২১শে আগস্ট

(Last Updated On: আগস্ট ২১, ২০১৮)

 জাকির হোসেন মারুফ :২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে নৃশংস গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছিল। মূলত আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্যই ওই গ্রেনেড হামলা চালানো হলেও তিনি সৌভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যান। তবে আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভী রহমানসহ কমপক্ষে ২৪ জন নেতাকর্মী নিহত হন। শেখ হাসিনাসহ অসংখ্য নেতাকর্মী গুরুতর আহত হন। এদের অনেকেই সারা জীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। কেউ কেউ এখনো শরীরে অসংখ্য স্প্রিন্টার নিয়ে দুঃসহ জীবনযাপন করছেন। ২১ আগস্টের বীভৎস হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে একটি কলঙ্কময় অধ্যায় হিসেবেই চিহ্নিত থাকবে।

সেদিন ২৩,বঙ্গবন্ধু এভিনিউ তে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর উদ্যোগে এক সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশের ডাক দেয়া হয়।জননেত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ অস্থায়ী মঞ্চ হিসেবে ট্রাক এর উপর দাড়িয়ে।সমাবেশ শেষে সন্ত্রাসবিরোধী মিছিল হবে।আমি তখন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ এর সাংগঠনিক সম্পাদক।আমাদের সভাপতি লিয়াকত সিকদার,সাঃসঃ নজরুল ইসলাম বাবু সহ আমরা ট্রাকের কাছ ঘেষে দাড়িয়ে।সাধারনত সমাবেশগুলোতে আমরা নেত্রীর কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করি।আমাদের পাশেই ছিলেন বাহাউদ্দিন নাসিম ভাই,মৃণালদা,পন্কজদা সহ আরও অনেকে।স্বেচ্ছাসেবকলীগ এবং যুবলীগের ও নেতৃবৃন্দ ছিলেন কাছাকাছি।ট্রাকের যে অংশে নেত্রী দাড়িয়েছিলেন তার একহাত দুরত্বে আমাদের অবস্থান।কিছুক্ষন পরেই বেগম আইভী রহমানের নেতৃত্বে মহিলা আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ মিছিল সহকারে উপস্থিত।ওনাদের জন্য আমরা জায়গা ছেড়ে দিলাম।স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা কুদ্দুস ভাইকে বললাম আপনারা আরেকটু পিছনে যান আমাদের মহিলা আওয়ামী লীগ কে জায়গা দিতে হচ্ছে।তার পাশেই ছিলেন সেন্টু ভাই।ভিড়ে ঠাসাঠাসি অবস্হা।আমি ভীড়ের চাপ থেকে মুক্ত হবার জন্য নেত্রীর ব্যবহৃত পুরনো গাড়ীটির(বুলেট প্রুফ গাড়ী কেনার আগে যেটি ব্যবহৃত হতো) পাশে অবস্থান নিলাম।কেন যেন ইচ্ছে হলো মিছিল যখন শুরু হবে এই গাড়ীর পাটাতনে দাড়িয়ে অংশগ্রহণ করবো।সাধারনত আমি এটা করি না।যা হোক আমার পাশেই দাড়িয়ে ছিল ছাত্রলীগের আরও দু’জন সংগ্রামী কেন্দ্রীয় নেতা পন্কজ সাহা(মাগুরা) ও চৌধুরী সাইফুন্নবী সাগর(নোয়াখালী)।নেত্রীর বক্তব্য শুনছিলাম।একেবারে মুখোমুখি দাড়িয়ে।বক্তব্যের শেষ মুহুর্তে আনুমানিক বিকেল  পাঁচটা বিশ/বাইশ মিনিটে প্রথম গ্রেনেড বিস্ফোরিত হলো।প্রথমেই আমার ভাবনায় এলো বিএনপি সমাবেশে আক্রমন করেছে।গোলাপ শাহ মাজারের দক্ষিণ  দিকে বিএনপির একটা অফিস আছে।সেখান থেকে হয়তো সমাবেশ বানচালের চেষ্টা চালাচ্ছে।তাৎক্ষনিক আমরা কয়েকজন একটা ছোট্র  মিছিল সংগঠিত করে শ্লোগান দিতে দিতে রমনা ভবনের সামনের মুল সড়ক পর্যন্ত এগিয়ে যাই।মুহুর্তের মধ্যে পিছন ফিরে দেখি রক্তাক্ত নিহত-আহত মানুষের আহাজারি।নেত্রীসহ অন্যরা কে বেঁচে আছেন,কে নেই সেদিকে নজর ছিল না।ততক্ষনে নেত্রীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষী ও দলের নেতাকর্মীদের সাথে নেত্রীর গাড়ী নিরাপদে সরিয়ে দিতে সচেষ্ট হই।বায়তুল মোকাররম গেটের দক্ষিণ পাশ পর্যন্ত নেত্রীর গাড়ীর পিছন পিছন দৌড়ে যাই।সেখানে ছাত্রলীগের অফিস সহকারী মিন্টুর সাথে দেখা। প্রশ্ন করলাম নেত্রী সেইফ তো?মিন্টু বললো হ্যা ভাই।তখনও জানি না নেত্রী কতটা আহত হয়েছেন।সাথে সাথে ফিরে এলাম দলীয় কার্যালয়ের সামনে।সবাই মিলে আহত-নিহতদের হাসপাতালে পাঠানোর কাজে নিবিষ্ট হলাম।আহত নির্মলদা কে আমাদের তৎকালীন চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ভুইয়া সাহেবের পিকআপ প্যাটার্নের একটা গাড়ীতে সবাই ধরাধরি করে ওঠালাম।সেন্টু ভাইকে ওঠাতে গিয়ে মনে হল তার ভারী শরীরটা আরও যেন ভারী হয়ে গেছে।আমার হৃদস্পন্ন্দন বন্ধ হওয়ার উপক্রম।সেন্টু ভাই বোধ হয় আর নেই।

