মুশফিক আর বোলারদের বীরত্বে লঙ্কানদের হারাল টাইগাররা

(Last Updated On: সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৮)

ব্যাটিংয়ে মুশফিকুর রহিমের অনবদ্য ও ক্যারিয়ার সেরা সেঞ্চুরি আর বোলারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে শ্রীলঙ্কাকে ১৩৭ রানের বড় ব্যবধানে হারিয়ে এশিয়া কাপে শুভসূচনা করল বাংলাদেশ।

শ্রীলঙ্কার ব্যাটিংয়ের শুরু আর শেষে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। ইনিংসের ১.৫ ওভারেই ২২ রান তুলে বাংলাদেশের বোলারদের জন্য খারাপ কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন দুই লঙ্কান ওপেনার থারাঙ্গা ও মেন্ডিস। কিন্তু তাদের খুব বেশিদূর যেতে দেন নি বাঁহাতি পেসার মোস্তাফিজুর রহমান।

নিজের প্রথম ওভারের শেষ বলেই কুশাল মেন্ডিসকে লেগ বিভোরের ফাঁদে ফেলেন ‘দ্য ফিজ’। কিন্তু আম্পায়ার টাইগারদের আবেদন নাকচ করে দিলে রিভিও নেন টাইগার দলপতি মাশরাফি। রিপ্লেতে দেখা যায় বল স্ট্যাম্পের একদম মাঝ বরাবর আঘাত হানতো। ফলে রিভিও জিতে নেয় বাংলাদেশ।

ইনিংসের তৃতীয় ওভারে বল করতে এসে আরেক লঙ্কান ওপেনার উপুল থারাঙ্গাকে বোল্ড করে দেন মাশরাফি। উইকেট সোজা বলকে থার্ডম্যান বরাবর পাঠাতে চাইলে বলের সুইংয়ে পরাস্ত হন থারাঙ্গা। স্কোর বোর্ডে ২৮ রান সংগ্রহ করতেই দ্বিতীয় উইকেট হারায় শ্রীলঙ্কা।

এরপর লঙ্কানদের আরও চাপে ফেলে দেন মাশরাফি। নিজের তৃতীয় ও ইনিংসের পঞ্চম ওভারে ধনঞ্জয়া ডি সিলভাকে লেগ বিফোরের ফাঁদে ফেলেন টাইগার অধিনায়ক। আম্পায়ার আউট দিলেও এবার রিভিও নেয় শ্রীলঙ্কা। রিপ্লে দেখে আম্পায়ার তার সিদ্ধন্তে অটল থাকেন। ১ উইকেটে ২২ রান থেকে ৩২ রানেই ৩ উইকেট হারিয়ে ফেলে শ্রীলঙ্কা।

লঙ্কান ইনিংসকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে অষ্টম ওভারে স্পিনার মেহেদি হাসান মিরাজকে আক্রমণে আনেন মাশরাফি। নিজের প্রথম ওভারে মাত্র ১ রান খরচ করা মিরাজ নিজের দ্বিতীয় ওভারের দ্বিতীয় বলেই কুশাল পেরেরার উইকেট তুলে নেন। সোজা বলে ডিফেন্ড করতে গিয়ে পরাস্ত হন পেরেরা, বল গিয়ে লাগে তার প্যাডে। টাইগারদের আবেদনে সাড়া দিয়ে পেরেরাকে আউটের ইশারা করেন আম্পায়ার।

শ্রীলঙ্কার পঞ্চম উইকেটের পতন ঘটে রান আউটে। ১৭তম ওভারে বল করতে আসেন মিরাজ। প্রথম বলেই অফ স্ট্যাম্পের বাইরে পড়ে বল ব্যাটসম্যান ম্যাথুজের ব্যাটে লেগে লেগ সাইডে গড়ালে রানের জন্য দৌড়ে ক্রিজের মাঝপথে চলে আসা লঙ্কান আসা শানাকাকে ফেরত পাঠান অধিনায়ক ম্যাথুজ। কিন্তু ততোক্ষণে মিড উইকেট থেকে বল কুড়িয়ে সজোরে থ্রো করেন সাকিব আল হাসান। বল হাতে পৌঁছানো মাত্র নন-স্ট্রাইকিং প্রান্তের স্ট্যাম্প ভেঙে দেন বোলার মিরাজ।

