ভ্যাক্সিন – ২. মুসলমান পথহারা

(Last Updated On: August 13, 2020)

নাসির উদ্দিনঃ প্রয়াত উর্দু কবি আল্লামা আকবর এলাহাবাদী তার একটি কবিতায় ইসলামকে ‘এক কিসসায়ে মাযী’ মানে ‘অতীত রূপকথার গল্প’ বলে উল্লেখ করেছেন। ইউরোপীয় এক নারীকে প্রেম নিবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হন তিনি। কারণ ঐ নারীর চোখে মুসলমানরা জিহাদি। এলাহাবাদী ঐ নারীকে রাজি করাতে গিয়ে বললেন, ‘আমাদের মাঝে পূর্বসূরি বীর খালিদের ঐতিহ্য অবশিষ্ট নেই, এখন শুধু আছে হাদীসের কাব্যিক অভিব্যক্তি! এখানে সেই তাকবীর ধ্বনী নেই, নেই সিপাহীর সেই ক্ষিপ্রতা। সকলে এমনিতেই শুধু সুবহানাল্লাহ বলে। আমার ইসলামকে তুমি কেবল অতীত রূপকথার একটি উপাখ্যান মনে করতে পার।’

এই লেখায় আকবর এলাহাবাদী মুসলিম সম্প্রদায়ের পশ্চাদপদতা ও অধঃপতনের চিত্র তুলে ধরেছেন। কবি আল্লামা ইকবাল বর্তমান মুসলমানদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘নির্বাপিত প্রেমের আগুন অন্ধকার, উত্তাপহীন। মুসলমান নয়, যেন স্তূপিকৃত ছাইভস্ম।’ তিনি বলেন, ‘মুসলমান জাগতিক ভোগ-বিলাসের মোহে, তার স্বীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের উত্তরাধিকার খুইয়ে ফেলেছে। এজন্য মুসলমান এখন হয়েছে হতভাগ্য ভবঘুরে জাতি।’

৩৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মেসোপটেমিয়ায় (ইরাক) সুমেরিয়দের হাত ধরে মধ্যপ্রাচ্যে সভ্যতার শুরু হয়েছিল। সে সময় প্রায় পুরো মধ্যপ্রাচ্য শাসন করছিল আসিরীয়রা। পৃথিবীতে সর্বপ্রথম লিখিত ভাষার প্রচলন করে এই সুমেরিয়ানরাই। খ্রিস্টপূর্ব ছয় শতকের শুরুর দিকে এই বিশাল অঞ্চল পারস্য সাম্রাজ্যের অধীনে চলে যায়। এরপর থেকে দ্রুত ক্ষমতার হাতবদল হতে থাকে। আলেকজান্ডারের ম্যাসিডনীয় সাম্রাজ্যের পর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চল রোমান, পার্থিয়ান ও সাসানীয়দের অধীন ছিল। ম্যাসিডনীয়রাই সর্বপ্রথম গ্রিক ভাষা ও সংস্কৃতি এ অঞ্চলে প্রতিষ্ঠা করেছিল। এরপর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে শুরু হয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা।

রোমান বা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সময়ে এ অঞ্চলে খ্রিস্টান ধর্ম ছড়িয়ে পড়ে। রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের সময়ে আলেক্সান্দ্রিয়া, ইরানের মতো অঞ্চল খ্রিস্টান পান্ডিত্যের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। সপ্তম খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্য খ্রিস্টানদের অধীনে ছিল।

সপ্তম খ্রীস্টাব্দ থেকে মুসলিমরা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন শক্তি হিসেবে বাইজেন্টাইন রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্য দখল শুরু করে। মুসলিম ভাবাদর্শে বিশ্বাসী খলিফাদের নেতৃত্বে দক্ষ সেনাবাহিনী গড়ে ওঠে। পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও ভূমধ্যসাগরীয় এলাকার অধিকাংশ আরব সাম্রাজ্যের অধীনে আসে। এরপর প্রায় ৪০০ বছরে ইসলামের ইতিহাস ব্যাপক প্রসারিত হয়। এই সময়কালেই মুসলমানরা শিক্ষাদীক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা এবং জ্ঞান বিজ্ঞানের শিখরে আরোহন করে।

