ঐক্যফ্রন্টের ঐক্যের আড়ালে বিড়াল ও ইঁদুরের খেলা

(Last Updated On: নভেম্বর ১৯, ২০১৮)

আবদুল গাফফার চৌধুরী :ঐক্যফ্রন্টের ঐক্যের আড়ালে বিড়াল ও ইঁদুরের খেলা

নির্বাচনের দিন যত ঘনাচ্ছে, আমার টেলিফোনের ঘণ্টাধ্বনি ততো বেশি বাজছে। রাত নেই, বিরেত নেই, একটাই প্রশ্ন, ‘ভাই সাহেব, এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ কি জিতবে?’ প্রশ্নটা করেন বিলেতের সাধারণ বাঙালিরা। বিদেশে বাস করলেও দেশের রাজনীতি সম্পর্কে তাদের উৎকণ্ঠা কম নয়।

এ প্রশ্নকারীদের অধিকাংশই শ্রমজীবী বাঙালি। কেউ রেস্টুরেন্টে, কেউ হোটেলে, কেউ গ্রোসারিতে বা কলে-কারখানায় কাজ করেন। রেডিও, টেলিভিশন বা ইন্টারনেটের খবরে তারা তৃপ্ত হন না। আমাকে যারা চেনেন তারা মনে করেন, আমি যখন দেশ নিয়ে লেখালেখি করি তখন দেশের ভূত-ভবিষ্যৎ সব আমার জানা।

ভালো লেখাপড়া জানা বাঙালি বন্ধুরাও এই একই প্রশ্ন করেন। সম্প্রতি অক্সফোর্ডে গিয়েছিলাম, কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব আছেন, তাদের সঙ্গে দেখা করতে, তারা আমাকে ছেঁকে ধরলেন। সেই একই প্রশ্ন, এবার দেশের নির্বাচনে কী হবে? আওয়ামী লীগ কি জয়ী হতে পারবে? পাল্টা প্রশ্ন করেছি, আপনারা কি চান আওয়ামী লীগ জয়ী হোক?

অমনি তারা দু’ভাগ হয়ে গেলেন। একভাগ বললেন, তারা চান আওয়ামী লীগ জয়ী হোক। আরেক ভাগ বললেন, তারা চান আওয়ামী লীগ নির্বাচনে পরাজিত হোক। হাসিনা-সরকার দেশের অনেক উন্নয়ন করেছে। কিন্তু তাদের একদল মন্ত্রী, এমপি ও নেতার অত্যাচারে, দুর্নীতিতে দেশের মানুষ অতিষ্ঠ। এ অবস্থায় রাষ্ট্র ক্ষমতায় একটা পরিবর্তন দরকার।

আমি এ দ্বিতীয় দলকে বলেছি, আপনারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় পরিবর্তন চান ভালো, তার অর্থ কি দেশে আবার বিএনপি-জামায়াতকে ক্ষমতায় দেখতে চান? দ্বিতীয় দলের এক বন্ধু বললেন, না, বিএনপি-জামায়াতকে চাইব কেন? তাদের শাসনামলে দেশের যে ভয়াবহ অবস্থা হয়েছিল, সে কথা কি আমরা ভুলে গেছি? এবার তো জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হয়েছে। ফ্রন্টের নেতাদের অনেকেই মুক্তিযোদ্ধা অথবা মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। তারা নির্বাচনে জয়ী হলে আপত্তি কোথায়?

বলেছি, এই নেতাদের অতীত ও বর্তমান কি এক? অতীতে খন্দকার মোশতাক আহমদ ছিলেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এবং বঙ্গবন্ধু সরকারের মন্ত্রী। বর্তমানে তার এই পরিচয়গুলোর কথা কেউ কি বলে?

