জামাল খাসোগি হত্যা মিশন চালায় যুবরাজের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা

(Last Updated On: অক্টোবর ১৯, ২০১৮)

সাংবাদিক জামাল খাসোগিকে হত্যার মিশন পরিচালনা করেছে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তারা।

খাসোগিকে হত্যায় জড়িত ১৫ জনের একটি দল। এ দলের মধ্যে অন্তত চারজন সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের ঘনিষ্ঠ।

তাদের একজন মেহের আবদুল আজিজ মুত্রেব। তিনি লন্ডনের সৌদি দূতাবাসের কূটনীতিক ছিলেন। সম্ভবত তিনি যুবরাজের দেহরক্ষী। গত জুলাই মাসে যুবরাজের প্যারিস ও মাদ্রিদ সফরের সময়ও আজিজকে দেখা গেছে।

নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, খাসোগি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে আরও তিনজনের সঙ্গে সৌদি আরবের নিরাপত্তাজনিত সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। সন্দেহভাজন ঘাতকদের পঞ্চম ব্যক্তি একজন ময়নাতদন্ত বিশেষজ্ঞ। যিনি সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন পদস্থ কর্মকর্তা। তুরস্কের দাবি, এ পাঁচ ব্যক্তি ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেটে খাসোগি গায়েব হয়ে যাওয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন। সন্দেহভাজন ১৫ ঘাতকের মধ্যে ৯ জনের পরিচয় শনাক্ত করার দাবি করেছে তুরস্ক। তাদের সবারই সৌদি নিরাপত্তা বাহিনী, সামরিক বা সরকারি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে।

যুবরাজকে দায়ী করলেন মার্কিন সিনেটর : ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম বলেন, খাসোগিকে হত্যার সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান।

তাকে ‘দুর্বৃত্ত ক্রাউন প্রিন্স’ বলেও আখ্যা দেন গ্রাহাম। বুধবার ফক্স নিউজের একটি অনুষ্ঠানে গ্রাহাম বলেন, যুবরাজ জানেন না এমন কোনো ঘটনা সৌদি আরবে ঘটে না।

তিনি আরও বলেন, ‘মার্কিন সিনেটে আমি ছিলাম তাদের (সৌদি আরব) সবচেয়ে বড় সমর্থক। কিন্তু এই লোকটা (যুবরাজ) সব তছনছ করে দিয়েছে। সে-ই খাসোগিকে তুরস্কের কনস্যুলেটের ভেতর হত্যা করিয়েছে।’

গ্রাহাম বলেন, ‘আমার কাছে এ যুবরাজকে বিষাক্ত মনে হয়। সে কখনোই বিশ্বমঞ্চে নেতা হয়ে উঠতে পারবে না।’ হুশিয়ারির সুরে তিনি বলেন, ‘খাসোগি হত্যার নেপথ্যে সৌদির হাত থাকার বিষয় প্রমাণিত হলে তাদেরকে কঠোর সাজা ভোগ করতে হবে।’

ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়ার দাবি তুরস্কের : তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সৌদি আরবের দুটি কূটনৈতিক ভবনে তল্লাশি চালিয়ে ‘ফিঙ্গারপ্রিন্ট’ পাওয়ার দাবি করেছেন তুরস্কের তদন্তকারীরা।

আলজাজিরা বলছে, খাসোগি হত্যায় অভিযুক্ত ১৫ সদস্যের হিট স্কোয়াডের মধ্যে ছয়জনের হাতের আঙুলের ছাপ পাওয়া গেছে সি-ব্লকে। ‘সি-ব্লক’ নামে পরিচিত ওই এলাকা শুধু কূটনৈতিক কর্মীদের জন্য নির্ধারিত।

সি-ব্লকে খাসোগি হত্যার শক্ত প্রমাণ রয়েছে। বুধবার রাতে কনস্যুলেট ভবন ও কনসাল জেনারেলের বাসভবনে ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় অনুসন্ধান ও তল্লাশি চালিয়েছে তুরস্কের তদন্ত দল।

প্রধান সন্দেহভাজন ময়নাতদন্ত বিশেষজ্ঞ : খাসোগিকে নির্যাতন ও হত্যায় প্রধান সন্দেহভাজন একজন ময়নাতদন্ত বিশেষজ্ঞ। সালাস মুহাম্মদ আল তুবাইগি নামের এ ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ অস্ট্রেলিয়ার একটি মেডিক্যাল ইন্সটিটিউটে কাজ করেছেন।