যা হোক সকল আহত-নিহতদের হাসপাতালে পাঠানো শেষ হলে গেলাম ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।আহত-নিহত স্বজনদের আহাজারিতে হাসপাতলের পরিবেশ ভারী হয়ে গেল।১৫ই আগস্ট,১৯৭৫ এ আমার বয়স ছিল চার।২১শে আগস্ট, ২০০৪ যেন তারই রেপ্লিকা।উদ্দেশ্য বঙ্গবন্ধু কন্যাকে হত্যা ও আওয়ামীলীগ কে নিশ্চিহ্ন করার প্রয়াস।

ঢাকা মেডিকেল থেকে ফিরে এলাম। বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা প্রতিবাদে ফেটে পড়ল।বিক্ষুব্ধ  জনতার ক্ষোভের অনলে পুড়ল ঢাকাসহ সারাদেশ।বিএনপি-জামাত জোট সরকার নির্বকার।

রাতে আবার বিভিন্ন হাসপাতালে গেলাম।পঙ্গু হাসপাতালে ২১শে আগস্টের শহীদ চাঁদপুরের কুদ্দুস পাটোয়ারীর লাশ আমি নিজে শনাক্ত করলাম।সেখানে চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগ তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক গনেশদার সাথে দেখা।ওনাকে কুদ্দুস পাটোয়ারীর ব্যাপারে অবগত করলাম।এরই মধ্যে একফাঁকে ধানমন্ডি পাঁচ নম্বরে নেত্রীর বাসভবনে ঘুরে এলাম।

 