না, তাকে বলা হয় বাংলাদেশের দ্বিতীয় মীরজাফর? বর্তমান ঐক্যফ্রন্টের কয়েকজন শীর্ষ নেতা সম্পর্কে বিশেষ করে একজন সম্পর্কে আমার ধারণা, তার চরিত্র ও মোশতাকের চরিত্র অভিন্ন। একজন বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিলেন, আরেকজন তার কন্যার বিরুদ্ধে করছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার জন্য মোশতাক হাত মিলিয়েছিলেন জেনারেল জিয়াউর রহমানের সঙ্গে, আর ঐক্যফ্রন্টের এক শীর্ষ নেতা বঙ্গবন্ধু কন্যাকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের জন্য হাত মিলিয়েছেন জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়া ও পুত্র তারেক রহমানের সঙ্গে।

আমার অক্সফোর্ডের বন্ধুদের দ্বিতীয় দলের আরেক বন্ধু বললেন, এখন তো খালেদা জিয়া কারাগারে এবং তারেক রহমান বিদেশে পলাতক। এখন ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে জয়ী হলে খালেদা বা তারেকের ক্ষমতায় আসার প্রশ্নই ওঠে না। তখন ঐক্যফ্রন্টের বর্তমান শীর্ষ নেতাই তো দেশের রাষ্ট্রপতি অথবা প্রধানমন্ত্রী হবেন। তিনি দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অঙ্গীকারাবদ্ধ। আপনি কি মনে করেন না, দেশের অনেক উন্নয়ন সত্ত্বেও এই সুশাসন এখন দরকার?

এই বন্ধুকে তার দলেরই একজন স্মরণ করিয়ে দিলেন, ঐক্যফ্রন্টের বর্তমান শীর্ষ নেতা বলেছেন, তিনি নির্বাচনে দাঁড়াবেন না। সুতরাং তিনি তো ক্ষমতায় যাচ্ছেন না। আমি তাকে বলেছি, এ ঘোষণার দু’পয়সার মূল্য নেই। অতীতে তিনি রাজনীতি থেকে অবসর নেয়ার ঘোষণা দিয়ে এখনও রাজনীতিতে বহাল তবিয়তে বিরাজ করছেন।

ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে জয়ী হলে মূলত সরকার গঠন করবে বিএনপি-জামায়াত। তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে। বর্তমান শীর্ষ নেতার পাগড়ি ধরে আর যারা ফ্রন্টে এসেছেন, প্রথমত তারা নির্বাচিত হতে পারবেন কিনা সন্দেহ। আর নির্বাচিত হতে পারলেও তাদের অবস্থা হারাধনের তিন ছেলের মতো হওয়ারই সম্ভাবনা বেশি।

ক্ষমতায় যেতে পারলে নতুন বিএনপি-জামায়াত সরকার প্রথমেই খালেদা জিয়াকে কারামুক্ত করবেন। তারেক রহমানের সব দণ্ড মওকুফ করে দেশে ফিরিয়ে আনবেন। হয়তো এর আইনি প্রক্রিয়াটা ফ্রন্টের বর্তমান শীর্ষ নেতাই বাতলে দেবেন। তারপর প্রবাদ বাক্য অনুযায়ী, ‘নিজের ধন পরকে দিয়া দৈবাত মরে কাঁথা বইয়া’- তেমনি ফ্রন্টের বর্তমান শীর্ষ নেতা শীর্ষ থেকে ভূপাতিত হবেন। তারেক রহমান দলের সংসদীয় নেতা নির্বাচিত হবেন। প্রধানমন্ত্রী পদের দরজা তাকে খুলে দেয়া হবে। সংসদের কোনো একটি শূন্য আসনের উপনির্বাচনে তারেককে জিতিয়ে আনা হবে।

বিএনপির সূত্র থেকেই জেনেছি, এবারের নির্বাচনে ফ্রন্ট জয়ী হলে খালেদা জিয়া হবেন দেশের প্রেসিডেন্ট। শুরু হবে দেশে ‘মাতা-পুত্রের সুশাসন’। এটা যদি হয়, তাহলে ইন্দিরা গান্ধীকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে কট্টর ডানপন্থী মোরারজী দেশাইয়ের নেতৃত্বে বর্তমান বিজেপির পূর্বসূরিদের ক্ষমতায় আনার পর ভারতের সর্বোদয় নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ কেঁদে ফেলে বলেছিলেন, ‘হায়, এ কি করলাম! সমাজবাদী গণতান্ত্রিক ভারতের বুকে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বুনে দিলাম!’ বাংলাদেশের বর্তমান ফ্রন্ট-নেতার মনে এ ধরনের বিবেকবোধ আছে কিনা সন্দেহ।

