বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুক্তি সংগ্রামে এক নেপথ্য অনুপ্রেরণাদাত্রী

(Last Updated On: August 9, 2020)

সাইদ আহমেদ বাবু : পৃথিবীর কোলে কাল বা সময় এক অমোঘ বিস্ময়। নতুবা বাঙালী নারীর বিস্ময়কর আর্বিভাব হবে কেন?
নাহ এই মুহূর্তে আমি ‘বেগম রোকেয়া,মাদার তেরেসা, বা মার্গারেট থেচার’ এর কথা লিখছি না পাঠক কূল জানতে পারেন আমি ঐ সব মানবীর উত্তর সূরির কথা বলছি-
আমি বেগম ফজিলাতুন্নেছার কথা বলছি।যিনি আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর গর্ভধারিণী,জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিণী, আমাদের যিনি বঙ্গ জননী।তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধিতে মহৎ করেছে বালক কালের প্রবীণতাকে ধৈর্য সহকারে।প্রচণ্ড ধী শক্তি দিয়ে পরিচালনা করেছেন স্বামী শেখ মুজিবুর রহমানকে।
ফরাসি তে একটি প্রবাদ আছে “First self revelation than social ravolation” অক্ষরে অক্ষরে জীবনে তিনি তা প্রয়োগ করেছেন, মেনেছেন জেনেছেন তার প্রমাণ তার সমস্ত জীবন ব্যাপী সংসারে রাষ্ট্রে।
১৯৩০ সালের গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন, পিতার নাম শেখ জহুরুল হক ও মাতার নাম হোসনে আরা বেগম। মাত্র ৩ বছর বয়সে পিতা ও ৫ বছর বয়সে মাতাকে হারান। তার ডাক নাম ছিল ‘রেনু’। বড় হন দাদার কাছে। দাদা শেখ কাসেম, চাচাত ভাই শেখ লুৎফর রহমানের পুত্র শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বেগম ফজিলাতুন্নেছার বিবাহ দেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বেগম মুজিবের অনানুষ্ঠানিকভাবে যখন বিয়ে হয় তখন তাঁর বয়স ছিল ৩ বছর, আর বঙ্গবন্ধুর বয়স ছিল ১০ বছর। তখন থেকে বেগম ফজিলাতুন্নেছাকে শাশুড়ি বঙ্গবন্ধুর মাতা সাহেরা খাতুন নিজের সন্তানদের সঙ্গে মাতৃস্নেহে লালন-পালন করেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পরিবারের সবার প্রতি ছিল তার সমদৃষ্টি।গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে তিনি প্রাথমিক লেখাপড়া করেন। অতঃপর সামাজিক রীতি-নীতির কারণে গ্রামে গৃহশিক্ষকের কাছে পড়াশুনা করেন। তার স্মৃতিশক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর। যেকোনো পরিস্থিতি অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তা, অসীম ধৈর্য ও সাহস নিয়ে মোকাবেলা করতে পারতেন।স্বামী শেখ মুজিবুর রহমান যখন কলকাতায় থাকতেন বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেছার সময় কাটতো নানা রকম বই পড়ে। তিনি ছিলেন সঙ্গীতপ্রিয়। তখন তাদের গ্রামের বাড়িতে গ্রামোফোন ছিল, পর্যায়ক্রমে সঙ্গীতের সব রকম বাদ্যযন্ত্রই তিনি সংগ্রহ করেন।
বঙ্গবন্ধু, বাঙালি ও বাংলাদেশ যেমন একই সূত্রে গ্রথিত, তেমনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবও পরস্পর অবিচ্ছেদ্য নাম। ফজিলাতুন্নেছার শৈশবের সঙ্গী শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁরা একই পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালির জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের যে নবধারা সূচিত হয়, সেই ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে নিউক্লিয়াস ঘটিত হয়েছিল, এ নিউক্লিয়াসের যারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তারা বঙ্গবন্ধুর অনুমোদনক্রমে সংগঠন, আন্দোলন এবং সংগ্রামের প্রতিটি পর্যায়ে আপোষহীন ভূমিকা রেখেছিলেন। সেই ছাত্র তরুণ সমাজের প্রধান এবং সর্বাত্মক প্রেরণার উৎসস্থল ছিলেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব।
১৯৫৪ সালে বেগম মুজিব প্রথমবারের মতো ঢাকার গেন্ডারিয়া এলাকায় বসবাস করতে চলে আসেন এবং ওই এলাকার রজনী চৌধুরী লেনে বাসা নেন। ১৯৫৪ সালে শেখ মুজিব মন্ত্রী হলে বেগম মুজিব গেন্ডারিয়ার বাসা ছেড়ে ৩ নম্বর মিন্টো রোডের বাড়িতে ওঠেন। পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভা ভেঙে দিলে ১৪ দিনের নোটিশে ৩ নম্বর মিন্টো রোডের বাসা ছাড়তে বাধ্য হন বেগম মুজিব। এ রকম অনেকবার তাঁর বাসা বদল করতে হয়েছে। অবশেষে ১৯৬১ সালে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে নিজেদের বাড়ির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় এবং ওই বছরের ১ অক্টোবর বেগম মুজিব ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িতে প্রবেশ করেন।
বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীর বিভিন্ন অংশে শেখ মুজিবুর রহমানের লেখায় উঠে এসেছে তেইশ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দৃঢ় নেতৃত্বের অনুপ্রেরণা ছিলেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকে দেশ ও মানুষের কল্যাণে অবদান রেখে গেছেন, তাকে প্রেরণা-সাহস-উৎসাহ দিয়েছেন।
১৯৬২ সালের সামরিক জান্তা আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে যখন অন্দোলন শুরু হয় তার কিছুদিন পরেই বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হন। সেই সময়ে বঙ্গবন্ধু প্রেরিত বার্তা মোতাবেক আন্দোলন পরিচালনা ও নির্দেশনা দিতেন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে বেগম মুজিব।
১৯৬৬ সালে বাঙালির জাতির মুক্তির সনদ ৬ দফা ঘোষণা করে জনমত সৃষ্টির জন্য সারাদেশে জনসভা করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু আট বার গ্রেফতার হন। বঙ্গবন্ধু যখন বারবার পাকিস্তানি শাসকদের হাতে বন্দী জীবন-যাপন করছিলেন, তখন দলের সর্বস্তরের নেতা-কর্মীরা বেগম মুজিবের কাছে ছুটে আসতেন, ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ, আবদুর রাজ্জাকসহ অপরাপর ছাত্রনেতার সঙ্গে সব সময় যোগাযোগ ছিল।আর ৬ দফা আন্দোলনের সবথেকে উল্লেখ যোগ্য ঘটনা কারাবন্দিদের মুক্তির জন্য ৭ জুনের হরতাল সফল করা, সেটাও সফল হয়েছিল বেগম মুজিবের প্রচেষ্টায়।গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার চোখ ফাকি দিয়ে সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন এবং আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগকে বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন দিক-নির্দেশনা পৌঁছে দিতেন এবং লড়াই-সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার জন্য অনুপ্রেরণা জোগাতেন।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করার পর তদানীন্তন পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে বেশ কয়েকবার জিজ্ঞাসাবাদ করে গ্রেফতারের হুমকি দেয়।নেপথ্যে থেকে তিনি ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের প্রাক্কালে সে সময় সারাদেশ আন্দোলনে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে।সামরিক জান্তা আইয়ুব খান বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে গোলটেবিল আলোচনায় বসার প্রস্তাব দেন। আওয়ামী লীগের অনেক প্রভাবশালী নেতা বঙ্গবন্ধু ভবন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে সড়কে বেগম মুজিবের কাছে ছুটে যান প্যারোলে মুক্তির প্রস্তাব মেনে নেয়ার জন্য। কিন্তু বেগম মুজিব এক অনমনীয় দৃঢ় মনোভাব প্রদর্শন করেন। কারাগারে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করে তাকে প্যারোলে মুক্তি না নেয়ার অনুরোধ করেন। বঙ্গবন্ধু মুক্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। প্যারোলে মুক্তির প্রস্তাব প্রত্যাখান করায় পাকিস্তানি শাসকের সব পরিকল্পনা ভন্ডুল হয়ে যায়।ইতিমধ্যে শেখ মুজিবের মুক্তি আন্দোলন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। গণঅভ্যুত্থানের মুখে বেগম মুজিবের পরামর্শে বঙ্গবন্ধুর সেই বিচক্ষণ সিদ্ধান্তের জন্য আইয়ুব খান জনরোষ থেকে বাঁচতে, ‘ওয়ান ম্যান ওয়ান ভোট’মেনে নিয়ে নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়।আন্দোলন সংগ্রামের সূতিকাগার, স্মৃতিবিজড়িত ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের সেই বাড়ীটি স্বাধীনতা আন্দোলনের এক অগ্নিস্ফুলিঙ্গ- স্বাধীনতার এক অবিনশ্বর কেন্দ্র।এই অগ্নিকুন্ডের প্রধান শক্তি বঙ্গমাতা বেগম মুজিব। বঙ্গবন্ধুসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সকল অভিযুক্তরা একসঙ্গে নিঃশর্ত মুক্তিলাভ করেন। এর মাধ্যমেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ত্বরান্বিত হয়।