সারারাত ব্যস্ত থাকার পর কখন যে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে কিছুই টের পাইনি।কখন যে আমার মোবাইলের চার্জ শেষ হয়ে গেছে তাও টের পাইনি।সারা শরীর মন জুড়ে ক্লান্তি আর অবসাদগ্রস্ততা।আমার বাসা গাজীভবনে।সকাল সাতটায় বাসায় ফিরলাম।আব্বা-আম্মা-বোন সবাই আমাকে দেখে কেঁদে ফেলল।তাঁরা ভেবেছিলেন মরে গেছি।আমি আসলে ঘোরের মধ্যেই ছিলাম।ঘটনার পর থেকে মন যেভাবে চালিত করেছে সেভাবেই চলেছি।অতঃপর সম্বিত ফিরে এলো।ঘটনা ঘটে যাবার পর সারা শহরের অন্যদের মতো  আমার বাসার লোকজনও যে জেনে ফেলেছে,তাঁরাও যে আমাকে নিয়ে চরম উৎকন্ঠায় ছিলেন এটা ঠিক বাসায় যাওয়ার পরই আমার মনে হল।আমি শুধু বললাম মোবাইলে চার্জ ছিল না।কেউ কিছুই বললো না।গোসল করলাম।সামান্য কিছু খেলাম।বস্তুত খাওয়াও মুখে নিতে পারছিলাম না।দশ মিনিটের জন্য বিছানায় শুয়ে পড়লাম।কারন ক্যাম্পাসে যেতে হবে।চোখ মেলে দেখি দুই ঘন্টা পার।তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়লাম।আব্বা কিছুই বললেন না।আম্মা বললেন সাবধানে থাকিস বাবা।বোনটা শুধু চেয়ে থাকলো।যাওয়ার সময় বলে গেলাম ঠিকমতো ঔষধ খেতে।আব্বা এবং আম্মার দু’জনেরই হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপ আছে।আব্বা ডায়বেটিক রোগী।আরও বললাম যারা গ্রেনেড হামলায় নিহত হয়েছেন তাঁদের মধ্যে দু’জনের বাড়ী চাঁদপুর।আমাকে  চাঁদপুর যেতে হবে।এই বলে বেরিয়ে গেলাম।

রাতে যখন কুদ্দুস পাটোয়ারীরসহ দুজনের লাশ নিয়ে চাঁদপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হবো ঠিক তখনই বাসা থেকে খবর এলো আব্বা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।বাসায় ফিরে আসলাম।চিকিৎসক বললেন মাত্রারিক্ত স্ট্রেস থেকে এরকম হয়েছে।আব্বার সাথে কিছু সময় কাটালাম।অসুস্থ আব্বাকে রেখে আবার চাঁদপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।আব্বা বললেন,চিন্তা করিস না,তুই যা,আমার কিছু হবে না।কিন্তু লাশের বহরে আর যেতে পারলাম না।সদরঘাটে গিয়ে রাত বারটার লঞ্চে উঠে পড়লাম।লঞ্চ চলতে শুর করলো।কখনও মোবাইল নেটওয়ার্ক পাই,কখনও পাই না।এর মধ্যে লাশের বহরে থাকা অন্যদের সাথে যোগাযোগ করতে লাগলাম।দু’জনের মধ্যে চাঁদপুরের মতলবের একজন।তিনি একজন রাজমিস্ত্রী ও আওয়ামীলীগ এর সমর্থক।অন্যজন স্বেচ্ছাসেবকলীগের কুদ্দুস ভাই।ওনার বাড়ী চাঁদপুরের হাইমচরে।বহর চাঁদপুরে যাওয়ার পথে দুইভাগ হয়ে যাবে।পথে পথে মানুষ লাশের বহর থামিয়ে জানাজা পড়ছে।তাই সকালের আগে পৌঁছবে না।আমি যাচ্ছি চাঁদপুর হয়ে হাইমচরে।