আমার এখানে একটাই সান্ত্বনা, বাংলাদেশে বর্তমানে ভারতের ওই পরিস্থিতি বিরাজ করছে না। ভারতের রাজনীতিতে জয়প্রকাশ নারায়ণের যে ক্যারিশমা ও গ্রহণযোগ্যতা ছিল, তা বাংলাদেশে বর্তমান ঐক্যফ্রন্টের নেতার নেই।

ঐক্যফ্রন্টকে নিয়ে আরও একটা বড় ফ্যাকড়া আছে। সেটা এখনও জনসমক্ষে আসেনি। ঐকফ্রন্টের শীর্ষ নেতাসহ নবাগত কয়েকজন নেতা সহসা রাজনৈতিক ফসিল থেকে ফসল হয়ে ওঠেননি। তার পেছনে কিছু পশ্চিমা শক্তি ও দেশি সুশীল সমাজের গোপন দাবা খেলাও রয়েছে। বাংলাদেশে হাসিনা সরকারকে যারা পছন্দ করেন না, এমন কিছু বিদেশি শক্তি বুঝে ফেলেছেন, দেশটির রাজনীতিতে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নেতৃত্ব সম্পূর্ণ ব্যর্থ ও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে। অথচ দল হিসেবে বিএনপি গুরুত্ব ও জনসমর্থন তেমন হারায়নি। নেতৃত্ব বদল হলে দলটিকে হয়তো আবার নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য করে তোলা যাবে। এ নেতৃত্ব বদলের জন্য জমি তো প্রস্তুত হয়েই আছে। খালেদা জিয়া জেলে এবং তারেক পলাতক। এ সুযোগে যদি তাদের পছন্দের সুশীল সমাজ ও তাদের হতাশ ও ব্যর্থ নেতাদের সমর্থন দিয়ে চাঙ্গা করে তুলে বিএনপি’র মতো একটি বড় দলের মাথায় চাপিয়ে দেয়া যায় তাহলে হয়তো হাসিনা সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানো সম্ভব।

বিএনপি-জামায়াত জোটের মাধ্যমে একটা নতুন টুপি পরানো গেলে এবং পুরনো ব্যর্থ নেতাদের ধোয়া-মোছা করে নতুন পোশাকে রাজনীতির মঞ্চে হাজির করা গেলে সহজেই বাজিমাত করা যাবে বলে তারা ভেবেছেন। এজন্যই অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির এতকালের প্রবক্তাকে এনে সাম্প্রদায়িক জোটের মাথায় বসানো হয়েছে। এজন্যই কয়েকটি পশ্চিমা দূতাবাসে ফ্রন্টের শীর্ষ নেতার এত আনাগোনা এবং বৃদ্ধ বয়সে এত হুমকি-ধমকি। সুশীল সমাজ ও তাদের মুখপত্র দুটিও এই ফ্রন্ট নেতাদের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। এটা একটু পরিবর্তিতভাবে সেই ২০০১ সালের খেলা।

কিন্তু এই খেলার কথাটি নিজের অজান্তে প্রথম ফাঁস করে দেন অযাচিতভাবে ফ্রন্টে এসে যোগ দেয়া ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। এক ফাঁস হয়ে যাওয়া টেলিফোন আলাপে শোনা যায়, তিনি বলছেন, … অমুক নেতাকে ফ্রন্টে আনা হয়েছে তো তারেক রহমানের নেতৃত্ব ঠেকানোর জন্য।’ থলের বিড়ালটি তখনই বেরিয়ে যায় এবং বিএনপি-জামায়াতের বর্তমান নেতারা জুনিয়র হলেও খেলাটা বুঝে ফেলেন। তারেক রহমান অতি চালাক। তিনিও সম্ভবত এলার্ট হয়ে যান।

