বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস আজ, ‘মুজিববর্ষ’ এর ক্ষণগণনা

(Last Updated On: January 10, 2020)

শীত দুপুরের সোনালি রোদে ব্রিটিশ রয়াল এয়ারফোর্সের কমেট জেট বিমান উড়ছে ঢাকার আকাশে। ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দরে অবতরণ করবে বিমানটি। লাখো চোখের নজরে থাকা বিমানের দরজা খুলে যাবে। নেমে আসবেন অগ্নিপুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। হর্ষধ্বনি, স্লোগানে প্রকম্পিত হবে চারিধার। কামানে বাজবে ২১ বার তোপধ্বনি। শিশুরা ফুল ছিটিয়ে বরণ করবে বাঙালির মহানায়ককে। বাংলাদেশি বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংকট মোচনকারী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস আজ ১০ জানুয়ারি।

‘মুজিববর্ষ’-এর ক্ষণগণনা উপলক্ষে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারির বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সেই ঐতিহাসিক দৃশ্য ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা হবে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে। আজ শুক্রবার বিকেল ৪টা ৩৫ মিনিটে জাতির জনকের ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের প্রতীকী বিমান অবতরণ করবে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে। বিমান থেকে আলোক প্রক্ষেপণ ও তোপধ্বনি করা হবে বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে। তার পাঁচ মিনিট পর প্রতীকী অভ্যর্থনা ও গার্ড অব অনার প্রদান করা হবে। শেষ পর্যায়ে নিজে বক্তব্য প্রদান করে মুজিববর্ষের ক্ষণগণনা উদ্বোধন ও লোগো উন্মোচন করবেন বঙ্গবন্ধুকন্যা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

অগুনতি মানুষ প্রত্যক্ষ করবে ক্ষণগণনা কর্মসূচি। উদ্বোধনের সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীসহ সারা দেশের সব বিভাগ, জেলা ও উপজেলায় স্থাপিত ঘড়িতে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর ক্ষণগণনা শুরু হবে। দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের ২৮টি পয়েন্টে, সব বিভাগীয় শহর, ৫৩ জেলা ও দুই উপজেলা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাজধানীতে মোট ৮৩টি পয়েন্টে কাউন্টডাউন ঘড়ি বসানো হয়েছে ক্ষণগণনা শুরুর জন্য।

২০২০ সালের ১৭ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মগ্রহণের শততম বছর পূর্ণ হবে। বাংলাদেশ এই দিনটি থেকে ২০২১ সালের ১৭ মার্চ পর্যন্ত জাতির পিতার জন্মশতবর্ষ উদ্যাপন করবে। তার আগে আজ এই ক্ষণগননা শুরু হচ্ছে।

সরকারি উদ্যোগে এভাবে কোনো জাতীয় নেতার জন্মশতবার্ষিকী পালনের উদ্যোগ এই প্রথম। জন্মশতবর্ষের আনুষ্ঠানিকতা চলবে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ, অর্থাৎ স্বাধীনতা দিবস পর্যন্ত। জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রায় ৩০০ অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা সাজিয়েছে ‘মুজিব শতবর্ষ’ বাস্তবায়ন কমিটি। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিন বঙ্গবন্ধু দুপুর পৌনে ২টার দিকে বিমানবন্দরে পৌঁছেছিলেন। কিন্তু আজ ১০ জানুয়ারি শুক্রবার জুম্মার দিন ও বিশ্ব ইজতেমা থাকায় অনুষ্ঠানটি বিকেলে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সারা দেশে আনন্দ উল্লাসের সঙ্গে একটি অপূর্ণতাও ছিল। তখনো পাকিস্তানি কারগারে বন্দি ছিলেন স্বাধীনতার মহানায়ক। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশের মাটিতে তাঁর পা রাখার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার সব আনন্দ এসে এক বিন্দুতে মিলিত হয়। দিনটিকে কেন্দ্র করেই মুজিববর্ষের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরুর ৬৬ দিন আগে ক্ষণগণনা শুরু হচ্ছে। এ উপলক্ষে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করছে বাস্তবায়ন কমিটি। এতে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নিয়েছিলেন। ‘খোকা’ নামের সেই শিশুই হয়ে ওঠেন রাজনীতির কবি, মুক্তিপথের নির্দেশক, বিশ্বের অন্যতম নেতা। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ঢাকার সেই সময়ের রেসকোর্স ময়দানে তাঁর ১৮ মিনিটের অলিখিত ভাষণ বিশ্বের কাছেও একটি অমূল্য সম্পদ।