ডঃ মরিস বুকাইলী তার কোরআন বাইবেল এবং বিজ্ঞান বইয়ে উল্লেখ করেন, ‘অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীতে ইসলাম জ্ঞান-বিজ্ঞানকে অনেক ঊর্ধ্বে তুলে ধরে। যখন খ্রিষ্টীয় জগতে বৈজ্ঞানিক উন্নয়নের ওপর নিষেধাজ্ঞা চলছিল তখন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে বহুসংখ্যক গবেষণা ও আবিষ্কার সাধিত হয়। কর্ডোভার রাজকীয় পাঠাগারে ৪ লাখ বই ছিল। ইবনে রুশদ তখন সেখানে গ্রীক, ভারতীয় ও পারস্য দেশীয় বিজ্ঞানে পাঠদান করতেন। যার কারণে সারা ইউরোপ থেকে পণ্ডিতরা কর্ডোভায় পড়তে যেতেন।

‘ইসলাম ও আরবি সভ্যতার ইতিহাস’ বইয়ে ওস্তাভলি বোঁ লিখেছেন, ‘ইউরোপে যখন বই ও পাঠাগারের কোন অস্তিত্ব ছিল না, অনেক মুসলিম দেশে তখন প্রচুর বই ও পাঠাগার ছিল। সত্যিকার অর্থে বাগদাদের ‘বায়তুল হিকমাহ’য় ৪০ লক্ষ, কায়রোর সুলতানের পাঠাগারে ১০ লক্ষ, সিরিয়ার ত্রিপোলী পাঠাগারে ৩০ লক্ষ বই ছিল। অপরদিকে মুসলমানদের সময়ে কেবল স্পেনেই প্রতিবছর ৭০ থেকে ৮০ হাজার বই প্রকাশিত হতো। কিন্তু বর্তমানে মুসলিম দেশগুলোতে বইয়ের কদর নেই, বই প্রকাশের বিষয়ে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা অপ্রতুল। ইউরোপের ক্ষুদ্র দেশ গ্রিসে বছরে ৫০০টির মতো বই অনুবাদ হয়। অথচ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে এই পরিমাণ বই মুদ্রণ হয় না।

কর্ডোভা ছাড়াও সে সময়ে মুসলমানদের তৈরি অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হচ্ছে- গ্রানাডা, টলেডো, মার্সিয়া, আলমেরিয়া, সেভিল, ভ্যালন্সিয়া কাদজে বিশ্ববিদ্যালয়। এইগুলো থেকেই আজকের ইউরোপ আমেরিকার বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্ম। ঐসব বিশ্ববিদ্যালয়ে স্পেন, ফ্রান্স, ইটালি ও জার্মানির জ্ঞান বিজ্ঞানের সাধকগণ ছুটে যেতেন।

বিজ্ঞানকে জ্যোতির্ময় করেছেন, পাশাপাশি বর্তমান বৈজ্ঞানিক বিপ্লবেও ভিত্তি রচনা করেছেন, মধ্যযুগের এমন একশো বিজ্ঞানীর একটি তালিকা করেছেন ইউরোপের একদল ঐতিহাসিক। সেই তালিকার একশো বিশ বৈজ্ঞানিকের নামের মধ্যে একশো পাঁচজনই ইসলামী জগতের সাথে সম্পৃক্ত ছিল। এরা প্রায় সবাই মুসলিম স্পেনের (কর্ডোভা গ্রানাডা) ইউনিভার্সিটিতে বিজ্ঞানের উপর লেখাপড়া করেছিলেন। মোটকথা মধ্যযুগে প্রায় নব্বই শতাংশ বৈজ্ঞানিকের সম্পর্ক মুসলিম জাহানের সাথে ছিল। বিজ্ঞানের আবিষ্কার এবং বিজ্ঞানভিত্তিক রচনাবলীর সাথেও তাদের সম্পৃক্ততা ছিল।

