মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশী নারী আইনজীবীকে নৃশংসভাবে খুন!

(Last Updated On: আগস্ট ১৯, ২০১৮)

মালয়েশিয়ার কুয়ালামপুরের সুঙ্গাই গম্বাকের জালান এলাকার ইপো ব্রিজের নিচে পড়ে ছিল একটি বড় কালো ব্যাগ।প্রথমে ব্যাগটি চোখে পড়ে কৌতূহলী এক ফটোগ্রাফার। স্থানীয়দের কাছে ব্যাগটি কার জানতে চাইলে তারাও এগিয়ে আসে। কে কখন এই কালো ব্যাগটি এখানে ফেলে গেছে কেউই বলতে পারলো না। উৎসাহী কয়েকজন ব্যাগটি টানাটানি করা শুরু করলে টের পেল, ব্যাগটিতে ভারি কিছু রয়েছে। খবর পেয়ে পুলিশ আসে। ব্যাগটি খুলতেই বেরিয়ে আসে টুকরো টুকরো এক নারীর টুকরো টুকরো লাশ। চাঞ্চলক্যর এই ঘটনাটি ঘটেছে ।

মালয়েশিয়ায় এরকম ঘটনা কমই ঘটে, তাই সর্বত্র এই নিয়ে চাঞ্চল্য। মোট ১২ খণ্ডে টুকরো করা ওই নারীর মরদেহটি গত ৫ জুলাই উদ্ধার হলেও পাওয়া যাচ্ছিলো না পরিচয়।মালয়েশিয়ার সব গণমাধ্যমেই ঘটনাটি বেশ ফলাও করে ছাপা হয়, খবরের সঙ্গে প্রকাশিত হয় ছবিও। প্রকাশিত সংবাদে কুয়ালামপুর পুলিশের প্রধান দাতুক সেরি মাজলান লাজিম বরাত দিয়ে বলা হয়, নিহত ওই নারীর বয়স ৩০ থেকে ৩৫। ব্যাগের মধ্যে তার টুকরো লাশ, কসমেটিকস, চাবি ও রক্তমাখা কয়েক জামা পাওয়া গেছে। এরমধ্যে ‘আল্লাহ্‌’ লেখা একটি নেকলেস রয়েছে। এ থেকেই পুলিশ ধারণা করছিলো নিহত নারী মুসলিম। লাশটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তে পাঠায় পুলিশ।

মালয়েশিয়ার পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ ও ছবি দেখে গত ১১ জুলাই নিহতের স্বজনরা শনাক্ত করেছেন ওই নারীর পরিচয়। নিহত সাজেদা ই বুলবুল বাংলাদেশের নাগরিক। তিনি পটুয়াখালীর পুরাতন আদালত পাড়ার ৯৯ বড় মসজিদ মহল্লার আনিস হাওলাদার ফিটারের মেয়ে। সাজেদা বিবাহিত ছিলেন। ঘটনার পর থেকে সাজেদার স্বামী শাহজাদা সাজুকে পলতাক রয়েছেন।

সাজেদাকে তার স্বামী শাহজাদা সাজুই হত্যা করেছে দাবি করে নিহতের বড় বোন খাদিজা পারভীন বলেন, বিয়ের পর থেকেই এই দম্পতির সংসারে অশান্তি লেগেই ছিল। ঘটনা গড়িয়েছিল থানা পুলিশ পর্যন্ত। ঢাকার প্রাইম ইউনিভার্সিটি থেকে এলএলবি ও এলএলএম করেছিলেন সাজেদা। আইন বিষয়ে ডক্টরেট করানোর প্রলোভন দেখিয়ে তাকে মালয়েশিয়া নিয়ে গিয়েছিলো শাহজাদা সাজু। শেষ পর্যন্ত স্বামীর হাতে নৃশংসভাবে বিদেশ-বিভুঁইয়ে খুন হতে হলো।

সাজেদার বোন খদিজা জানান, ২০০৪ সালে একই জেলার মির্জাগঞ্জের সুবিদখালীর ঘটকের আন্দুয়া গ্রামের মৃত সোহরাব ফকিরের ছেলে সাজুর সঙ্গে বিয়ে হয় সাজেদার। সাজেদা তখন এসএসসি পরীক্ষার্থী। অন্যদিকে সাজু সৌদি ফেরত, বেকার। সাজেদার বাবা আনিস হাওলাদার লঞ্চের ব্যবসা করেন। বিয়ের পর থেকেই একটার পর একটা দাবি নিয়ে হাজির হয় সাজু। কখনো ব্যবসা, কখনো বিদেশে যাওয়ার নামে লাখ লাখ টাকা নেয় শ্বশুরের কাছ থেকে। শ্বশুরের টাকায় চলতো সাজুর সংসার। ২০১১ সালে এক কন্যাসন্তানের মা-বাবা হন এই দম্পতি।

