ঢাকাকে অচল করে দেয়া সমাবেশ থেকে শুকরানা মাহফিল

(Last Updated On: নভেম্বর ১২, ২০১৮)

চ্যানেল আই অনলাইন: ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকাকে অচল করে সরকারবিরোধী তাণ্ডবের কর্মসূচি নিলেও কওমি শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিসকে স্নাতকোত্তরের সমমান দেওয়ায় এবার প্রধানমন্ত্রীকে সম্মাননা জানাতে রাজধানীতে ‘শুকরানা মাহফিল’ এর আয়োজন করেছে হেফাজতে ইসলামের ‘আল-হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’।

এমন পরিপ্রেক্ষিতে দাওরায়ে হাদিসকে স্নাতকোত্তরের সমমান দেওয়ার বিষয়টিকে কিভাবে দেখছেন বিশ্লেষকরা? এই প্রশ্নের জবাবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘ধর্মীয় শিক্ষার ক্ষেত্রে এটা বড় ধরনের স্বীকৃতি। কওমি শিক্ষাকে আধুনিক করার এই পদক্ষেপ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বড় ধরনের সফলতা।’ তবে হেফাজতপন্থী কট্টর কওমি আলেম ও শিক্ষার্থীদের এই সমর্থন আসলে কতদিন থাকে এ নিয়েও বিশ্লেষকরা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

রোববার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘শুকরানা মাহফিল’-এ প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এতে সভাপতিত্ব করবেন হেফাজতের আমির ও হাইয়াতুল উলইয়ার চেয়ারম্যান শাহ আহমদ শফী।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়্যারম্যান ড. অরুণ কুমার গোস্বামী বলেন: কওমী শিক্ষা এতদিন অফিসিয়াল নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল, এই স্বীকৃতির ফলে কওমী মাদ্রাসা এখন নিয়ন্ত্রণে আসবে।

তিনি বলেন: মাদ্রাসা শিক্ষা এদেশে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে, পশ্চিমবঙ্গেও আছে। এই শিক্ষা এখন যেহেতু সরকারের নিয়ন্ত্রণে, তাই এখন বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রেখে এদের সিলেবাস দেশের সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। পাশাপাশি ৭২ এর সংবিধান যদি পুনরুজ্জীবিত হয় যে, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি শিথিল থাকবে, তাহলে সেদিক দিয়ে এই উদ্যোগ ঠিকই আছে।

ড. অরুণ কুমার গোস্বামী বলেন: পশ্চিমবঙ্গে যেমন আছে অমুসলিম ছাত্র ও শিক্ষক মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষক হতে পারবেন। অর্থাৎ তাদেরকে শুধু ধর্মীয় শিক্ষা না দিয়ে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা হয়, তাহলে অসুবিধা হওয়ার কথা না। এখন বিষয় হলো পরবর্তী নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি ক্ষমতায় আসেন তাহলে হয়তো এই বিষয়গুলো আসবে এবং নিয়ন্ত্রিত হওয়ার পথ সুগম হবে।

কওমি শিক্ষার এই স্বীকৃতিকে প্রধানমন্ত্রীর যুগান্তকারী পদক্ষেপ উল্লেখ করে তিনি বলেন: কওমি শিক্ষা নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলে তারা যা খুশি করতে পারবে, কিন্তু এটি নির্দিষ্ট কারিকুলাম বা সিলেবাস অর্থাৎ সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিয়মের মধ্যে থাকলে সেটা আর করতে পারবে না।

হেফাজতের সঙ্গে সরকারের শুরুর দিকে একটা মুখোমুখি অবস্থান ছিল, সেখানে কওমি শিক্ষার্থীদের এই স্বীকৃতিকে কেউ ভোটের রাজনীতি হিসেবে দেখবে কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন: ভোটের রাজনীতির কথা কেউ বললে বলতে পারে, কারণ ভোটের রাজনীতি তো থাকবেই, এটা স্বাভাবিক। গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে যে যেভাবে পারে তার পক্ষে ভোটারদের সমর্থন আনার চেষ্টা করবে। এটি তো ইতিবাচক চাওয়া।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন: বাংলাদেশে আসলে ভোটের রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে আদর্শ অনেক সময় ভোটের রাজনীতির কাছে অনেক সময় কম গুরুত্বহীন হয়।

তিনি বলেন: বাংলাদেশে অনেক কওমি মাদ্রাসা আছে, সেখানে হাজার হাজার ছাত্র আছে। স্বাভাবিকভাবে তাদের এই সমমানের স্বীকৃতি মূল ধারায় চাকরি-বাকরি পেতে সুবিধা হবে। সেক্ষেত্রে সরকার এটা দিতেই পারে। আমি মনে করি, সরকার রাজনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে তাদেরকে প্রভাবিত করে, পাশাপাশি তাদের এই সুবিধা দিয়ে সরকার সফল হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কত দিন এই সমর্থন থাকে, সেটা সময়ই বলে দেবে।

