অগ্নিঝরা মার্চ মাস শক্তি ও প্রেরণার উৎস

(Last Updated On: মার্চ ১৮, ২০১৮)

অগ্নিঝরা মার্চের প্রথম দিন আজ। বাঙালীর জীবনে নানা কারণে মার্চ মাস শক্তি ও প্রেরণার উৎস। মুক্তিসংগ্রামের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল এ মাস থেকেই। উনিশ শ’ একাত্তর সালের এই মাসে তীব্র আন্দোলনের পরিণতিতে শুরু হয় মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বিশ্ব মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটেছিল বাংলাদেশ নামক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা হলেও চূড়ান্ত আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল একাত্তরের ১ মার্চ থেকেই। এ মাসেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এদিন বেতার ভাষণে ৩ মার্চের গণপরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। এ সময় ঢাকা স্টেডিয়ামে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম) পাকিস্তান বনাম বিশ্ব একাদশের ক্রিকেট খেলা চলছিল। ইয়াহিয়া খানের ওই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে দর্শক খেলা ছেড়ে বেরিয়ে আসে। ততক্ষণে হাজারো মানুষ পল্টন-গুলিস্তানে বিক্ষোভ শুরু করে। সেই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ নেয়।

ক্ষুব্ধ ছাত্ররা প্রথমবারের মতো সেøাগান দেয়, ‘বীর বাঙালী অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’। ছাত্ররা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে কর্মসূচী ঘোষণার দাবি জানায়। বিক্ষোভ-সেøাগানে উত্তাল ঢাকাসহ সারাদেশ। আর কোন আলোচনা নয়, এবার পাক হানাদারদের সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তোলার দাবি ক্রমশ বেগবান হতে থাকে।

উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধু ২ ও ৩ মার্চ তৎকালীন পাকিস্তানে সর্বাত্মক হরতালের ডাক এবং ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনসভার ঘোষণা দেন।

সেই শুরু। এরপর ১ মার্চ পেরিয়ে ২ মার্চ। একে একে পার হয় ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ ২৫টি দিন। চলে আক্রমণ, প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে পাল্টা জবাব দেয় বীর যোদ্ধারা। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালীর ওপর আক্রমণ চালায়, শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। এই পথ ধরে বাঙালী দামাল ছেলেরা এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ছিনিয়ে আনেন একটি স্বাধীন দেশ- গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ।

১৯৭১ এর ৭ মার্চ সাবেক রেসর্কোস ময়দান- আজকের সোহ্রাওয়াদী উদ্যানে দেয়া এই ঐতিহাসিক ভাষণের সময় মুহুর্মুহু গর্জনে উত্তাল ছিল জনসমুদ্র। লাখ কণ্ঠের একই আওয়াজ উচ্চারতি হতে থাকে দেশের এ প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে। ঢাকাসহ গোটা দেশে পত পত করে উড়ছিল সবুজ জমিনের উপর লাল সবুজের পতাকা।

গত বছরের (২০১৭) ৩০ অক্টোবর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় জাতিসংঘের শিক্ষা বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো। ইউনেস্কোর মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা প্যারিসের ইউনেস্কোর সদর দফতরে এই স্বীকৃতি দেয়ার সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন।

ইউনেস্কোর পক্ষ থেকে বলা হয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণটি মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্ট্রারের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ইউনেস্কো বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য ঐতিহ্যের তালিকা সংরক্ষণ করে থাকে। মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্ট্রারের অন্তর্ভুক্ত প্রামাণ্য ঐতিহ্যের তালিকা বিশ্ব প্রেক্ষাপটে গুরুত্ববহ। ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্ট্রারের লক্ষ্য হচ্ছে বিশ্বের প্রামাণ্য ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা এবং বিশ্ববাসী যাতে ঐতিহ্য সম্পর্কে সহজে জানতে পারে তা নিশ্চিত করা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতির পর এবারের মার্চ মাসে বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালনে যোগ হবে নতুন মাত্রা। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ৭ মার্চ উপলক্ষে বিস্তারিত কর্মসূচী গ্রহণ করেছে। অন্যদিকে এ মাসেই জাতি এবার পালন করবে মহান স্বাধীনতার ৪৭ বছর। এ উপলক্ষে মাসের প্রথম দিন থেকেই শুরু হবে সভা সমাবেশ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। নানা আয়োজনে মুখরিত থাকবে গোটা দেশ।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষার জন্য যে আগুন জ্বলে উঠছিল- সে আগুন যেন ছড়িয়ে পড়ে বাংলার সর্বত্র। এর পরে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬ এর ছয় দফা এবং উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সিঁড়ি বেয়ে একাত্তরের মার্চ বাঙালীর জীবনে নিয়ে আসে নতুন বার্তা। এ বছরের ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা। এর আগে ২৫ মার্চ রাত একটার পরে বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানী সেনারা গ্রেফতার করে তার বাড়ি থেকে।

২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানীরা বাঙালীর কণ্ঠ চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়ার লক্ষ্যে অপারেশন সার্চলাইট নামে বাঙালী নিধনে নামে। ঢাকার রাস্তায় বেরিয়ে সেনারা নির্বিচারে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্নি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে ছাত্রী-শিক্ষককে হত্যা করে।

এর পরের ঘটনাপ্রবাহ প্রতিরোধের ইতিহাস। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলা হয়। আবালবৃদ্ধবনিতা যোগ দেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বের বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে জাতি লাভ করে স্বাধীনতা।

আগামীকাল পতাকা উত্তোলন দিবস ॥ আগামীকাল ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) ‘পতাকা উত্তোলন দিবস’ উদযাপন করা হবে। এ উপলক্ষে বেলা ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলা ভবন সংলগ্ন ঐতিহাসিক বটতলা প্রাঙ্গণে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করা হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করবেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ আখতারুজ্জামান। এরপর দিবসটির তাৎপর্য নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা ও সঙ্গীত পরিবেশন করা হবে।

উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রামী ছাত্র সমাজের উদ্যোগে কলাভবন প্রাঙ্গণে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়, যা মুক্তিযুদ্ধে প্রেরণার উৎস ছিল।

.dailyjanakantha.com

Print Friendly

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.