বাংলাদেশ কি জনগণের রাষ্ট্র হবেনা?

(Last Updated On: জুন ৩, ২০১৮)

নাসির উদ্দিন: মাদক নির্মুলের নামে দেশে দস্তুরমত হত্যার উৎসব চলছে। টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর একরাম তারই বলি। দৃশ্যত মনে হচ্ছে, একরাম নিরপরাধ। আর অপরাধী হলেও রাষ্ট্র কাউকে হত্যা করতে পারেনা। হত্যার মাধ্যমে মানুষকে বা কোনো বিশেষ অংশকে দমন করলে প্রমাণ হয়ে যায়, স্বাধীনতার ৪৭ বছরেও আমরা রাষ্ট্র হয়ে উঠিনি।

দূর অতীতে, মারাঠিরা প্রথমে মোগলদের পক্ষে সেনাবাহিনী সমেত কালেক্টর রুপে এবং পরে মোগলদের সরিয়ে নিজেরাই পৃথক রাষ্ট্র গড়ে তুলছিল। গুজরাট থেকে বিহার চারটি অঞ্চল নিয়ে ছিল তাদের সেই মহারাষ্ট্র। এই মারাঠিরাই বর্গক্ষেত্ররুপে আক্রমণ সাজাতো বলে ইতিহাসে তারা বর্গী নামে পরিচিতি পায়, যে সমষ্টি শিশুদের ঘুম পাড়ানিয়া ভয়ের ছড়াগান “বর্গী এলো দেশে” ও পরে ভুপেনের “বর্গীরা আর দেয়না হানা” গণসংগীত হয়ে উঠেছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ইতিহাস বইয়েও বর্গীদের সম্পর্কে রাজ্যচালনার চাইতে দস্যুতা ও ডাকাতিতে জড়িত হয়ে উঠবার কথা বলা হয়েছে। ফলে বর্গী নেতা শিবাজী মারাঠাদের সেই মহারাষ্ট্রকে রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারেনি।

বৃটিশ ভারতে ভারতীয় কংগ্রেসকে বলা হত সর্বভারতীয় অভিন্ন প্লাটফর্ম। বাম-ডান সকলেই সম্মিলিতভাবে কংগ্রেস করতেন। কংগ্রেসে হিন্দু-মুসলমানদের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য নেতা ছিলেন জিন্নাহ। তাকে মুসলিম লীগে যোগ দেয়ার অনুরোধ করা হলে তার শর্ত ছিল তিনি কংগ্রেস ছাড়বেন না। এ শর্তে তিনি ২৫ বছর একইসাথে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ করেছেন। বৃটিশ ভারতের সর্বশেষ ১৯৪৬ এর নির্বাচনে একমাত্র বাংলায় মুসলিম লীগ জয়ী হয়েছিল। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হয়েছিলেন বাংলার গভর্ণর। পাকিস্তান ভারতের আর কোথাও মুসলিম লীগ জয়ী হতে পারেনি। অর্থাৎ বাঙালিরাই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভুমিকা পালন করেছিল। কিন্তু সেই বাঙালিরাই ধর্মের নামে পাকিস্তানে বন্দী হয়ে পরেছিল।

পাকিস্তান আন্দোলনের অন্যতম বাঙালি বুদ্ধিজীবী প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক ১৯৫০ সালে এক প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, যে কারণে তিনি পাকিস্তান আন্দোলন করেছিলেন, একই কারণে এখন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। শ্রুতি রয়েছে ৬ দফা প্রণয়ণে প্রফেসর রাজ্জাকই অন্যতম ভুমিকা পালন করেন এবং তিনিই বংগবন্ধুর হাতে ৬ দফা তুলে দিয়েছিলেন।

স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে দুই বড় দলের অসাংবিধানিক বিতর্ক বাদ দিয়ে সংবিধানের দিকে তাকালেই সবকিছু পরিস্কার হয়ে যায়। ১৯৭১ এর ১৭ এপ্রিল অস্থায়ী সরকার গঠনের প্রাক্কালে, ১০ এপ্রিল অধ্যাপক এম ইউসুফ আলীর স্বাক্ষরে ব্যাখ্যাসহ স্বাধীনতার স্বীকৃত এবং লিখিত ঘোষণাপত্র ঘোষণা করা হয়েছিল। যা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সেই ঘোষণায় স্পষ্টতই সাম্য, মৌলিক মানবিক অধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এ ৩টি অংগীকারের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় ৪ মূলনীতি ঘোষণা হয়েছিল স্বাধীনতার পর সংবিধান রচনাকালে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতা ঘোষণার সেই ৩ অংগীকার গত ৪৭ বছরেও এমনকি এর আগেও পুরণ হয়নি। ফলে বৃটিশ, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ এ তিন রাষ্ট্রই এদেশের জনগণের সাথে শুধুই প্রতারণা করেছে। মানচিত্র এবং সরকারের পরিবর্তন হয়েছে, জনগণের রাষ্ট্র হয়নি। সাধারণ মানুষ অনেক রক্ত ঝড়িয়ে দেশকে স্বাধীন করলেও তাদের রাষ্ট্র পায়নি। এমনকি মুক্তিযুদ্ধে ঘোষিত সাম্য, মৌলিক মানবিক অধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচার দাবি করার অধিকারটুকুও এখন আর অবশিষ্ট নেই। এখানে শাসনের নামে তরবারি দিয়ে সমুদ্রের ঢেউ মোকাবেলার চেষ্টাই চলছে অহর্নিশ। আমরা একরামুল হকেরা শাসকদের এই তরবারির অসহায় শিকার মাত্র।

নাসির উদ্দিন: সাবেক সাধারন সম্পাদক, কুমিল্লা প্রেসক্লাব।

Print Friendly

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.