মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধা নাহাকে মুক্তি দিন

(Last Updated On: মার্চ ১৮, ২০১৮)

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম: রাখাল চন্দ্র নাহা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। মোটেই ভুয়া নয়। তার প্রমাণ সে আজ ২৩ বছর যাবৎ কারাগারে বন্দী। দেনদরবার করার তেমন কেউ নেই। তবু প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা বলে এমনিতেই তালিকাভুক্ত হয়েছে। ২০০৮ সালে ওয়ান-ইলেভেনের সময়ের কথা। এক সন্ধ্যায় ১০-১২ জন ছেলেমেয়ে মোহাম্মদপুরের বাসায় এসেছিল। আমি তাদের কাউকে চিনতাম না। তারা কেউ রাখাল চন্দ্র নাহাকে চিনত না।

পত্রিকায় খবর বেরিয়েছিল, আগামীকাল গভীর রাতে কুমিল্লা কারাগারে রাখাল চন্দ্র নাহা নামে এক বীর মুক্তিযোদ্ধার ফাঁসি হবে। এখন সরকারি কর্তৃপক্ষ ধরেই নিয়েছে সব অপরাধে এক শাস্তি— ফাঁসি। ফাঁসি কোনো শাস্তি নয়, ফাঁসি সর্বৈব এক অসভ্যতা। আমাদের মধ্যে যেদিন আবার মানবতা জাগবে সেদিন আমরা বুঝতে পারব। অযোগ্য শাসকদের কারণে অস্থির পৃথিবীতে দাঙ্গা-হাঙ্গামা, খুন-খারাবি বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই অধৈর্য হয়ে ফাঁসি আর ফাঁসি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু ফাঁসি কোনো সমস্যার সমাধান নয়। পৃথিবীর বহু স্থানে বহু ক্ষেত্রে এর নজির রয়েছে। একসময় অনেক দেশ থেকে ফাঁসির প্রচলন উঠে গিয়েছিল। এখনো পৃথিবীর কিছু কিছু দেশে মৃত্যুদণ্ড কল্পনারও বাইরে। কিন্তু আমাদের দেশে বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর ফাঁসির যেন মহামারী লেগেছে।

যে কারণে কুমিল্লার দেবিদ্বারের রাখাল চন্দ্র নাহা একটি ষড়যন্ত্রমূলক খুনের মিথ্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিল। বিচার-আচার হয়ে গেলে অনেক আসামি জেলখানায় সত্য কথা বলে। সব দিক থেকে জেনে-শুনে নাহার এই মামলা মিথ্যা মামলা বলছি। কারণ আমি তার গ্রামে গেছি, বাদীপক্ষের উকিলের সঙ্গে কথা বলেছি, যিনি বিচারে ফাঁসি দিয়েছিলেন ভাগ্যচক্রে তাকেও দেখেছি, কথা বলেছি। সাক্ষ্য-প্রমাণ যাই হোক নাহা এর সঙ্গে জড়িত ছিল না। সত্য হোক মিথ্যা হোক একজন মুক্তিযোদ্ধার ফাঁসির আদেশের কথা শুনে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ-তরুণীরা এসেছিল তার প্রাণ রক্ষার জন্য।

একজন মুক্তিযোদ্ধার প্রতি তাদের মমতা দেখে আমি বিচলিত হয়েছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে মহামান্য রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎ প্রার্থনা করেছিলাম। তখন অধ্যাপক ইয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ ছিলেন রাষ্ট্রপতি। যে যাই বলুন যত দোষই দিন প্রবীণ শিক্ষকরা হন পিতার মতো। আমি গেলে তিনি খুব আগ্রহ নিয়ে জানতে চান কেন তার কাছে গেছি, আমার জন্য কী করতে পারেন। দিন শেষে গভীর রাতে নাহার ফাঁসির কথা মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে জানালে তার আসন থেকে উঠে এসে আমার হাত চেপে ধরে বলেছিলেন, ‘সিদ্দিকী সাহেব! আপনি এসেছেন একজন মুক্তিযোদ্ধার প্রাণ বাঁচাতে। এতে আমার বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই। আপনি তো জানেন, আমার কিছুই করার নেই। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দণ্ড মওকুফের আবেদন এলে আমি শুধু তাতে স্বাক্ষর করতে পারি। আপনি যদি সত্যিই লোকটির জীবন বাঁচাতে চান তাহলে সেনাপ্রধানকে বলুন। তারাই সব।’ মহামান্য রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে সেনাপ্রধানকে ফোন করেছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে তিনি বলেছিলেন, আপনি আসতে চাইলে সময় বেঁধে দিই কী করে? আপনি বঙ্গভবনে আছেন। আসতে যতক্ষণ আসুন। অপেক্ষায় থাকব।’

