ধর্ষণে অভিযুক্ত উপ-সচিবের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন তরুণী

(Last Updated On: September 26, 2019)

সময় সংবাদ: ইন্টারনেটে ভিডিও ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে এক কলেজছাত্রীকে এক বছর ধরে ধর্ষণ করার অভিযোগ উঠেছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের একজন উপসচিবের বিরুদ্ধে। মামলার চার্জশিট হবার পর এ কে এম রেজাউল করিম রতন নামের এই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

অভিযোগপত্র দাখিলের পর তিনি আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। এরপর জামিনে বেরিয়ে আসেন রেজাউল করিম রতন। অভিযোগ রয়েছে, জামিন পেয়েই ধর্ষণের শিকার ওই তরুণীকে হত্যা ও এসিড নিক্ষেপের হুমকি দিচ্ছেন তিনি।

নির্যাতিতা ওই তরুণী  জানান, ২০১৬ সালে মোহাম্মদপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন এ কে এম রেজাউল করিম রতন। সে সময় ইন্টারমিডিয়েট ১ম বর্ষে ভর্তি হতে ওই কলেজে যান ওই তরুণী। এর মাস দুই পর থেকে ওই ছাত্রীর মোবাইল নম্বর যোগাড় করে তাকে ফোন করতে শুরু করেন অধ্যক্ষ রেজাউল করিম। দারিদ্র্যের কারণে ওই ছাত্রীকে পড়াশোনার পাশাপাশি অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে হতো। ফলে তিনি নিয়মিত ক্লাস করতে পারতেন না। অধ্যক্ষ হিসেবে রেজাউল করিম তার অনুপস্থিত থাকার কারণ জানতে চান এবং সেই কারণ জানার পর ওই ছাত্রীকে বলেন, তার চিন্তার কিছু নেই, তার পড়াশোনার সমস্ত দায়িত্ব তিনি নেবেন।

ওই তরুণী অভিযোগ করেন, এসব কথা বলে রেজাউল করিম ২০১৭ সালের ১২ জুন কলেজ ছুটির পর নিজকক্ষে ডেকে নেন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা কেউ সেসময় কলেজে না থাকলেও পিয়ন জলিল ও হান্নান উপস্থিত ছিলেন। তারা ওই ছাত্রীকে অধ্যক্ষের কক্ষে পৌঁছে দেন। পিয়ন জলিল এরপর কেক ও কোমল পানীয় এনে দেন। কোমল পানীয়টি খাওয়ার পর তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। ঘণ্টা তিনেক পর ঘুম ভাঙলে তিনি নিজেকে অধ্যক্ষের কক্ষের সোফায় এবং শরীরের পোশাক এলোমেলো অবস্থায় আবিষ্কার করেন। অধ্যক্ষ রেজাউল করিম রতনও সে সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন। পরে ওই ছাত্রী ঘটনা প্রকাশ করে দেয়ার কথা বললে রেজাউল করিম রতন বলেন, সমস্ত ঘটনার ভিডিও তার কাছে আছে, সে যদি এ ব্যাপারে সবাইকে জানায় তাহলে ওই ভিডিও তিনি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেবেন।

ওই তরুণী অভিযোগে আরো জানান, এরপর থেকে সেই ভিডিও ফেরত দেয়ার কথা বলে বা ভিডিও ছড়িয়ে দেয়ার কথা বলে তাকে বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় নিয়ে ধর্ষণ করেন রেজাউল করিম রতন। এরমধ্যে নিজের স্ত্রীর সঙ্গে ডিভোর্স ও পারিবারিক অশান্তির কথা বলে তাকে বিয়ে করারও আশ্বাস দেন তিনি।

রেজাউল করিম রতন বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা। ২০১৮ সালে পদোন্নতি পেয়ে তিনি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হন। নির্যাতিতা তরুণী জানান, এসময় রেজাউল করিম তাকে বলেন, এখন থেকে আর কলেজে নয়, অন্য এক বন্ধুর বাসায় তাদের দেখা হবে। পরে ভিডিও দেয়ার কথা বলে ওই ছাত্রীকে ধানমন্ডি-৮ এর এক বাসায় আসতে বলেন তিনি। সেখানেও ইন্টারনেটে ভিডিও ছড়িয়ে দেয়ার কথা বলে এবং বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে বেশ কয়েকবার তাকে শারীরিক সম্পর্ক করতে বাধ্য করেন। শেষদিন ওই বাসাতে শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি অন্য সহযোগীদের সহায়তায় তাকে প্রাণে মেরে ফেলারও চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ করেন তরুণী। পরে বাসার কেয়ারটেকারের সহায়তায় তিনি প্রাণে বাঁচেন এবং পুলিশে অভিযোগ করেন।

