নগ্ন ভারত (১)

(Last Updated On: August 6, 2020)

নাসির উদ্দিনঃ ভারতের এই পতনে আমি ব্যথিত। শুধুমাত্র ক্ষমতামূখী নষ্ট রাজনীতি একটা জনপদকে কিভাবে ধ্বংসের পথে নিয়ে যায়, সেটিই করে দেখালো বিজেপি। বিশ্বের বৃহত্তম গনতান্ত্রিক দেশের তকমাটি এখন দুর্গন্ধযুক্ত লাশ। গায়ে গনতন্ত্রের জামা। অথচ ধর্ম হচ্ছে তার হৃদয়ের মন্ত্র। কি অদ্ভুত অসভ্যতা। ভারতবর্ষ, মধ্যপ্রাচ্যসহ এশিয়ার অধিকাংশ দেশ এবং আফ্রিকাও ভুগছে এই দর্শনহীন রোগে। আদর্শহীনতা এসব অঞ্চলের রাজনীতিকে ঘুরেফিরে ধর্মাশ্রয়ী করে তোলে। বিশ্বের অর্ধেক জন অধ্যুষিত এসব অঞ্চলের দর্শনহীনতা থামাতে হলে রেনেসাঁর কোনো বিকল্প নেই।

যেভাবে চতুর্দশ থেকে ষোড়শ শতাব্দীতে রেনেসাঁ বা নবজাগরণ ঘটিয়েছিল ইউরোপ। যা বিদ্যমান ধর্ম এবং যাবতীয় অন্ধ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পথচলা শিখিয়েছিল ইউরোপকে। রেনেসাঁর উদ্ভবে পুনরুজ্জীবিত হয়েছিল বিস্মৃত প্রাচীন গ্রীক ও রোমান সাহিত্য, দর্শন, শিল্পকলা এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা। ধর্মের শাসন থেকে তারা রাষ্ট্র ও রাজনীতিকে মুক্ত করেছিল বলেই ইউরোপ বা পাশ্চাত্য সভ্যতা আজ পৃথিবীজুড়ে একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। এই রেনেসাঁ না করলে ইউরোপসহ পুরো বিশ্বই এখনও মধ্যযুগের অন্ধকারেই পড়ে থাকত। কারণ ইউরোপ ছাড়া আর কোনো অঞ্চল ধর্মের আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি।

১০৯৬ সালে ইউরোপের খ্রীষ্টান সম্প্রদায় তাদের ধর্মগুরু পোপের আহ্বানে প্রথম ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধে নেমেছিল। উদ্দেশ্য যীশুখ্রীষ্টের জন্মভূমি ও তীর্থস্থান জেরুজালেম ও প্যালেস্টাইনকে মুসলমানদের হাত থেকে পুনরুদ্ধার করা। এরপর থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত কয়েকটি ক্রুসেড পরিচালিত হয়। খ্রীষ্টানরা প্যালেস্টাইন এবং জেরুজালেম দখল করলেও শেষ পর্যন্ত তা ধরে রাখতে পারে নি। প্যালেস্টাইনে শেষ খ্রীষ্টান দুর্গের পতন ঘটে ১২৯১ খ্রীষ্টাব্দে। এই পরাজয়েই শেষ হয় খ্রিষ্টানদের ক্রুসেড। ইউরোপেও পরলোকমুখী ধর্মের বিপরীতে জীবন ও বাস্তুবমুখী যুক্তি ও জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার পুনরুজ্জীবন হয়েছিল ধর্মীয় শক্তির এই ক্ষয় ও ব্যর্থতার ফলে। ইউরোপীয়দের এই জীবনমূখী চিন্তার ফলেই বিশ্ব আজ জ্ঞান বিজ্ঞান ও সভ্যতার আলোয় আলোকিত।

ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ইউরোপ ধর্মকে কবর দিয়ে গড়ে তুলেছিলো নতুন সভ্যতা। নরেন্দ্র দামোদর মোদি গতকাল (৫ জুলাই ২০) মঙ্গলবার সেই কবরে ভূমি পূজার মধ্য দিয়ে মৃত্যুবাদী সভ্যতার সেই অচল বীজ পুনঃরোপন করলেন। এর মধ্য দিয়েই অপমৃত্যু ঘটলো গনতান্ত্রিক ভারতের।

ভূমি পূজার পর মোদি বলেছেন ‘এত বছর ভগবান রাম তাঁবুর নিচে বসবাস করেছেন। এবার তাঁর স্থান হবে ভব্য মন্দিরে। বৈচিত্র্যময় ভারতকে এক সূত্রে গেঁথেছেন রামচন্দ্র। বিবিধের মাঝে তিনিই মিলনের প্রতীক। দেশের মতো বিদেশেও আজ তাই রামের নামে জয়ধ্বনি শোনা যায়।’ রাম মন্দির নির্মাণ এবং এ নিয়ে মোদির ভাষণ যে শুধুমাত্র রাজনৈতিক তার প্রমাণও তিনি রেখে গেছেন।

রাম মন্দির প্রতিষ্ঠা আন্দোলনের সূচনাকারী ছিলেন লালকৃষ্ণ আদভানি। তাঁর আন্দোলনে ভর করেই বিজেপি লোকসভায় ২টি থেকে ৮৯ আসন এবং পরে কেন্দ্রে ক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হয়েছিল। আন্দোলনে আদভানির সহযোগী ছিলেন মুরলী মনোহর যোশি। অথচ রাম মন্দির নির্মাণের ভূমি পূজায় তাঁরা আমন্ত্রিতই ছিলেন না। কারণ নেতৃত্বের কোন্দল। ফলে ধর্ম শুধু ক্ষমতার রাজনীতিতে নয় দলীয় নেতৃত্বের কোন্দলেও মোক্ষম অস্ত্র। ধর্ম বা রাম যদি বিবিধের মাঝে মিলনের প্রতীক হবেন তাহলে সেই মিলনে যোশী আদভানী নেই কেন? আর মোদি যাকে মিলনের প্রতীক বললেন সেটাই তো বিভেদের মহা অস্ত্র। কারণ ধর্ম দিয়ে মানুষকে একসূত্রে গাঁথা যায়না। ধর্মই ভারতে দলিতমথিতের যে অস্পৃশ্য জাতপাত সৃষ্টি করেছে, রামের সাথে তার দুরত্ব যোজন যোজন। আর এই ধর্মীয় শাসনের নিগড়ে অন্য ধর্ম ও সভ্যতার সাথে ভারতের সাংস্কৃতিক মিলনের আর সুযোগই থাকলো না। যেমনটি মধ্যপ্রাচ্যের ধর্মীয় সংস্কৃতি ও সভ্যতার বেলায় ঘটেছে। (চলবে)

নাসির উদ্দিন, সাবেক সাধারন সম্পাদক , কুমিল্লা প্রেসক্লাব ।

Print Friendly, PDF & Email

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.