মানবপাচারকারী পীর রুমেলে, জিকুদের স্বপ্ন ধরাছোঁয়ার বাইরে

(Last Updated On: July 19, 2020)

মানবজমিন:  পড়াশুনা শেষ করে বিদেশে কাজ করার ইচ্ছা ছিল কাজী হোসনে জামান জিকুর। এর জন্য বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগও করেছেন। কিন্তু কোথাও ভালো কোনো সুযোগ সুবিধা পাচ্ছিলেন না। এরই মধ্যে একদিন কুমিল্লায় একটি হোটেলে জিকুর সঙ্গে পরিচয় হয় সালাউদ্দিন ভূঁইয়া রুমেল নামে এক লোকের। কিছুদিন পরে আবার জিকুর দেখা হয় রুমেলের সঙ্গে। একপর্যায়ে জিকু তার বিদেশ যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলে তাকে আলবেনিয়া নেয়ার ব্যাপারে আশ্বস্ত করে রুমেল। এ সময় রুমেল জানায়, প্রথম কয়েক মাস আলবেনিয়া থাকার পরে জিকুকে ইউরোপের অন্য দেশে যাওয়ার ব্যবস্থাও করে দেবেন তিনি। তবে আলবেনিয়া যাওয়ার জন্য ৮ লাখ বিশ হাজার টাকা দিতে হবে।

জিকু আলবেনিয়া যাওয়ার জন্য রাজি হলে দুইজনের মধ্যে বেশ কয়েকটি চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী আলবেনিয়া যাওয়ার পর জিকুর প্রথম তিন মাসে বেতন হওয়ার কথা ছিল প্রতি মাসে ৫০০ ইউরো। আর পরবর্তী মাস থেকে প্রতি মাসে আরো ২০০ ইউরো করে ইনক্রিমেন্ট অর্থাৎ চতুর্থ মাস থেকে ৭০০ ইউরো করে বেতন পাওয়ার কথা জিকুর। কিন্তু আলবেনিয়া যাওয়ার পর দেখা যায় ভিন্নচিত্র। বাংলাদেশে থাকতে যে চুক্তি করে আলবেনিয়ায় গিয়েছিলেন জিকু সেখানে গিয়ে দেখেন তার স্বাক্ষরিত চুক্তির সঙ্গে সেখানকার কোম্পানির চুক্তির কোনো মিল নেই। সেখানে উল্লেখ আছে প্রতি মাসে তিনি ৩০০ ইউরো করে বেতন পাবেন। তিন মাস পরে কোনো ইনক্রিমেন্ট হবে না। আবার প্রতি বছরে ওয়ার্ক পারমিটের জন্য তার খরচ হবে দেড় হাজার ইউরো যা বাংলাদেশি টাকায় ১ লাখ ৪০ হাজার। জিকু আলবেনিয়ায় গিয়ে কাজে যোগ দিয়েছেন সাত মাস হলো। এরই মধ্যে তিনি বেতন পেয়েছেন মাত্র ৩ মাসের। এই তিন মাসে পেয়েছেন ৮০০ ইউরো। এসব বিষয়ে রুমেলের সঙ্গে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করেও ব্যর্থ হয় জিকু।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে জিকু বলেন, রুমেল ভাই আমার কাছে নিজেকে একজন তাবলীগের লোক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তাকে দেখতেও অনেকটা ধার্মিক মনে হয়। তার কথায় বিশ্বাস করে আমি অনেকগুলো টাকা দিয়ে আলবেনিয়ায় এসেছি। কিন্তু এখানে এসে দেখলাম আমার সঙ্গে পুরো প্রতারণা করা হয়েছে। আমার সঙ্গে যে চুক্তি করা হয়েছে এটার সঙ্গে এখানকার কোম্পানির চুক্তির সঙ্গে কোনো মিল নেই। আজ চার মাস ধরে কোনো বেতন পাচ্ছি না। কোনো রকম খেয়ে না খেয়ে দিনাতিপাত করছি। আমি দেশে অনেক টাকা ঋণ করে এখানে এসেছি। এ পর্যন্ত ঋণ পরিশোধ করাতো দূরের কথা এখন পর্যন্ত এক টাকাও বাড়িতে পাঠাতে পারিনি। এভাবে চলতে থাকলে তো না খেয়ে মারা যাবো। এখানে আমাদের এই বিপদের কথা জানানোর জন্য রুমেলের সঙ্গে অনেকবার যোগাযোগ করেও ব্যর্থ হই। আমার মতো অনেক মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করেছে তারা।

