ভ্যাক্সিন চিত্র (১) মুসলমানরা কোথাও নেই

(Last Updated On: August 6, 2020)

নাসির উদ্দিনঃ ২০১৯ সালে বিশ্বব্যাপী ভ্যাক্সিন বিক্রি হয়েছিল সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি ডলার। বাংলাদেশী টাকায় প্রায় পৌনে ৫ লক্ষ হাজার কোটি টাকা। মূলত ইনফ্লুয়েঞ্জা, সোয়াইন ফ্লু, হেপাটাইটিস ও ইবোলার মতো রোগের ক্ষেত্রেই এসব ভ্যাক্সিন ব্যবহৃত হয়েছে। ঔষধ মাফিয়াদের ধারণা কোভিড ১৯ ভ্যাক্সিন এর ১০ গুণ বেশি বিক্রি হবে।

এজন্য বিশ্বব্যাপী ১৬৫ টিরও বেশী প্রতিষ্ঠান কোভিড-১৯ এর টিকা তৈরির কাজ শুরু করেছে এরমধ্যে ২৭ টি প্রতিষ্ঠান ভ্যাকসিনের হিউম্যান ট্রায়াল পর্যন্ত পৌঁছেছে। জেনেটিক, ভাইরাস, প্রোটিন, তামাক ও পুনঃব্যবহার এই ৫ ধরনের সূত্র থেকে ভ্যাক্সিন তৈরী করছে এসব প্রতিষ্ঠান। এ তথ্য “নিউইয়র্ক টাইমস ভ্যাক্সিন ট্র‍্যাকার” এর। দুঃখের বিষয় হচ্ছে বিশ্বের মুসলিম কোনো দেশই এই তালিকায় নেই। দর্শনহীনতা, অশিক্ষায় নিমজ্জিত থাকা, জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চা এবং গবেষণায় অনাগ্রহী, অনীহা এবং অবৈজ্ঞানিক ধ্যান ধারণা পোষণের কারণে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে বিশ্বের মুসলিম সম্প্রদায়।

ভ্যাক্সিন তৈরী একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কাজ। এর প্রয়োগ পর্যন্ত পৌঁছাতে প্রয়োজন দীর্ঘ গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার। কোভিড ইমার্জেন্সিতে বিশ্বের বিজ্ঞানীরা এই দীর্ঘ প্রক্রিয়াকে কমিয়ে এনেছে প্রায় এক তৃতীয়াংশ সময়ে। গত ১১ জানুয়ারি চীনের সাংহাই ল্যাবের বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো নভেল করোনাভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সিং সম্পন্ন করেন। সেখান থেকেই জানা যায়, প্রচলিত SARS-CoV ভাইরাস যা SARS রোগের জন্য দায়ী ছিলো সেই ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সের সঙ্গে এই নতুন ভাইরাসের সিকোয়েন্সের শতকরা প্রায় ৮৯ ভাগ মিল রয়েছে। তার পরে নানা দেশে, নানা গবেষণাগারে এই ভাইরাসের বিভিন্ন স্ট্রেইনের জিনোম সিকোয়েন্সিং শুরু হয়।

এরপর গবেষণাগারে তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করে বিশ্বের এসব প্রতিষ্ঠান ভ্যাক্সিন তৈরীতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ২৭ প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে মানবদেহে সফল প্রয়োগ শেষে মাত্রা ও কার্যকারিতা পরীক্ষা এবং তুলনামূলক মূল্যায়ন শেষে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। দ্রুততম সময়ে এসব কাজ করতে বিজ্ঞানীরা চারটি ধাপকে একত্র করে সমন্বিত ধাপের মাধ্যমে এগিয়েছে।

