বিপদে বিএনপি !!

(Last Updated On: অক্টোবর ১২, ২০১৮)

আলী আসিফ শাওন (আমাদের সময়): ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ে কিছুটা বিচলিত বিএনপি রাজনীতিকভাবেই বেশি বিপদে পড়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশিষ্টজনরা। তাদের মতে, রায়ে আদালতের যে পর্যবেক্ষণ, তাতে দলটি রাজনৈতিক নৈতিকতার প্রশ্নে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে। দেশে-বিদেশে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ভূমিকা আরও প্রশ্নবিদ্ধ হবে। আওয়ামী লীগ মনে করছে, রায়ের মধ্য দিয়ে বিএনপি নৈতিকভাবে পরাজিত হয়েছে। তাদের ভাষ্য, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাজা হওয়ার পরই বিএনপি বেকায়দায় পড়ে। ২১ আগস্ট হামলা মামলার রায়ের পর এ নৈতিক পরাজয়ের কারণে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি আরও চাপে পড়বে বলে মনে করছেন তারা।

অবশ্য তারেক রহমানের যাবজ্জীবন সাজা বিএনপিকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিয়েছে। দলের নেতাকর্মীদের আশঙ্কা ছিল, তার সর্বোচ্চ সাজা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে দলের নেতারা মানসিকভাবে কিছুটা প্রশান্তিই পেয়েছেন। বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো বলছে, তারেক রহমানের সাজার রায় রাজনৈতিকভাবে কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, তা নিয়ে দুদিন ধরে বৈঠক করছে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম। এ নিয়ে কর্মসূচি থাকছে, নতুন কৌশল নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত বিদেশি কূটনীতিকদের এ ব্যাপারে ব্রিফ করা হবে। বিএনপি নেতারা ও সমর্থক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ রায় দলটির ওপর তেমন নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। কারণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এ রায় দেওয়া হয়েছে, তা জনগণও বুঝতে পেরেছে। তারা বলেন, মামলার তদন্ত এবং কয়েকবার তদন্ত কর্মকর্তা বদলিসহ তদন্তের ধাপে ধাপে বিভিন্ন কার্যক্রম প্রমাণ করে, বিএনপি নেতারা নির্দোষ।

আইনজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, এ রায়টাই চূড়ান্ত রায় নয়। এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল হবে এবং আপিল বিভাগেও আপিল হবে। আপিলের আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বাধ্যতামূলকভাবে আপিল হতেই হবে। আর হাইকোর্ট এবং আপিল বিভাগ থেকে চূড়ান্ত রায় হতে আরও ৫ থেকে ৭ বছর লেগে যেতে পারে। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, এ রায় নিয়ে বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক মতপার্থক্য হবে। একদল বলবে এ রায় ঠিক হয়নি, আরেক দল বলবে যে উচিত রায় হয়েছে। আমার যেটা ধারণা, এ রায়ের ফলে যারা আওয়ামী লীগের কথা বিশ্বাস করে, তারা করবেই। আবার যারা বিএনপির কথা বিশ্বাস করে, তারা বিএনপিকেই বিশ্বাস করবে। আর যারা মাঝামাঝি, যারা কোনো দলের সে রকম সমর্থক নন, তাদের ওপরে কী প্রভাব সেটা বলা মুশকিল। কিন্তু আমার ধারণা, খুব বেশি প্রভাব পড়বে না। তৃতীয়ত, বিদেশে তারেক রহমান রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছেন যে কথা বলে তার প্রতি অন্যায়-অবিচার হচ্ছে, দেশে গেলে আরও অন্যায়-অবিচার করা হবেÑ আইনগতভাবে তারেক রহমানের সেই যুক্তি আরও জোরালো হবে। ড. মালিক আরও বলেন, রায়ে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচ্চতম কর্মকর্তারাও দোষী সাব্যস্ত হয়ে সাজা পেয়েছেন। রাজনীতিবিদদের মধ্যে অনেক সন্ত্রাসী-অসৎ ব্যক্তি রয়েছে। এটা থাকতে পারে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচ্চতম পর্যায়ের লোকজন যখন এসব নৃশংস হত্যাকা-ে জড়িত বলে সাজাপ্রাপ্ত হয়, সেটা আমার দৃষ্টিতে দেশের জন্য বেশি উৎকণ্ঠার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক মনে করেন, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যাকা-ের ধারাবাহিকতায় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের শীর্ষনেতাদের হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। হত্যাকা-ের বিচার যেন না হয়, সে জন্য পঁচাত্তরের ঘটনার মতোই হত্যাকারীদের সব ধরনের সহায়তা দিয়েছিল বিএনপি সরকার। তিনি বলেন, দেশের জনগণ রাজনৈতিক দলের এ ধরনের কার্যকলাপকে মূল্যায়ন করে বলে আমি বিশ্বাস করি। সরকারি দলেই শুধু নয়, বিরোধী দলে থাকার সময়ও ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে-পরে বিএনপি অবরোধ ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে সারাদেশে তা-ব চালিয়েছে। তিনি মনে করেন, এতসব ঘটনার পর নিজেকে গণতান্ত্রিক দল হিসেবে দাবি করার সুযোগ নেই বিএনপির। বিএনপি নেতারা মনে করছেন, রায় নিয়ে সরকার যতটুকু সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করবে, মানুষের কাছে রায় নিয়ে ততই প্রশ্ন উঠবে। তাই ভোটের মাঠে এটা তেমন প্রভাব ফেলতে পারবে না। কারণ, সরকারের আচরণে মানুষ ক্ষুব্ধ। সরকার যা-ই করবে, তা-ই তার বিরুদ্ধে যাবে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, (ওই হামলার) ঘটনা খারাপ, কারও জন্য কাম্য নয়। মানবিকভাবে গ্রহণ করা যায় না। কিন্তু মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া রাজনৈতিক, অর্থাৎ এটা রাজনৈতিক মামলা। জনগণ মনে করে না, তারেক রহমান ও বিএনপির এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা আছে। তাই বিএনপির ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রশ্ন আসে না। মামলা স্বাভাবিক গতিতে চললে রায় এমন হতো না। অবশ্য বিএনপির উদারপন্থি কোনো কোনো নেতা ও বিশ্লেষকের ধারণা, এ ধরনের ঘটনা তখনকার সরকার কোনোভাবেই এড়িয়ে যেতে পারে না। তারা এও মনে করেন, এ রায় তারেক রহমানকে যেমন বিতর্কের মধ্যে ফেলবে, বিদেশিদের কাছে বিএনপিকে সমালোচনার মধ্যে পড়তে হবে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, রায়ের ফলে বিএনপিতে একটা সংকট তো দেখা দিয়েছেই। খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা গেলে অথবা তার পরিবারের কেউ দেশে এসে দলের হাল ধরলে সংকট থাকবে না। বরং বিএনপি আরও শক্তিশালী হবে। এ ছাড়া বিবিসিকেও এক সাক্ষাৎকারে দিলারা চৌধুরী বলেন, রাজনীতিতে এ রায় বাড়তি প্রভাব ফেলবে না। কারণ, তারেক রহমানসহ বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব এরই মধ্যে বিভিন্ন মামলায় দ-িত হয়েছেন। এ মামলার রায়ের পর যত আলোচনা তারেক রহমানকে ঘিরেই। ১১ বছর ধরে তিনি লন্ডনে আছেন। সহসা তার দেশে ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই। এ মামলার রায় তার ফেরা আরও জটিল করেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, এ রায় আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়ার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। যাদের অপরাধের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে, তাদের অভিযুক্ত করে রায় দেওয়া হয়েছে। আইনের শাসনের দিক দিয়ে এ রায়কে আমি স্বাগত জানাচ্ছি। বিএনপি ও জামায়াত সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত হলো এ রায়ের মাধ্যমে। এ কারণে বিএনপি দুটো ফল ভোগ করতে পারে। হয়তো তাদের জনসমর্থন কমে যাবে অথবা তাদের সমর্থকদের মধ্যে সহানুভূতি আরও বেড়ে যাবে। যাই হোক, আমি মনে করি না, নির্বাচনের ওপর এ রায় প্রভাব ফেলবে। তবে রাজনৈতিক পরিবেশের ওপর প্রভাব তো ফেলবেই, এটা অনস্বীকার্য।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়কে নৈতিক বিজয় হিসেবে দেখছেন তারা। কারণ, ওই হামলার লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব ধ্বংস করে দেওয়া। এর বিচার হয়েছে। রায় নিয়ে দৃশ্যত কিছুটা উষ্মা দলের তরফে প্রকাশ করা হলেও শাসক দল মনে করছে, শুধু দল হিসেবে আওয়ামী লীগ নয়, আইনের শাসন প্রশ্নে সরকারের ভাবমূর্তিও এতে উজ্জ্বল হবে। তাদের ধারণা, এ রায়ের ফলে আওয়ামী লীগকে নির্মূল করে দেওয়ার জন্য বিএনপির যে অংশ তৎপর থেকেছে, তারা এখন সংকটে পড়বে। আওয়ামী লীগের নেতারা এমনটিও মনে করেন, এ রায়ের মধ্য দিয়ে কয়েকটি দলের চলমান জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়াও প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, এ রায়ের ফলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলো। শুধু আওয়ামী লীগের ওপর এ হামলা হয়নি; একটি গণতান্ত্রিক শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টার বিচার হওয়ায় প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিরও পরাজয় হলো। সাবেক এ মন্ত্রীর মতে, রায়ের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। প্রমাণ হয়েছে, অপরাধী যে-ই হোক, তারা আইনের ঊর্ধ্বে নয়। অপরাধ করলে সাজা পেতেই হবে। শতাধিক মামলার আসামি তারেক রহমান, তিন মামলায় দ-িত : বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বর্তমানে শতাধিক মামলার আসামি। কমপক্ষে ১০টিতে তার বিরুদ্ধে রয়েছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। দ-িত হয়েছেন ৩টিতে। বাকি মামলাগুলোর মধ্যে কিছু বিচারাধীন আর কিছু তদন্তাধীন পর্যায়ে রয়েছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া পলাতক থাকায় তার বক্তব্য প্রচারের ওপর রয়েছে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা। পাঁচটি মামলায় আত্মসমর্পণেরও আদেশ রয়েছে হাইকোর্টের।

