নির্বাচন বর্জনের কোনো আলোচনা নেই বিএনপিতে

(Last Updated On: নভেম্বর ১২, ২০১৮)

হারুন উর রশীদ স্বপন, সংলাপ নিয়ে ‘হতাশা আর অসন্তুষ্টি’ যাই থাকুক না কেন এখন পর্যন্ত নির্বাচন বর্জনের কোনো সিদ্ধান্ত নেই বিনপিতে৷ ঐক্যফ্রন্টের মূল অংশীদার বিএনপি৷ তাই বিএনপি’র চাহিদাকেই প্রাধান্য দিয়ে কাজ করছেন ফ্রন্ট নেতারা৷

বৃহস্পতিবারের সংলাপের পর ঐক্যফ্রন্ট নেতারা আনুষ্ঠানিক এবং আলদাভাবে কথা বলেছেন সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে৷ আর তারা অফ দি রেকর্ডও তথ্য দিচ্ছেন৷ তারা মনে করেন সরকারের সঙ্গে ছোট আকারে আবারো সংলাপ হবে৷ তারা সেই প্রস্তুতিও নিচ্ছেন৷

এর কারণ বৃহস্পতিবারের সংলাপে প্রধানমন্ত্রীর কয়েকটি প্রশ্নের জবাব দিতে পারেননি তারা৷ এরমধ্যে অন্যতম হল বর্তমান সরকার ক্ষমতা ছেড়ে দিলে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান বা প্রধানমন্ত্রী কে হবেন? আর ২১ আগষ্টের গ্রেনেড হামলা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নের জবাবে বিএনপি নেতারা কথাই বলেননি৷

বিএনপি’র কয়েকজন দায়িত্বশীল নেতার সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, ঐক্যফ্রন্টের মূল দাবি হলো নির্বাচনের আগে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা৷ তারা নিশ্চিত হতে চান প্রার্থীদের যতে গ্রেপ্তার করা না হয়৷ আর ভোটাররা যাতে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ঠিকমত ভোট দিতে পারেন৷

সরকারের পক্ষ থেকে সভা সমাবেশ ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে৷ কিন্তু ফ্রন্ট নেতারা সেটা কীভাবে হবে তার নিশ্চয়তা চান৷ একাধিক নেতা বলেছেন, বিএনপি নির্বাচনে যাবে না এ ধরনের কোনো বিষয় নিয়ে এখন আর আলোচনা হচ্ছে না৷ আলোচনা হচ্ছে বিএনপি কীভাবে এবং কতটুকু ছাড় দিয়ে নির্বাচনে যাবে তা নিয়ে৷ এ নিয়ে যুক্তফ্রন্ট নেতারা বেঠক করবেন৷ বিএনপি তাদের কৌশল এবং পরিকল্পনা নিয়ে এখন কাজ করছে৷

বিএনপি’র প্রাধান্যে যুক্তফ্রন্ট সংলাপের পর এটা নিশ্চিত হয়ে গেছে যে, বিএনপি’র চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে কোনো ছাড় দেবে না সরকার৷ আর নির্বাচনও হবে শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রিত্বে৷ তাই এর মধ্য থেকে কতটুকু সুবিধা পাওয়া যায় তা নিয়ে ভাবছে বিএনপি৷

তারা চাইছে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেয়া না হলেও তাকে নির্বাচনের সময় প্যারোলে মুক্তি দিয়ে বাসায় রাখা যায় কিনা৷ অথবা তাকে বাসায় রেখে বাসাটাকেই সাবজেল ঘোষণা করা যায় কিনা৷ অথবা নির্বাচন নিয়ে দলের সঙ্গে জেলখানাতেই কথা বলার সুযোগ দেয়া যায় কিনা৷ কারণ প্রার্থী মনেনানয়নে খালেদা জিয়ার সঙ্গে বিএনপি’র বার বার আলোচনার প্রয়োজন পড়বে৷

অন্যদিকে এই সরকারের অধীনেই নির্বাচন হলে অথবা প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আলাদা নির্বাচনী সরকার হলে সেখানে যেন ঐক্যফ্রন্টের কমপক্ষে তিনজন প্রতিনিধি থাকে৷ ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন পেছানের দাবি করেছে৷ সেক্ষেত্রে তাদের যুক্তি হলো, মামলা আটকের শিকার নেতা-কর্মীদের বাইরে আনতে সময় লাগবে৷ সরকারও তালিকা চেয়েছে৷ তা করতেও সময় লাগবে৷