ইনিংসের ১৮তম ওভারে পেসার রুবেল হোসেনের হাতে বল তুলে দেন টাইগার অধিনায়ক মাশরাফি। অধিনায়কের আস্থার প্রতিদান দিলেন ওভারের দ্বিতীয় বলেই লঙ্কান অধিনায়ক অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুসকে লেগ বিভোরের ফাঁদে ফেলে আউট করে দেন রুবেল।
মিরাজের বলে লঙ্কান অলরাউন্ডার থিসারার পেরেরা রুবেলের ক্যাচে পরিণত হলে সপ্তম উইকেটের পতন ঘটে শ্রীলঙ্কার।

ইনিংসের ২৬তম ওভারের দ্বিতীয় বলে দারুণ এক লেন্থ বলে লঙ্কান টেল-এন্ডার ব্যাটসম্যান সুরাঙ্গা লাকমলকে বোল্ড করে দেন মোস্তাফিজ। ইনিংসে এটি তার দ্বিতীয় উইকেট।

শেষ দুই উইকেট তুলে নিয়ে লঙ্কান ব্যাটিং অর্ডারের লেজ মুড়ে দেন দুই স্পিনার মোসাদ্দেক হোসেন ও সাকিব আল হাসান। ১২৪ রান তুলতেই সব উইকেট হারিয়ে ১৩৭ রানের বড় ব্যবধানে পরাজিত হয় শ্রীলঙ্কা।

বল হাতে ৬ ওভারে ২ মেডেনসহ ২৫ রান খরচে ২ উইকেট তুলে নিয়েছেন অধিনায়ক মাশরাফি। ৬ ওভারে ২০ রান খরচে সমান ২ উইকেট পেয়েছেন মোস্তাফিজ। স্পিনার মিরাজ ৭ ওভারে ২১ রান খরচ করে ২ উইকেট আর ১ উইকেট করে পেয়েছেন সাকিব, রুবেল এবং মোসাদ্দেক।

এই জয়ে এশিয়া কাপে জয় নিয়েই নিজেদের মিশন শুরু করল বাংলাদেশ।

তবে ম্যাচের আসল নায়ক টাইগার উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান মুশফিক। ধ্বংসস্তুপের মাঝে একাই ‍বুক চিতিয়ে লড়াই করলেন মুশফিকুর রহিম। চাপের মধ্যে থেকেও কি দুর্দান্ত ব্যাটিংটাই না করলেন তিনি। তার অন্যবদ্য সেঞ্চুরিতেই এশিয়া কাপের উদ্বোধনী ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে সবকটি উইকেট হারিয়ে ২৬১ রানে থামে বাংলাদেশের ইনিংস।

এদিন নিজের ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ সেঞ্চুরি তুলে শেষ পর্যন্ত ক্যারিয়ার সেরা ১৪৪ করে আউট হন মুশফিক। ২০১৪ সালে ফতুল্লায় ভারতের বিপক্ষে ১১৭ রানের ইনিংসটি ছিল তার আগের ওয়ানডে সেরা।

এর আগে এশিয়া কাপের ১৪তম আসরে উদ্বোধনী ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে মাঠে নামে বাংলাদেশ। যেখানে লঙ্কানদের বিপক্ষে টসে জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন টাইগার অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা। দুবাই ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় বিকেল সাড়ে পাঁচটায় মাঠে নামে দু’দল।

শুরুটা বেশ বাজে হয় বাংলাদেশের। প্রথম ওভারের দুটি উইকেট হারায় দলটি। লাসিথ মালিঙ্গার পঞ্চম বলে স্লিপে থাকা কুশাল মেন্ডিসের ক্যাচে শূন্য রানে ফেরেন থাকা লিটন দাশ। পরের বলে উইকেটে আসা সাকিব আল হাসানকে একেবারে বোল্ড করে দেন এই অভিজ্ঞ লঙ্কান পেসার।

সুরাঙ্গা লাকমালের করা দলীয় দ্বিতীয় ওভারের শেষ বলে বাঁহাতের কবজিতে আঘাত পান তামিম ইকবাল। এমনিতেই ডানহাতের অনামিকায় তার পুরোনো চোট রয়েছে। পরে সে সময়ই রিটায়ার্ড হার্ট হয়ে মাঠ ছাড়েন এই ওপেনার।

