ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি

(Last Updated On: ফেব্রুয়ারি ১, ২০১৯)

বছর ঘুরে আবার এলো ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’-রক্তে রাঙানো সেই ভাষা আন্দোলনের মাস শুরু হলো আজ। ফেব্রুয়ারি মাস একদিকে শোকাবহ হলেও অন্যদিকে আছে এর গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। কারণ পৃথিবীর বুকে একমাত্র বাঙালী জাতিই ১৯৫২ সালের এই মাসে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য জীবন দিয়েছিল।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে দুর্বার আন্দোলনে সালাম, জব্বার, শফিক, বরকত, রফিকের রক্তের বিনিময়ে বাঙালী জাতি পায় মাতৃভাষার মর্যাদা এবং আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেরণা। পাকিস্তানী বুলেটও সেদিন বাঙলার তরুণদের দমাতে পারেনি। সেদিনের সেই আত্মদানই পরবর্তীকালে রূপ নিয়েছিল বাঙালীর স্বাধিকার ও স্বাধীনতার আন্দোলনে। পাকিস্তানী শাসক এবং তাদের দোসরদের সব চক্রান্ত, ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে বাঙালী জাতি এগিয়ে গেল তার অভীষ্ট লক্ষ্যে। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জন্ম হলো স্বাধীন বাংলাদেশের। তাই এই ফেব্রুয়ারিকে নিয়ে আমাদের এত অহঙ্কার, এত গর্ব।

ফেব্রুয়ারি এলেই আমরা ফিরে তাকাই আমাদের শিকড়ের দিকে। আমাদের সংস্কৃতি ও ইতিহাস-ঐতিহ্য নতুন করে এগিয়ে চলার প্রেরণা জোগায়। সঙ্গত কারণেই ভাষার মাস নিয়ে আমাদের মধ্যে একটি অন্য রকম আবেগ কাজ করে। সেই আবেগের বহির্প্রকাশ থাকে মাসজুড়েই। শুরুটা ১৯৪৭ সালের পর থেকেই। পাকিস্তান কৌশলে বাঙালী জনগোষ্ঠীর ভাষার ওপর প্রথম আঘাত হানে। মায়ের ভাষায় কথা বলাও তারা বন্ধ করে দেয়ার ষড়যন্ত্র শুরু করে।

কিন্তু বাংলার মানুষ সেই ষড়যন্ত্রকে মোকাবেলা করতে একবিন্দু পিছু হটেনি। মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে প্রতিদিন রাজপথে চলতে থাকে মিছিল-সমাবেশ। শুরু হয় বাংলা ভাষা রক্ষার আন্দোলন। মায়ের মুখের ভাষাকে কেড়ে নিয়ে তারা রাষ্ট্রভাষা উর্দু করতে চেয়েছিল। আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অনেক চড়াই-উতরাই পার করে চূড়ান্ত রূপ লাভ করেছিল ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। বায়ান্নর আগুনঝরা সে দিনগুলো বিশ্বের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।

বায়ান্নর পহেলা ফেব্রুয়ারি সম্পর্কে ভাষা সংগ্রামী আহমদ রফিক এক স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘সে বছর ঢাকায় মাঘের শীতটা বেশি মাত্রায় এসেছিল। মাঘের সে শীত বাঘের গায়ে লাগতে পারে, কিন্তু ঢাকার ছাত্রদের গায়ে তেমন লাগেনি। কারণ একটাইÑ সাতাশে জানুয়ারি পল্টন ময়দানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন তার দীর্ঘ বক্তৃতায় রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে বলেন, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দুই হতে যাচ্ছে।’ এটুকু বলেই তিনি থামেননি। প্রসঙ্গক্রমে তাদের কায়েদে আযমের ভাষা বিষয়ক মতামত, প্রাদেশিকতা, এক রাষ্ট্রে এক রাষ্ট্রভাষা ইত্যাদি বিষয়েও কথা বলেন তিনি এবং উর্দু বিরোধীদের পাকিস্তানের দুশমন বলে ঘোষণা দেন। যেমনটা ১৯৪৮-এর মার্চে ঢাকা সফরে এসে পাকিস্তানের প্রথম গবর্নর-জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ করেছিলেন।’

ভাষার জন্য বাংলার দামাল সন্তানদের আত্মত্যাগ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায় ১৯৯৯ সালের ১৭ নবেম্বর। এদিন ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ঘোষণা করে। এর মধ্য দিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে এখন বিশ্বের দেশে দেশে পালিত হয়। শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা পৃথিবীতে একুশে ফেব্রুয়ারিকে পালন করা হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয় সেই অমর শহীদদের, যারা ভাষার জন্য তাদের জীবন দিয়ে গেছেন।

একুশের সবচেয়ে বড় কর্মযজ্ঞ মাসব্যাপী বইমেলা শুরু হচ্ছে। বাংলা একাডেমিতে এই মেলার উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন থেকেই শুরু হবে নানা কর্মসূচী। প্রতিবারের মতো আজ থেকে জাতীয় শহীদ দিবস সামনে রেখে প্রাণে প্রাণ মিলাবে নানা কর্মসূচীতে। বেদনাবিধুর সেই দিন হয়ে উঠবে বাঙালী জাতির প্রাণের মিলনমেলা।

লাখ কণ্ঠে গাওয়া হবে অমর সেই গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/ আমি কি ভুলিতে পারি…।’ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার আবার হয়ে উঠবে নানান সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে মুখর। এই মুখরতার মাঝে একুশের শহীদদের প্রতি সম্মান জানানো আর শোকের আবহও বিরাজমান। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের হাকিম চত্বরে আজ থেকে শুরু হচ্ছে জাতীয় কবিতা উৎসব। চলবে দুু’দিন।

সূত্র – দৈনিক জনকণ্ঠ

Print Friendly, PDF & Email

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.