ব্যঙ্কের ইতিহাসে পথিকৃত কুমিল্লা

(Last Updated On: আগস্ট ১৮, ২০১৯)

রেজাউল করিম শামীম: ইতিহাসে ব্যঙ্ক,ট্যঙ্ক আর হুক্কা,খড়মের জন্যে প্রশিদ্ধ ছিলো কুমিল্লা।এ ঐতিহ্যর সাথে পরে যুক্ত হয় খদ্দর আর রসমালাই।সাম্প্রতিককালে এমনিতেই সারদেশ জুরেই ব্যঙ্কের অভাব নেই।কিন্তু, সেই বৃটিশ-ভারতের সময় যখন তেমন কোন ব্যঙ্কই ছিলোনা। সে সময়ই কুমিল্লায়বেশ কিছু ব্যঙ্কের অস্থিত্ব ছিলো।কথাটি শুনলে অনেকেরই অবাক হওয়ার কথা। কিন্তু ব্যঙ্কের ইতিহাস,ঐতিহ্য ঘাটলে এসত্যই জ্বলজ্বল করছে।

ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যাবে, ১৯শতকের প্রথম দিকেই কুমিল্লাতে ব্যঙ্ক প্রতিষ্ঠা প্রক্রিয়া চলে।ব্যঙ্ক প্রতিষ্ঠার প্রথিকৃত হচ্ছেন নরেন্দ্রচন্দ্র দত্ত।তাকে এখনো ভারতের ব্যঙ্কিং ক্ষেত্রে প্রথিকৃত বলা হয়।বলা হয় আধুনিক ব্যঙ্কে একজন লিজেন্ড।‘সেন্টার ফর ষ্ট্যাডিজ অন স্যোসাল সাইন্স,কলকাতা“ নামের থিঙ্ক ট্যঙ্ক খ্যত প্রতিষ্ঠানের বিশিষ্ট গবেষক, ইন্দ্রজিৎ মল্লিকের একটি বিশাল লেখা রয়েছে নরেন্দ্রচন্দ্র দত্ত সম্পর্কে।অনেক খোঁজাখুঁজি করে লেখাটি পেয়েছিলাম। সেখানে ‘ডেভলাপমেন্ট ব্যঙ্কার ফরম ব্যঙ্গল“ নামের ঐ লেখায় মি; দত্ত এবং সে সময়কার ব্যঙ্ক ব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায।ঐ লেখায় দেখা যায়,মি. দত্ত, পেশায় ছিলেন একজন আইনজীবি। কুমিল্লার কালাকচুয়া(গ্রামটি সম্পর্কে লেখা আছে এ ভিলেজ অব ত্রিপুরা ষ্টেট) গ্রামে তার জন্ম হলেও তিনি থাকতেন কুমিল্লা শহরে।তাঁর শিশুকাল ছিলো অত্যন্ত কষ্টের। মাত্র নয় মাস বয়সে তিনি তার পিতাকে হারান। কষ্টকর তাঁর সেই শিশুকালেই তিনি লেখাপড়ার প্রতি মনযোগি হন।কলেজ পেরিয়েই তিনি কলকাতা থেকে ল‘পাশ করেন।এরপর কুমিল্লা ফিরে আসেন।কুমিল্লা সিভিল কোটে আইন পেশায় যুক্ত হন।সময়টি ছিলো ১৯১৪ সাল। সে সময় তিনি ছোট আকারে ব্যঙ্কিং ব্যবস্থা চালু করেন।সাইকেল চড়ে বিভিন্ন জনের বাড়ি বাড়ি গিয়ে টাকাপয়সা লেনদেন করতেন,হিসাবপত্র রাখতেন। পরবর্তিতে আদালতের জজ সাহেব, তাকে অনুমতি দেন আদালত অঙ্গনে তার ব্যঙ্কিং কার্যোক্রম চালিয়ে যেতে।সে অনুযায়ি আদালত ভবনের পাশে একটি ষ্টিলের সেইড তৈরী করে তিনি সেখানে ব্যঙ্কের কর্যরক্রম শুরু করেন।

 

