আওয়ামী লীগ বনাম সাবেক আওয়ামী লীগ

(Last Updated On: নভেম্বর ১, ২০১৮)

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ঐক্যফ্রন্টের ১৬ নেতা অংশ নেবেন আলোচনায় আজ। ঐক্যফ্রন্টের এই ১৬ নেতার মধ্যে ৯ নেতা ছিলেন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে। বনিবনা না হওয়ায় কেউ দল ছেড়েছেন, কেউ কেউ বহিষ্কৃতও হয়েছেন নানা কারণে। আবার কেউ কেউ দীর্ঘদিন পদ-পদবি না পেয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আজকে সংলাপ হবে আওয়ামী লীগ বনাম সাবেক আওয়ামী লীগের মধ্যে। এই ১৬ নেতার নেতৃত্বে থাকবেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। দীর্ঘ একযুগ পর মুখোমুখি হচ্ছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। ড. কামাল হোসেন ১৯৭০ সালের পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়েছিলেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এরপর আওয়ামী লীগের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন করে পরাজিত হন তিনি। এ ছাড়া ১৯৮৬ ও ১৯৯১ সালে রাজধানীর মিরপুর আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছিলেন ড. কামাল হোসেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে কামাল হোসেনের মতবিরোধ দেখা দেয়। তিনি ১৯৯২ সালের দলের সম্মেলনের আগে দেশ থেকে চলে যান। এরপর ফিরে এসে গণফোরাম গঠন করেন। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪-দলীয় জোট গঠিত হয়। ১৪ দলের শরিক ছিল গণফোরাম। আওয়ামী লীগ থেকে চলে যাওয়ার পর ওই সময়ে ১৪ দলের সভায় শেখ হাসিনার সঙ্গে ড. কামাল হোসেনের দেখা হয়। ২০০৬ সালে রাজধানীর পল্টন ময়দানে ১৪ দলের সমাবেশে একই মঞ্চে বক্তব্য রেখেছিলেন শেখ হাসিনা ও ড. কামাল হোসেন। পরে আবার মতবিরোধ দেখা দিলে ১৪ দল ছেড়ে যায় গণফোরাম। এরপর শেখ হাসিনা ও কামাল হোসেন মুখোমুখি হননি। ১২ বছর পর আজ সংলাপের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা ও কামাল হোসেন মুখোমুখি হচ্ছেন।

জাতীয় ঐক্যের অন্যতম নেতা ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম সংগঠক। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ১৯৭১ সালের ২ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে বাংলাদেশের পতাকা তুলে দেন। ৭ মার্চে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে মঞ্চে ওঠার আগে ‘জাতির পিতা শেখ মুজিব লও লও সালাম’ এই স্লোগানদাতা ছিলেন রব। সেদিনই প্রথম বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা বলা হয়। ছাত্রলীগের ব্যানারে আ স ম আবদুর রব ডাকসুর প্রথম নির্বাচিত ভিপি। স্বাধীনতার পর আ স ম রব নতুন দল জাসদ গঠন করেছিলেন।

ঐক্যফ্রন্টের নেতা ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না। ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বাসদের কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ছিলেন। ১৯৯২ সালে জনতা মুক্তি পার্টি বিলুপ্ত করে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। তিনি সর্বশেষ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ থেকে বাদ পড়েন মান্না।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ছাত্রলীগের ব্যানারে ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ। তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। নৌকা নিয়ে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া থেকে এমপিও নির্বাচিত হয়েছিলেন সুলতান মনসুর।

২০০৯ সালের গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসীন মন্টু যুবলীগের চেয়ারম্যান ছিলেন। ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নাগরিক ঐক্যের নেতা এস এম আকরাম। ১৯৯৪ সালে চাকরি ছেড়ে দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ১৯৯৬ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বর্তমানে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য। শিক্ষাজীবনে ছাত্রলীগ করতেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ মুক্তিযুদ্ধের সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৯, ১৯৭০ ও ১৯৭১ সালে তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে কাজ করেছেন আইনজীবী হিসেবে। জাতির পিতার ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। এ ছাড়াও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। আর সংগঠনের সহ-সভাপতি এবং আ স ম আবদুর রবের স্ত্রী তানিয়া রব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

১৭ পদের খাবার দিয়ে আপ্যায়ন : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবরই অতিথি পরায়ণ। তার সরকারি বাসভবন গণভবনে আজ সন্ধ্যায় ৭ দফা দাবি ও ১১ লক্ষ্য নিয়ে সংলাপে বসছেন ঐক্যফ্রন্টের ১৬ নেতা। ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের বিশেষ পছন্দের খাবার চিজ কেকসহ ১৭ ধরনের খাবার দিয়ে ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের আপ্যায়ন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল গণভবন সূত্রে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, খাবারের মেন্যুতে আরও থাকছে পিয়ারু সরদারের মোরগ পোলাও, চিতল মাছের কোপ্তা, রুই মাছের দো-পিয়াজো, চিকেন ইরানি কাবাব, বাটার নান, মাটন রেজালা, বিফ শিক কাবাব, মাল্টা, আনারস, জলপাই ও তরমুজের ফ্রেশ জুস, চিংড়ি ছাড়া টক-মিষ্টি স্বাদের কর্ন স্যুপ, চিংড়ি ছাড়া মিক্সড নুডলস, মিক্সড সবজি, সাদা ভাত, টক ও মিষ্টি উভয় ধরনের দই, মিক্সড সালাদ, কোক ক্যান এবং চা ও কফি।

ডিনারে অংশ নেবে না ঐক্যফ্রন্ট : সংলাপে বসলেও নৈশভোজে অংশ নেবে না জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। গতকাল রাতে ২০ দলীয় জোটের বৈঠকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ তথ্য জানিয়েছেন। একই তথ্য গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন ড. কামাল হোসেন ও মাহমুদুর রহমান মান্না। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা থেকে ঘণ্টাব্যাপী ২০ দলীয় জোটের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসন কার্যালয়ে। জানা গেছে, সংলাপকে স্বাগত জানিয়েছে ২০ দল। একই সঙ্গে নৈশভোজে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তে একমত হয়েছেন তারা। জোটের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ছাড়া কোনো নির্বাচনে নয়। একই সঙ্গে সংসদ না ভাঙলে নির্বাচনে যাবে না ২০ দল। এ বিষয়টি যেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সংলাপে বিএনপি তুলে ধরে। এ নিয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করেন মির্জা ফখরুল। জোট নেতাদের তিনি বলেন, সংলাপ কিংবা আন্দোলনে জয়ী হওয়ার পরই নির্বাচন নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হবে। নির্বাচনে গেলে সবাইকে মূল্যায়নও করা হবে।

মির্জা ফখরুলের সভাপতিত্বে বৈঠকে অংশ নেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য আবদুল হালিম, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) মোস্তফা জামাল হায়দার, বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ, কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, এলডিপির ড. রেদোয়ান আহমেদ, জাগপার ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান, এনপিপির ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, লেবার পার্টির ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, ডেমোক্রেটিক লীগের সাইফুদ্দিন আহমেদ মনি, সাম্যবাদী দলের সাঈদ আহমেদ প্রমুখ।

সূত্র – বাংলাদেশ প্রতিদিন ।

Print Friendly, PDF & Email

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.