ২, বাগেরহাটের ফকিরহাটে ৬, নরসিংদীর রায়পুরায় ১২, কক্সবাজারের চকরিয়ায় ৫, মাদারীপুরে ৯, চট্টগ্রামের চন্দনাইশে ২ জনকে আটক করেছে পুলিশ।
বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভীর অভিযোগ, গত ২৮ জানুয়ারি থেকে গতকাল বিকাল পর্যন্ত বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বরচন্দ্র রায়, কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেলসহ সারা দেশ থেকে ১২ শতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ভাষ্যÑ যাদের আটক করা হয়েছে, তারা সবাই অপরাধী। কোনো দলের নেতাকর্মীকে আটক করেনি পুলিশ।
অপরদিকে বিশেষ ক্ষমতাবলে রায়ের দিন ঢাকা শহরে সব ধরনের মিছিল-মিটিং নিষিদ্ধ করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। প্রতিক্রিয়ায় গতকাল বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ নিষেধাজ্ঞাকে ‘আইনের নামে অনাচার’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে এর নিন্দা জানানো হয়েছে।
এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, বৃহস্পতিবার ভোর ৪টা থেকে পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত ঢাকা শহরে সকল প্রকার মিছিল এবং ছুরি-লাঠির মতো অস্ত্র বহন নিষিদ্ধ। খালেদা জিয়ার মামলার কথা উল্লেখ না করে ডিএমপি কমিশনার আরও বলেন, বিচারাধীন একটি মামলার রায় কেন্দ্র করে ঢাকা মহানগরীতে কোনো কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অরাজকতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টির মাধ্যমে জননিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা বিঘেœর অপপ্রয়াস ঘটাতে পারে।
পুলিশের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগেও নেওয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। গত কয়েক দিন দফায় দফায় বৈঠক করেছেন দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা। সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার আওয়ামী লীগের ধানম-ি কার্যালয়ে দলের সব সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদকম-লীর সদস্যরা। বৈঠকে সকলকে নিজ নিজ অবস্থানে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়। বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, খালেদা জিয়ার মামলার রায় কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ সতর্ক পাহারায় থাকবে আজ থেকে। যে কোনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে জনগণের জান-মাল রক্ষার প্রয়োজনে পুলিশকে সহযোগিতা করবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, আমরা ক্ষমতায় আছি। আমরা দায়ে পড়ে কেন অশান্তি ডেকে আনব; কিন্তু বিএনপির নেতাকর্মীরা যদি উসকানি দেয়, যদি হাইকোর্টের সামনে পুলিশের প্রিজনভ্যানে হামলার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, তা হলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে। প্রয়োজনে জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা রক্ষায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও পাশে থাকবে।
এদিকে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রায়ের দিন ভোর থেকেই ঢাকাসহ সারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান নেবেন দলটির নেতাকর্মীরা। সন্দেহজনক কাউকে দেখলেই তাকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেবেন তারা। যেহেতু খালেদা জিয়ার রায় ঘোষণা হবে পুরান ঢাকার বকশিবাজার অর্থাৎ ঢাকা সিটি করপোরেশন দক্ষিণের এলাকা থেকে, সে কারণে ওই অঞ্চলে নেওয়া হয়েছে বাড়তি সতর্কতা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ আমাদের সময়কে বলেন, আমাদের নেতাকর্মীরা প্রতিটি মোড়ে অবস্থান করবে। আমরা থাকব বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে, দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। কোথাও বিশৃঙ্খলা দেখলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করবেন আমদের নেতাকর্মীরা। ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট বলেন, কেন্দ্র থেকে বিশেষ নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত আমাদের নেতাকর্মীর রায়ের দিন সকাল থেকেই পাড়া-মহল্লা-ওয়ার্ডে নিজ নিজ এলাকায় অবস্থান করবেন। জনগণের জান-মাল রক্ষায় জনগণের পাশে থাকবেন তারা। ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসাইন বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাজধানীর সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে থাকবে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। শুধু ঢাকায় নয়, সারা দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবং জেলা পর্যায়েও সতর্ক অবস্থানে থাকতে বলা হয়েছে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, খালেদা জিয়ার রায় কেন্দ্র করে যে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খল ঘটনার বিপক্ষে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি চান না আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়–ক। তাই সার্বিক পরিস্থিতি দেখভালের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপরই দেওয়া হয়েছে। পুরো বিষয়টিই প্রশাসনিকভাবে মোকাবিলা করতে চান আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা। এ বিষয়ে দলটির জ্যেষ্ঠ নেতা তোফায়েল আহমেদ গতকাল বলেন, খালেদা জিয়ার রায় ঘোষণার দিন নিরাপত্তার জন্য রাস্তায় পুলিশ মোতায়েন থাকবে। আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মী রাস্তায় নামবেন না।
আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড থেকে দলের নেতাকর্মীদের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করার নির্দেশ দেওয়া হলেও দলটির কিছু অতিউৎসাহী নেতাকর্মী রায়ের দিন ঝামেলায় জড়িয়ে পড়তে পারেনÑ এমন আশঙ্কাও রয়েছে ক্ষমতাসীন দলে।
অপরদিকে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে নেতিবাচক রায় ঘোষণা হলে দলটির কর্মী ও সমর্থকদের আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখা নিয়ে চিন্তিত বিএনপি। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা মনে করেন, এই মুহূর্তে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা হচ্ছেন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এই জনপ্রিয়তাই কাল হয়েছে খালেদা জিয়ার জন্য। তাই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার তাকে রাজনীতি ও নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে চাইছে। এই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে ভিত্তিহীন মামলায় সাজা দিতে সব আয়োজন সম্পন্ন করেছে সরকার। ক্ষমতাসীন সরকারের মন্ত্রী-এমপি ও নেতাদের কথা থেকেই বোঝা যাচ্ছে খালেদা জিয়াকে সাজা দেওয়া হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, আমরা গণতন্ত্রের রীতির বাইরে কোনো পথ গ্রহণ করব না। কারণ গণতন্ত্রের কৃতিত্ব তো বিএনপির, সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার। সুতরাং আমরা গণতান্ত্রিক রীতির মধ্যে, গণতান্ত্রিক পদ্ধতির মধ্যে, গণতন্ত্রের আওতার মধ্যে আমরা যতটুকু প্রতিবাদ করার ততটুকুই করব।
তিনি আরও বলেন, রায় কেন্দ্র করে এত অত্যাচার-গ্রেপ্তারের পরও খালেদা জিয়ার কর্মসূচিতে মানুষ যাচ্ছে, দাঁড়াচ্ছে। এই যে মহাসমুদ্রের জনতার মধ্যে দেশনেত্রীর জনপ্রিয়তা, সেই জনপ্রিয়তায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করলেও সেই পানি শুকাবে না। সেই পানি আরও বাড়তে থাকবে। নিপীড়ন-নির্যাতন যাই করুক, যত অত্যাচারই করুক, সমস্ত কর্কশে, কঠিনে, সিমেন্টে, কংক্রিটে, ইটে-কাঠে-পিঠে-পাথরে, দেয়ালে-দেয়ালে বেজে উঠছে এক দুর্বার উচ্চারণ, এক প্রত্যয়ের তত্ত্ব সংশোধনীÑ আমার নেত্রী, আমার মা বন্দি হতে দেব না, এটা এখন আওয়াজ সারা বাংলাদেশে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য জানান, রায়ের দিন দলটি শান্তিপূর্ণভাবে রাজপথে অবস্থান করতে চায়; কিন্তু সরকার যেভাবে অত্যাচার চালাচ্ছে তাতে করে সাধারণ কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে বলে মনে করছেন তারা। সরকার যদি কঠোর অবস্থান থেকে সরে না আসে, নেতিবাচক রায়ের পর পরিস্থিতি ও পরিণতি কোন দিকে যাবে, এটি নিয়ে আমরাও চিন্তিতÑ বলেছেন বিএনপির একাধিক নেতা। তারা যোগ করেনÑ সাধারণ কর্মী ও সমর্থকদের যে আবেগ, এরই মধ্যে রায়ের দিন রাজধানীতে ডিএমপির সব ধরনের মিছিল-মিটিংয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করায় এই চিন্তা আরও বেড়ে গেছে।
অপরদিকে খালেদা জিয়ার রায়ে বাস চলাচলে কোনো প্রভাব ফেলবে না বলে জানিয়েছেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। আগামীকাল ঢাকা শহরে নাশকতা ঠেকাতে গজারি হাতে অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ঢাকা বাস মালিক-শ্রমিকরা। গতকাল বিকালে ঢাকায় বাস-মালিক সমিতির কার্যালয়ে এক যৌথ সভায় এ ঘোষণা দেওয়া হয়। ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েতউল্লাহ বলেন, বৃহস্পতিবার স্বাভাবিকভাবে বাস চলবে। এমনকি দূরপাল্লার বাসও চলবে। রায়ে খালেদা জিয়ার জেল হলে বিএনপি যদি হরতালের ঘোষণা দেয়, তবু বাস চলাচল স্বাভাবিক থাকবে।

dainikamadershomoy.com

Print Friendly

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.