তা যাই হোক অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ‘কুমিল্লা ইষ্টার্ট ব্যঙ্কিং কর্পোরেশন“ নামে ব্যঙ্ক চালু করেন মাত্র চারহাজার টাকা দিয়ে। সেই ব্যঙ্কটিই বর্তমানে কুমিল্লা কান্দিরপারে পূবালী ব্যঙ্ক হিসাবে দাঁড়িয়ে আছে। ১৯১৪ সালে মি.দত্তেরে প্রতিষ্ঠিত ব্যঙ্ক থেকে তিনি মাত্র ৮ টাকা ভাতা নিতেন।এরপর তার ছেলে বাতা দত্তও লেখাপড়া শেষ করে কুমিল্লা ফিরে এসে বাবার মতোই ব্যঙ্ক ব্যবস্যা শুরু করেন । তার প্রতিষ্ঠিত ব্যঙ্কটির নাম ‘নিউ ষ্ট্যন্ডার্ড ব্যঙ্ক অব ইন্ডিয়া।এরমাঝে অনেক ঘটনা ঘটে।সেসব বর্তমান লেখায় প্রাসঙ্গিক নয়।প্রাসঙ্গিক হলো ১৯১৫ সালে এ‘দুটি ব্যঙ্ক একিভূত হয়।পরবাতীতে ‘ইউনিয়ন ব্যঙ্ক “ নামে আরো একটি ব্যঙ্ক কুমিল্লায় প্রতিষ্ঠা পায়।ব্যঙ্কটি প্রতিষ্ঠা করেন,ইন্দ্র ভূষন দত্ত।১৯১৯ সালে মহ্ত্না গান্ধী এ ব্যঙ্কটি উদ্বোধন করেন।কিন্তু ব্যঙ্কটি বেশিদিন চলেনি।পরে এ ব্যঙ্কটিও কিনে নেন মি.দত্ত।এ ভাবে ব্যঙ্ক ব্যবসায় মি.দত্ত ও তাঁর ছেলের অনেক প্রসার ঘটে।তারা ব্যবস্যার প্রয়োজনে চা-বাগানে বিনিয়োগ শুরু কনরে এবং প্রয়োজনের তাগিদেই কলকাতা,মহারাষ্ট্র,গুজরাট বিভিন্ন স্থানে সম্প্রসারন করেন তাদের কার্য্ক্রম।তারা আরো দুটি ব্যঙ্ক একত্রিত করে ইউনিয়ন ব্যঙ্ক অব ইন্ডিয়া স্থাপন করেন। যার কার্যাক্রম এখনো অভ্যাহত রয়েছে।শুধু তাই নয় ভারতের টাটা, বিড়লা,টিভিএস বিশেষ করে ওবেরিও চেইন হোটেলেও তাদের অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।নরেন্দ্রচন্দ্র দত্ত, মোর্টগেজ প্রদ্ধতি থেকে শুরু করে ব্যঙ্ক ব্যবস্থার যেসব আধুনিক আইনকানুন তৈরী করে গেছেন, সেগুলো আজো ব্যঙ্ক কার্যুক্রমে সাফল্যের সাথে ব্যবহৃত হচ্ছে।  এজন্যই মি. দত্তকে ব্যঙ্কের পথিকৃত এবং লিজেন্ড হিসাবে সারা ভারতে সন্মান দেয়া হয়।