জানা যায়, দীর্ঘ ১০ বছর ধরে মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন রুমেল। সে মূলত কাজ করছেন ইংল্যান্ডের নাগরিক কেনান ইব্রাহিম বকস নামের এক লোকের হয়ে। কেনান এক সময় বাংলাদেশে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। শিক্ষকতা করা অবস্থায় এক ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়। পরে তিনি ইংল্যান্ডে চলে যান। কেনান বাংলাদেশে থাকা অবস্থায় তার সঙ্গে পরিচয় হয় রুমেলের। এরপর থেকেই তারা মানবপাচারের কাজ করে আসছে। রুমেলসহ আরো কয়েকজনের রাজধানীর গুলশান এলাকায় ‘গুলশান এডুকেশন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান ছিল। গত কয়েক মাস ধরে এটা বন্ধ রয়েছে বলে জানা গেছে। এই প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যাওয়ার কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। এ ছাড়া ফেনীতে তাদের ‘ফেনী ট্র্যাভেলস’ নামে একটি ভিসা প্রসেসিং এজেন্সি রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানটিও গত কয়েক মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। রুমেলের স্ত্রীও এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রয়েছে বলে জানা গেছে। এসব বিষয়ে জানতে চেয়ে বেশ কয়েকবার রুমেলের মুঠোফোনে কল বা এসএমএস দেয়া হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।
জিকুর মতো এমনই প্রতারণার শিকার হয়েছেন কুমিল্লা সদর উপজেলার বারপাড়া এলাকার শফিক। চলতি বছরের ২৭শে জানুয়ারি একই ফ্লাইটে করে আলবেনিয়া যান জিকু ও সফিক। তার অবস্থাও একই। মুঠোফোনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে সফিক মানবজমিনকে জানান, রুমেলের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর সে একদিন আমার বাসায় যায়। পরে সে আমার পরিবারের সঙ্গে কথা বলে আমাকে আলবেনিয়া নেয়ার প্রস্তাব দেয়। এক পর্যায়ে আলবেনিয়া যাওয়ার জন্য তার সঙ্গে আমার একটা কন্ট্রাক হয়। রুমেল আমাকে বলেন, আলবেনিয়ায় যাওয়ার পর আমাকে তিন মাস ওই কোম্পানিতে প্রশিক্ষণ নিতে হবে। এই অবস্থায় থাকা-খাওয়া বাদে আমাকে ৫০ হাজার টাকা প্রতি মাসে বেতন দেয়া হবে। তার কথায় বিশ্বাস করে আলবেনিয়া যাওয়ার বিষয়ে কথা বলি। তিনি আমাকে বলেন- দুই মাসের মধ্যে সেখানে পাঠাবেন। কিন্তু ভিসা প্রসেস করতে চার মাস লেগে যায়। পরে আলবেনিয়া এসে দেখি তাদের কথা এবং আমার সঙ্গে যে চুক্তি করা হয়েছে এর কোনো মিল নেই। গত সাত মাসের মধ্যে আমি বেতন পেয়েছি তিন মাসের। আর প্রতিমাসে আমাকে বেতন দেয়া হয়েছে ১৬ হাজার টাকা করে। এই টাকা দিয়ে আমার খাওয়া এবং বাসা ভাড়া হয় না। খুব কষ্টে দিন পার করছি। এখন যে দেশে যাবো এটার কোনো সুযোগও পাচ্ছি না। আলবেনিয়ায় আসার পর আমি যখন রুমেলকে এখানে আমার দুরবস্থার কথা বলি তখন সে আমার সঙ্গে খুবই দুর্ব্যবহার করে। ইদানীং বিভিন্ন মানুষ দিয়ে আমার পরিবারকে বিভিন্নভাবে হুমকি দিচ্ছে। প্রতারক মানবপাচারকারী সালাউদ্দিন ভূঁইয়া রুমেল ওরফে পীর  রুবেলের বাড়ী কুমিল্লা শহরের রেইসকোর্স এলাকার নুর মসজিদ সড়কে ।

Print Friendly, PDF & Email

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.