নৌকার বিরোধিতাকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা আসছে

(Last Updated On: এপ্রিল ২, ২০১৯)

কালের কণ্ঠ:  চার ধাপে উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া নিয়ে তৃণমূল আওয়ামী লীগে অভ্যন্তরীণ কোন্দল চরমে উঠেছে। ক্ষোভের আগুনে জ্বলছে তৃণমূল। দেশজুড়ে বিভিন্ন উপজেলায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। এমন অবস্থায় ক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়। উপজেলায় নৌকার বিরোধিতাকারী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একাধিক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও দলীয় নেতার বিরুদ্ধেও নেওয়া হচ্ছে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। এরই মধ্যে আট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকরা নৌকার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নেতাদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছেন।

আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো বলছে, গত শুক্রবার আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সভায় নৌকার প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করা আওয়ামী লীগ নেতাদের পেছনে থেকে সহযোগিতা করার জন্য বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের সমালোচনা করা হয়। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, সংসদ সদস্য আবদুল হাইসহ বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের নাম ধরে তাঁদের ভূমিকার সমালোচনা করেন। বৈঠকে বিদ্রোহী প্রার্থীদের মদদ দেওয়া নেতাদের একটি তালিকা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে গত রবিবার আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর বৈঠকে আট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদকদের বিদ্রোহী প্রার্থীদের মদদ দেওয়া নেতাদের একটি তালিকা তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়।

এ তালিকা আগামী শুক্রবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, ‘আমরা উপজেলা নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করতে এটি সবার জন্য অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থা রাখার জন্য বলি; কিন্তু নৌকার বিরুদ্ধে যারা কাজ করেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তিনি বলেন, ‘নৌকার বিরুদ্ধে যেসব দলীয় নেতা ও সংসদ সদস্য অবস্থান নিয়েছেন, তাঁদের বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে এই তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হবে।’

আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো জানায়, উপজেলায় বিএনপি প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করায় আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায় আওয়ামী লীগ। মনোনয়নবঞ্চিত অনেক নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নৌকার প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ফলে অনেক উপজেলায় নৌকার প্রার্থী পরাজিত হন। আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা মতিয়া চৌধুরীর নির্বাচনী এলাকা নালিতাবাড়ী উপজেলায় নৌকার প্রার্থীর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের এক নেতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় গত নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী জয় পান। এবারও ওই উপজেলায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন। সেখানে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী জয় পেয়েছেন। আবার অনেক উপজেলায় স্থানীয় সংসদ সদস্যের নৌকার প্রার্থী মনঃপূত না হওয়ায় তাঁরা নৌকার বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থীকে মদদ দেন। অনেক উপজেলায় এসব স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ও পান। এসব ঘটনায় তৃণমূল আওয়ামী লীগে দলীয় কোন্দল মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।

বেশ কয়েকটি উপজেলায় সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। ফলে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাসহ দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা ক্ষুব্ধ। তাঁরা সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত অমান্য করা নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের ঢাকা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, ‘নৌকার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নেতাদের তালিকা তৈরি হচ্ছে।’

তৃণমূলে কোন্দল চরমে : চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলায় আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী খোরশেদ আলম চৌধুরী। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী জিয়াউল হক চৌধুরী বাবুলকে সমর্থন দিচ্ছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য আবু রেজা মুহম্মদ নেজামুদ্দিন নদভী। এ নিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলায় নৌকার প্রার্থী আব্দুল কাদেরের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন স্বতন্ত্র প্রার্থী, যুবলীগ নেতা আবু রেজা মোস্তফা কামাল শামীম। তাঁর পক্ষে কাজ করেন সাবেক এমপি গোলাম মোস্তফা বিশ্বাস ও জিয়াউর রহমান। সামাজিকভাবে ব্যাবক সমালোচিত ও এলাকাবাসীর কাছে অগ্রহণযোগ্য উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী এই শামীমকে দুই সাবেক এমপি তাঁদের প্রয়োজনে সহযোগিতা করলেও তাঁর পরাজয় রোধ করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত জয় পান নৌকার প্রার্থী আবদুল কাদের।

গত রবিবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছয় উপজেলায় ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ওই ছয় উপজেলার পাঁচটিতেই নৌকা প্রতীকের বিরুদ্ধে প্রার্থী হন আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিতরা। নাসিরনগর উপজেলায় নৌকা প্রতীকের প্রার্থী ছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রাফিউদ্দিন আহমেদ। তাঁর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ টি এম মনিরুজ্জামান।

নবীনগর উপজেলায় নৌকা প্রতীকের প্রার্থী কাজী জহির উদ্দিন সিদ্দিক টিটু। তাঁর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন আওয়ামী লীগ নেতা মনিরুজ্জামান। মনিরুজ্জামানকে স্থানীয় সংসদ সদস্য এবাদুল করিম বুলবুল সমর্থন দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে নৌকার প্রার্থীর পক্ষে মাঠে নামেন সাবেক সংসদ সদস্য ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফয়জুর রহমান বাদল।

আশুগঞ্জ উপজেলায় নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হানিফ মুন্সীর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন আওয়ামী লীগ নেতা আনিসুর রহমান।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলায় নৌকার প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ফিরোজুর রহমান ওলিও।

Print Friendly, PDF & Email

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.