করোনা : চট্রগ্রামে ফিল্ড হসপিটাল ও একজন মানবিক চিকিৎসকের কথা

(Last Updated On: May 24, 2020)
মিলটন রহমানঃ করোনাভাইরাস পুরো বিশ্বকে প্রকৃতির মোছড় দেখাতে ব্যস্ত। প্রতিদিন মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। ইউরোপ আমেরিকার মতো পশ্চিমা শক্তির দেশগুলো বুঝতে পারছে প্রকৃতির কাছে সব শক্তিই নস্যি। চায়নার উহান শহর থেকে জিহ্বা উঁচিয়ে পুরো বিশ্ব চেটে-চুটে খাচ্ছে করোনা। ইউরোপের দেশ ইতালী, স্পেন, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানসহ সব ক‘টি দেশ এ দূর্যোগ সামাল দিতে হীমসীম খাচ্ছে। 

আমেরিকার অবস্থাতো আমরা দেখতেই পাচ্ছি। সেখানে আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়? এ প্রশ্নের উত্তর এক একজনের কাছে এক এক রকম। আমি নেরাশ্যবাদিদের দলে নই। আমি মনে করি এ পরিস্থিতিতেও আমাদের অবস্থান দৃঢ়। আমাদের একাত্তর বিজয়ের অভিজ্ঞতা খুব বেশি পুরনো নয়। সে সময়ের মানুষগুলো এখনো আমাদের শক্তির যোগান দিয়ে যাচ্ছেন। তাদেরই প্রনোদনায় পরবর্তী প্রজন্ম উঠে দাঁড়াচ্ছে। আমরা তাঁদের কাছ থেকে জেনেছি যুদ্ধে মনোবল হারাতে নেই। তাহলে একসময় জিতবোই।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এবারের যুদ্ধতো প্রকৃতির বিপক্ষে। এখানে একটু বলি ‘বিরুদ্ধে‘ আর ‘বিপক্ষে‘ শব্দ দু‘টোর অর্থ এ ক্ষেত্রে ভিন্ন। আমরা প্রকৃতির বিপক্ষে যুদ্ধে নেমেছি। এই যে করোনা ভাইরাস তাকে রুখে দেয়া বা প্রতিহত করার জন্য। প্রকৃতির যা কিছু মঙ্গলজনক তার বিরুদ্ধে নয়। মাত্র কয়েকদিনে করোন প্রতিরোধে বাংলাদেশের প্রস্তুতি কম নয়। মানুষ সচেতন হলেই সব উদ্যোগ ইতিবাচক ফলাফল এনে দেবে বলে আমার বিশ্বাস। দেখা যাচ্ছে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সংগঠন, ব্যক্তি মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে। এই যে দাঁড়ানো এরও একটি শৃঙ্খলা থাকতে হবে। তা না হলে সেবা সমবন্টন হবে না। ফলে সব সহায়তা একটি কেন্দ্র থেকে বিলি-বন্টন হলে তা ইতিবাচক হবে। এই যে সহযোগিতার মনোভাব বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে দেখা যাচ্ছে তার মধ্যে সবগুলো উদ্যোগই বিশেষ করে উল্লেখ করার দাবি রাখে। তবে তার মধ্যে চট্টগ্রামের একটি উদ্যোগ আমাকে আপ্লুত করেছে। সেখানে একটি ফিল্ড হাসপাতাল নির্মাণ হচ্ছে করোনভাইরাসে আক্রান্ত রোগিদের জন্য। আমি আরো সপ্তাহ তিনেক আগে ফেসবুকে ডাক্তার বিদ্যুৎ বড়ুয়ার ফেসবুকে এ বিষয়ে একটি স্ট্যাটাস দেখেছিলাম। সেটি দেখার পর আমি পুলকিত হয়েছিলাম। তবে কিছুটা শংকা ছিলো আদৌ সেটা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে কিনা। কারণ আমাদের রাজনৈতিক ও দাফতরিক জটিলতার জাল ছিন্ন করে কোন উদ্যোগ বাস্তবায়ন অনেক কঠিন। কিন্তু আমার সে শংকা টিকলো না। হঠাৎ সেই ডাক্তার বিদ্যুৎ বড়ুয়া ফেসবুকে জানান দিলেন, ফিল্ড হাসপাতালের কাজ শুরু হয়েছে। তিনি প্রতিনিয়ত আমাদের এ বিষয়ে আপডেট দিচ্ছেন। সকল মানুষের কাছে তিনি একশ টাকা করে সহায়তা চেয়েছেন। এ যাবত সংগৃহতি অর্থ তিনি ইতোমধ্যে ফিল্ড হাসপাতাল নির্মানের সাথে যুক্ত ইঞ্জিনিয়ারের হাতে তুলে দিয়েছেন। আরো দেখলাম তিনি ইতোমধ্যে চিকিৎসা সরঞ্জাম যোগাড় করতে শুরু করেছেন। কেউ কেউ এসব সরঞ্জাম সহায়তা হিসেবে দিচ্ছেন। ফেসবুকে চট্টগ্রাম ফিল্ড হাসপাতাল নামে একটি গ্রুপ খোলা হয়েছে। সেখানে এই হাসপাতাল কেনো তারও কিঞ্চিত বর্ণনা রয়েছে। সেখানে দেখলাম বলা হয়েছে-

ইঞ্জিনিয়ারের কাছে নির্মাণ কাজের চেক হস্তান্তর করছেন ডাক্তার  বিদ্যুৎ বড়ুয়া (ডানে)