ভ্যাক্সিন তৈরির ৫ সূত্র
ক. জেনেটিক ভ্যাকসিন।
১. ভাইরাসের এক বা একাধিক জিন ব্যবহার করে জেনেটিক বা জিন ভ্যাক্সিন তৈরী হয়। এই ভ্যাক্সিন তৈরীতে আমেরিকান মডার্না সর্বাগ্রে হিউম্যান ট্রায়াল সম্পন্ন করে গত ২৭ জুলাই শেষ ধাপের কাজ শুরু করেছে। ২০২১ এর শুরুতেই তাদের ভ্যাকসিনটির ডোজ তৈরি হয়ে যাবে বলে তারা আশাবাদী।

২. জার্মান কোম্পানি বায়োন্টেক, আমেরিকান কোম্পানি ফাইজার এবং চায়নিজ ওষুধ কোম্পানি ফোসুন-ফার্মা যৌথভাবে তাদের mRNA ভ্যাকসিন তৈরি করছে। জুলাইয়ে আমেরিকা ও জার্মানিতে এই ভ্যাকসিনের ২য় ধাপের ট্রায়ালের ফলাফল প্রকাশ করেছে। এই ভ্যাকসিনটি যাদের শরীরে প্রয়োগ করা হয়েছে তারা SARS-CoV-2 এর বিরুদ্ধে এন্টিবডি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। শুধু তাই নয়, এটি তাদের শরীরে T cells রেসপন্স বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রেখেছে।

৩. লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের গবেষকরা একটি “সেলফ-এমপ্লিফাইয়িং” RNA ভ্যাক্সিন তৈরি করেছেন। এটি মানবদেহের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আরও সক্রিয় করতে একটি ভাইরাল প্রোটিনের উৎপাদন বাড়িয়ে তোলে। তারা ১৫ জুন থেকে ট্রায়াল শুরু করেছেন।

৪. ভারতীয় ভ্যাক্সিন প্রস্তুতকারী কোম্পানি জাইডাস ক্যাডিলা, DNA ভিত্তিক একটি ভ্যাক্সিন তৈরি করছে। ভারত বায়োটেকের পর কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন তৈরির দৌড়ে ভারতের দ্বিতীয় সংস্থা হিসেবে গত ৩ জুলাই তারা তাদের তৈরি ভ্যাকসিনটির হিউম্যান ট্রায়ালের অনুমোদন পেয়েছে।

৫. জাপানি জৈবপ্রযুক্তি সংস্থা অ্যানজিস ঘোষণা করেছে যে তারা ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং টাকারা বায়ো, যৌথভাবে DNA ভিত্তিক একটি ভ্যাক্সিনের নিরাপত্তা পরীক্ষা শুরু করেছে।

৬. ক্যালিফোর্নিয়া ভিত্তিক সংস্থা আর্কটারাস থেরাপিউটিক্স এবং সিংগাপুরের ডিউক- NUS মেডিকেল স্কুল যৌথভাবে একটি M- RNA ভ্যাক্সিন তৈরি করেছে। গত ২১ জুলাই সিঙ্গাপুর সরকার মানুষের উপর ভ্যাক্সিনটি ট্রায়ালের অনুমোদন দিয়েছে।

৭. আমেরিকান সংস্থা ইনোভিও তাদের DNA ভিত্তিক ভ্যাক্সিন ট্রায়ালের অন্তর্বর্তীকালীন ডেটা পেয়ে গেছে বলে ঘোষণা করেছে। তারা পরবর্তী ধাপের পরীক্ষা শুরু করেছে।

৮. কিওরভ্যাক তার M-RNA ভ্যাক্সিনের ট্রায়াল শুরু করেছে গত জুনে। সংস্থাটির জার্মান কেন্দ্রটি বছরে কয়েক মিলিয়ন ভ্যাক্সিন তৈরিতে সক্ষম।

৯. কোরিয়ান সংস্থা “জেনেক্সিন” জুনে তাদের DNA ভিত্তিক ভ্যাকসিনের সুরক্ষা পরীক্ষা শুরু করেছে। তারা আগস্টে পরবর্তী ট্রায়ালে যাবে।

