কুমিল্লার জন্য কেউ ভাবেনা..?

(Last Updated On: জুন ১৭, ২০১৮)

রেজাউল করিম শামীম: এবার কুমিল্লাতে ঈদের বাজার খুবই জমজমাট দেখলাম।স্বল্প সময়ের জন্যে কুমিল্লা গিয়েছিলাম ঈদের ঠিক আগ মুহুর্তে।একটা সময় ছিল যখন কুমিল্লায় অবস্থান করতাম ,সাংবাদিকতায় নিয়োজিত ছিলাম।তখনতো নানা কারনে আমদের কাছে  অনেক রাত অবধি ঈদ বাজারে গমগম করা ক্রেতাদের উপস্থিতি ছিলো বেশ উপভোগ্য।তখন অবশ্য লোক সংখ্যা এতটা ছিলনা।ছিলনা এত উন্নত সব দোকানপাট।ছিলনা এত অধিক সংখ্যক হরেক রকমের যানবাহনের কোলাহল,হাটাচলার সমস্যা।

কুমিল্লার ঈদ বাজারের পোষাক-আষাক কেনাকাটার মধ্যে বরাবরই প্রাধান্য ছিল খাঁদি বা খদ্দরের পণ্য।খদ্দরজাত  পাঞ্জাবি থেকে শুরু করে বাহারি সব পোষাক-পরিচ্ছদ ক্রেতা সাধারনের মন কেড়েছে বরাবরই।কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী  খদ্দরের বড় দু’টি ভবন হচ্ছে “খাদি ভবন” ও “খাদি ঘর”।সেই দোকান দুটিতে সেদিন তারাবি নামাজের পর বেশ কিছু সময় কাটিয়েছি।পুরনো দিনের কথার মধ্য দিয়ে মধুময় কিছু সময় ছিল খুবই উপভোগ্য।

কথা হচ্ছিল,খাদি ঘরের মালিক কান্তি‘দার সাথে। খদ্দর তাঁদের পারিবারীক ব্যবসা। ওনার বাবা,কুমিল্লার পরিচিত মুখ, বিশিষ্ঠ সমাজ সেবক তরুনী রাহা এই প্রতিষ্ঠানটি দাঁড় করিয়েছিলেন।তারই পরম্পরায় কান্তি‘দার  শিক্ষা,প্রতীভা,শৈল্পীক দৃষ্টিভঙ্গি আর শ্রমের সমন্বয়ে রূপ পায় খদ্দরে আধুনিকতা।ওনার সময়োচিত পদক্ষেপ আর তার বিবর্তনের ছোঁয়ায়  রুপান্তরিত খদ্দর এখনো দর্শক-ক্রেতার মন কারে।

কান্তি‘দা কথায় কথায় বলছিলেন,তাদের ছোট বেলার সমৃদ্ধ কুমিল্লার অতীতের কথা।বলছিলেন,টাউন হলের দীপিকার লাগোয়া মাঠটির কথা । সেখানে ক্রিকেট খেলার কথা্ বলছিলেন,কুমিল্লার শিল্পীদের সঙ্গীত-নাট্য চর্চ্চার কথা। সেই সাথে টাউন হলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের কথা।এসবের মাঝেই উঠে আসে খদ্দর প্রসঙ্গ। তিনি বলেন, খদ্দর নিয়ে আমাদের গর্বের শেষ নেই।কিন্তু,এই পণ্যটির অতীত ঐতিহ্যের পরম্পরার ধারাবাহিকতা ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়ছে। নানা কারনেই এর সাথে জড়িত পুরনো কারিগর থেকে শুরু করে এর সাথে সংশ্লিস্ট শিল্পী, ব্যবসায়ী ইত্যাদি খুঁজে পাওয়া খুবই দুস্কর।কিন্তু, অবিভক্ত ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সাথে কুমিল্লা সংশ্লিষ্ট থাকলেও ,কুমিল্লাতে খদ্দরের বিকাশমান ধারা আজো অভ্যাহত রয়েছেো আজো খদ্দর বললে কুমিল্লার নামই সামনে চলে আসে সবার আগে।কিন্তু তাই বলে ত্রিপুরা কিন্তু বসে নেই। আমার অভিজ্ঞতা থেকে উদাহরন টেনে কান্তি‘দাকে বল্লাম, আমি বিভিন্ন সময় আগরতলায় দেখেছি,সেখানকার সরকারী উদ্যোগে খদ্দরের সম্ভার নিয়ে মেলা,সেমিনার, প্রশিক্ষনের ইত্যাদির আয়োজন করতে।তারা গ্রামীন উদ্যোগ হিসাবে খদ্দর নিয়ে অনেক কাজ করছে ।বল্লাম, এক সময় খদ্দরের  জিআই বা ব্রান্ডিং নিয়ে প্রশ্ন উঠলে-তারা যদি আমাদের প্রতিযোগী হয়ে দাঁড়ায় তবে কিছু কি বলার থাকবে? আমাদের এখান থেকে কেন এখনই এই উদ্যোগ নেয়া হচ্ছেনা?