‘মুজিববর্ষ’ আয়োজনের সঙ্গে জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করতে জন্মশতবার্ষিকীর মাহেন্দ্রক্ষণ শুরুর আগে সারা দেশে একযোগে ক্ষণগণনা অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন জাতীয় বাস্তবায়ন’ কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ড. কামাল আবদুল নাসের। তিনি জানান, বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য এসব আয়োজন বিশেষ ভূমিকা রাখবে। এ উদ্দেশ্যে সরকারি খরচে সবার জন্য উন্মুক্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কিছু স্থানে ‘শতবর্ষের প্রতীক্ষা’ শীর্ষক আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। যার অংশ হিসেবে থাকছে একটি করে ক্ষণগণনার ডিজিটাল ঘড়ি স্থাপন, এলইডি স্ক্রিনে বঙ্গবন্ধুর জীবনী ও ইতিহাস সম্পর্কিত বিভিন্ন অডিও ভিজ্যুয়াল পরিবেশনা। একটি কিউআর কোডের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে জন্মশতবার্ষিকীর শুভেচ্ছা ও বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের সুযোগ থাকবে।

বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন অর্থাৎ ১৭ মার্চ জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে পালিত হয়। অন্যান্য বছরের মতো এবারও সারা দিনব্যাপী শিশুদের জন্য ছবি আঁকার প্রতিযোগিতাসহ নানা আয়োজন থাকবে। সঙ্গে যোগ হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী ও মুজিববর্ষ উদ্যাপনের আয়োজন। এদিন দেশব্যাপী বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম নিয়ে ইতিহাসভিত্তিক তথ্য ও ছবির প্রদর্শনী, বাংলাদেশের গর্বের উপাদানসমূহের উপস্থাপনসহ আকর্ষণীয় আলোকসজ্জা, আতশবাজির আয়োজন থাকবে।

এ জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ব্যাপক আয়োজন শুধু বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বিদেশে থাকা বাংলাদেশের দূতাবাস, মিশনে বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালন করা হবে। সেখানে বঙ্গবন্ধু যে শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা পৃথিবীর নির্যাতিত মানুষের কণ্ঠস্বর ছিলেন, তা তুলে ধরার বিভিন্ন আয়োজন থাকবে। এরই মধ্যে ভারত, মালয়েশিয়া, আরব আমিরাতসহ বেশ কিছু দেশের বর্তমান ও সাবেক সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানরা ১৭ মার্চের মূল অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে সম্মতি দিয়েছেন। শিল্প, সাহিত্য, ক্রীড়া, রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতিসহ দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানকে তুলে ধরে বিভিন্ন অনুষ্ঠান হবে। বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মকে প্রতিপাদ্য করে বাংলাদেশ এবং ভারতের যৌথ প্রযোজনায় একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের কাজ চলছে। ঢাকায় চলমান বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগকে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

আগামী ২২ ও ২৩ মার্চ জাতীয় সংসদে বিশেষ অধিবেশন বসবে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল বা বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে নিজেদের স্মৃতি আছে এমন বিদেশি গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন অতিথিকে বক্তব্য রাখতে আমন্ত্রণ জানানো হবে তাতে। একই সঙ্গে আরো অনেক বিদেশি অতিথিকে সংসদের বিশেষ অধিবেশন দেখার আমন্ত্রণ জানানো হবে।

