সেই ওয়ান ইলেভেন শেখ হাসিনায় পরাজিত

(Last Updated On: January 11, 2020)

খুজিস্তা নুর-ই নাহারীন মুন্নী: আমার মেয়ে বলল ‘আমি আব্বুকে ভুলতে পারছি না।’ আমি বললাম, ‘আব্বু কি ভোলার জিনিস; কেন তোমার ভুলতে হবে?’ শ্রেয়া বলল, ‘আমি তোমাকে বোঝাতে পারছি না।’ বললাম, ‘আব্বুর জন্য তোমার কষ্ট হচ্ছে?’ বলল, ‘হু।’ ২০০৭-এর ২৩ জানুয়ারি ’৯০-এর ছাত্র আন্দোলনের নেতা ডা. জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকুকে যখন ধরে নিয়ে গেল, আমার মেয়ের বয়স তখন পাঁচ বছর। ও বলত, ‘আমি ছবির আব্বু চাই না, আমি আব্বুকে কাছে পেতে চাই। আব্বুর বুকে ঘুমাতে চাই, আব্বুর কোলে উঠে বেড়াতে যেতে চাই। ওরা কি জানে না আব্বুর ছোট্ট একটা মেয়ে আছে, ওর অনেক কষ্ট হচ্ছে।’ সত্যিই তো, ছোট্ট মেয়েটার কী দোষ? আমাদের ছেলেটার কী দোষ? অকারণে কেন আমাদের শাস্তি পেতে হলো? ২০০৭-এর ২৩ জানুয়ারি রাত তখন ১টা, হঠাৎ বিরতিহীনভাবে কলিং বেলের শব্দ। টিংকু তাড়াতাড়ি উঠে দরজা খুলে দিল। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখি কালো ড্রেস পরা আট-দশ জন সশস্ত্র লোক আমার বেডরুমে ঢুকে পড়েছে।

টিংকু ওদের বলল, ‘আপনারা বাইরে দাঁড়ান।’ ওরা বিন্দুমাত্র নড়ল না। টিংকুকে না নিয়ে ওরা নড়বে না। টিংকু রেগে গেলে ওকে থামিয়ে দিলাম। ওরা তাকে নিয়ে গেল নিচে। আমাকে একজন বলল, ‘আপনাদের মোবাইলগুলো দিন।’ সম্মোহিতের মতো সব মোবাইল ফোন দিয়ে দিলাম। হঠাৎ দেখি একজন অফিসার ডুপ্লেক্স বাসার সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনে চিৎকার করে বলছে, ‘স্যার, ধরে ফেলেছি।’ ভাব দেখে মনে হচ্ছে না জানি কত কষ্টসাধ্য কাজ করে ফেলেছে। ওরা আমার শাড়ির আলমারি দেখল, গহনা দেখল, ড্রেসিং টেবিল, বইয়ের আলমারি সবকিছু। একজন ড্রইংরুম থেকে একটি শোপিস তলোয়ার এনে বলল, ‘পেয়েছি স্যার।’ অফিসারটি ধমক দিয়ে বলল, ‘এটা শোপিস, রেখে আস।’ ওরা চার তলা শেষ করে তিন তলায় নামল। আমি দুই বাচ্চা নিয়ে বেডরুমে বসে আছি। ভিতরে ভিতরে আমি ভয় পাচ্ছি। আমি একা মেয়েমানুষ। গভীর রাত। পুরো বাড়িতে শখানেক কালো ড্রেস পরা লোক। আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে।

এভাবেই সেই সময় রাজনীতিবিদ-ব্যবসায়ীদের বাড়ি বাড়ি হানা দিয়ে ভীতসন্ত্রস্ত করে, সমাজে সবাইকে হেয় করে বিকৃত আনন্দ পায়। সে রাতে তারা টিংকুর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ড্রাইভার, কাজের লোক, বাসার ম্যানেজার, কয়েকজন মেহমান- তাদেরও ধরে নিয়ে গেল। ভোরে ফজরের নামাজ আদায় করে র‌্যাব-৩-এর অফিসে গেলাম, বাইরে বসে আছি। এমন সময় র‌্যাবের অফিসার সুলতান-ই-নূর এলেন। প্রথমে কথা বললেন না, আমি নাছোড়বান্দা। তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।