আর নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন যদি করা হয় তাহলেও নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন সম্ভব নয়৷ তাদের কথা, সরকারের কাছ থেকে যা আদায় করা যায় তা তফসিল ঘোষণার আগেই করতে হবে৷ পরে আর সম্ভব নয়৷ আর সরকার যে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে তার জন্য কী ব্যবস্থা নেয় তা দৃশ্যমান হতেও সময় লাগবে৷

ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সংলাপে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনও ছিলেন৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘সরকারতো আমাদের সাত দফা দাবির কোনোটিই প্রত্যাখ্যান করেনি৷ তারা বলেছে দাবিগুলো নিয়ে ছোট আকারে আরো আলোচনা হবে৷ আমরা আমাদের সব দাবি তুলে ধরেছি৷ তারাও দাবিগুলোর ব্যাপারে তাদের অবস্থান নিয়ে কথা বলেছেন৷ এখন পরবর্তী আলোচনায় কী হয় সেটাই দেখার বিষয়৷ তারা আবার আলোচনায় ডাকবেন৷ আমরা সেই আলোচনায় যাব কিনা বসে সিদ্ধান্ত নেব৷”

তিনি আরেক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘‘আমরা চাই নির্বাচনের লেভেল প্লেইং ফিল্ড৷ এখন সরকার সেটা করার কথা বলেছে৷ সেটা করার জন্য যে কাজ তা সরকারকেই করতে হবে৷ কী কী পদক্ষেপ নেয় তা দেখার আছে৷ আমরা নির্বাচনের তফসিল পেছানোর কথা বলেছি৷ যে যার দাবির কথা বলে৷ কী হবে সেটাতো পরের বিষয়৷”

তিনি আরো বলেন, ‘‘নির্বাচনে যাব কি যাব না তাতো পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে৷”

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের সূত্রগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকার কোনেভাবে খালেদা জিয়ার ব্যাপারে ছাড় দিতে রাজি নয়৷ তিনি যদি আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে কারাগারের বাইরে আসতে পারেন, আসবেন৷ কিন্তু নির্বাচনের সময় প্যারেলে মুক্তি, তার বাসভবনকে সাবজেল এসব কোনো সুবিধা খালেদা জিয়াকে দেয়া হবে না৷ তাঁকে কারাগারে বসে মামলার বাইরে কোনো রাজনৈতিক পরামর্শের সুযোগ দেবে না সরকার৷ কারণ এটা আইনে অনুমোদন করে না৷

এদিকে, নির্বাচনকালীন সরকারের নামে মন্ত্রিসভা ছোট করার কথা আগে সরকারের দিক থেকে বলা হলেও আপাতত সেই সিদ্ধান্ত ত্যাগ করেছে সরকার৷ তবে সরকারের এই আকার ঠিক রেখে যদি সমঝোতা হয় তাহলে ঐক্যফ্রন্টসহ আরো দু’একটি জোট ও দল থেকে মন্ত্রিসভায় কয়েকজন নতুন মুখ নেয়া হতে পারে৷ আর নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের কোনো ইচ্ছ নেই সরকারের৷ তারা চায় নির্বাচন ডিসেম্বরের মধ্যেই করতে৷

‘নির্বাচনকালীন মন্ত্রী-এমপি ক্ষমতার ব্যবহার করবেন না’

তবে তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচন কমিশন যাতে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে তার জন্য কিছু পদক্ষেপ নেয়া হবে৷ তার অংশ হিসেবে ওই সময় সরকার রুটিন কাজের বাইরে কোনো কাজ করবে না৷ নতুন কোনো নীতি নির্ধারনী সিদ্ধান্ত বা বড় কোনো উন্নয়নমূলক কাজের সিদ্ধান্ত নেয়া হবে না৷ এমপি মন্ত্রীরা তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন না৷ নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে কমিশনের সিদ্ধান্ত

বাস্তবায়নে সরকার সর্বাত্মক সহায়তা করবে৷ সভা সমাবেশে কোনো বাধা দেয়া হবে না৷ হয়রানিমূলক মামলা, আটক ও গ্রেপ্তার যাতে না হয় সেদিকেও সতর্ক থাকবে সরকার৷

