দুবাইয়ে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তি ঢাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান নয়!

(Last Updated On: অক্টোবর ১৩, ২০১৯)

বাংলা ট্রিবিউন: সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই শহরে গ্রেফতার হওয়া এক ব্যক্তিকে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদ বলে দাবি করেছিল পুলিশ। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, দুবাইয়ে গ্রেফতার হওয়া ওই ব্যক্তি আসল জিসান নয়। শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান এখন লন্ডনে। ঢাকায় ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরুর আগেই তিনি দুবাই ছাড়েন। ইউরোপের একাধিক দেশ ঘুরে গত ১০ অক্টোবর তিনি আবার লন্ডনে যান। এদিকে, দুবাইয়ে যাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল সেই ব্যক্তিও তিন দিন আগে জামিনে বেরিয়ে গেছেন। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, দুবাই পুলিশের পাঠানো তথ্যের বরাত দিয়েই তারা গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিকে জিসান বলে শনাক্ত করেছিলেন। এখন এ ব্যাপারে আরও খোঁজ করা হচ্ছে।

যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ পুলিশের মুখপাত্র এআইজি (মিডিয়া) মো. সোহেল রানা বাংলা  বলেন, ‘দুবাই পুলিশের বরাত দিয়ে আমাদের এনসিবি (ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো) জিসানের গ্রেফতার হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিল। আমরা এখনও আমাদের আগের বক্তব্যেই স্থির রয়েছি।’

গত ৩ অক্টোবর একটি প্রেস নোট দিয়ে পুলিশ সদর দফতর থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানকে গ্রেফতার হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। পুলিশ সদর দফতরের এনসিবি শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এআইজি মহিউল ইসলাম সেসময় বলেন, ‘দুবাই এনসিবি জিসানকে গ্রেফতারের পর আমাদের তা জানিয়েছে। আমরা তাদের সঙ্গে আইপি ফোনে যোগাযোগ করি এবং ভেরিফাই করে নিশ্চিত হই গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিই জিসান। তাকে গ্রেফতার করার পর দুবাইয়ের জুডিশিয়াল কাস্টডিতে নেওয়া হয়।’ পুলিশের এই কর্মকর্তা কথিত জিসানকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথাও বলেন। এমনকি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও কথিত জিসানকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে সাংবাদিকদের জানান।

এদিকে, পুলিশের পক্ষ থেকে জিসানের গ্রেফতার হওয়ার দাবি ওঠার পর নির্ভরযোগ্য সূত্রে জিসানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। ওই সূত্রের বরাতে জানা গেছে, দুবাই পুলিশ যাকে গ্রেফতার করেছে, সে আসল জিসান নয়। জিসান সেসময় ইউরোপের একটি দেশে অবস্থান করছিলেন। নিজের গ্রেফতারের খবরে জিসান নির্ভরযোগ্য ওই সূত্রের সঙ্গে হাস্যরস করেন। পরদিন দুপুরে পুলিশের পক্ষ থেকে ‘প্রেস নোট’ দেওয়ার পর একই সূত্রের মাধ্যমে আবারও জিসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। জিসান ‘ঘুমজড়িত’ কণ্ঠে আবারও তার গ্রেফতারের বিষয়টি নিয়ে হাস্যরস করেন। জিসান দাবি করেন, তার কাছে একটি ভারতীয় পাসপোর্ট ছিল—একথা সত্য। কিন্তু বেশ কয়েকবছর আগেই তিনি সেটি বাতিল করে দিয়ে অন্য একটি দেশের পাসপোর্ট বহন করছেন। নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে সেই দেশের নাম প্রকাশ করতে চাননি তিনি।

এদিকে, ঢাকায় পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক সূত্র জানিয়েছে, দুবাইয়ে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতারের পর ‘আলী আকবর চৌধুরী’ নামে একটি পাসপোর্ট উদ্ধার করা হয়। দুবাই পুলিশ ওই ব্যক্তিকে জিসান হিসেবে চিহ্নিত করে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশের এনসিবি বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করে। পরবর্তীতে পুলিশ সদর দফতরের এনসিবি বিভাগ এ সংক্রান্ত নথিপত্র ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে পাঠায়। গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারাও ওই ব্যক্তিকে জিসান হিসেবে শনাক্ত করেন। পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, জিসানের নতুন কোনও ছবি না থাকায় তাকে শনাক্ত করতে গিয়ে ‘গণ্ডগোল’ হয়েছে বলে তিনি ধারণা করছেন।

পুলিশ সদর দফতরের একটি সূত্র জানিয়েছে, তিন দিন আগে দুবাইয়ে গ্রেফতার হওয়া ওই ব্যক্তি জামিন পেয়েছেন। এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে গত সপ্তাহে পুলিশ সদর দফতরের এনসিবি বিভাগ টেলি কনফারেন্সের মাধ্যমে সরাসরি দুবাই পুলিশের সঙ্গে আলোচনা করে। আলোচনার পর তারাও দুবাইয়ে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তি যে জিসান নন, সে বিষয়ে নিশ্চিত হন। এজন্য এনসিবি বিভাগ থেকেও নতুন করে কেউ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। এআইজি (এনসিবি) মহিউল ইসলাম শনিবার অফিশিয়াল ট্যুরে চিলির উদ্দেশে ঢাকা ছেড়েছেন।

নব্বই দশকের শেষের দিকে সন্ত্রাসী হিসেবে জিসানের উত্থান ঘটে। কুমিল্লায় জন্ম নেওয়া জিসান ঢাকার রামপুরায় বেড়ে ওঠেন। ২০০১ সালের ২৬ ডিসেম্বর তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শীর্ষ যে ২৩ সন্ত্রাসীর তালিকা প্রকাশ করে সেখানে জিসানের নাম ছিল। তার বিরুদ্ধে খুন-চাঁদাবাজিসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অনেক অভিযোগ ছিল। সর্বশেষ ২০০৩ সালে মালিবাগে ডিবি পুলিশের দুই কর্মকর্তাকে হত্যার ঘটনায় জিসানের নাম আসার পর তিনি দেশ ছাড়েন। এরপর থেকে বিদেশে অবস্থান করেই ঢাকার মতিঝিল-খিলগাঁও এলাকা নিয়ন্ত্রণ করতেন। ঢাকায় তার অন্তত একডজন ক্যাডার রয়েছে; যারা তার নামে চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি করে টাকার ভাগ তার কাছে পাঠাতেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, সর্বশেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে জিসানকে ধরতে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই ধরা-ছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন জিসান। সর্বশেষ ঢাকায় ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে যুবলীগের দুই নেতা খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া ও জি কে শামীম গ্রেফতার হওয়ার পর জিসানের নাম আলোচনায় আসে। খালেদ ও জি কে শামীমের সঙ্গে একসময় জিসানের খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। জিসানের ক্যাডার বাহিনীর ওপর ভর করেই ঢাকায় চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি করতেন খালেদ ও শামীম। কিন্তু বছরখানেক ধরে তাদের সম্পর্কে ফাটল ধরে। খালেদ ও শামীম নিজেরাই ক্যাডার বাহিনী তৈরি করে আধিপত্য বিস্তার করেন। এ নিয়ে ঢাকার আন্ডার-ওয়ার্ল্ড উত্তপ্ত হলে মাসখানেক আগে জিসানের দুই সহযোগীকে একাধিক অস্ত্রসহ গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।

Print Friendly, PDF & Email

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.