১০. চায়নিজ একাডেমি অফ মিলিটারি মেডিকেল সায়েন্সেস, সুজহো অ্যাবোজেন বায়োসায়েন্সেস এবং ওয়ালভ্যাক্স বায়োটেকনোলজির গবেষকরা তাদের “ARCoV” নামে একটি M-RNA ভিত্তিক ভ্যাক্সিনের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করেছে।

১১. ফ্রান্সের সানোফি, ট্রান্সলেশন বায়ো’র সাথে মিলে M-RNA ভ্যাক্সিন তৈরি করছে। গত ২৩জুন তারা ঘোষণা করেন যে আগস্টে তারা প্রথম ধাপের ট্রায়াল শুরুর পরিকল্পনা করছেন।

খ. ভাইরাল ভেক্টর ভ্যাকসিন।
করোনাভাইরাসের জিনগুলোকে কোষের ভেতর পৌঁছাতে অন্য একটি ভাইরাসকে বাহক হিসেবে ব্যবহার করে এবং মানবদেহে রোগপ্রতিরোধমূলক প্রতিক্রিয়ার উদ্দীপনা জাগায় ভাইরাল ভেক্টর ভ্যাকসিন। এ ধরনের ভ্যাক্সিনও তৈরী করছে কিছু প্রতিষ্ঠান।

১. ব্রিটিশ-সুইডিশ সংস্থা অ্যাস্ট্রাজেনেকা এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ChAdOx1 নামে শিম্পাঞ্জি অ্যাডেনোভাইরাস ভিত্তিক একটি ভ্যাক্সিন তৈরি করছে। এটি করোনভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরির পাশাপশি অন্যান্য ইমিউন রেসপন্স তৈরিতেও সক্ষম। ভ্যাক্সিনটি ইংল্যান্ডে ২য়-৩য় ট্রায়াল পর্যায়ে এবং ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকাতে তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা শুরু হয়েছে। এই ভ্যাক্সিন অক্টোবরের মধ্যে জরুরি সরবরাহ সম্ভব বলে ধারনা করা হচ্ছে। অ্যাস্ট্রাজেনেকা বলেছে তাদের মোট উৎপাদন ক্ষমতা দাঁড়াবে দুই বিলিয়ন ডোজ। ভ্যাক্সিনের সফলতায় আশাবাদী ব্রিটিশ সরকার এর ৯ কোটি ডোজ কেনার চুক্তিও সম্পন্ন করেছে।

২. চীনা সংস্থা ক্যানসিনো বায়োলজিকস দেশেটির একাডেমি অফ মিলিটারি মেডিকেল সায়েন্সেস এর জীববিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সাথে মিলে Ad5 নামে একটি অ্যাডেনোভাইরাস ভিত্তিক ভ্যাকসিন তৈরি করেছে। মে মাসে তারা প্রথম ধাপের সুরক্ষা পরীক্ষার আশাব্যঞ্জক ফল প্রকাশ করেছে। দ্বিতীয় ধাপের পরীক্ষায়ও ৯০ ভাগ রোগীর ক্ষেত্রেই ভ্যাকসিনটি শক্তিশালী ইমিউন রেসপন্স তৈরিতে করতে সক্ষম হয়েছে। চীনা সামরিক বাহিনী ২৫ জুন “বিশেষভাবে প্রয়োজনীয় ওষুধ” হিসেবে এক বছরের জন্য এই ভ্যাক্সিনটি অনুমোদন দিয়েছে।

