তনু হত্যার তিন বছর, আর কবে শেষ হবে তদন্ত

(Last Updated On: মার্চ ২০, ২০১৯)

মাসুক আলতাফ চৌধুরী, কুমিল্লা, ঘুরেফিরে একই কথা ‘সময় লাগবে’। এরই মধ্যে পেরিয়ে গেছে তিন-তিনটি বছর। আর কত সময় লাগবে, তাও নির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সংশ্নিষ্টরা। অভিযোগপত্র প্রদান বা আসামি শনাক্তের প্রশ্নেও কোনো সঠিক উত্তর নেই কারও কাছে।

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের অনার্স পড়ূয়া সোহাগী জাহান তনু (২১) হত্যার তিন বছর আজ বুধবার। ২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে একটি বাসায় প্রাইভেট পড়াতে গিয়ে নিখোঁজ হন তনু। পরে তার স্বজনরা খোঁজাখুঁজির পর রাত ১০টার দিকে বাসার অদূরে একটি ঝোপে তার লাশ পান। পরদিন তার বাবা সেনানিবাস বোর্ডের অফিস সহায়ক ইয়ার হোসেন কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। থানা পুলিশ ও ডিবির পর ওই বছরের ১ এপ্রিল থেকে মামলাটির তদন্ত পায় সিআইডি। কুমিল্লার বিশেষ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জালাল উদ্দিন আহমেদ দীর্ঘ সময় ধরে এ মামলার তদন্ত কাজ করছেন।

এ ব্যাপারে তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে বেশ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। এখন আর আগের মতো গণহারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে না। সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তিদের আগে যাচাই-বাছাই করে ও আগের জিজ্ঞাসাবাদের আলোকে তবেই আবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

২০১৭ সালের মে মাসে সিআইডি জানিয়েছিল, ডিএনএ পরীক্ষায় তনুর অন্তর্বাসে তিনজনের শুক্রাণু পাওয়া যায়। তাদের পরিচয় শনাক্তে চলছে ডিএনএর নমুনা মেলানোর কাজ। এই মেলানোর কাজই চলছে দুই বছরের মতো সময় ধরে। এ পর্যন্ত কতজন সন্দেহভাজনের ডিএনএ মিলিয়ে দেখা হয়েছে, তাদের মধ্যে সামরিক-বেসামরিক কতজন, তা বলতে নারাজ সিআইডি। তবে তদন্ত কর্মকর্তার দাবি, ডিএনএ প্রোফাইলিং ও ম্যাচিং একই সঙ্গে চলছে। মিলে গেলেই একটা ফলাফল আসবে তদন্তে, যা এখনও সম্ভব হয়নি।

কখন খুন করা হয়েছে, খুনের উদ্দেশ্য, কারণ জানা গেছে কি-না, ধর্ষক বা ধর্ষণকারীরাই কি খুনি, না অন্য কেউ- তা ‘তদন্তে’র বেড়াজালেই রয়ে গেছে। আগে খুন করা হয়েছে, নাকি খুনের পর লাশ ঝোপে ফেলে যাওয়া হয়েছে, পরিস্কার করে কিছুই বলছে না সিআইডি। তবে কোনো প্রকার চাপ বা বাধা নেই বলে দাবি করেছেন পুলিশ কর্মকর্তা জালাল উদ্দিন আহমেদ।