কান্তি‘দার কথায় তখন হতাশার সুর।এক রাশ দুঃখের অবিজ্ঞতার কথা শোনালেন। বললেন,কুমিল্লা বাড়ি এমনি কেবিনেট সেক্রেটারী থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যা্য়ের অনেক কর্মকর্তা তার দোকানে এসেছেন। জোড় দিয়ে বলে গেছেন ,কুমিল্লার রস মালাই ও খদ্দর অবশ্যই জিআইএর স্বীকৃতি পাবে। কিন্তু,ঐ পরয্দন্তই।এক  সময় তারা চাকুরী থেকে অবসরে চলে গেছেন। কাজের কাজ কিছুই করে যাননি।এর কারন হিসাবে তিনি যা বল্লেন তা খুবই দুঃখজনক। তিনি বলেন, ঐতিহ্যের পরম্পরারে একটা বন্ধন না থাকলে এসবের প্রতি কারোই মায়া জন্মায় না।এ প্রতি কেউ টানও অনুভব করেননা।তিনি বলেন কুমিল্লার নেতৃস্থানীয় জনপ্রতিনিধি,বড় আমলা,সাংবাদিক-যারাই কিছু করার ক্ষমতা রাখেন,যারা কুমিল্লার বলে নিজেদের দাবী করেন,খোজ নিয়ে দেখেন তারা কেউ এই কুমিল্লা শহরের সন্তান নন। ফলে, কুমিল্লা শহরের প্রতি কোন টান তারা  হৃদয়  থেকে অনুভব করেননা।

পরে খাদি ভবনের অন্যতম কর্ণধার সানাইয়ের সঙ্গে বসে কিছু সময় কাটালাম।সঙ্গে ছিল টিটু ভূইয়া।আমাদের অত্যন্ত প্রিয় একটি জায়গা। পুরনো দিনের অনেক কথা মনে পড়ছিল।এক সময় সানাই ছাড়াও ওর বড় ভাই বিজয়‘দা খাদি ভবনের সব কিছু দেখাশোনা করতেন তাদের বাবার সঙ্গে । মূলত,ঈদকে সামনে রেখে,রমজানের আগ থেকেই দোকানে মালামাল তোলা হতো।সেজন্যে আগাম কিছু টাকা দিয়ে বিভিন্ন স্থানে খদ্দর তৈরীর লোকজনের কাছে কাপড় তৈরীর ওয়ার্ডার দিয়ে রাখা হতো। সেগুলো এনে কখনো নিজেরাই বাড়িতে বিড়াট বিরাট টেবিলে বিভিন্ন ধরনের প্রিন্ট করাতেন। তারপর নিজস্ব দর্জী দিয়ে তৈরী করা হতো নির্দিষ্ট ডিজাইনের কাপড়। কখনো আবার বিভিন্ন স্থান থেকে পছন্দ মাফিক ওয়ার্ডার দেয়া তৈরী পোষাকও আনা হতো।এসবের  মূল্য পরিশোধের পরিমান বিশাল অংকের টাকা।

আর তা পরিশোধ করা হতো ঈদের আগের রাতে যাকে বলা হয়,চাঁদ রাত।তার দু‘তিনদিন আগ থেকেই অনেক রাত পর্য ন্ত খোলা থাকতো দোকান। সে কি জমজমাট বেচাকেনা। সেসময় সাংবাদিক নুরুর রহমান বাবুল ,নাসির ঊদ্দিন,আলী হোসেন চৌধুরী,মোস্তফা ভাই ছাড়াও রূপক,আবু এমনি আরো অনেকেই সেসব উপভোগ করতাম। অনেক পরিচিত লোকজন আসতো। বিশেষ করে,চাকরী বা অন্য পেশার কারনে যারা কুমিল্লার বাইরে অবস্থান করতেন। তারাও ঈদের ছুটিতে আসতেন। অনেক দিন পর তাদের সাথে আলাপ আলোচনার মধ্য দিয়ে কখন যে সময় পালিয়ে যেতো,তার হদিস পেতাম না । রাতের খাওয়া সেখানেই হতো।

সেই সব দিনগুলো আর পাওয়া যাবেনা।তখন কুমিল্লার বিভিন্ন বিষয় নিয়েও কথা হতো।অনেক সমস্যার কথা যা আলোচনা হতো –তা  নিয়ে পরে ,হয় প্রশাসনের সঙ্গে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হতো অথবাতা স্থান পেতো পত্রিকার পাতায় সংবাদ আকারে।তখন কুমিল্লার বিষয়ে কারো মাঝে আন্তরিকতার কোন অভাব দেখিনি।শহরের বাইরের লোক হলেও দেখেছি সার্বিক ভাবে কুমিল্লার ভালোর জন্যে সকলেই ছিল ঐক্যবন্ধ।অথচ যে খদ্দর আর রস মালাই কুমিল্লাকে শুধু মাত্র জাতীয় পরযায়ই শুধু নয়,দেশের গন্ডি পেড়িয়ে আজ আন্তর্জাতীক পর্যাসয়ে পরিচিতি দিয়েছে,আমাদের অতীত ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করার সুযোগ করে দিয়েছে,তাকে আজ স্বীকৃতি দেয়ার বিষয়ে যা শুনলাম তা খুবই দুঃখজনক। আপনার কি বলেন?

রেজাউল করিম শামীম: সাবেক সভাপতি- কুমিল্লা প্রেসক্লাব ও সদস্য জাতীয় প্রেসক্লাব।

Print Friendly

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.