রাত ৩টা।একদিকে পুরো ঘটনার মনস্তাত্বিক চাপ আর আব্বার অসুস্থতার চিন্তা ঘুরপাক করছে।হঠাৎ ঢাকা থেকে ফোন এলো।বুকটা ধুক করে উঠলো।রিং বাজার সাথে সাথে মনে হল আব্বা কি নেই?মামা ফোন করেছে।মামার বাসা আমাদের বাসার কাছেই।মামা বললো দুলাভাই একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছে।ওনাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।আমি জানতে চাইলাম কি হয়েছে,কোন হাসপাতালে ঠিকমতো বলেন?উনি বললেন এনআইসিভিডি তে।তেমন কিছু না,তুমি যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি চলে আসো।মামা আমাকে সবটা বললেন না।আমি বুঝে নিলাম।আমি তখন মাঝ নদীতে।আল্লাহর কি অদ্ভুত পরীক্ষা!ঐ মুহুর্তে মনে হয়েছিল আমি পৃথিবীর এক হতভাগ্য অসহায় সন্তান।আগের রাতে আব্বা জানতেন না আমি বেঁচে আছি কি না,পরের রাতে আমি জানতে পারছি না আব্বা বেঁচে আছেন কি না!হাইমচরে পৌঁছা পর্যন্ত প্রতিটি মুহুর্ত আমি এক দুর্বিসহ যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছিলাম।কারন আমাকে বিস্তারিত কিছুই বলা হলো না আর মামার কথা আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না।

হাইমচরে আমি পৌঁছনোর কিছুক্ষণ আগে কুদ্দুস ভাইয়ের লাশ পৌঁছেছে।বিপুল সংখ্যক নেতা-কর্মীর ভীড় আর স্বজনদের আহাজারির মাঝেই আমি কুদ্দুস ভাইয়ের বড় ভাই হুমায়ুন ভাইকে ঢাকায় অসুস্থ আব্বার কথা বলে বাদজোহর এর জানাজা না পড়েই সকাল বেলায়ই ঢাকার উদ্দেশ্যে বাসে রওনা হলাম।ঢাকায় এনআইসিভিডি হাসপাতালে সরাসরি আসলাম।এস দেখি আল্লাহর রহমতে আব্বা বেঁচে আছেন।চিকিৎসকদের সাথে কথা বললাম।চিকিৎসক জানালেন ওনার দুটো সিভিয়ার হার্ট এটাক হয়েছে।একটা হয়েছে গত রাতে।আরেকটা ২৪ ঘন্টা আগে।উনি বেঁচে আছেন এটা আল্লাহর অশেষ রহমত।ডায়বেটিক রোগী হওয়ার কারনে প্রথম এটাকটা বোঝা যায়নি। চিকিৎসক আরও জানালেন উচ্চরক্তচাপ ও হার্ট এটাকের কারনে ওনার দুটো ব্লক সৃষ্টি হয়েছে আর একটি ব্লক ওনার আগে থেকেই ছিল।স্টেবিলিটি আসলে ওনাকে বাইপাস করাতে হবে।

একজনের প্রতি আমাদের পরিবারের রয়েছে অপরিসীম  ঋণ ও কৃতজ্ঞতা।গাজীভবনে আমাদের ফ্ল্যাট ওনার ছিলেন বিশিষ্ট  সাহিত্যিক ও প্রকাশক গাজী সাহাবুদ্দিন।ওনার ছেলে বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব গাজী শুভ্র নিজে গাড়ী চালিয়ে আমার অসুস্থ বাবাকে মধ্যরাতে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন।

সেই সময়ে একবেলা অসুস্থ বাবার পাশে তো আরেক বেলা ছাত্রলীগ এর সংগ্রামী মিছিলে।এভাবেই অতিবাহিত হয়েছিল আমাদের জীবন।

এতো শুধু আমার সামান্য অভিজ্ঞতা।আমি জানি সেই সময়ে আমাদের নেতা-কর্মীদের আরও ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।

একটা ব্যাপারে দুঃখ প্রকাশ করছি।আগস্টের ২১ এবং ২২ তারিখে আরও অনেকগুলো টুকরো টুকরো ঘটনা আমার স্মৃতিপটে রয়েছে যা তাৎক্ষনিক আমার মাথায় আসেনি বলে লেখা হল না।সেই সাথে অনেকের নামও লেখায় আসেনি।যে সমস্ত ঘটনাপ্রবাহে আমার সম্পৃক্ততা ছিল পরবর্তীতে লেখায় পুর্নাঙ্গ ঘটনাবলী সংযুক্ত করবো।

লেখকঃ জাকির হোসেন মারুফ

সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ।

সদস্য-সমন্বয়কারী,আমরা ক’জন মুজিব সেনা।

Print Friendly, PDF & Email

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.