তিনি বললেন, ‘আমার অনেক কাজ আছে।’ বললাম, ‘আমার বাসা আপনার এলাকার ভিতর। আমার স্বামীকে কে বা কারা ধরে নিয়ে গেছে জানি না। আপনার কাছে এসেছি সাহায্য চাইতে।’ এবার আমাকে ভিতরে ঢুকতে দিলেন। পরদিন পত্রিকা খুলে দেখলাম, ‘গডফাদার, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, হাওয়া ভবনের জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকু।’ মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। সবার নিষেধ সত্ত্বেও আমি আপার সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। আপা মানে আমার বিশ্ববিদ্যালয়-জীবন থেকে পাওয়া নেত্রী শেখ হাসিনা। আপাকে বললাম, ওরা টিংকুকে বলির পাঁঠা বানাচ্ছে। সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করতে চাচ্ছে। সাংবাদিকদের দিয়ে যা খুশি তা লিখিয়ে ওর বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করতে চাচ্ছে। ‘ও’ চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী হতেই পারে না। হাওয়া ভবনে ‘সে’ কোনো দিন ঢোকেনি। আমি এখন কী করব? আপা আমাকে বললেন, ‘তোমাদের বঙ্গবন্ধু বছরের পর বছর জেল খেটেছেন, আর তুমি এত অল্পে ভেঙে পড়লে কী করে হবে? কখনো সাহস হারাবে না। মনে রাখবে।’ দুর্বল মনে করলে সবাই পেয়ে বসবে। আমি সেই থেকে আর কিছু পরোয়া করিনি। আপা দারুণ শক্তি দিলেন।

আপা এরপর একটি সভায় বলেছিলেন, ‘কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন শাস্তি না পায়।’ একেকটি দিন যেন একেকটি মাসের সমান। বিকাল হলেই বুকটা কেমন ধড়ফড় করতে থাকে। নিচের তলায় ড্রইংরুমে বিভিন্ন খতম চলছে। আমার হাতে তসবিহ। সব সময় আমি অজু রাখি, কখন কোন অবস্থার মুখোমুখি হতে হয় কে জানে। আমার ঘুম হয় না, প্রচণ্ড মাথাব্যথা। অনেক ঘুমের ওষুধ খেয়ে ফেললাম। তিন দিনের দিন আমার এক আত্মীয়ের মোবাইল ফোনে একটা কল এলো, বলল, ‘এ রাতটা বড় কঠিন টিংকুর জন্য। কাল সকালে ওরা টিংকুর হার্ট ফেইলোর, স্ট্রোক অথবা ক্রসফায়ার দেখাতে পারে। তোমরা সদকার ব্যবস্থা কর। তোমাদের নেত্রীকে জানাও, এদের টার্গেটের শীর্ষে তিনি। এরা ধীরে ধীরে ওনার দিকে অগ্রসর হবেন।’ হঠাৎ একটা চিরকুট। দুই কোটি টাকা দিলে আমার স্বামীকে ছেড়ে দেবে। এত টাকা কোথায় পাব? টাকার জন্য সবাইকে ফোন করতে লাগলাম। এরপর আবার চিরকুট, টাকার ব্যাপারটা সবাই জেনে গেছে, আমার টেলিফোনে টাকা চাওয়া উচিত হয়নি। এখন ১ কোটি টাকা দিলে ওরা ওকে এমনভাবে টর্চার করবে যাতে ওর কিডনি বিকল না হয়, অন্ধ না হয়। আমি দিশা হারিয়ে ফেললাম। একদিকে আমার স্বামীকে ওরা সন্ত্রাসী বলছে, অন্যদিকে আবার সবার সামনে জিম্মি করে গোপনে টাকা চাইছে। সাত দিন পর মাঝরাতে আমার ড্রাইভারসহ লোকদের ওরা ছেড়ে দিল। আমি ওদের মুখোমুখি বসলাম। ওরা কাঁদতে লাগল। বলল, মধ্যযুগীয় কায়দায় চোখে কালো কাপড় বেঁধে টর্চার করেছে। ইলেকট্রিক শক দিয়েছে। ঘুমের ওষুধ খাইয়ে মুখের ওপর হাজার ভোল্টের বাতি জ্বালিয়ে রেখেছে। মাথা নিচে পা ওপরে দিয়ে ঝুলিয়ে রেখেছে। আমি ভাবী, চোখে কালো কাঁপড় বাঁধে কেন? তবে কি ওরা ভয় পায়? ওরা কি জেনেশুনে অন্যায় করছে? ওরা ওদের ওপর অকথ্য র্নিযাতন করেছে। ওদের সারা শরীরে কালো কালো দাগ। তবে জানলাম টিংকু বেঁচে আছে। বাকি রাতটুকু আমার চোখে আর ঘুম এলো না।