জানতে চাওয়া হলে তার অন্যতম আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, ‘তারেক রহমানের জনপ্রিয়তাকে সরকার বেশি ভয় পায়। তার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে এ সরকার একের পর এক মামলা করেছে। রাজনৈতিক বক্তব্যকে ইস্যু করে বিচারকদের ব্যবহারের মাধ্যমে এসব মামলা দায়ের করা হয়েছে। সব মামলা মিথ্যা ও হয়রানিমূলক। আমরা আইনগতভাবে এসব মামলা মোকাবিলা করব।’

সবশেষ গত বুধবার তারেক রহমানকে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনায় করা দুটি মামলায় যাবজ্জীবন ও ২০ বছর কারাদ- দেওয়া হয়েছে। এর আগে অর্থপাচারের অভিযোগে সাত বছর এবং জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় তাকে আরও ১০ বছর কারাদ- দেন আদালত। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ৩৭টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ৫ বছর সাজা হয়েছে। বিচার শেষ পর্যায়ে রয়েছে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার। তার বিরুদ্ধে গাড়ি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং মানহানির মামলাও রয়েছে।

আওয়ামী লীগ সভাপতি ও তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। এ সংক্রান্ত মামলায় গত বুধবার দেওয়া রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদ- দেন আদালত। আর তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী, সাবেক সাংসদ কায়কোবাদসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদ- দেওয়া হয়।

আলী আসিফ শাওন (আমাদের সময়):

Print Friendly

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.