‘বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারী দেখে ভীত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। সাধারণ ভাইরাসের লক্ষণের সাথে করোনা ভাইরাসের লক্ষণের অনেক মিল থাকলওে কিছু উপসর্গ মারাত্মক ভাবে মানুষের জন্য ক্ষতিকর। কন্তিু শুরু থেকে উপসর্গগুলোর চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হলে ৯৭ শতাংশ রোগী সুস্থ্য হয়ে যায়। সব জ্বর সর্দি কাশি হাঁচি কিন্তু করোনা নয়। সাধারণ মানুষকে ভরসা দেওয়ার জন্য এবং এইসব লক্ষণের যথাযথ চিকিৎসা দেওয়ার জন্য (শুধুমাত্র জ্বর সর্দি কাশি হাঁচি ) আপনাদের জন্য ফিল্ড হাসপাতাল চিন্তাধারা ও সূচনা। আগামীতে করোনার ভয়াবহতা যদি হয় ( মনে প্রাণে চাই না এমন হউক ) তখন এই ধরণরে ফিল্ড হাসপাতাল বা আইসোলেশন হাসপাতালের উপর আস্থা রাখা যাবে অনায়াসে। আপনার আমার সকলের জন্য এই হাসপাতালের ফ্রি চিকিৎসা উন্মুক্ত থাকবে। কারণ সকলের ক্ষুদ্র মানবকি অনুদানে তৈরী হবে আমাদের হাসপাতাল। সাথে থাকুন , পাশে থাকুন। আমি , আপনি ও আপনারা কি পারিনা এমন কিছু করতে আশে পাশে পরিচিত মানুষের জন্য ? হ্যা আমরা পারি , পারতেই হবে। এই টুকু প্রত্যয়ই যথষ্টে।‘

কথাগুলো পাঠের পর আমি নিশ্চিত এ হাসপাতাল তৈরী হবে। যেখানে সাধারন মানুষের সম্পৃক্ততা থাকবে তা বাস্তবায়ন হবেই। এ মুহুর্তে আমাদের জন্য এমন একটি হাসপাতাল জরুরী বললেই শেস হয় না বলতে পারি অত্যন্ত জরুরী। এ সংকটে আমরা ভিন্ন চেহারাও দেখতে পাচ্ছি। অনেক প্রাইভেট ক্লিনিক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অনেক চিকিৎসক চেম্বার বন্ধ করে ঘরে বসে আছেন। আবার অনেক চিকিৎসক হাসপাতালে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন(সরকারের উচিত এসব ক্লিনিকের লাইসেন্স বাতিল করে দেয়া। যেসব চিকিৎসক দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রয়েছেন তাদের সার্টিফিকেট বাতিল করা)।

হাসপাতালের বহির্বিভাগ

এমতাবস্থায় আরেকজন চিকিৎসক ডাক্তার বিদ্যুৎ বড়ুয়া অসম সাহসের সাথে মাঠে নেমেছেন। আমার জানামতে তিনি ডেনমার্কেও কোপেনহেগেনে থাকেন স্বপরিবারে। তিনিতো সেখানে নিরাপদেই থাকতে পারতের এ সংকটে নিজের জান বাজি রেখে মাঠে না নেমে। আমি সব সময় দেখেছি দেশের বাইরে যারা থাকেন তারা দেশের যে কোন সংকট কালে প্রচন্ড ব্যাথিত হন। ডাক্তার বিদ্যুৎ বড়ুয়া তাদেরই প্রতিনিধি। তিনি যে উদ্যোগ নিয়েছেন তা বাস্তবায়নে সরকার নিশ্চয় দাফতরিক সহায়তাগুলো করছে। যার ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে তিনি দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছেন। আর এ সংকটকালে হাসপাতালটি দ্রুত নির্মাণ অত্যাবশ্যক।  বিশেষ করে চট্টগ্রামের সকল স্তরের মানুষেদের উচিত এ প্রকল্প বাস্তবায়নে এগিয়ে আসা। এখানে কোন দল-গোষ্ঠি, রাজনীতি নয়। মানব কল্যাণে সব মানুষকে এক হয়ে কাজ করতে হবে। একজন বিদ্যুৎ বড়ুয়া এখানে মানবতার দূত হিসেবেই মাঠে নেমেছেন। কোন দল বা রাজনীতির হয়ে নয়।

ফলে আসুন তাঁকে আমরা সবাই সহায়তা করি। ব্রিটেন-আমেরিকার মতো দেশে সরকারী উদ্যোগে ফিল্ড হাসপাতাল হচ্ছে। আমাদেও দেশে ব্যক্তি উদ্যোগে হচ্ছে এ কাজ। আমরা আবারো প্রমাণ করলাম, আমরা কারো অপেক্ষায় থাকি না। যার যা কিছু আছে তা নিয়েই বিপদের মোকাবেলা করি। আজকে যে ফিল্ড হাসপাতাল চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সলিমপুরে হচ্ছে তা মানবতার ইতিহাস হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে সারা জীবন। আফতাব অটোমোবাইল এ হাসপাতাল নির্মাণে সহায়তা করে নিজেকে এই ইতিহাসের অংশই করলো। পঞ্চাশ থেকে ষাট বেডের এ হাসপাতাল এ সংকটকালে মানুষের জন্য ত্রাতার ভূমিকায় দাঁড়াবে এ কম কিসের।

করোনা পুরো বিশ্বে যে ধ্বংসযজ্ঞে নেমেছে তা একমাত্র ঠেকাতে পারে মানুষের সাহস এবং একাত্মতা। বাংলাদেশের মানুষকে এ মহামারী ঠেকাতে আরো সচেতন হতে হবে। মেনে চলতে হবে বিধি-নিষেধ।

লেখক: কবি, গবেষক, সাংবাদিক
milton.rahman07@gmail.com

Print Friendly, PDF & Email

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.