সাজেদাকে নিয়ে ঢাকার মিরপুরে থাকতেন শাহজাদা সাজু। বিয়ের পরও পড়াশোনা চালিয়ে যান সাজেদা। ২০০৭ সালে প্রাইম ইউনিভার্সিটি থেকে এলএলএম পাশ করেন তিনি। পাশাপাশি চাকরি করেন একটি ওষুধ কোম্পানিতে।

খদিজা পারভীন অভিযোগ জানিয়ে বলেন, সাজেদাকে বাবার কাছ থেকে টাকা আনার জন্য চাপ দিতো তার স্বামী। এজন্য মারধর করতো। তাছাড়া শাহজাদা সাজু পরকীয়ায় আসক্ত ছিলো। দ্বিতীয় বিয়ে করতে চাইতো। আমার বোন বাধা দিতো। এ নিয়ে কলহ আরও বেড়ে যায়। সাজুকে তার মাসহ পরিবারের সদস্যরাও প্রশয় দিতো।

নিহতের বোন বলেন, সাজেদাকে মালয়েশিয়া নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেয় সাজু। সেখানে গিয়ে আইন বিষয়ে ডক্টরেট করবে সাজেদা। সেইসঙ্গে দু’জন মিলে ব্যবসা করবে। এরমধ্যেই সাত বছর বয়সী মেয়ে মুগ্ধকে দেশে রেখে সাজেদাকে নিয়ে ২০১৬ সালের ৩ ডিসেম্বর মালয়েশিয়া চলে যায় সাজু। মেয়ে মুগ্ধ থাকে শাহজাদা সাজুর বোনের কাছে। কুয়ালামপুরে গিয়ে লেখাপড়া সেভাবে না হলেও স্বামী-স্ত্রী মিলে ব্যবসা ভালোই করছিলেন। কুয়ালালামপুর একটি রেস্টুরেন্ট চালাতেন সাজেদা। একটি গাড়িও কিনেছিলেন। কিন্তু তখনই সাজেদা বুঝতে পারেন তার স্বামী একজন জুয়ারি। প্রায়ই জুয়ার আসরে বসে কষ্টে আয় করা টাকা হাওয়ায় উড়িয়ে দেয়। খেসারত হিসেবে গত ফেব্রুয়ারিতে বিক্রি করতে হয়েছে রেস্টুরেন্ট, গাড়ি। আবার বাড়তে থাকে স্বামী-স্ত্রীর কলহ। গত ২৭শে জুন সাজু মারধর করে বাসা থেকে বের করে দেয় সাজেদাকে। পরিচিত জনরা সেদিন শাহজাদা সাজু ও সাজেদাকে মিলিয়ে দেন।

খদিজা পারভীন বলেন, রাগ-অভিমান ভুলে বারবার সংসার করতে চাইলেও সংসার তার ভাগ্যে জুটেনি। প্রায়ই নির্যাতন করা হতো তাকে। হত্যাকাণ্ডের কয়েক মাস আগে থেকেই সাজু বাইরে গেলে বাইরে থেকে তালা দিয়ে যেতো বাসায়। দেশে থাকা মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে দিতো না।

সর্বশেষ গত ২ জুলাই কথা হয়েছে দুই বোন খাদিজা ও সাজেদার। ফোনের ওপর প্রান্ত থেকে বোনের কান্না শব্দ পেয়েছেন খাদিজা। সাজুর নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন সাজেদা। এমনকি একমাত্র সন্তানের সঙ্গে কথা বলতে না দেয়ার কষ্টগুলোও প্রকাশ করেছেন। এই করুণ অবস্থা থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন সাজেদা। শেষপর্যন্ত তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে টুকরো টুকরো করে মুক্তি দিয়েছে সাজু!

মালয়েশিয়ার অবস্থানরত স্বজন ও ময়নাতদন্তের বরাত দিয়ে খাদিজা পারভীন জানান, ধারালো অস্ত্র দিয়ে সাজেদার মাথায় আঘাত করা হয়। এমনকি তাকে ইনজেকশন পুশ ও শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। তারপর তার লাশটি টুকরো টুকরো করা হয়েছে। অন্তত ১২ টুকরো করা হয়েছে বলে জানতে পেরেছেন তারা। পরে লাশটি ব্যাগে ভরে নদীর চড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে। সেখান থেকেই লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ।

নিহতের বোন খাদিজা বলেন, লাশ দেশে আনা, মামলা বা আসামি গ্রেপ্তারের বিষয়ে মালয়েশিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের কোনো সহযোগিতা পাচ্ছি না। আমরা এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই।

Print Friendly

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.