ভ্যাক্সিন -৩, মুসলিম বিশ্ব

(Last Updated On: August 8, 2020)

নাসির উদ্দিনঃ  মধ্যযুগে ধর্মীয় বিধিনিষেধের কারণে ইউরোপে পড়াশোনা এবং জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চা নিষিদ্ধ ছিলো। জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতির জন্য ইউরোপকে ভরসা করতে হতো স্পেনের ইসলামী ইউনিভার্সিটিগুলোর ওপর। বর্তমানে গোটা মুসলিম বিশ্বকে উল্টো উচ্চশিক্ষা কিংবা জ্ঞান-বিজ্ঞানের যে কোনো শাখায় কাজ করতে ইউরোপ-আমেরিকায় যেতে হচ্ছে। এমন কি ইসলাম এবং ইসলামী ইতিহাসের উপর গবেষণাও এখন ইউরোপ-আমেরিকার ইউনিভার্সিটিগুলোতেই হচ্ছে। আর মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা সেখানে অংশগ্রহণ করাকেই গৌরবের বলে মনে করে থাকেন। মুসলমানরা ধ্বংস করেনি এমনসব প্রাচীন ইসলামী পাঠ সামগ্রীর সিংহভাগ সংরক্ষিত আছে বিধর্মীদের এসব ইউনিভার্সিটিতে। বাগদাদের প্রায় দু’শ লাইব্রেরির জ্যোতির্বিদ্যা, ফিজিক্স, কেমিস্ট্র্রি, গণিতশাস্ত্র, চিকিৎসা বিজ্ঞানসহ বহু বিষয়ের প্রাচীন বই এবং ইবনে হিশাম এবং জাবির ইবনে হাইয়্যানের রচনাবলীও তাদের সংগ্রহে রয়েছে। অথচ এসব বই মুসলিম বিশ্বের কোনো দেশেই নেই।

ইউরোপীয় ঐতিহাসিকগণ গবেষণা করে বলেছেন, অষ্টাদশ শতাব্দীতে মুসলমানদের পতন এত তীব্র ছিল যে, বিশ্বের নতুন নতুন আবিষ্কার সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাই ছিল না। আর চর্চা এবং শিক্ষাহীনতার কারণে পুরাতন বৈজ্ঞানিক সফলতাগুলো সম্পর্কেও তাদের কোনো জ্ঞান ছিল না। এ ব্যাপারে মুসলিম বিশ্বের প্রখ্যাত মনীষী মাওলানা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী বলেন, “ইতিহাসের বিস্ময়কর ঘটনা হলো, বিজ্ঞানের ব্যাপক খেদমত আঞ্জাম দেয়ার পর মুসলমান স্বীয় গবেষণালব্ধ বিষয় এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের ব্যবহারকে বিস্মৃত করে ফেলেছে। এটা হয়েছে কেবল অনুসরণ এবং অতীত বর্ণনা নীতিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ার কারণে। ফলশ্রুতিতে তারা বিজ্ঞান এবং এর আবিষ্কারের ময়দানে সম্পূর্ণ হারিয়ে যায় এবং পশ্চিমাদের থেকে বহুদূর পিছিয়ে পড়ে।”

খ্রিষ্টান পোপদের সময়ে আধুনিক শিক্ষা কেন্দ্রগুলোকে শিক্ষালয় না বলে জল্লাদখানা বলা হতো। রোমান সাম্রাজ্যের পতনের সময় খ্রিষ্টধর্মানুসারী ইউরোপীয়রা প্রার্থিব জগতের চিন্তা বাদ দিয়ে কেবল আধ্যাত্মিক উন্নতির চিন্তা করতো। প্রার্থিব বিষয়ে জ্ঞানচর্চাকে খ্রিস্টানরা এতটা ঘৃণার চোখে দেখতো যে, উকলিদাস, আফলাতুন এবং জালিয়ানুছের রচনাবলীও নিষিদ্ধ করেছিল। এ কারণে রোমানরা পঞ্চম শতাব্দীতে ইস্কান্দারিয়ার বিখ্যাত লাইব্রেরিও আগুনে জ্বালিয়ে দিয়েছিল।

অথচ মুসলমানরা ৬৪২ খ্রিস্টাব্দে মিসর জয়ের পর পুরাতন রোমান এবং গ্রিক সাহিত্যকে সংরক্ষণ করে আরবীতে অনুবাদ করে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে তা ছড়িয়ে দিয়েছিল। ঐতিহাসিক ব্রাউন লিখেছেন, মুসলমানরা নতুন কোনো এলাকা জয়ের পর যে সন্ধি করত, সেখানে শর্ত থাকতো অত্র এলাকার বিভিন্ন জ্ঞান-বিজ্ঞানের গ্রিক গ্রন্থগুলো মুসলমানদের নিকট হস্তান্তর করতে হবে। এ ছিল মুসলিম জাগরণের স্বরূপ।