খুনের ঘটনা ঘটেছে সংরক্ষিত এলাকার কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে, তাই সহজেই খুনিকে ধরে ফেলা যাবে, এমন আশায় বুক বেঁধেছিলেন তনুর বাবা-মা। সার্জেন্ট জাহিদ ও তার স্ত্রী এবং সিপাহি জাহিদের সংশ্নিষ্টতার কথা বরাবরই অভিযোগ করে আসছিলেন তার মা। ওই সেনাসদস্যের বাসায় বাচ্চাদের প্রাইভেট পড়াতেন তনু। ঘটনার দিন সার্জেন্ট জাহিদের বাসায় প্রাইভেট পড়ানো শেষে বেরিয়েই তিনি নিখোঁজ হন। তারপর তার লাশ মেলে বাড়ির পাশের ঝোপে। সিআইডি বলেছে, তাদের দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। সর্বশেষ সন্দেহভাজন হিসেবে তিনজনকে ২০১৭ সালের ২৫-২৭ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা সেনানিবাসে জিজ্ঞাসাবাদ করে সিআইডি। জিজ্ঞাসাবাদ করা ব্যক্তিরা তনুর মায়ের সন্দেহভাজন বলেও তখন জানিয়েছিল সিআইডি। তবে তাদের নাম-পরিচয় জানায়নি সংস্থাটি।

ঘটনার শুরু থেকেই আলামত নষ্ট করা ও গোপন করার প্রবণতা ছিল বলে দাবি করেন অধিকারকর্মী আইনজীবী আনিছুর রহমান মিঠু।

জননিরাপত্তা আদালতের অতিরিক্ত এ পাবলিক প্রসিকিউটর বলেন, দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্তের পরও মৃত্যুর কারণ না বলতে পারাই ছিল মূল রহস্য। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের প্রথম ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ডা. শারমিন সাম্মির বিরুদ্ধেও আলামত গোপন করার অভিযোগ উঠেছিল। পরে ডা. কে পি সাহার নেতৃত্বে একই কলেজের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক দলও মৃত্যুর কারণ জানাতে পারেনি। এভাবেই ময়নাতদন্ত ও কুমেক ফরেনসিক বিভাগ মৃত্যুর কারণ জানাতে ব্যর্থ হয়। রহস্যের শুরু সেখান থেকেই।

তদন্ত কর্মকর্তার মতে, জিজ্ঞাসাবাদ করতে হচ্ছে সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তিদের। নিয়মকানুন মেনে জিজ্ঞাসাবাদেও সময় পেরিয়ে যায়। তবে ভিন্নমত পোষণ করেছেন তনুর মা আনোয়ারা বেগম। তিনি বলেন, এক বছর ধরে সিআইডির সঙ্গে আমাদের কোনো যোগাযোগ নেই। অফিসে গিয়েও তদন্ত কর্মকর্তাকে পাইনি। তদন্তে কী হচ্ছে তা আমার জানা নেই। তিনি হতাশা জানিয়ে বলেন, তনুর বাবা সেনানিবাস বোর্ডের কর্মচারী মো. ইয়ার হোসেন এবং আমি খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছি। মৃত্যুর আগে মেয়ে হত্যার বিচার দেখে যেতে পারব কি-না, জানি না। প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ পেলে মেয়ে হত্যার বিচার চাওয়ার সুযোগ পেতাম। আমার নিরপরাধ মেয়ে হত্যার বিচার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছি।

তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিশেষ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তনুর মায়ের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ রয়েছে, কথা হয়।

সিআইডি কুমিল্লা বিশেষ পুলিশ সুপার মোস্তফা কামাল তিন-চার মাস আগে কুমিল্লায় যোগদান করেছেন। তিনি বলেন, যোগদান করেই চাঞ্চল্যকর মামলা হিসেবে খোঁজখবর নিয়েছি। তদারকি করছি। তিনিও সময় লাগার কথা জানালেন।

তনু কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থিয়েটারের নাট্যকর্মী ছিলেন। থিয়েটারের কর্মীরা আজ সকালে কলেজে দোয়ার আয়োজন করবে। থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক নুর হোসাইন রাজিব ওই তথ্য জানান।

গণজাগরণ মঞ্চ কুমিল্লার মুখপাত্র খায়রুল আনাম রায়হান জানান, সিআইডির নিষ্ফ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে আজ বিকেলে কান্দিরপাড় পূবালী চত্বরে আমরা মানববন্ধন করব।

Print Friendly, PDF & Email

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.