এমনই এক রাতে টিংকুকে আমাদের মগবাজার বাসায় নিয়ে এলো। তারপর ক্যান্টনমেন্ট থানায়। সেখান থেকে সুপ্রিম কোর্ট। এই প্রথম সুপ্রিম কোর্টে আসা। প্রচণ্ড ভিড় ঠেলে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। এর মধ্যে বিভিন্ন দিক থেকে তির্যক মন্তব্য কানে আসে ‘চোরের বউ’। বুঝলাম সবই সাজানো। টিংকু আমাকে বলল, ‘চিন্তা কোরো না, হাবিয়া দোজখ থেকে এলাম, এটা বেহেশত।’ এখান থেকে ওদের ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে নেওয়া হলো। জেলে ওকে ৭ নম্বর সেল বকুলে থাকতে দেওয়া হয়েছে। টিংকুর সঙ্গে দেখা করতে এসবি ক্লিয়ারেন্স লাগবে। এর মধ্যে ছাত্রলীগের অর্পণা সহযোগিতা করল। শুরু হলো আমাদের চিঠি চালাচালি।

দুই দিন পর আমার টিংকুর সঙ্গে দেখা হলো। খানিকটা শুকনো মনে হলো। আমাদের তিনজনকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। বলল, ‘অনেক অত্যাচার করেছে বিনা কারণে। আমি নির্দোষ। এরা কী করতে চাইছে, কেন চাইছে ওরা নিজেরাও জানে না।’

আমি অফিসে যাওয়া শুরু করি। অন্য একটি ব্রোকারেজ হাউসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজাউল করিম আমাকে বললেন, ‘আপনার স্বামী সন্ত্রাসী!’ আমি বলি, আপনি কী করে জানলেন? ‘পত্রিকা পড়ে’, সোজা উত্তর। পত্রিকায় যা কিছু ছাপা হয় সবই কি সঠিক? আপনি না ইঞ্জিনিয়ার? আমি চিৎকার করে বলি। মনে মনে বলি ওরা সাকসেসফুল।

দ্বিতীয়বার টিংকুর সঙ্গে দেখা করতে গেছি, ওর খুব মন খারপ। বলল, ‘আমাকে ভীষণ চাপ দিচ্ছে জলিল ভাই আর কাদের ভাইয়ের নামে মামলা দিতে।’ আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি কি ঠিক করেছ? ও বলল, ‘আমি ওদের বলে দিয়েছি ওনারা আমার নেতা। প্রয়োজনে জীবন দেব, কিন্তু মামলা করার প্রশ্নই আসে না।’

পঞ্চমবার যখন দেখতে গিয়েছি তখন টিংকুকে খুব হাসিখুশি দেখাচ্ছিল। তখন জেলে সব নামকরা ব্যবসায়ী আর রাজনীতিবিদ একসঙ্গে। সেও মানিয়ে নিয়েছে।

