‘কথনে’ ব্যস্ত ওবায়দুল কাদের!

(Last Updated On: সেপ্টেম্বর ২৯, ২০১৯)
পরিবর্তন ডটকম: প্রতিনিয়ত নানা ইস্যুতে কথা বলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। কখনো দল, কখনো সরকার, কখনো শুদ্ধি অভিযান, আবার কখনো বিরোধী পার্টিও উঠে আসে তার কথনে। পত্র-পত্রিকা, টিভি ও অনলাইন গণমাধ্যমে প্রতিদিনই তার সরব উপস্থিতি।
 
এক সময়ের সাংবাদিক ও ছাত্রনেতা বর্তমান সময়ের বর্ষীয়ান রাজনীতিক ওবায়দুল কাদের- নানা ‘কথনে’ বিরোধীদের মোকাবেলা করা, মাঠ নিয়ন্ত্রণ, মন্ত্রণালয়-প্রশাসন ও দল পরিচালনায় সিদ্ধহস্ত। সড়কেও বেশ তৎপর, এজন্য মুখে মুখে ফাটাকেষ্ট খ্যাতিও পেয়েছেন তিনি।
 
কিন্তু আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কেমন ওবায়দুল কাদের? তার সাংগঠনিক আমলনামা মূল্যায়নের সময় এসেছে। কারণ সামনের মাসেই শেষ হচ্ছে তার কমিটির মেয়াদ। চলতি বছর ২০-২১ ডিসেম্বর দলের ২১তম জাতীয় সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা হয়েছে, হয়েছে প্রস্তুতি কমিটিও।
 
এরমধ্যে নিশ্চয়ই প্রস্তুত হয়েছে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ওবায়দুল কাদেরের সাংগঠনিক রিপোর্ট। তিন বছরের কাজের হিসেবে সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের আমলনামা বাম হাতে। দীর্ঘ এই সময়ের মধ্যে মাত্র একটি জেলা ইউনিটে সম্মেলন করেছেন তিনি।
 
দৃশ্যত, সরকারে বেশ সফল আওয়ামী লীগ। সিডর, নার্গিস, আইলা ও ফণীসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করে সব ক্যটাগরিতে টানা সরকারে সেরা পারফর্ম করছে দলটি। মাদক, সন্ত্রাস ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের অভিযান ইতিমধ্যে প্রশংসিত। এ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী হিসেবেও ওবায়দুল কাদের সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। পদ্মাসেতু, মেট্রোরেলসহ নানা মেগা প্রজেক্ট তার হাত ধরেই হচ্ছে।
 
শুধু তাই নয়, ওবায়দুল কাদের স্বপ্নের নয়া দিগন্তে বাংলাদেশের নেতৃত্বদানকারী শেখ হাসিনার অন্যতম সারথী। ১৯৭৭-১৯৮১ সেশনে ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। ওই ১৯৮১ সালেই শেখ হাসিনাও আওয়ামী লীগ সভাপতি নির্বাচিত হন। সে সময় থেকে একজন অনুগত কর্মী হিসেবে সফলভাবে শেখ হাসিনার সঙ্গে কাজ করেছেন কাদের। জায়গাও করে নেন তার গুডবুকে। দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে নিজেকে খাঁটি সোনা প্রমাণ করেই সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে এশিয়ার বৃহৎ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হন।
 
২০তম সম্মেলনের শেষ সেশনে নতুন সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর সভাপতি শেখ হাসিনা তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে সাধারণ সম্পাদকের বিষয়ে বলেন, ‘সে (সৈয়দ আশরাফ) আমার ছোট ভাই। দুই টার্ম আমার সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছে। শহীদ পরিবারের সন্তান হিসেবে মন-প্রাণ দিয়ে সংগঠন ও দেশকে ভালোবেসেছে। আজকে সে-ই সাধারণ সম্পাদক পদে ওবায়দুল কাদেরের নাম প্রস্তাব করেছে। কাদেরও ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতি করছে। আশা করছি, দল আরও শক্তিশালী হবে।’
 
দলীয় সাংগঠনিক রিপোর্ট বলছে, আগের চেয়ে দল শক্তিশালি হয়নি। বরং নানা গ্রুপিং ও কোন্দলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার ওপর ৭৮টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে মাত্র একটিতে (মৌলভীবাজার জেলা) সম্মেলন করা হয়েছে। এর বাইরে প্রায় ৪ শতাধিক উপজেলা তো রয়েই গেছে। উপজেলাগুলোতেও দীর্ঘদিন কমিটি না হওয়া, ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বে এখন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থা নাজুক। গত উপজেলা নির্বাচনে বেশির ভাগ ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর জয়ে তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও তার প্রভাব পড়বে বলে শঙ্কা দলীয় নেতাদের।
 