‘মুজিব শতবর্ষ’ বাস্তবায়ন কমিটির পক্ষ থেকে আটটি উপকমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে সেমিনার, ওয়ার্কশপ ও আলোচনাসভা আয়োজন, আন্তর্জাতিক কর্মসূচি ও যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রদর্শনী, প্রকাশনা ও সাহিত্য উপকমিটি। এ ছাড়া আছে আন্তর্জাতিক প্রকাশনা ও অনুবাদ, ক্রীড়া ও আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজন, মিডিয়া, প্রচার ও ডকুমেন্টেশন উপকমিটি। রয়েছে চলচ্চিত্র ও তথ্যচিত্র উপকমিটি। এই কমিটিগুলো নিজ নিজ ক্ষেত্রে বছরব্যাপী বহুমুখী কার্যক্রম গ্রহণ করবে। এতে মূল বিষয় হিসেবে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর সঙ্গে আরো দুটি বিষয়কে তুলে ধরা হবে। প্রথমটি হচ্ছে, নিম্ন আয়ের দেশ থেকে বাংলাদেশের নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়া। দ্বিতীয়টি ২০২১ সালে অনুষ্ঠেয় স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী।

‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন জাতীয় কমিটি’র সভাপতির দায়িত্বে আছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর বাইরে জাতীয় অধ্যাপক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন জাতীয় বাস্তবায়ন’ নামে আরেকটি কমিটি রয়েছে।

শতবর্ষ উদ্যাপন কমিটির আন্তর্জাতিক কর্মসূচি ও যোগাযোগ উপকমিটির আহ্বায়ক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন জানান, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে নরেন্দ্র মোদি, প্রণব মুখার্জি, আরব আমিরাতের ক্রাউন প্রিন্স, বান কি মুন, ওআইসি সেক্রেটারি জেনারেল, ভুটানের রাজা ও মাহাথির মুহাম্মদ এরই মধ্যে সম্মতি দিয়েছেন।

শতবর্ষে মহা আয়োজন : জাতির পিতার জন্মশতবর্ষকে বিশেষভাবে উদ্যাপন করতে জাতীয় সংসদ ও বিচার বিভাগসহ সরকারের ৫৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ নানামুখী উদ্যোগ নিচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন কমিশন, দপ্তর ও সংস্থার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় জাতীয়ভাবে ২৯৮টি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে জন্মশতবার্ষিকী উদ্‌যাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি। মুজিববর্ষে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সারা দেশে ১৬ হাজার নতুন পাকা ঘর তৈরি করে দেবে। প্রায় এক হাজার বর্গফুটের প্রতিটি ঘর হবে একই নকশার। প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধাদের কবর একই নকশায় বাঁধানোর উদ্যোগও নিচ্ছে এ মন্ত্রণালয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে চিকিৎসা ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো রোগীর সেবায় বিশেষ উদ্যোগ নিচ্ছে। তথ্য মন্ত্রণালয় বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মের ওপর বিশেষ প্রচার, প্রকাশনা ও তথ্যচিত্র প্রদর্শনের ব্যবস্থা নিচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিশ্বব্যাপী বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম তুলে ধরার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের ১৭ মার্চের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানাতে কাজ করছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে পুরো উদ্যোগের সমন্বয় করছে। এর বাইরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর ও সংস্থার পক্ষ থেকে দেশের সব সরকারি অফিস পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু কর্নার তৈরি, লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো প্রদর্শন, বঙ্গবন্ধুর ওপর রচনা ও বক্তৃতা প্রতিযোগিতা, বঙ্গবন্ধুর পারিবারিক ও মুক্তিযুদ্ধের ছবি প্রদর্শনী, ডাকটিকিট ও মুদ্রা প্রদর্শনী, কবিতা আবৃত্তি, দেশাত্মবোধক গানসহ বিভিন্ন উদ্যোগ থাকবে বছরব্যাপী।

Print Friendly, PDF & Email

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.