৩. এক দশক আগে, যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনের ‘বেথ ইসরায়েল ডিকনস মেডিকেল সেন্টার’ এর গবেষকরা অ্যাডেনোভাইরাস-২৬ (Ad26) নামে একটি ভাইরাস থেকে ভ্যাকসিন তৈরির একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করে। জনসন অ্যান্ড জনসন্স ইবোলা প্রতিরোধের জন্য প্রায় একই ধরনের ভ্যাকসিন তৈরি করে যা ইতিমধ্যেই ইউরোপিয় কমিশনের অনুমোদন লাভ করেছে। তারা এখন করোনাভাইরাসের জন্যও ভ্যাকসিন তৈরি করেছে। ২০২১ সালের মধ্যে এক বিলিয়ন ডোজ উৎপাদনের আশা নিয়ে তারা জুলাই মাসে ১ম ও ২য় ধাপের পরীক্ষা শুরু করেছে। তারা আশাবাদী সেপ্টেম্বরের মধ্যেই তাদের ৩য় ধাপের পরীক্ষা শুরু করতে পারবে।
৪. রাশিয়ান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গামালিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউট জুনে, গ্যাম-কোভিড-ভ্যাক-লিয়ো নামে একটি ভ্যাক্সিনের ২য় ধাপের ট্রায়াল আগস্টের ৩ তারিখ শেষ করবে। এরপর ৩য় ধাপের ট্রায়ালের জন্য রাশিয়া ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশের সঙ্গে চুক্তি করেছে। গ্যামালিয়া এর ভ্যাকসিনটি দুইটি অ্যাডেনোভাইরাস, Ad5 এবং Ad26 এর সংমিশ্রণে তৈরি করা হয়েছে।

৪. যুক্তরাষ্ট্রের জিন থেরাপি সংক্রান্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠান জোলজেনসমা এর তৈরিকৃত অ্যাভেক্সিস নামক থেরাপির উপর ভিত্তি করে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন তৈরির প্রচেষ্টায় সংযুক্ত হয়েছে নোভারটিস। অ্যাডেনো- এসোসিয়েটেড ভাইরাস নামে একটি ভাইরাস কোরোনাভাইরাসের জিনের অংশ কোষে সরবরাহ করে। এই ভ্যাকসিনের জন্য ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতাল এবং ম্যাসাচুসেটস চোখ কান হাসপাতালে ১ম ধাপের পরীক্ষা শুরু করতে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

৫. আমেরিকান ফার্মাসিউটিক্যাল জায়ান্ট মার্ক মে মাসে ঘোষণা দিয়েছিল যে তারা ভেসিকুলার স্টোমাটাইটিস ভাইরাস ব্যবহার করে করোনা ভাইরাসের ভ্যাক্সিন তৈরি করবে। এর আগে একই পদ্ধতিতে তারা সফলভাবে ইবোলার একমাত্র অনুমোদিত ভ্যাক্সিন তৈরি করেছিল। সংস্থাটি আন্তর্জাতিক এইডস ভ্যাকসিন ইনিশিয়েটিভ (IAVI) এর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। এই ভ্যাকসিন তৈরির জন্য তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বায়োমেডিকেল আডভান্সড রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলাপমেন্ট অথরিটি থেকে ৩৮ মিলিয়ন ডলার অনুদান পেয়েছে।

৬. পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ভ্যাক্সিন রিসার্চ এবং থেমিসের যৌথ গবেষণায় হাম এর ভাইরাস ব্যবহার করে ভ্যাক্সিন তৈরির পদ্ধতিতে করোনাভাইরাসের ভ্যাক্সিন তৈরির চেষ্টা চলছে এই দুটি প্রতিষ্ঠান। মার্ক এই থেমিস কোম্পানিটিকেও কিনে নিচ্ছে।

৭. ভ্যাক্সার্টের সান ফ্রান্সিস্কোর ভ্যাক্সার্ট কোম্পানির ভ্যাক্সিনটি করোনভাইরাসের জিন বহন করতে ব্যবহার করছে একটি অ্যাডেনোভাইরাসযুক্ত ওরাল ট্যাবলেট। তারাও মার্কিন সরকারের অপারেশন ওয়ার্প স্পিড থেকে অনুদান লাভ করেছে এই ট্যাবলেট ভাইরাস তৈরির জন্য।