সংলাপে আওয়ামী লীগের যারা ছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন দলটির আইন সম্পাদক অ্যাডভোকেট শ ম রেজাউল করিম৷ তিনি  বলেন যে, সরকার অনেক বিষয়েই ছাড় দিতে প্রস্তুত বা ছাড় দেয়া সম্ভব৷ তিনি বলেন, ‘‘নির্বাচনকালীন সরকারের কোনো মন্ত্রী, এমপি তাদের ক্ষমতার ব্যবহার করবেন না৷ প্রয়োজনে মন্ত্রীরা তাদের পতাকাও ব্যবহার করবেন না৷ কোনোরূপ প্রতিশ্রুতি বা মানুষকে প্রলুব্ধ করার কোনো উন্নয়নমূলক কাজে অংশগ্রহন বা প্রশাসনিক কাজে অংশ নেবেন না৷ নির্বাচনকালীন সময়ে তাদের নিস্ক্রিয় করে রাখা হবে৷ নির্বাচনী কার্যক্রমে সবাই যাতে অংশ নিতে পারেন তা নিশ্চিত করবে সরকার৷ কোনো সভা, মিছিল বা নির্বাচনী প্রচারণায় কাউকে কোনোভাবে বাধা দেয়া হবে না৷ আর কারুর বিরুদ্ধে যদি কোনো রাজনৈতিক কারণে মামলা হয়ে থাকে, তা প্রত্যাহার করা হবে৷ রাজনৈতিক কারণে কোনো মামলা হবে না৷ আর নির্বাচনে বিদেশি পর্যবেক্ষক আসার ব্যাপারে সর্বোচ্চ উদারতা দেখানো হবে৷ সুতরাং নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে তাদের আশঙ্কার কোনো কারণ নেই৷”

নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘নির্বাচন কমিশন গঠন বা পুনর্গঠনের এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির৷ এখানে সরকারের কিছু করার নেই৷”

খালেদা জিয়ার মুক্তির প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘খালেদা জিয়া সর্বোচ্চ আদালতে দন্ডপ্রাপ্ত হিসেবে কারাগারে আছেন৷ বাংলাদেশের কোনো আইনে প্রধানমন্ত্রী বা সরকার তাঁকে মুক্তি দিতে পারেন না৷ আর তাঁর বিরুদ্ধে যেসব মামলার রায় হয়ে হয়ে গেছে, তা প্রত্যাহারেও কোনো আইন নেই৷”

সংসদ ভেঙ্গে দেয়া এবং সরকারের পদত্যাগ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া সংসদ ভাঙার কোনো প্রশ্নই আসে না৷ সংসদ ভেঙে দেয়ার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই৷ সরকারের পদত্যাগের মত কোনো পরিস্থিতিও সৃষ্টি হয়নি৷ আর প্রধানমন্ত্রী নিজেও যদি পদত্যাগ করেন তাহলে সংবিধান অনুযায়ী কার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন? সরকারতো আর বেওয়ারিশ থাকতে পারে না৷ প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করতে সংবিধান অনুযায়ী পরবর্তী নির্বাচিত সরকার না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে দায়িত্ব পালন করে যেতে বলবেন৷ তিনি তো একা দায়িত্ব পালন করবেন না৷ তার মন্ত্রিপরিষদও লাগবে৷ প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ না করলেও থাকবেন আর পদত্যাগ করলেও সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী থাকবেন৷”

এদিকে রবিবার নির্বাচনের তফসিল নিয়ে বৈঠক করবে নির্বাচন কমিশন৷ এই বৈঠকেই নির্বাচনের তফসিলের ব্যাপারে সিদ্ধন্ত নেয়ার কথা৷ ঐক্যফ্রন্ট শনিবার বিকেলে নির্বাচন কমিশনে দেয়া এক চিঠিতে সংলাপ শেষ হওয়ার আগে তফসিল ঘোষণা না করার দাবি জানিয়েছে৷ আর সরকারের দিক থেকে বলা হয়েছে, তারা সংলাপ তফসিলের আগেই শেষ করতে চায়৷ তফসিলের পর কোনো সংলাপ নয়৷

Print Friendly, PDF & Email

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.