ভোটের রাজনীতির দিক থেকে একে নেতিবাচক হিসেবে দেখার সুযোগ আছে কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন: এটাকে আমি নেতিবচাক বলবো না। এটা আসলে কৌশল, সব রাজনৈতিক দলই কৌশল অনুসরণ করে। আদর্শিক দিক থেকে আওয়ামী লীগ প্রথম যে অবস্থানে ছিল সেখান থেকে সরে এসে, আসলে বাংলাদেশের মানুষের ধর্মের প্রতি একটা সহানুভূতি আছে সেটা বুঝিয়েছে। ভোটের রাজনীতির কৌশলগত দিক থেকে আওয়ামী লীগের দলীয় অবস্থান থেকে ঠিকই আছে। কিন্তু যারা বাম ঘরানার তারা এটাকে কিভাবে দেখে সেটা বিষয়।

তিনি বলেন: আমার মনে হয় তাদেরকে যে এই স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে, সেটা তাদের জন্য ভালো হয়েছে। কিন্তু দেখার বিষয় তাদের কত অংশ বা কোন অংশ আওয়ামী লীগকে ভোট দিবে সেটা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে মোটের ওপর মূলধারার শিক্ষা বা সরকারি-বেসরকারি ক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে। ইতিবাচক বিষয় হলো জঙ্গিবাদের বিষয় নিয়ে যে ভ্রান্ত ধারণা আছে, এই বিষয়গুলো নিয়ে এই স্বীকৃতির ফলে আধুনিক শিক্ষায় যারা শিক্ষিত তাদের সঙ্গে কওমি শিক্ষার্থীদের মেশার সুযোগ হবে, ভ্রান্ত ধারণা দূর হবে।

তবে এই আইনের বাস্তবায়ন যেন সঠিকভাবে হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে, তা না হলে তাদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হবে বলে মনে করেন তিনি।

সম্প্রতি সরকার প্রজ্ঞাপন দিয়ে কওমি মাদ্রাসাগুলোর সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিসের সনদকে মাস্টার্স ডিগ্রি সমমানের স্বীকৃতি দেয়। এরপর ২৭ অক্টোবর বেফাক কার্যালয়ে শুকরিয়া মাহফিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংবর্ধনা দেয়ার কথা ঘোষণা দেন হাইয়াতুল উলিয়ার নেতারা।

সেই ঘোষণা অনুযায়ী রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দেশের কওমিপন্থী ৬টি বোর্ড নিয়ে গঠিত আল-হাইয়াতুল উলিয়া লিল জামিআাতিল কওমিয়া বাংলাদেশের (হাইয়াতুল উলিয়া) শুকরিয়া মাহফিল হবে আজ রোববার।

মাহফিলে বোর্ডের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে সম্মাননা ক্রেস্ট দেয়া হবে। অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রায় ৫ লাখ কওমি আলেম ও শিক্ষার্থীর সমাগম হবে হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গত ১৯ সেপ্টেম্বর কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিসকে স্নাতকোত্তরের সমমান দিয়ে ‘কওমি মাদ্রাসাসমূহের দাওরায়ে হাদিসের (তাকমিল) সনদকে মাস্টার্স ডিগ্রি (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি) সমমান প্রদান বিল, ২০১৮’ জাতীয় সংসদে পাস হয়।

এর আগে গত বছরের এপ্রিল মাসে দাওরায়ে হাদিসকে স্নাতকোত্তর সমমানের স্বীকৃতি দেয় সরকার। এরপর এই স্বীকৃতির আইনি বৈধতা দিতে উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত ১৩ আগস্ট এই আইনের খসড়ার অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। ১০ সেপ্টেম্বর তা সংসদে তোলা হয়। গত ১৯ সেপ্টেম্বর শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বিলটি পাসের জন্য সংসদে তোলেন। বিলের ওপর দেওয়া জনমত যাচাই, বাছাই কমিটিতে পাঠানো এবং সংশোধনী প্রস্তাবগুলোর নিষ্পত্তি শেষে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়।

তখন বিরোধী দলের সদস্যরা অভিযোগ করেছিলেন, কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ স্তরকে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ বা নজরদারির ব্যবস্থা রাখা হয়নি। শুধু বলা হয়েছে, ‘আল-হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’-এর কমিটি তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে সময়-সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অবহিত করবে। মূলত হেফাজতে ইসলাম যেভাবে চেয়েছিল, সেভাবেই আইনটি হয়েছে।

 

Print Friendly, PDF & Email

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.