ষষ্ঠবার গিয়ে দেখি ওকে কেমন যেন অস্থির মনে হচ্ছে। টিংকু বলল, ‘ক্ষমতাসীনরা দেশের পুঁজিপতিদের ধরে এনে এলোপাতাড়ি মামলা দিচ্ছে যেগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। কিন্তু এর ফলে পুঁজিপতিরা দেশে বিনিয়োগের পরিবর্তে বিদেশকেই নিরাপদ মনে করছেন। এ টাকা দিয়ে দেশের লাখ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হতে পারত, দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন তথা সার্বিক পুঁজির বিকাশে তা বিরাট ভূমিকা রাখতে পারত। কিন্তু এখন সব টাকা অন্ধকার পথে বিদেশে পাচার হয়ে যাবে। অর্থনৈতিকভাবে দেশটাকে পঙ্গু বানিয়ে ফেলছে। রাজনীতিবিদদের শেষ করে দিলে দেশ চালাবে কারা?’ সপ্তমবার যখন দেখা করতে যাই তখন সেলে নতুন যোগ হয়েছে ইকবালুর রহিম। ও টিংকুকে খবর পাঠিয়েছিল তাকে যেন ৭ নম্বর সেলে নিয়ে আসে। ডিআইজি শামসুল হায়দার চৌধুরীর ডাকনাম জুয়েল। জামালপুরে আমাদের কাছাকাছি বাসা। এ ছাড়া আমার ভাইয়ের ছেলেবেলার বন্ধু। উনাকে বলে ইকবালকে ৭ নম্বর সেলে নিয়ে আসা হয়। টিংকু বলল, ‘ইকবাল সারা দিনই কান্নাকাটি করছে ওর মনটা বড় নরম।

ইকবালকে ওরা চাপ দিচ্ছে বাহাউদ্দিন নাছিমের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য। ইকবাল ওর বউ আর তিনটি ছোট ছোট বাচ্চার কথা ভেবে রাজি হয়ে যাচ্ছে। আমি ইকবালকে ভয় দেখিয়েছি, তুই মামলা করলে রাতের বেলা তোকে বালিশচাপা দিয়ে মেরে ফেলব। এখন ইকবাল আরও বেশি কান্নাকাটি করছে।’ নবমবার দেখা করতে গেলে বলল, ‘এত দিন হয়ে গেল কোনো মামলা দিতে পারল না, তবু আটকে রেখেছে। দুই নেত্রীকে ওরা সাবজেলে রেখেছে। কিন্তু এরপর কী করবে সে ব্যাপারে ওদের কোনো নির্দেশনা নেই। ব্যবসায়ী-রাজনীতিবিদকে জেলে বন্দী করে ওরা কী করতে চাইছে তা তারাই ভালো জানে।’ আমি বুঝলাম জেলের চার দেয়ালে ও হাঁপিয়ে উঠেছে। আমরা নিশ্চুপ। তারা সব প্রশ্নের ঊর্ধ্বে, সব জবাবদিহির ঊর্ধ্বে। ওরা নিজেদের একেকজন বিধাতা মনে করছে। এদের চোখ আছে কিন্তু দূরদৃষ্টি নেই। কান আছে কিন্তু মানুষের বুকফাটা আর্তনাদ সেখানে পৌঁছায় না। সবচেয়ে বেশি যেটা নেই তাদের তা হচ্ছে নিজেদের ক্ষমতা এবং দৌড় সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা। নিজেদের সীমাবদ্ধতা নিয়ে ওরা একেবারেই অজ্ঞ। ওরা সবকিছু লেজেগোবরে করে ফেলেছে। গ্রাম ও মফস্বল শহরগুলোয় বিভিন্ন অজুহাতে বাড়িঘর ভাঙছে, দোকানপাট ভাঙছে, হাটবাজার নষ্ট করছে। দেশের কোথাও দুর্নীতি কমেনি কিন্তু রেইট বেড়ে গেছে। দেশে চলছে নীরব দুর্ভিক্ষ। অর্থনৈতিক মন্দার চাপে মানুষের নাভিশ্বাস উঠে গেছে তার ওপর আবার র‌্যাংগস ভবেন চাপা পড়ে এতগুলো হতভাগ্য দিনমজুরের মৃত্যু। ওরা গরিব বলে এই কি সুশাসনের নমুনা? কোথায় আছে দেশের তথাকথিত সুশীলসমাজ? মাত্র কিছু দিন আগে যে ক্ষমতাসীনদের তারা ফুলের মালা দিয়ে বরণ করেছিল সেখানে শুধুই ধিক্কার।

