প্রশাসনে বিএনপি পন্থিদের এখনও সুদিন

(Last Updated On: মার্চ ১৮, ২০১৮)

সমকাল:  বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলেও পেয়েছেন সময়মতো পদোন্নতি ও ভালো পদায়ন। ওই আমলে জনপ্রশাসন (সংস্থাপন) সচিবের একান্ত সচিব ছিলেন। ছাত্রজীবনের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। বর্তমান সরকারের আমলে হয়েছেন একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সচিব। আর সচিব হওয়ার পেছনে বড় যোগ্যতা- তার ভাই সরকারের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা ছিলেন।

শুধু তিনি নন, প্রশাসনে এমন প্রায় ২০ জন সচিব রয়েছেন, যারা বিএনপি আমলে খুব প্রভাবশালী কর্মকর্তা ছিলেন। বর্তমান সরকারের আমলেও কমেনি তাদের প্রভাব। উল্টো প্রশাসনের শীর্ষ পদে বসেছেন তারা। অথচ ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, চাকরিতে এসে আওয়ামী সমর্থক কর্মকর্তা হিসেবে বিএনপি আমলে বারবার পদোন্নতিবঞ্চিত হয়েছেন, আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে যার যার অবস্থান থেকে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির জন্য কাজ করেছেন এমন অনেক কর্মকর্তা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। তালিকায় প্রথমদিকে থেকেও তারা সচিব হতে পারছেন না। আবার যারা সচিব হয়েছেন তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কম গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে। প্রশ্ন উঠেছে- ইতিমধ্যে ভালো অবস্থানে থাকা বিএনপি সমর্থিত কর্মকর্তাদের আগামী নির্বাচনে ভূমিকা কী হবে? তারা বাতাস বুঝে আবার ভোল পাল্টাবেন বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্নিষ্টরা। তাদের মতে, পরিস্থিতি বিপাকে গেলে পরীক্ষিত কর্মকর্তারা আর সরকারের পাশে থাকবেন না।

তারা নিজেদের পিঠ বাঁচানোর জন্য নীরব থাকবেন। অন্যদিকে সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের খুঁজে পাওয়া যাবে না।

প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তার অভিযোগ, আগামী সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রশাসন সাজানোর অজুহাতে সুবিধাভোগী ও অযোগ্য কর্মকর্তাদের দপ্তর, অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে পদায়ন করা হচ্ছে। অথচ যোগ্য কর্মকর্তা যথাস্থানে পদায়ন না হওয়ায় জনপ্রশাসন তাদের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। এ ছাড়া একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যাদের জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার তালিকা করা হয়েছে, তাদের অধিকাংশই ছাত্রদল ও শিবির অনুগত কর্মকর্তা। কাদের ইশারায় এই তালিকা করা হয়েছে- সরকারের নীতিনির্ধারকরাও জানেন না বলে জানা গেছে।

২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে জনপ্রশাসন পরিচালনার লক্ষ্যে কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করেছিল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার। মূল লক্ষ্য ছিল- প্রশাসনকে গতিশীল করা; যোগ্য, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের যথাস্থানে পদায়ন ও ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। ব্যক্তি সখ্যকে প্রাধান্য দিয়ে অযোগ্যদের পদোন্নতি ও ভালো জায়গায় পদায়ন করা হচ্ছে। দ্বিতীয় মেয়াদের শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের চার বছরে জনপ্রশাসনে সচিব থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে কয়েক দফা পদোন্নতি ও পদায়ন হয়েছে। এ ক্ষেত্রে স্বাধীনতার পক্ষের কর্মকর্তাদের বঞ্চিত করে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে চিহ্নিত সুবিধাভোগীদের অবস্থান সুসংহত করা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, প্রশাসনের কাজের গতি পর্যবেক্ষণে কোনো তদারকি সেল নেই। যে কারণে সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের ইশারায় সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। পরোক্ষভাবে জামায়াত-বিএনপি ঘরানার কর্মকর্তাদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে। সচিব পদ শূন্য হলে শুধু শূন্যস্থান পূরণ করার কাজ করছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। একজন অতিরিক্ত সচিবকে দেওয়া হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ ওই সচিবের দায়িত্বে। অথচ দীর্ঘদিন সচিব হিসেবে কম গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ভালোভাবে কাজ করলেও তাদের অবস্থানের পরিবর্তন হচ্ছে না। তারা আগের জায়গায় থাকলেও তাদের জুনিয়র কর্মকর্তাদের দেওয়া হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। আবার অতিরিক্ত সচিবদের মধ্য থেকে যাদের ওই দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে তারা ওই পদের যোগ্য কি-না, তারও কোনো হিসাব-নিকাশ নেই। কতিপয় সিনিয়র কর্মকর্তার সঙ্গে যাদের সুসম্পর্ক তাদেরই দেওয়া হচ্ছে ওই পদের দায়িত্ব।