তাদেরই উত্তরসূতি হিসাবে ,সেসময় কুমিল্লায় সমবায় আন্দোলনেরও সূত্রপাত হয় ।আর্থীক কর্মকান্ডে সাহায্য সহযোগিতার জন্য সদস্য চাঁদা সঞ্চয়ের মাধ্যমে পুজি গঠনের ব্যবস্থা হিসাবে সমবায়  কিছু ব্যঙ্ক প্রতিষ্ঠিত হয়।  যার অস্থিত্ব এখনো রয়েছে বিভিন্ন নামে।যেমন কুমিল্লা সমবায় ব্যঙ্ক,পিপলস্ কোঅপারেটিভ ব্যঙ্ক(বর্তমানে যা ভূমি উন্নয়ন ব্যঙ্ক নামে  চালু রয়েছ),কুমিল্লা ইন্ডাষ্টিয়াল কোঅপারেটিভ ব্যঙ্ক(বর্তমানে সমবায় মার্কেট) ইত্যদি।এগুলোর প্রতিষ্ঠা কাল হচ্ছে ১৯১৩ থেকে ১৯১৭।দু:খজনক হলেও সত্য,এই ব্যঙ্কে ইতিহাসে আদিস্তান কুমিল্লা হলেও দেশের কেন্দ্রীয় ব্যঙ্ক, যা “বাংলাদেশ ব্যঙ্কে“ নামে পরিচিত।এর একটি শাখা আজো কুমিল্লায় স্থাপন করা হয়নি।এই কেন্দ্রীয ব্যঙ্ক এর ধারনাও কিন্তু খুব বেশি দিনের নয়।পাকিস্তান আমলের মাঝামাঝি সময় স্থাপিত হয় এই ব্যঙ্ক।মুদ্রানীতি ঘোষনা,দেশের সরকারি-বেসরকারি ব্যঙ্গগুলোর কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রন,বৈদেশীক মুদ্রার হিসাব-নিকাষ ,ট্র্যজারির কর্মকান্ড দেখভাল করা ইত্যাদি কাজগুলো এই ব্যঙ্কের মাধ্যমে হয়ে থাকে। দেশে ব্যঙ্ক ও তার শাখার ব্যপ্তি বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন স্থানে, বাংলাদেশ ব্যঙ্ক  তার শাখা খুলেছে। বর্তমানে এর শাখার সংখ্যা দশটি।

কিন্তু এই তালিকায় কুমিল্লা নেই ।দীর্ঘদিন থেকেই কুমিল্লতে একটি শাখা স্থাপন করার দাবিটি ছিলো।যেসব প্রাকযোগ্যতার ভিত্তিতে শাখা স্থাপন করা হয়ে থাকে,তার সবই কুমিল্লাতে বিদ্যমান। এসবের মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বা রেমিট্রন্স, যাকে প্রবাসী আয়ও বলা হয়।তাকেই বাংলাদেশ ব্যঙ্কের শাখা স্থাপনের অন্যতম বিবেচনায় আনা হয়। সেক্ষেত্রে কুমিল্লা কিন্তু অনেক এগিয়ে। বাংলাদেশ ব্যঙ্কের হিসাব থেকেই দেখা গেছে যে, প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে কুমিল্লা রয়েছে এক নাম্বারে । গোটা দেশের মধ্যে কমিল্লার প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের পরিমান সর্বোচ্চ। পরপর সাত বছর ধরেই এক নম্বর স্থানটি দখলে রয়েছে কুমিল্লার।তাছাড়াও ঢাকাসহ আশেপাশের জেলাগুলোর সাথে যোগাযোগের ব্যবস্থাও অত্যন্ত উন্নত।কিন্তু তারপরও কুমিল্লায় একটি শাখা স্থাপন হচ্ছেনা কেন-তার উত্তর নেই। একটু খতিয়ে দেখলেই দেখা যায় যে, বগুরার চৌধুরী মোহম্মদ আলী কিছুদিনের জন্যে তৎকালীন পাকিস্থানের গভর্নর জেনারেলের দায়িত্ব পেয়েছিলেন।আর সে সুযোগে তিনি তার বাড়ি বগুরাতে বাংলাদেশ ব্যঙ্কের শাখা স্থাপন করাতে সক্ষম হয়েছিলেন।তা বহুবছর আগের ঘটনা। অথচ কুমিল্লারওতো অনেকেই  রাষ্ট্রপতি,প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে অনেক প্রভাবশালী মন্ত্রী,এমপি,ক্যবিনেট সচিব,সচিব ছিলেন। দেখতে দেখতে ব্যঙ্কটির দশ দশটি শাখা হয়েছে দেশের বিভিন্ন স্থানে ,কিন্তু কুমিল্লায় হচ্ছেনা।

বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যঙ্কের একজন প্রভাবশালী পরিচালক হচ্ছেন,আমাদের কুমিল্লার কৃতি সন্তান আফতাবুল ইসলাম মঞ্জু, আমাদের মঞ্জু ভাই। অর্থমন্ত্রী আহম মুস্তফা কামালও কুমিল্লারই লোক।বাংলাদেশ ব্যঙ্কের নীতিনির্ধারনী কর্মকান্ডে ওনাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।কুমিল্লা সদরের সংসদ সদস্য আকম বাহাউদ্দিন বাহার, একবার সংসদে জোড়ালো ভাবেই এ দাবিটি তুলে ধরেছিলেন। সাবেক রেলপথ মন্ত্রী,মুজিবুল হক মুজিব এমপি এ ব্যাপারে সংশ্লিষএদর সাথে অনেকবারই কথা বলেছেন বলে আমাকে জানিয়েছেন। সম্প্রতি, বাংলাদেশ ব্যঙ্কের পরিচালক মঞ্জু ভাইয়ের সাথে এব্যপারে কথা হয়েছে অনেকক্ষন। ওনার গুলশানের অফিসে বসে কথা বলার সময় তিনি বলেন,অন্যন্য যেসব স্থানে কেন্দ্রীয় ব্যঙ্কের শাখা রয়েছে, সেসব এলাকার চাইতে কুমিল্লাতে শাখা স্থাপন অনেক বেশি যৌক্তিক এবং যথার্থই হবে।তিনি বলেন, তিনি যেখানে যে অবস্থাতেই থাকেন না কেন, সুযোগ পেলেই কুমিল্লার জন্য কিছু করার আন্তরিক চেষ্টা করেন। তিনি এসএমইর চেয়ারম্যন থাকাকালীনও কুমিল্লাতে একটি প্রকল্প স্থাপনের প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। অনেকের অসহযোগিতার জন্যে তা শেষ পর্যকন্ত হতে পারেনি। কিন্তু,বাংলাদেশ ব্যঙ্কের একটি শাখা স্থাপনের ক্ষেত্রে কারো কোন আপত্তি থাকবে বলে মনে হয়না। তিনি জোর দিয়ে বলেন তিনি অর্থমন্ত্রীর সাথে এবিষয়ে কথা বলবেন। তাছাড়া কুমিল্লার প্রভাবশালি এমপি,স্থানীয় গন্যমান্য ব্যক্তিদের সাথেও কথা বলবেন বলে জানান।কুমিল্লার ব্যঙ্কগুলোর অতীত জানতে গিয়ে,জানা যায় যে, সমবায় ব্যঙ্ক বিশেষ করে ইন্ডাস্টিয়াল কো-অপারেটিভ ব্যঙ্ক এবং অরিয়েন্টাল কো-অপারেটিভ ব্যঙ্কে স্থাপন এবং পরবর্তীতে সেগুলো দখল হওয়ার হাত থেকে রক্ষার ক্ষেত্রে এডভোকেট আফজল খা আমাকে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, তিনি যখন বাংলাদেশ সমবায় ব্যঙ্কের কেন্দ্রীয় ব্যঙ্কের চেয়ারম্যন ছিলেন,তখনো তিনি কুমিল্লাতে বাংলাদেশ ব্যঙ্কের  একটি শাখা স্থাপনের বিষয়ে চেস্টা করেছিলেন। এ প্রশ্নে যেকোন প্রয়োজনে তিনি সহযোগিতা করবেন বলে জানান।

এমনি প্রয়োজনীয় সব প্রাগযোগ্যতা থাকা সেইসাথে কুমিল্লা লোক অর্থমন্ত্রী,ব্যঙ্কের পরিচালকসহ প্রভাবশালী অনেক এমপি,উচ্চ পর্যা্য়ের কর্মকর্তা থাকা সত্বেও কুমিল্লার এই দাবিটি পূরন হচ্চেনা।এর জন্য আর কি কি করা প্রয়োজন ?

রেজাউল করিম শামীম: সাবেক সভাপতি, কুমিল্লা প্রেসক্লাব, সদস্য জাতীয় প্রেসক্লাব।

Print Friendly, PDF & Email

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.