কতক্ষণ আর হবে, ৪০-৫০ মিনিটে সেনা সদরে পৌঁছেছিলাম। আরও দু-তিন বার সেনা সদরে গেছি। প্রথম গিয়েছিলাম ’৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর সকাল ১০টায় হানাদার সেনাপতি টাইগার আমির আবদুল্লাহ নিয়াজিকে বন্দী করতে। দ্বিতীয়বার মাহবুবুর রহমান তখন সেনাপ্রধান। তার সঙ্গে সপরিবারে দেখা করতে। তৃতীয়বার মইন উ আহমেদের সঙ্গে। আমি যেতে যেতেই তিনি আরও আট-নয় জন জেনারেলকে ডেকেছিলেন। তারা অসাধারণ সৌজন্য দেখিয়েছেন। বিশেষ করে মইন উ আহমেদ অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে বলেছিলেন, ‘কোনো মানুষের জীবন যাক তা আমরাও চাই না। বিশেষ করে কোনো মুক্তিযোদ্ধার। আপনি এসেছেন, আপনাকে নিয়ে আমরা গর্ব করি। ফাঁসির দণ্ড মওকুফ হলে আমরাও আনন্দিত হব।’ বলেছিলাম, তাহলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রধান উপদেষ্টা এবং বঙ্গভবনে আপনাদের মনোভাব জানিয়ে দিন। তারা সেই মুহূর্তেই মৌখিক এবং লিখিত তাদের ইচ্ছা জানিয়ে ছিলেন।

সেনা সদর থেকে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে গিয়েছিলাম। তাকে আমার খুবই নম্র-ভদ্র শালীন মনে হয়েছিল। অনেক ছোটাছুটি করে সন্ধ্যার একটু আগে বাড়ি ফিরেছিলাম। স্ত্রী ছিলেন উদ্বিগ্ন। আমি সাধারণত দেরি করে বাড়ি ফিরি না, দেরি করে খাই না। আমার শুকনো মুখ দেখে স্ত্রী জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তোমাকে অমন লাগছে কেন? বলেছিলাম, একজন মুক্তিযোদ্ধার ফাঁসি হবে। তাকে রক্ষার জন্য সারা দিন ছোটাছুটি করলাম। সবাই মুখে মুখে ‘হ্যাঁ হ্যাঁ’ করল। কিন্তু কাজের কাজ কতটা হবে বুঝতে পারছি না। সূর্য অস্ত গেলে মধ্যরাতে একজন অসহায় নিরীহ মুক্তিযোদ্ধা এই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে যাবে— ভালো লাগছে না। দিন শেষে রাত এলো, কিন্তু কোনো খবর এলো না। শুনেছিলাম, ১২টার পর দণ্ড কার্যকর হবে। তখন ঘড়িতে ৯টা। দু-তিন বার রাষ্ট্রপতি ভবনে ফোন করেছি। প্রধান উপদেষ্টার দফতর, সেনাপ্রধানের দফতরে ফোন করেছি। তারা হবে হচ্ছে বলছেন। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট ঘোষণা আসেনি। রাত ১০টায় যখন ধৈর্যের বাঁধ প্রায় ভেঙে যাওয়ার পথে তখন হঠাৎ বঙ্গভবন থেকে ফোন এলো। রাখাল চন্দ্র নাহার ফাঁসি স্থগিত করা হয়েছে।

খবরটি বুকের ভিতর এক অকল্পনীয় অনাবিল নির্মল আনন্দ সৃষ্টি করেছিল। ’৭১-এর ১৬ ডিসেম্বরের মতো মনে হচ্ছিল যখন নিয়াজির দফতরে আমাদের সামনে মাথা নত করে বসে ছিল, যখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আত্মসমর্পণ পত্রে স্বাক্ষর করছিল সেই দুর্লভ মুহূর্তগুলোর মতো।

একদিন পর কুমিল্লা কারাগারে গিয়ে রাখাল চন্দ্র নাহাকে দেখে এসেছিলাম। গেটের বাইরে একদল কারারক্ষী চমৎকার গার্ড অব অনার দিয়েছিল। কদিন আগে ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে এ নিয়ে কথা হচ্ছিল। তিনি বলছিলেন, আপনাকে ওভাবে গার্ড অব অনার দিয়ে কারা কর্তৃপক্ষ গর্বিত হয়েছে। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল বলে এটা সম্ভব হয়েছে। আওয়ামী লীগ-বিএনপির সরকার হলে সম্ভব হতো না। কথাটা একেবারে মিথ্যা নয়। আমার ওসব নিয়ে কোনো আগ্রহ নেই, আমার আগ্রহ কাজ করার। নাহাকে দেখে খুব ভালো লেগেছিল। খুব সম্ভবত সেদিন মৌলভীবাজারের ’৭৫-এর প্রতিরোধসংগ্রামী তরুণের বিয়েতে অংশ নিয়েছিলাম। ফিরেছিলাম পরদিন অনেক রাতে। বড় ভালো লেগেছিল একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার জীবন বেঁচে যাওয়ায়।