দলীয় ২০তম ওভারে ক্যারিয়ারের চতুর্থ ওয়ানডে ম্যাচে প্রথম হাফসেঞ্চুরির দেখা পান মোহাম্মদ মিঠুন। ৫২ বলে ৪টি চার ও ২টি ছক্কায় ফিফটি করেন তিনি। ডানহাতি এ ব্যাটসম্যান মালিঙ্গার তৃতীয় শিকার হয়ে মাঠ ছাড়েন। ২৬তম ওভারের তৃতীয় বলে তুলে মারতে গিয়ে উইকেটরক্ষক পেরেরার তালুবন্দি হন তিনি। ৬৮ বলে ৫টি চার ও ২টি ছক্কায় ৬৩ করেছিলেন মিঠুন। তৃতীয় উইকেট জুটিতে মুশফিকুর রহিমের সঙ্গে ১৩১ রান করেছিলেন তিনি।

২৭তম ওভারের তৃতীয় বলে লঙ্কান স্পিনার আমিলা আপোনসোর শিকার হয়ে ফেরেন নতুন ব্যাটসম্যান মাহমুদউল্লাহ। ব্যক্তিগত এক ‍রানে তিনি ধনাঞ্জয়া ডি সিলভার ক্যাচে পরিণত হন। পরের ওভারের শেষ বলে মালিঙ্গা নিজের চতুর্থ উইকেট উদযাপন করে মোসাদ্দেক হোসেনকে দিয়ে। এক রান করা মোসাদ্দেক উইকেটের পেছনে থাকা পেররাকে ক্যাচ দেন।

মুশফিকের সঙ্গে ভালো ব্যাটিং করতে থাকা মেহেদি হাসান মিরাজ ৩৪তম ওভারে ফিরে যান। ১৫ রান করা এই অলরাউন্ডার সুরাঙ্গা লাকমালের কট এন্ড বোল্ডের শিকার হন।

১৮ বলে ১১ রানের ইনিংস খেলে বিদায় নেন বাংলাদেশ অধিনায়ক মাশরাফি। ৩৯ ওভারের শেষ বলে ডি সিলভা আউট করেন তাকে। পরে ডি সিলভার শিকারে ২ রান করে ফেরেন রুবেল হোসেন।

৪১তম ওভারে দলীয় দুশো রানের গণ্ডি পার করে বাংলাদেশ। পরে নিজের ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ সেঞ্চুরির দেখা পান মুশফিকুর রহিম। ১৮৮ ম্যাচ ও ১৭৩ ইনিংসে এই কীর্তি গড়েন তিনি। ১২৩ বলে ৭টি চার ও এক ছক্কায় সেঞ্চুরি স্পর্শ করেন মুশফিক।

৪৭তম ওভারে ১০ রান করা মোস্তাফিজুর রহমান রান আউটের শিকার হন। তবে মোস্তাফিজের বিদায়ে বাংলাদেশ যখন নবম উইকেট হারায়, ঠিক তখনই সবাইকে চমক দেখিয়ে মাঠে নামেন এশিয়া কাপ থেকে ইতোমধ্যে ছিটকে পড়া ওপেনার তামিম। ইনিংসের শুরুতে চোট পাওয়া এই তারকা নাকি হাসপাতাল পর্যন্ত গিয়েছিলেন। পরে চোট পাওয়া হাত নিয়েই মাঠে নেমে এক হাতে একটি বল মোকাবেলা করেন।

তামিম মাঠে আসার পর নিজের সংগ্রহে আর কোনো রান (২) যোগ করতে না পারলেও, ঝড় তুলতে শুরু করেন মুশফিক। শেষ পর্যন্ত তিনি ১৫০ বলে ১১টি চার ও ৪টি বিশাল ছক্কায় ১৪৪ করে থিসারা পেরার বলে বিদায় নেন। ৪৯.৩ ওভারে বাংলাদেশের ইনিংস শেষ হয়।

শ্রীলঙ্কান বোলারদের মধ্যে মালিঙ্গা এক বছরের বেশি সময় পর মাঠে নেমেই ৪টি উইকেট তুলে নেন। এদিন আবার স্বদেশি মুত্তিয়া মুরালিধরনকে পেছনে ফেলে এশিয়া কাপের শীর্ষ উইকেট শিকারি হন তিনি (৩২)। ডি সিলভা দুটি উইকেট তুলে নেন।

দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে ম্যাচসেরা হয়েছেন মুশফিকুর রহিম.

সূত্র -বাংলা নিউজ ।

Print Friendly

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.