অথচ আগের সাংগঠনিক রিপোর্ট বলছে, বিএনপি-জামায়াতের নানা আন্দোলন সংগ্রাম মোকাবেলা করেও ৫৮টি শাখায় সম্মেলন করেছিলেন প্রয়াত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।
 
১০ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগে কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে তৃণমূলের সম্মেলন শেষ করে সম্মেলনের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিয়েছেন দলের প্রধান শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ‘তারা ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ অক্টোবর ৮টিমে সাংগঠনিক সফর করে পুরো দেশকে সম্মেলনের জন্য প্রস্তুত করবেন। ১০ ডিসেম্বরের আগেই সব শাখা সম্মেলন করে কাউন্সিলর লিস্ট তৈরি করবেন।’ অবশ্য এরপর এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনো ইউনিটের সম্মেলনের খবর পাওয়া যায়নি।
 
তিন বছরে যেসব সম্মেলন হয়নি, সেগুলো তিন সপ্তাহে আদৌ সম্ভব কীনা? এমন প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় এক নেতা বলছেন, ‘যার হয় না নয়ে, তার হবে না নব্বইয়ে।’
 
তবে সম্মেলন না হওয়ার কারণ হিসেবে তারা বলছেন, ‘জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে ব্যস্ততা, ওবায়দুল কাদেরের অসুস্থতা ও সরকারের নানা রকম ব্যস্ততা অন্যতম। এক্ষেত্রে শুধু সাধারণ সম্পাদককে দায়ী করা যাবে না।’
 
তারা আরও বলেন, সম্মেলন করতে গেলেই প্রবীণ নেতারা বাগড়া দিয়ে বসেন। অনেকে দাবি করে বলে বসেন, ‘আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে রাজনীতি করেছি।’ এমনকি তারা সম্মেলন পেছাতে গণভবনেও ছুটে আসেন। নানা কারণ দেখিয়ে সম্মেলন না করার কথা বলেন। এছাড়াও মন্ত্রী-এমপিদের ‘পকেট কমিটি’ হাতছাড়া হওয়ার শঙ্কায় অসহযোগিতা তো আছেই।
 
জানা গেছে, তৃণমূলের দ্বন্দ্ব ও কোন্দল তো বিষফোঁড়া! সম্মেলন করতে গেলে সেটি আরও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। নানা সময় কেন্দ্রীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা সম্মেলন করতে গেলেও সেই চিত্র দেখে ব্যর্থ মনোরথে ফিরে এসেছেন।
 
আওয়ামী লীগের একজন সাংগঠনিক সম্পাদক  বলেন, ‘এখন যে ত্রিমুখী সংকট তাতে সম্মেলন করা আরও কঠিন। কারণ উপজেলা নির্বাচনে বিদ্রোহীদের বড় অংশ পাস করেছে। নৌকার প্রার্থী অনেকেই ফেল করেছে। কমিটি করতে গেলে নৌকার প্রার্থীকে মানবিক বিবেচনায় নেতা বানাতে হয়, কিন্তু কাউন্সিলরদের ভোট তো পাবে সেই বিদ্রোহীরাই। কারণ বিদ্রোহীরা জনপ্রিয় ও কর্মীবান্ধব না হলেতো নৌকার বাইরে গিয়ে পাস করতে পারতো না! কাউন্সিলরদের ভোটে নেতা বানালে সেই বিদ্রোহী সামনে চলে আসে, আর দলীয় বিবেচনায় কাউন্সিলরদের পাশ কাটিয়ে কমিটি দিলে কেউ মানবে না। এ সংকটের সমাধান তো কঠিন।
 
‘এরমধ্যে সামনে আবার ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন, সেখানেও এর প্রভাব পড়তে দেয়া যাবে না। ফল ঘরে তুলতে হলে তৃণমূলকে যেকোনোভাবে ঐক্যবদ্ধ রাখতে হবে। আর যাই হোক, যাতে দ্বন্দ্ব আর না বাড়ে, অন্তত সেটা নিশ্চিত করতে হবে।’
 
সেই বিবেচনায় এখন তৃণমূলে সম্মেলন না দেয়ার পক্ষে অনেক কেন্দ্রীয় নেতা। যদিও তারা দলীয় সভাপতির দিকেই তাকিয়ে আছেন। কারণ তারা মনে করেন, এই সংকট উত্তরণ করতে পারেন একমাত্র শেখ হাসিনা। তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সবাই তার সিদ্ধান্ত মাথা পেতে নেবেন।
 
দলীয় বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, আমলনামা যাই হোক, ফের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছেন ওবায়দুল কাদের। শেখ হাসিনা সভাপতি থাকলে ও কাদের সুস্থ থাকলে তাকেই বেছে নেবেন তিনি। অবশ্য কে হচ্ছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে হবে ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
পরিবর্তন ডটকম..
Print Friendly, PDF & Email

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.