১৯৯৮-এর একেবারে শেষে বা ’৯৯-এর শুরুতে নাহার এক প্রতিবেশী খুন হয়। রাখাল চন্দ্র নাহা তখন বাড়ি ছিল না। তার ধারণাও ছিল না তাকে আসামি করা হবে। কিন্তু ২৬.০২.১৯৯৯ সালে তাকে হঠাৎই গ্রেফতার করা হয়। কুমিল্লা জজ কোর্টে তার নামে মিথ্যা খুনের মামলা চলে। চার বছর মামলা চলার পর ০২.০১.২০০৩ সালে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। একটা মানুষ কত দরিদ্র এবং অসহায় হলে জজ কোর্টের ফাঁসির আদেশের বিরুদ্ধে আপিল পর্যন্ত করেনি! ফাঁসির দণ্ড মাথায় নিয়ে সেই কারাদণ্ড ভোগ করতে থাকাকালে ২৫.০৬.২০০৮ সালে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সিদ্ধান্ত হয়। ফাঁসির মঞ্চ সাজিয়ে, আলো জ্বালিয়ে সবকিছু ঠিকঠাক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কুমিল্লা কারাগারকে প্রস্তুত করা হয়। এই খবর বেশ কটি পত্রপত্রিকায় ছাপা হলে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০-১২ জন ছেলেমেয়ে ছুটে আসে আমার কাছে। একজন মুক্তিযোদ্ধার ফাঁসি হবে— এ কথা শুনে খুবই মর্মাহত হয়ে রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধান, প্রধান উপদেষ্টার কাছে ছোটাছুটি করে তার ফাঁসির দণ্ড রোধ করেছিলাম। কী দেশে বাস করি!

ফাঁসির দণ্ড মওকুফ করে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়নি, তাকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন। সে জেলই খাটছিল। হঠাৎ অসুখের কথা শুনে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়েছিলাম। সপরিবারে রাখাল চন্দ্র নাহাকে দেখে বেশ খুশি হয়েছি। কারা কর্তৃপক্ষ তাকে বেশ আদরযত্ন করে। কিন্তু একসময় সিদ্ধান্ত হয়েছিল সব মুক্তিযোদ্ধা কয়েদি-হাজতিকে ডিভিশন দেওয়া হবে। কিন্তু তাকে তা দেওয়া হয়নি। ভেবেছিলাম, একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রপতির কাছে মার্জনা চাইব। কিন্তু কারাগারে গিয়ে শুনলাম তিন বছর আগেই তার যাবজ্জীবন কারাবাসের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। তবু সে মুক্তি পায়নি। এই হলো মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি আমাদের আচরণ! আগে যাবজ্জীবন ছিল ২০ বছর। কারাগারে ভালো আচরণ করলে ১২ বছরে মুক্তি পেত।

বিচারপতি সাহাবুদ্দীন সাহেব হঠাৎই অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। তিনি জীবনে জেলে যাননি, যাবেনও না। তাই মানুষের কষ্ট বোঝেননি। তিনি যাবজ্জীবনের সাজা বৃদ্ধি করে ২০ বছরের স্থলে ৩০ বছর করেছিলেন। সেই ৩০ বছর মেয়াদে ভালোভাবে ২০ বছর সাজা খাটলেই সব সাধারণ কয়েদি মুক্তি পায়। সেই হিসেবে রেয়াতসহ নাহার মুক্তির সুপারিশ করা হয়েছে ০৩.০৮.২০১৫ সালে। অথচ সে মুক্তি পায়নি। তাই মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে সাজা মওকুফের আবেদন না করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে রাখাল চন্দ্র নাহাকে অনতিবিলম্বে মুক্তির অনুরোধ জানিয়েছি। যেখানে মুক্তি তার প্রাপ্য সেখানে মুক্তি না দিয়ে তাকে কারাগারে বন্দী রেখে সরকারের অপরাধের বোঝা দিনের পর দিন বাড়ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাকে তাত্ক্ষণিক মুক্তি দিয়ে সেই পাপের বোঝা লাঘব করতে পারেন।

বিনা অপরাধে কাউকে কারাগারে রাখা যায় না এটাই সভ্যতার বিধান। তাই অনুরোধ জানিয়েছি। স্বাধীনতার পরপর দালাল আইনে খুলনার খান এ সবুর খান বন্দী ছিলেন। ব্যাপারটা বঙ্গবন্ধুকে জানালে পরদিনই তিনি তাকে মুক্তি দিয়েছিলেন। সবুর খান তো ছিলেন পাকিস্তানের কোলাবরেটর। কিন্তু রাখাল চন্দ্র নাহা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তাই তার আশু মুক্তি প্রয়োজন। আশা করব, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা রাখাল চন্দ্র নাহাকে অনতিবিলম্বে মুক্তি দিয়ে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানবীর তালিকায় নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করবেন।

লেখক : রাজনীতিক।
সূত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন 

Print Friendly

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.