সংবাদের প্রয়াত সম্পাদক বজলুর রহমান আমাকে মেয়ের মতো স্নেহ করতেন। একসঙ্গে রমনা পার্কে হাঁটতাম। একদিন একজন এসে বলল, ‘আপার নামে চাঁদা নেওয়ার মামলা দিতে হবে। টিংকুকে ছেড়ে দেবে।’ রাজি হইনি। মতিয়া আপার বাসায় গেলাম। বললাম, আপাকে জানাতে। আগস্ট মাস। অফিসে মনিটরের দিকে তাকিয়ে বাজার পর্যবেক্ষণ করছি হঠাৎ দেখি নিম্নমুখী প্রবণতা। কোনো কারণ নেই। পুঁজিবাজার নীতিনির্ধারণে কোনো পরিবর্তন আছে বা আসছে বলেও আমার জানা নেই। তাহলে কি দেশের অবস্থা খারাপ? অজানা আশঙ্কায় বুকটা কেঁপে উঠল। রকিব ভাইকে ফোন করলাম। রকিব ভাই বললেন, বাসায় চলে যান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র বিক্ষোভে উত্তাল। ১৪৪ ধারা জারি হতে পারে। পথঘাট সব ফাঁকা। যে যেদিক পারছে ছুটে পালাচ্ছে। আজ আমার গাড়িতে উঠতে ইচ্ছা হলো না। রিকশায় বাড়ি ফিরব। ‘আঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। নিজের ভিতর কেমন একটা প্রশান্তি অনুভব করলাম। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৬৬-এর ছয় দফা, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭১-এর স্বাধীনতাযুদ্ধ, ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন সবকিছুর সূতিকাগার এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সময়ের সাহসী সন্তানরা দেশের প্রয়োজনে ঠিকই গর্জে উঠেছে। প্রতিবাদ করছে। প্রতিরোধের চেষ্টা করছে। ওদের এ আন্দোলনকে স্বাগত জানিয়ে দেশের সর্বস্তরের মানুষ এতে শামিল হলো। চলল তিন দিনব্যাপী কারফিউ। ওদেরও মনে হয় টনক নড়ল। দেশের মানুষ অত্যাচারে অতিষ্ঠ। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ছাড়া অন্য কোনো শাসন তারা চায় না। এ অকাট্য সত্য কথাটি হয়তো ওরা অনুধাবন করতে পারছে। এ এক বছরে একাধারে ভয়াবহ ভূমিধস, প্রচণ্ড খরা, বন্যা, তীব্র গরম ও তীব্র শীত। তার ওপর সিডরের মহাদুর্যোগ। ভুক্তভোগীরা সবাই বলছে প্রকৃতির প্রতিশোধ!

১০ জানুয়ারি, ২০০৮-এ টিংকুকে ছাড়ার পর পুনরায় নাটকীয়ভাবে অ্যারেস্ট করে জেলে রাখা হলো। এবার টাকার চাপ আরও দ্বিগুণ। কিন্তু আমার পক্ষে সম্ভব নয়। শেষ পর্যন্ত ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ ও ছাড়া পেল। নতুন করে শুরু হলো মেজর জাকিরের অত্যাচার। দিন নেই রাত নেই আমার মোবাইলে ফোন করে টিংকুকে দেখা করতে বলে। টিংকু দেখা করে এলো।