গ. প্রোটিন-ভিত্তিক ভ্যাক্সিন।
করোনাভাইরাসের নিজস্ব প্রোটিন বা নিজস্ব প্রোটিনের অংশবিশেষ ব্যবহার করে যে ভ্যাক্সিন ইমিউন রেসপন্স তৈরি হয় তাকেই বলা হয় প্রোটিন-ভিত্তিক ভ্যাক্সিন।

১. চীনা সংস্থা আনহুই ঝিফেই লংকম বায়োটেকনোলজি এবং চাইনা ইনস্টিটিউট অফ মাইক্রোবায়লজির গবেষণায় তৈরি ভাইরাস প্রোটিন ও একটি এডজুভ্যান্ট এর সমন্বয়ে গঠিত ভ্যাক্সিনের ২য় ধাপের ট্রায়াল শুরু করেছে। সংস্থাটি চংকিং ঝিফাই বায়োলজিক্যাল প্রডাক্ট নামে একটি কোম্পানির অংশ এবং চায়নিজ একাডেমি অব মেডিক্যাল সায়েন্সের সাথে মিলিতভাবে ভ্যাকসিন উৎপাদনের কাজ করছে।

২. মেরিল্যান্ডভিত্তিক নোভাভ্যাক্স অতি-আণুবীক্ষণিক কণার সাথে প্রোটিন যুক্ত করার একটি উপায় তৈরি করেছে। তারা এই প্রক্রিয়াটি ব্যবহার করে বিভিন্ন রোগের জন্য ইতিমধ্যে ভ্যাকসিন তৈরি করেছে। সংস্থাটি তাদের NVX‑CoV2373 নামক কোভিড-১৯ ভ্যাক্সিনের ১ম ও ২য় ধাপের সম্মিলিত ট্রায়াল করেছে। কোয়ালিশন ফর এপিডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস ইনোভেশনস, এই ভ্যাক্সিনটিতে ৩৮৪ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছ থেকেও ১.৬ বিলিয়ন ডলার অনুদান লাভ করেছে।

৩. ক্লোভার বায়োফর্মাসিউটিক্যালস করোনাভাইরাসের প্রোটিন সংবলিত একটি ভ্যাকসিন SCB-2019 তৈরি করেছে। এই ভ্যাকসিনটি ব্রিটিশ ঔষধ প্রস্তুতকারক কোম্পানি জিএসকে এবং আমেরিকান সংস্থা ডায়নাভ্যাক্স নির্মিত এডজুভ্যান্ট প্রোটিনের সাথে সংযোজিত করা হয়েছে। তারা ২০২০ এর মধ্যেই সম্মিলিত ধাপ-২/৩ এর পরীক্ষা শুরু করবে।

৪. সিগারেট প্রস্তুতকারক ফিলিপ মরিস এর মালিকানাধীন কানাডাভিত্তিক সংস্থা মেডিকাগো তামাক ব্যবহার করে উদ্ভিজ প্রোটিনের মাধ্যমে, করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন তৈরির চেষ্টা করছে। তাদের ১ম ধাপের পরীক্ষা শেষ পর্যায়ে রয়েছে। অক্টোবরে ২য় ও ৩য় ধাপের ট্রায়াল শুরুর পরিকল্পনা করছে।

৫. অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যাল ভ্যাকসিনটি পরিবর্তিত ভাইরাল প্রোটিন কোষে সরবরাহ করে শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। অস্ট্রেলিয়ান বায়োটেকনিক্যাল কোম্পানি সিএসএল এর তৈরি এডজুভ্যান্ট এর সাথে প্রোটিনগুলোর সংমিশ্রণে তৈরি ভ্যাক্সিনটির ১ম ধাপের ট্রায়াল শুরু হয়েছে।

