বিউটির ধর্ষক বাবুল খুনি তার বাবা’

(Last Updated On: এপ্রিল ৮, ২০১৮)

হবিগঞ্জের চাঞ্চল্যকর বিউটি হত্যারহস্য নাটকীয় মোড় নিয়েছে। বিউটির বাবা ছায়েদ আলীর আদালতে দেওয়া জবানবন্দির বরাত দিয়ে হবিগঞ্জের পুলিশ জানিয়েছে স্কুলছাত্রী বিউটি আক্তারকে ধর্ষণ করলেও হত্যাকাণ্ডে বাবুল মিয়ার সম্পৃক্ততা নেই। বরং বাবা ছায়েদ আলীই ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে ভাড়াটে এক খুনি দিয়ে  বিউটিকে খুন করান।

শনিবার (৭ এপ্রিল) সন্ধ্যায়  এক প্রেস ব্রিফিংয়ে হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার বিধান ত্রিপুরা এসব তথ্য জানান।

নিজ কার্যালয়ে ওই ব্রিফিংয়ে পুলিশ সুপার বলেন, স্বাধীনতার মাসে লাল সবুজের পতাকায় বিউটির হত্যা নিয়ে যে পোস্টটি সারাদেশে ভাইরাল হয়েছে তদন্তে তার বিপরীত চিত্র পাওয়া গেছে। বিউটি হত্যার নেপথ্যে রয়েছে তারই বাবা মামলার বাদী ছায়েদ আলীই। পাঁচ ঘণ্টা ধরে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি বিউটিকে নানার বাড়ি থেকে নিয়ে এসে কীভাবে খুনিদের হাতে তুলে দিয়েছেন তার বর্ণনা দিয়েছেন। জবানবন্দির পর হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সরঞ্জামাদি উদ্ধার করা হয়েছে বলেও জানান পুলিশ সুপার।

বিউটির ধর্ষণকারী বাবুল মিয়া হত্যাকাণ্ডে জড়িত নয় উল্লেখ করে পুলিশ কর্মকতা  বিধান ত্রিপুরা বলেন, বাবুল মিয়া অলিপুরে প্রাণ কোম্পানিতে সুপারভাইজার হিসাবে চাকরি করেন। তার মা ইউপি সদস্য হওয়ায় এলাকায় তার অর্থ এবং প্রভাব রয়েছে। দুশ্চরিত্রের বাবুলএর আগে তিনি এক প্রবাসীর স্ত্রীকে বিয়ে করেন। পরে বিউটির ওপর তার দৃষ্টি পড়ে। তার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক করে বিয়ের প্রলোভন দেখান বাবুল। পরে অলিপুর এলাকায় একটি ঘর ভাড়া নিয়ে গত ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে ৯ মার্চ পর্যন্ত সেখানে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে বসবাস করেন তারা।

হবিগঞ্জের পুলশি সুপার বলেন,  গত ৯ ফেব্রুয়ারি বিউটিকে প্রাণ কোম্পানিতে চাকরি দেওয়ার কথা বলে সেখানে নিয়ে গেলে খবরটি জানতে পারেন পাশের আরএফএল ফ্যাক্টরিতে চাকরি করা বিউটির মা হুসনা বেগম। তিনি এবং ছায়েদ সেখানে গিয়ে মেয়েকে উদ্ধার করে বাড়ি নিয়ে আসেন বিষয়টি জানাজানি হলে এলাকায় সালিশের মাধ্যমে নিস্পত্তির চেষ্টা করা হলে বিউটিকে বিয়ে করতে বাবুল অস্বীকৃতি জানায়।পরে ১৪ ফেব্রুয়ারি আদালতে অপহরণসহ ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেন বিউটির বাবা ছায়েদ। মামলাটি গত ৪ মার্চ শায়েস্তাগঞ্জ থানায় নথিভুক্ত এবং ১২ মার্চ বিউটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও আদালতে জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়।