সূত্র জানায়, দ্বিতীয় মেয়াদের মহাজোট সরকারের কতিপয় কর্মকর্তার একচ্ছত্র ক্ষমতার কারণেই কর্মকর্তাদের পদায়ন ও পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় বিভাজন তৈরি হয়েছে। তাদের পছন্দের ব্যক্তিদের চুক্তি, পদোন্নতি ও পদায়ন হয়ে আসছে। তারাই প্রধানমন্ত্রীকে বুঝিয়ে নিজেদের পছন্দনীয় কর্মকর্তাদের এসব জায়গায় পদায়ন দিয়ে আসছেন। এক্ষেত্রে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের ডিও আমলে আনা হচ্ছে না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় গুরুত্বপূর্ণ অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন ঢিমেতালে চলছে। ফলে বর্তমানে বড় বড় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের পারফরম্যান্স নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।

তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে নৌপরিবহনমন্ত্রী প্রয়াত কর্নেল (অব.) আকবরের একান্ত সচিব হারুনুর রশিদ এখন বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক। বর্তমান সরকারে আমলে পদোন্নতি পেয়েছেন দুই দফা। এখন তিনি সচিব হওয়ার দৌড়ে রয়েছেন।

বিএনপির যোগাযোগমন্ত্রী কর্নেল (অব.) অলি আহমদের একান্ত সচিব দেওয়ান হুমায়ন কবির এখন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক। সম্প্রতি ৮৫ ব্যাচের এমন ৫ কর্মকর্তাকে সচিব পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যারা বিএনপি আমলে পালন করেছেন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব; পেয়েছেন সময়মতো পদোন্নতিও। উল্টো ওই ব্যাচের পরীক্ষিত মেধাবী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত কাউকেই এখনও সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।

শুধু ওই ব্যাচই নয়; ২০০৮ সালে নির্বাচনের আগে যেসব কর্মকর্তা আওয়ামী লীগের নির্বাচনী সেলকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন, ওই কর্মকর্তাদের ভাগ্যেরও কোনো পরিবর্তন হয়নি। ওইসব কর্মকর্তার কেউ কেউ সচিব হলেও কাজ করছেন কম গুরুত্বপূর্ণ পদে।

সূত্র জানায়, চারদলীয় জোট সরকারের আমলে দুটি গুরুত্বপূর্ণ জেলার ডিসি ও একটি বিভাগের কমিশনার ছিলেন এমন কর্মকর্তা রয়েছেন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে। এ ছাড়া ঢাকা জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব এখন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্বে রয়েছেন। চারদলীয় জোটের আমলে কুড়িগ্রামে ডিসি ছিলেন; যার বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হয়রানি করার ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে তিনি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ৮৪ ব্যাচের একজন মহিলা কর্মকর্তার পুরো পরিবারের রাজনৈতিক আদর্শ নিয়ে প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও তিনি এ সরকারের আমলে সচিব হয়েছেন। অথচ ওই ব্যাচের একাধিক কর্মকর্তা চারদলীয় জোটের আমলে পরপর চারবার পদোন্নতিবঞ্চিত হয়েছেন; তাদের রাখা হয়েছে কম গুরুত্বপূর্ণ পদে।

প্রশাসনে একাধিক কর্মকর্তার অভিযোগ, বিগত ৮ বছরে প্রশাসনে পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে দল সমর্থক বা বিরোধী দলের সমর্থক বলে কিছুই নেই। প্রশাসনে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। তাদের আশীর্বাদ যাদের জুটছে, তারাই পদোন্নতি ও ভালো পদায়ন পাচ্ছেন। তবে প্রশাসন-সংশ্নিষ্টরা প্রশাসনে নতুন এ মেরুকরণকে ভালো চোখে দেখছেন না। তারা মনে করেন, এটি প্রশাসনের জন্য অশনি সংকেত। তারা বলেন, বিগত ২০ বছরে দলীয়করণ করে যেভাবে প্রশাসনের মাজা ভেঙে দেওয়া হয়েছে, এখন নতুন এ নিয়মের মাধ্যমে প্রশাসনিক কাঠামো ভাঙার শেষ পেরেকটুকু মারা হয়েছে। প্রশাসনের এ দৈন্যদশা মেধাবী কর্মকর্তাদের মাঝে হতাশার জন্ম দিয়েছে। তাদের অনকেই চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়ারও পরিকল্পনা করছেন।

তবে এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মোজাম্মেল হক খান বলেন, প্রশাসনে কিছু ভূত ঢুকেছে। এগুলো দূর করারও চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় কাউকে পদোন্নতি ও পদায়ন করা হচ্ছে না। পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে সামষ্টিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন রিপোর্টও বিবেচনা করা হয় বলে জানান তিনি।

তবে এসব কথা একেবারই মানতে নারাজ প্রশাসনের বিভিন্ন ব্যাচের কর্মকর্তারা। তারা বলেন, জনপ্রশাসন গুটিকয়েক কর্মকর্তার হাতে বন্দি হয়ে পড়েছে। তারা যেভাবে চাচ্ছেন প্রশাসন সেভাবেই চলেছে। এসব কর্মকর্তা বিগত সময়ের সুবিধাভোগীদের সুবিধা দিয়ে নিচের ব্যাচের কর্মকর্তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছেন। প্রশাসনিক কাঠামোতেও বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে।

Print Friendly

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.