৬. আরেক সিগারেট প্রস্তুতকারী কর্পোরেশন ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর একটি সহায়ক সংস্থা কেন্টাকি বায়োপ্রসেসিং আরেকটি তামাক উদ্ভিদজাত প্রোটিন থেকে ভ্যাকসিন KBP-V001 তৈরির কাজ শুরু করেছে। নিকোটিয়ানা বেন্থামিয়ানা নামক তামাকের একটি প্রজাতিকে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে পরিবর্তন করে ভাইরাল প্রোটিন তৈরি করে তারা ভ্যাকসিন তৈরি করতে চাচ্ছে। তারা নেব্রাস্কার মেরিডিয়ান ক্লিনিকাল রিসার্চ সংস্থার সহায়তায় ১ম ধাপের পরীক্ষা শুরু করেছে। সংস্থাটি ইবোলার জন্য ‘Zmapp’ নামে একটি ঔষধ তৈরি করতে আগে একই কৌশল ব্যবহার করেছিল।

৭. অস্ট্রেলিয়ান সংস্থা “ভ্যাকসাইন” জুলাইয়ে তাদের করোনভাইরাস ভ্যাকসিন COVAX-19 এর প্রথম ধাপের পরীক্ষা শুরু করেছে। তাদের ভ্যাকসিন ভাইরাল প্রোটিনগুলিকে একটি অ্যাডজুভেন্টের সাথে সংযুক্ত করে যা প্রতিরোধক কোষকে উদ্দীপিত করে।

৮. বেইলর কলেজ অব মেডিসিন এর গবেষকরা টেক্সাস চিলড্রেনস হাসপাতালের সাথে একত্রিত হয়ে ভ্যাক্সিন তৈরী করছে।

৯. পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় নির্মিত পিটকোভ্যাক ভ্যাক্সিনটি মূলত একটি স্কিন-প্যাচ যা কার্বোহাইড্রেডের তৈরি ৪০০ টি অতি ক্ষুদ্র সূঁচ দিয়ে তৈরি। ত্বকে লাগানো অবস্থায়, সূঁচগুলি দ্রবীভূত হয় এবং শরীরে ভাইরাস প্রোটিন সরবরাহ করে।

১০. এম-আরএনএ ভ্যাকসিন ছাড়াও, ফার্মাসিউটিক্যাল জায়ান্ট সানোফি ভাইরাল প্রোটিনের উপর ভিত্তি করে একটি ভ্যাকসিন তৈরি করছে। পোকার কোষে পাওয়া যায় এমন একটি ভাইরাসকে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে পরিবর্তন করে তারা করোনাভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনের একই বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন প্রোটিন উৎপাদন করছে। জিএসকে এই প্রোটিনগুলোর জন্য এডজুভ্যান্ট সরবরাহ করবে।

ঘ. দুর্বল পূর্ণ-ভাইরাস ভ্যাকসিন।
কোন ভাইরাসকে দুর্বল বা নিষ্ক্রিয় করার পর সেটিকে ভ্যাক্সিন হিসেবে ব্যবহার করে ইমিউন রেসপন্স তৈরি করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় সরাসরি ভাইরাসকে ব্যবহার না করে, ভাইরাসের দুর্বল একটি ফর্ম ব্যবহার করা হয়।

১. রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন চীনা সংস্থা সিনোফর্ম গবেষণার মাধ্যমে দেখেছে নিষ্ক্রিয় ভাইরাসের তৈরি একটি ভ্যাকসিন নিরাপদভাবে প্রতিরোধে প্রতিক্রিয়া শুরু করতে পারছে। প্রথম দুটি ধদপেই শতভাগ ক্ষেত্রেই ইমিউনো রেস্পন্স পাওয়া গিয়েছে। এরপর জুলাইয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে তারা তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল শুরু করে। আবু ধাবির স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রথম স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নিজে এই ভ্যাকসিন ইনজেকশন নেন। সিনোফার্মের এই ভ্যাক্সিনটি জনগণের জন্য উন্মুক্ত প্রথম কার্যকরী ভ্যাক্সিন হতে পারে।