পরে বিউটিকে লাখাই উপজেলার গুণিপুর গ্রামে নানা বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয় জানিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, এই সুযোগে ফন্দি আঁটেন ইউপি নির্বাচনে বাবুলের মায়ের কাছে হেরে যাওয়া আসমা আক্তারের স্বামী ময়না মিয়া। গত ইউপি নির্বাচনে ব্রাহ্মণডোরা ইউনিয়নের ৪, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ড থেকে সংরক্ষিত নারী সদস্য পদে নির্বাচন করে বাবুলের মা কলম চান বিবির কাছে আওয়ামী লীগ নেতা ময়না মিয়ার স্ত্রী আসমা আক্তার হেরে যান বলে জানান পুলিশ সুপার।

বিউটি আক্তার বিউটি আক্তার এরপর থেকেই দুই পরিবারের মধ্যে দ্বন্দ চলে আসছে জানিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, এরই জেরে বিউটিকে অপহরণের পর ধর্ষণের ঘটনায় মামলায় সাক্ষী হন ময়না। প্রায়ই ছায়েদকে বোঝাতে থাকেন, বাবুল বিয়ে না করলে বিউটিকে কেউ বিয়ে করবে না। তার অন্য সন্তানদেরও বিয়ে হবে না। এর চেয়ে বিউটিকে মেরে বাবুল ও তার মাকে ফাঁসানোও হলো এবং প্রতিশোধও নেওয়া হবে।

পুলিশ কর্মকর্তা বিধান ত্রিপুরা বলেন, এক পর্যায়ে ময়নার ফাঁদে পা দেন ছায়েদ মিয়া। তাকে নানীর বাড়ি থেকে বের করার সময় চেয়ারম্যানের কাছে নেওয়ার কথা বলা হয়। পরে লাখাইয়ের সেই বটলতায় ঘটে হত্যাকাণ্ড। বিউটিকে খুনের পর রক্ত ধুয়ে মরদেহটি হাওরে ফেলে রাখা হয়। মরদেহ উদ্ধারের খবরে নানী বিউটিদের বাড়িতে এলে তাকে শাসিয়ে দেওয়া হয় কোনো কিছু না বলার জন্য।

যদিও আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে ‘বিউটিকে রাতে কে নিয়ে গেছে, কিভাবে নিয়ে গেছে এবং তাকে কী বলে নিয়ে গেছে’ সেসব বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দেন ফাতেমা।

রহস্য উদঘাটনের তথ্য দিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, মেয়ে হত্যার পর একজন বাবার যে অনুভূতি থাকার কথা ছিল তা ছায়েদের চেহারায় ছিল না। তার ও ময়নার চলাচল এবং আচরণে সন্দেহ হলে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে তথ্য ঘেঁটে বের করে দু’জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ভাড়াটে খুনিকে ধরতেও পুলিশ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাকে গ্রেফতার করতে পারলেই অভিযোগপত্র দাখিল করা যাবে।

পুলিশ সুপার আরও বলেন, বাবুল মিয়া সরাসরি হত্যায় জড়িত না থাকলেও তার কারণেই এই ঘটনা ঘটেছে। অবশ্যই তাকে অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে মামলার অভিযোগপত্রে রাখা হবে।

উল্লেখ্য, গত ১৭ মার্চ সকালে জেলার শায়েস্তাগঞ্জের পুরাইকলা বাজার সংলগ্ন হাওর থেকে বিউটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় সেদিনই বিউটিকে হত্যা ও ধর্ষণের অভিযোগে তার বাবা ছায়েদ বাদী হয়ে বাবুল (৩২) ও তার মা ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য কলম চাঁন বিবির (৪৫) নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজনকে আসামি করে শায়েস্তাগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিউটির নিথর মরদেহের ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর এ নিয়ে আলোচনার ঝড় ওঠে। হত্যা ও ধর্ষণে জড়িতদের বিচার দাবিতে দেশজুড়ে নানা কর্মসূচি পালন করা হয়। পরে ২১ মার্চ কলম চাঁন ও বাবুলের বন্ধু একই গ্রামের ইসমাইলকে আটক করে পুলিশ। এরপর ৩১ মার্চ সিলেটের বিয়ানীবাজার থেকে গ্রেফতার করা হয় বাবুলকে।

Print Friendly

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.