আমার ধারণা, ঐক্যফ্রন্টের ভেতরে এখন চলছে বিড়াল ও ইঁদুরের খেলা। বুধবার নয়াপল্টনে যে হিংসাত্মক খেলাটি হল সেটা ইঁদুরের খেলা। বিএনপির যে অংশটি জাল কাটতে চায়, বুনতে চায় না তারা হাসিনা সরকারের অধীনে নির্বাচনে না গিয়ে তা বানচাল করতে চায়। আর ফ্রন্টের ভেতরে বসা বিএনপির ভেতরের ও বাইরের যে অংশটি বিড়াল, তাদের কণ্ঠ হয়ে শীর্ষ নেতা বলেছেন, নির্বাচনে যেতে ফ্রন্ট অটল। বাধা-বিপত্তি নির্যাতনের যত ঝড়ই আসুক না। আসলে নির্বাচনে এবার বিএনপি-জামায়াত জোটকে যেতেই হবে। কারণ, বিদেশি পৃষ্ঠপোষকরা তাই চান। অন্তরালে মাইনাস খালেদা-তারেক নেতৃত্বের খেলাও চলতে থাকবে। আমি এটাকেই বলেছি ঐক্যফ্রন্টে বিড়াল-ইঁদুরের খেলা।

এ খেলাটা দৃশ্যমান হবে ফ্রন্টের শরিক দলগুলোর মধ্যে আসন বণ্টন ও প্রার্থীদের মনোনয়ন চূড়ান্ত করার সময়। এটা ঐক্যফ্রন্ট, না অনৈক্য ফ্রন্ট সেটা তখন স্পষ্ট হব।

ফ্রন্টের শীর্ষ নেতার নেতৃত্ব ও ফ্রন্টের ঐক্য তখন একটা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে। যদি শীর্ষ নেতা দেখেন, এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা তার পক্ষে অসম্ভব হবে, তাহলে অকস্মাৎ বিদেশ যাত্রা তার জন্য অনিবার্য হয়ে উঠবে। আর আমাদের সুশীল সমাজের যে চিফ প্যাট্রন, হিলারি ক্লিনটনের বন্ধু, যিনি বিদেশে বসে বাংলাদেশের রাজনীতিতে চক্রান্তের জাল বুনছেন, তিনি যদি দেখেন তার নিপুণ হস্তের চক্রান্তের জাল বিড়াল ও ইঁদুরের লড়াইয়ে ছিন্ন হয়ে গেছে তাহলে তিনিও আপাতত জাল বোনা ত্যাগ করবেন এই ভেবে যে, ২০০১ সালের ঘটনা বাংলাদেশে এবার ঘটানো যাবে না। তিনি আবার উড়ন্ত বিমানে দুরন্ত ব্যবসা শুরু করবেন।

সহৃদয় পাঠক, এ পর্যন্ত যা লিখেছি তা সবই আমার চিন্তা ভাবনা। তা সঠিক হয় কিনা তা দেখার জন্য আর দু’তিন সপ্তাহ অপেক্ষা করার জন্য অনুরোধ জানাব। আওয়ামী লীগ শিবিরেও এখন জোর নির্বাচন প্রস্তুতি চলছে। আমার ধারণা, নির্বাচনে আওয়ামী মহাজোট সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করবে।

তবে সবই নির্ভর করছে দলের ভেতর থেকে কালো মেঘগুলো তাড়িয়ে সৎ, শিক্ষিত, যোগ্য এবং জনগণের পছন্দের প্রার্থী মনোনয়নের ওপর। ঐক্যফ্রন্ট কিছু ব্যর্থ ও জনগণ কর্তৃক বারবার প্রত্যাখ্যাত নেতার ঐক্য তৈরি করেছে। আওয়ামী লীগ জোট যদি জনগণের ঐক্যের দুর্ভেদ্য দেয়াল তৈরি করতে পারে তাহলে অবশ্যই নৌকা তীরে ভিড়বে। ধানের শীষ পোকায় খাবে। এটা আমার অনুমান নয়, বিশ্বাস।

সূত্র : যুগান্তর।

Print Friendly, PDF & Email

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.