২. বেসরকারী চীনা সংস্থা সিনোভাক বায়োটেক করোনোভ্যাক নামে একটি নিষ্ক্রিয় ভ্যাকসিনের পরীক্ষা চালাচ্ছে। সংস্থাটি ১ম ও ২য় ধাপের ট্রায়াল ভাগ ক্ষেত্রেই সফল হয়েছে। পরবর্তীতে জুলাই মাসে সংস্থাটি ব্রাজিলে তৃতীয় পর্যায়ের একটি ট্রায়াল শুরু করে। এই ভ্যাকসিনের তৃতীয় পর্যায়ের একটি ট্রায়াল বাংলাদশে ৪২০০ স্বাস্থ্যকর্মীর উপরে সম্পন্ন হতে যাচ্ছে।

৩. পোলিও এবং হেপাটাইটিস-এ এর ভ্যাকসিন উদ্ভাবনকারী ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল বায়োলজি এট দ্যা চাইনিজ একাডেমি অব মেডিকাল সায়েন্সেসের গবেষকগণ জুন মাসে একটি নিষ্ক্রিয় ভাইরাস ভ্যাক্সিনের ২য় ধাপের ট্রায়াল শুরু করেছে।

৪. ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিকেল রিসার্চ এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজির যৌথ সহযোগিতায়, ভারতীয় সংস্থা ভারত বায়োটেক নিষ্ক্রিয় করোনভাইরাসের উপর ভিত্তি করে কোভাক্সিন নামে একটি ভ্যাকসিন তৈরি করেছে। এর প্রথম ধাপের কাজ শেষ হয়েছে। নরেন্দ্র মোদি এই ভ্যাক্সিনটি ১৫ আগস্টের মধ্যে প্রস্তুত হবে বলে ঘোষণা দিতে চেয়েছিলেন। যদিও সংস্থাটির সিইও সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন এটি ২০২১ সালের আগে হয়তো জনগণের কাছে পৌঁছানো যাবে না।

৫. উত্তর কোরিয়ার স্টেট কমিশন অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের ওয়েবসাইটে ঘোষণা করেছে যে তারা করোনভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনের উপর ভিত্তি করে তৈরি একটি ভ্যাক্সিনের ক্লিনিকাল ট্রায়াল শুরু করতে যাচ্ছে।

ঙ. রিপারপাসড ভ্যাকসিন।
যে ভ্যাক্সিন অন্যান্য রোগের প্রতিষেধক হিসেবে ইতিমধ্যে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, সেটি যখন নতুন কোন রোগের প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহার করা হয় তখন সেটিকে রিপারপাসড ভ্যাক্সিন বলে।

১. যক্ষ্মার বিরুদ্ধে সুরক্ষা হিসেবে ১৯০০ সালের গোড়ার দিকে ব্যাসিলাস ক্যালমেট-গেরিন (বিসিজি) ভ্যাকসিনটি তৈরি করা হয়। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় ১৯৭৯ সাল থেকে বাংলাদেশে ১ বছরের কম বয়সী শিশুদের এই বিসিজি ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে। সেই একই ভ্যাকসিন করোনভাইরাস প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে কিনা তা দেখার জন্য অস্ট্রেলিয়ার মারডোক চিলড্রেন রিসার্চ ইনস্টিটিউট প্রায় ১০ হাজার মানুষের উপরে ৩য় ধাপের পরীক্ষা চালিয়েছে।

এটিই হচ্ছে বিশ্বব্যাপী ভ্যাক্সিন তৈরির সর্বশেষ চিত্র। ফলে আগামী এক-দুই মাস বা ২০২০ সালের মধ্যেই ভ্যাক্সিন পেয়ে যাবার অবস্থা এখনো দৃশ্যমান হয়নি। তবে আশার কথা হচ্ছে বেশ কিছু ভ্যাক্সিন সফলভাবেই তৃতীয় ধাপে পৌঁছে গিয়েছে। (চলবে)।

নাসির উদ্দিন, সাবেক সাধারন সম্পাদক , কুমিল্লা প্রেসক্লাব ।

Print Friendly, PDF & Email

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.