বিংশ শতাব্দীতে যখন মুসলমানদের পতন শুরু হয়, তখন মুসলমানদের ক্ষেত্রে উল্টো চিত্র দেখা গেল। যেমনটা ছিল খ্রিষ্টান পোপ ও যাযকদের সময়ে। এ পরিস্থিতির বিবরণ দিতে গিয়ে মাওলানা আবুল কালাম আযাদ বিভিন্ন প্রবন্ধে বলেছেন; জ্ঞান-বিজ্ঞানকে আধ্যাত্মিক এবং দ্বীনি কেন্দ্রসমূহের সাথে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। যার ফলে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার গতি থেমে গিয়েছে। আধুনিক জ্ঞান এবং বিজ্ঞানকে ধর্ম বিরোধী মনে করা হয়। একারণে মুসলমানরা ১৮৫৭ সালে দিল্লি কলেজের লাইব্রেরি লুট এবং ধ্বংস করে দেয়। ইংরেজি এবং বিজ্ঞানের গ্রন্থগুলোকে ছিঁড়ে পুড়িয়ে ফেলে। বিজ্ঞানাগারের যন্ত্রপাতিকে শয়তানের যন্ত্র বলে ধ্বংস করে দেয়া হয়। বিদ্রোহীরা হাজার হাজার আরবী-ফারসী বই পুরাতন কাগজ হিসেবে বিক্রী করে দেয়।

ষোড়শ শতাব্দীতে এসে এক শ্রেণীর লোক বলতে থাকে কুরআন-হাদীসে যে শিক্ষার কথা বলা হয়েছে, তার সম্পর্ক শুধু দ্বীনের সাথে, জাগতিক শিক্ষার সাথে নয়। ফলে জাগতিক শিক্ষার প্রতি পুরো মুসলিম সমাজে বিরূপ প্রভাব ও অনীহা প্রবল হয়ে উঠে। ভারতবর্ষের মুসলমানরা আধুনিক শিক্ষাকে বিধর্মীদের এবং ফিরিংগীদের শিক্ষা বলতে শুরু করে। জাগতিক শিক্ষার প্রতি এই মূর্খ অনাগ্রহে, বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্ন থেকে মুসলমানরা শিক্ষা, জ্ঞান বিজ্ঞান, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক সকল ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণরূপে দুর্বল হয়ে পড়ে।

১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপীয় সৈন্যরা বায়তুল মুকাদ্দাস দখল করে ঘোষণা করেছিলো, “এ যুদ্ধ ছিল অষ্টম ক্রুসেড। এতে আমরা পূর্ণরূপে বিজয়ী হয়েছি।” সেই থেকে মুসলমানরা স্থায়ী পশ্চাদপদ জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিগনিত হয়ে পশ্চিমাদের পদানত ও অধস্তন জাতি হিসেবেই টিকে আছে।

আপাতদৃষ্টে, বর্তমান মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব এ অবস্থাকেই মেনে নিয়েছে। কারণ এতেই তাদের ক্ষমতার সুরক্ষা সম্ভব। অন্যদিকে একশ্রেনীর মৌলানা ও মুফতি মনে করেন এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ কেবলমাত্র আল্লাহর দরবারে হাত তুলেই সম্ভব। এরা বড় বড় মাহফিল করে আধ্যাত্মিকতার সবক দেয়, যার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যেও এর প্রভাব বিস্তৃত হয়েছে। আল্লামা সাইয়িদ হামিদের মতে ‘এসব মাহফিলে সবচেয়ে বেশী চলে পরস্পরের বিরুদ্ধে বিষোদগার। শতাব্দী ধরে অনর্থক, বেহুদা বিষয়াবলী নিয়ে মুসলমানরা বাক-বিতন্ডায় লিপ্ত রয়েছে’। মাওলানা আবুল কালাম আযাদ তাহযিবুল আখলাক নামক একটি প্রবন্ধে লিখেছেন, “শুধু দোয়ার আমল, কর্মহীন এবং শিক্ষাহীন মানুষের শক্তি অর্জনের পথ রুদ্ধ করে রেখেছে। এটি কর্মস্পৃহা হারিয়ে ফেলার একটি মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেবল দোয়ার উপর ভরসা করার ফলে মুসলমানরা আজ বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়ার জায়গা থেকে বহু দূরে সরে গিয়েছে। (চলবে)

নাসির উদ্দিন, সাবেক সাধারন সম্পাদক , কুমিল্লা প্রেসক্লাব ।

Print Friendly, PDF & Email

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.