দ্বাদশ শতাব্দীতে মধ্য এশিয়ার তুর্কিরা বর্তমান ইরান, ইরাক, সিরিয়া, ফিলিস্তিন দখল করলে মুসলিমদের কর্তৃত্ব শেষ হয়ে যায়। তখন থেকেই হারিয়ে যায় মুসলমানদের বিকাশের পথ। এ সময় ইউরোপীয়রাও মধ্যপ্রাচ্য দখলে নামে। তবে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে তুর্কি ও অন্যান্য শক্তিকে হটিয়ে উসমানীয় সাম্রাজ্য ক্ষমতা দখল করে এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত এ বিস্তর অঞ্চল শাসন করে। উসমানীয় শাসনামলে রাজ্য শাসন ব্যতীত শিক্ষা এবং জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চায় তাদের ভূমিকা ছিলো না। ফলে মেসোপোটেমিয়া সভ্যতা থেকে শুরু হওয়া সংস্কৃতি সভ্যতা ও জ্ঞান বিজ্ঞানের পথ চলা পুরোপুরি হারিয়ে যায়। সপ্তদশ শতাব্দীতে ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের পর থেকে ইউরোপীয়রা মধ্যপ্রাচ্যে একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে।

১৯০৮ সালে ইরানে এবং পরে সৌদি আরব, লিবিয়া ও আরব বিশ্বের অন্য দেশগুলোতে তেলের খনি আবিষ্কৃত হয়। মধ্যপ্রাচ্য পরিণত হয় অশোধিত তেলের বৃহত্তম মজুদকেন্দ্র এবং ইউরোপ আমেরিকার দখলদারত্বের কেন্দ্রে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর উসমানিয়া খেলাফতের পতন ঘটে এবং ইরান, তুরস্ক, সৌদি আরবের মতো দেশগুলো স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে চলতে শুরু করে। কিন্তু স্বাধীনতাপ্রাপ্ত এই দেশগুলোর রাজা বাদশাহগণ অসির শক্তির উপরই তাদের কতৃত্ব ধরে রাখতে সচেষ্ট ছিলেন। এজন্য দেশে শুধুমাত্র ধর্মীয় শিক্ষা ব্যতীত, রাজনীতি, দর্শন, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চার সকল পথ শুরু থেকেই বন্ধ করে রাখে। ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়েই তেলের অর্থে সৃষ্টি হয় অশিক্ষিত বিত্তবান শ্রেনী। যে ধারা অদ্যাবধি চলছে।

বিশ্বব্যাপী জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চা সম্পর্কিত যুক্তরাষ্ট্রের একটি সংস্থার ২০১৮ সালের এক জরিপ বলছে, ইউরোপের সবচাইতে ক্ষুদ্রতম দেশ নরওয়েতে বৈজ্ঞানিক, ইঞ্জিনিয়ার এবং ডাক্তারদের সংখ্যা গোটা মুসলিম জাহানের মোট সংখ্যার চেয়েও বেশি। অথচ এ সংখ্যা জাপানের মোট সাইন্টিস্টদের অর্ধেকের চেয়েও কম ছিল। একই সময়ে পৃথিবীব্যাপী বিজ্ঞানের উপর যে সকল রচনাবলী বিভিন্ন প্রচারপত্রের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল, এর মধ্যে মুসলিম দেশগুলো থেকে প্রকাশিত রচনাবলীর সংখ্যা এক শতাংশেরও কম।
অথচ মধ্যযুগে বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ। সে সময় বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান ছিল প্রায় নব্বই শতাংশ। পক্ষান্তরে একবিংশ শতাব্দীতে যখন গোটা পৃথিবীতে মুসলমানদের সংখ্যা প্রায় ২৫ শতাংশ, তখন বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তাদের অবদান এক শতাংশেরও কম। তাই হয়তো কবি বলেছেন “ইসলাম আজ অতীত রূপকথার কাহিনী।” (চলবে)

নাসির উদ্দিন, সাবেক সাধারন সম্পাদক , কুমিল্লা প্রেসক্লাব ।

Print Friendly, PDF & Email

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.