ওর প্রচণ্ড মাথাব্যথা। বলল, ‘আমি আর পারছি না।’ ভিসা করা ছিল। পরদিন ওকে আমেরিকা পাঠিয়ে দিলাম। দীর্ঘদিন বিদেশ থাকার পর ও ফিরে এলো। পুরো শরীর চেকআপ করিয়েছে শুধু মাথা ছাড়া। ২০০৮-এর ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণরায়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হলো। দেশে দিনবদলের হাওয়া লেগেছে। দেশের সামনে ‘ভিশন ২০২১’। ডিজিটাল বাংলাদেশ হবে। সবকিছুর পরিবর্তন হবে। উন্নত থেকে উন্নততর হবে। ভালো থেকে ভালোতর হবে। কিন্তু ভালো যাছে না টিংকুর শরীরটা। ওর মন-মেজাজ, চিন্তা-চেতনা কোনো কিছুই আগের মতো নেই। কেমন একটু এলোমেলো। মাঝে মাঝে ভয় হয়, আবার ভাবী অত বড় একটা ধকল গেছে পরিবর্তন হওয়াটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু পরিবর্তনটা যে এত বেশি হয়ে গেছে ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি। টর্চার সেলে ওকে যে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে, ইলেকট্রিক শক দেওয়া হয়েছে তার ফলে ওর ব্রেইনের কোষ মিউটেশন হয়ে টিউমার, টিউমার থেকে ক্যান্সারে রূপ নিয়েছে। পরিণাম ওর এই অকালমৃত্যু। আমি এখন কার শাস্তি চাইব? কার কাছে চাইব? কী অপরাধ ছিল টিংকুর? কেন ওকে বাঁচতে দেওয়া হলো না?

সে সময় কতজনকে অন্যায়ভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। কারাবন্দী করা হয়েছে। পরিবার-সন্তানদের নাজেহাল, অপমান করা হয়েছে। নির্দোষ সন্তানদের দুর্নীতিবাজ বানিয়ে আদালতে নেওয়া হয়েছে। কেন এত বাড়াবাড়ি হলো? উত্তর এখনো জানি না। কত ব্যবসায়ীর কাছ থেকে জোর করে টাকা নেওয়া হলো, ফিরিয়ে দেওয়া হলো না। অপমান, অন্যায়ের জন্য কারও বিচার হলো না!

তবে বিএনপি-জামায়াত শাসনামলের সীমাহীন অন্যায়-অপরাধের পর ক্ষমতায় টিকে থাকার চতুরতা, প্রশাসনিক শক্তিকে ব্যবহার, মনের মতো ইয়াজউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার দিয়ে একতরফা ক্ষমতায় আসার পদক্ষেপ যে সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করে তাতেই ওয়ান-ইলেভেন আসে জনসমর্থনে। কিন্তু তাদের নির্বাচনের পথ পরিহার করে, জুলুম, নির্যাতন, রাজনৈতিক শক্তিকে ভেঙে নির্যাতন করার অপারেশনের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সাহসী নেতৃত্ব, প্রতিবাদ, বাধা উপেক্ষা করে দেশে ফিরে কারাবরণ, আপসহীন অবস্থানই তাদের পরাজিত করে গণতন্ত্রের বিজয় নিশ্চিত করে। ক্ষোভ ঘৃণায় বিদায় নিতে হয়। ব্যালটযুদ্ধে শেখ হাসিনাই আসেন ক্ষমতায়। দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীও সেই ভুল ধারা থেকে দেশকে গণতন্ত্রের ধারায় ফিরিয়ে আনতে রাখে ঐতিহাসিক ভূমিকা। নির্ভুল ভোটার তালিকায় করে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন।

বিএনপির ভ্রান্তনীতির কারণে আসা অভিশাপের মতো ওয়ান-ইলেভেন শেখ হাসিনার লড়াইয়েই বিদায় নেয় পরাজিত হয়ে, গণঅসন্তোষে। মাঝখানে কত রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী অপমানিত হন। অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

লেখক: খুজিস্তা নুর-ই নাহারীন মুন্নী, সম্পাদক, পূর্ব পশ্চিম ডটকম

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

Print Friendly, PDF & Email

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.