ভিক্টোরিয়ান ইন্সটিটিউট অব ফরেনসিক মেডিসিনে তিনি তিন মাস কাজ করেন। দ্য গার্ডিয়ান বলছে, প্রকাশিত অডিও কথোপকথনে আল তুবাইগিকে কথা বলতে শোনা গেছে।

তুর্কি সূত্রের বরাতে বলা হয়, খাসোগিকে জিজ্ঞাসাবাদের কোনো আলামত দেখা যায়নি। তাকে হত্যা করতেই স্কোয়াডটি এসেছিল। স্টাডি রুমের টেবিলে শুইয়ে মাত্র সাত মিনিটে খাসোগিকে জীবিত অবস্থায় কেটে টুকরো টুকরো করেন তুবাইগি। ভিক্টোরিয়ান ইন্সটিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক নোয়েল উডফোর্ড বলেন, ২০১৫ সালে তিনি আমাদের ইন্সটিটিউটে আসেন। তার আগ্রহের জায়গা ছিল সিটি স্ক্যানিং। কারণ এটা সব মর্গ ও ফরেনসিক ইন্সটিটিউটে নেই।’

গাড়িচাপায় নিহত ‘কিলিং স্কোয়াড’র সদস্য : খাসোগি নিখোঁজের দিনে তুরস্কে উড়ে যাওয়া সৌদি আরবের ১৫ সদস্যের ‘কিলিং স্কোয়াড’র এক সদস্য গাড়ি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। সৌদি রয়্যাল এয়ারফোর্সের লেফটেন্যান্ট পদমর্যাদার এ কর্মকর্তা ও সন্দেহভাজন ঘাতক গাড়ি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন। বৃহস্পতিবার তুরস্কের দৈনিক ইয়েনি সাফাক বলেছে, নিহত ব্যক্তি হলেন সৌদি রয়্যাল এয়ারফোর্সের লেফটেন্যান্ট মেশাল সাদ মোহাম্মদ আলবোস্তানিও। জানা গেছে, কনস্যুলেট থেকে ফেরার পথে তিনি নিহত হয়েছেন।

সত্য আড়াল করছে সৌদি, তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্র? : দুই সপ্তাহের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও খাসোগির অন্তর্ধানের রহস্য উন্মোচিত হয়নি। সৌদি আরব, তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে খাসোগির পরিণতি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও কিছু বলা হয়নি। এতদিন পরও ঘটনাটি সম্পর্কে সত্য উন্মোচন না হওয়ায় আশঙ্কা জাগছে তিনটি দেশের সদিচ্ছা নিয়ে। তিন দেশের প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করে ধারণা হচ্ছে, তারা খাসোগির সম্পর্কে সত্য প্রকাশে আগ্রহী নয়।

বৃহস্পতিবার সিএনএনের এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়, খাসোগির সবচেয়ে খারাপ পরিণতি যা হতে পারে তা হচ্ছে, সৌদি যুবরাজের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কূটনীতিক তাকে বিদেশের মাটিতে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে।

এমনটা হলে যুবরাজ সালমানের নেতৃত্বে সৌদি প্রশাসনের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। একে ছোট ঘটনা হিসেবে তুলে ধরে পার পেলেও আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হবে।

রিয়াদের কৌশল হচ্ছে- বিশ্বে বড় কোনো ঘটনার অপেক্ষায় থাকা। যাতে সংবাদমাধ্যম ও বিশ্বের নজর অন্যদিকে চলে যায়। ফলে সময় যত গড়াবে খাসোগি ইস্যু তাদের জন্য আরও বড় হয়ে দেখা দেবে। বুধবার খাসোগি হত্যার এক কথোপকথন ফাঁস হয়েছে।

এমন সময় এই অডিও ফাঁস হল যখন সৌদি ও যুক্তরাষ্ট্র ঘটনাটিকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে চাচ্ছিল। ট্রাম্প তুরস্কের ফাঁস করা কথোপকথন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বুধবার তিনি বলেন, হয়তো তুর্কি কর্তৃপক্ষের কাছে থাকতে পারে। আমি নিশ্চিত নই যে এটা আছে, হয়তো আছে, সম্ভবত আছে। পম্পেও ফিরলে বিস্তারিত জানতে পারব।

www.jugantor.com

Print Friendly, PDF & Email

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.