ধানমন্ডির ওই বাসাটি এ ধরনের অনৈতিক কাজের জন্যই ব্যবহৃত হতো বলে জানিয়েছেন ওই তরুণী। পরবর্তীতে তরুণীর অভিযোগের ভিত্তিতে ধানমন্ডি থানা পুলিশ সেখানে অভিযান চালিয়ে অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পায়। ওই বাসার কেয়ারটেকারও সত্যতা স্বীকার করে জবানবন্দি দেন।

পরে ধানমন্ডি থানায় নারী নির্যাতন মামলা করেন ওই তরুণী। মেডিক্যাল রিপোর্টেও তরুণীর অভিযোগের সত্যতা পায় পুলিশ। তরুণী মামলাটি তদন্তের পর রেজাউলকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। বিষয়টি জানতে পেরে আত্মসমর্পণ করলে আদালত তাকে জামিন দেন। জামিন পেযেই ওই তরুণীকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি-ধামকি ও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ দিতে থাকেন রেজাউল করিম। ভাড়াটে গুণ্ডা লাগিয়ে রাস্তায় বিভিন্ন সময় তাকে অপদস্ত করা হয় বলেও অভিযোগ ওই তরুণীর।

এরমধ্যে ১৯ এপ্রিল ২০১৯ ধানমন্ডিতে তাকে রিকশা থেকে নামিয়ে রেজাউল করিম মারধর করেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এছাড়াও, ২ জুন ২০১৯ তারিখে ধানমন্ডির ৮ নম্বর ব্রিজ এলাকায় ওই তরুণীকে গাড়ি চাপা দেয়ারও চেষ্টা করেন রেজাউল করিম। পরে তাকে মারধর করেন এবং তার মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেন। সেদিন পথচারীরা রেজাউল করিমকে আটক করে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করে। এ ঘটনায় তরুণী আরেকটি মামলাও করেন।

রেজাউল করিমের সঙ্গে আপস নয়, এই অন্যায়ের বিচার চান ওই তরুণী।

এ ঘটনার বিষয়ে এ কে এম রেজাউল করিম রতন ফোনে  বলেন, ‘ওই তরুণীকে আমি সরল বিশ্বাসে সাহায্য করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু মেয়েটি নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য আমাকে ফাঁসিয়েছে। যে তারিখে আমি তাকে কলেজে ডেকে নিয়েছি বলে সে জানিয়েছে তখন রোজা ছিল। তাহলে তাকে কিভাবে আমি কোমল পানীয় খাওয়ালাম?’ ওই সময় কলেজে রোজার ছুটি ছিল বলেও দাবি করেন এই উপ-সচিব। ধানমন্ডির ওই বাসারও কোনো অস্তিত্ব নেই বলে দাবি তার।

তিনি বলেন, ‘আমি তার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম এ কথা সত্যি, কিন্তু আমার দুর্বলতাকে ব্যবহার করে ওই মেয়েটি আমাকে ফাঁসিয়ে আমার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিতে চাইছে। ওই তরুণীর করা এজাহারে অনেক সত্য গোপন করা হয়েছে। এছাড়াও মেডিক্যাল রিপোর্টেও অনেক অসঙ্গতি আছে। আমার স্ত্রীর সঙ্গেও আমার ডিভোর্স হয়নি। আমার সন্তানদের মানসিক প্রতিবন্ধী বলেছে ওই তরুণী, কিন্তু তারা সম্পূর্ণ সুস্থ।’

ওই তরুণীর করা নারী নির্যাতনের মামলাকে মিথ্যা দাবি করে ওই উপসচিব অভিযোগ করেন, ওই মামলা নিষ্পত্তি করে দেবার জন্য ধানমন্ডি থানার পুলিশ তার কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা দাবি করেছে।

টাকা নেয়া ও মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে ধানমন্ডি থানার তদন্ত কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘মামলার চার্জশিট দিয়েছে উইমেন সাপোর্ট সেন্টার। এ মামলার সঙ্গে এখন আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তাহলে আমরা কেন টাকা চাইবো? তাছাড়া ধানমন্ডির যে বাসা নিয়ে মেয়েটি অভিযোগ করেছিল সেই বাসায় আমরা অভিযান পরিচালনা করেছি। সেখানে ওই তরুণীর অভিযোগের সত্যতা আমরা পেয়েছি।’

ধানমন্ডি থানার অফিসার ইনচার্জ মো. আব্দুল লতিফ  বলেন, টাকা চাওয়ার অভিযোগ একদমই সত্য নয়। ওই উপসচিবের সঙ্গে আমাদের কোনো কথাই হয়নি। তদন্তে যা পেয়েছি সেটাই কোর্টে উপস্থাপন করেছি।

অভিযুক্ত রেজাউল করিম রতন প্রতিবেদককে বিভিন্ন সময় নির্যাতিতা মেয়েটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রমাণ সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি দিলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি তা দিতে পারেননি। বরং নিজের অসুস্থতার কথা বলে বারবর সময় ক্ষেপণের চেষ্টা করেছেন।

Print Friendly, PDF & Email

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.