১৯৭০-এর নির্বাচনের সময় বিভিন্ন দল দাবি তুলেছিল ভোটের আগে ভাত চাই। কিন্তু বেগম মুজিব আওয়ামী লীগের নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নেন। সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, কিন্তু পাকিস্তানীরা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে তালবাহানা শুরু করে। শুরু হয়ে যায় পূর্ববাংলায় মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি পর্ব।বঙ্গমাতার অপর অনন্যসাধারণ সিদ্ধান্ত হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ। বঙ্গবন্ধুকে সেই সময় তাঁর সহচররা ৭ মার্চের ভাষণের ব্যাপারে নানা পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দিচ্ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের নেপথ্যে বঙ্গমাতার সঠিক পরামর্শ ছিল।প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনার বক্তবে জানা যায়, ১৯৭১ এর ৭ই মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় যাওয়ার আগে দুপুরে খাওয়ার পরে আব্বা বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। আমি ও আমার মা তাঁর সাথে ছিলাম। সেদিন জাতির পিতা কি বলবেন -সে সম্পর্কে অনেকে পরামর্শ দেন। মা বলেছিলেন, ‘তুমি মনে রেখ তোমার সামনে আছে জনতা, আর পেছনে বুলেট। তোমার মন যা চাইবে সে কথাই আজ বলবে।’ এবারের সংগ্রাম- আমাদের মুক্তির সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম- স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলে বঙ্গবন্ধুর সেদিনের স্বাধীনতার ডাকে বঙ্গমাতার মনস্তাত্তিক সমর্থন বঙ্গবন্ধুকে সাহস জুগিয়েছিল। বাঙালির স্বাধীনতা ও অধিকারের সংগ্রামে ওপরে বর্ণিত এ দুটি ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহে যদি বঙ্গমাতা প্রত্যক্ষ অবদান না রাখতেন, সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ইতিহাস অন্য রকম হতে পারত। আজ থেকে ৫০ বছর আগে এক বাঙালি নারী, বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী, বঙ্গবন্ধুর বিখ্যাত বক্তৃতাদানের আগে তার পটভূমি তৈরি করে দিচ্ছেন কী মহান রাজনৈতিক আদর্শের আত্ম জিজ্ঞাসা থেকে!সেদিনের সেই অলিখিত ও স্বত:স্ফুর্ত ভাষণের জন্যই শেখ মুজিবুর রহমান আজও বাঙালির বঙ্গবন্ধু ও জতির জনক।
১৯৭১সালের ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হওয়ার পর বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে পরিবারের অপরাপর সদস্যদের সঙ্গে ধানমন্ডির ১৮নং সড়কের একটি বাড়িতে গৃহবন্দি করে রাখা হয়। চরম মানসিক পীড়ন ও ভয়ঙ্কর পরিবেশ সৃষ্টি করে তাদের ওপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। কিন্তু স্বামীর বন্দিদশা এবং পাকিস্তানের কারাগারে তাকে হত্যার আশঙ্কা সর্বোপরি নিজেদের বন্দিত্ব ও নির্যাতন সত্বেও তিনি মুহুতের জন্যও ৬)ভেঙে পড়েননি; মাথানত করেননি। ১৯৭১-এর ১৭ ডিসেম্বর তাদের বন্দিদশার অবসান ঘটে। কিন্তু তারপরও বিজয়ের আনন্দ তিনি অনুভব করতে পারেননি। অপেক্ষা করতে হয়েছে এবং দেশবাসীকেও ধৈর্য্য ধারণের জন্য পরামর্শ দিতে হয়েছে। ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। অবসান ঘটে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছার দীর্ঘ প্রতিক্ষার। বাঙালি জাতি ফিরে পায় তাদের অবিসংবাদিত প্রিয় নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।
এই মহীয়সী নারী জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকে দেশ ও জাতির সেবা করে গেছেন। বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব কেবল জাতির পিতার সহধর্মিণীই নন, বাঙালীর মুক্তির সংগ্রামে অন্যতম এক স্মরণীয় অনুপ্রেরণাদাত্রী। আমাদের মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।তিনি সব সময় অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতেন।তিনি ছিলেন অত্যন্ত দানশীল। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পশ্চাৎপদ মানুষদের মুক্তহস্তে দান করতেন। উত্তরাধিকার সূত্রে বেগম মুজিব যতটুকু অর্থ সম্পদের মালিক হয়েছিলেন তার পুরোটাই তিনি ব্যয় করেছেন নিঃস্বার্থভাবে সংসার এবং বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত রাজনীতির পিছনে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের রোগে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, তিনি নিজের জমির ধান বিক্রির র্অথ পাঠিয়ে স্বামীকে সহযোগিতা করেছেন। প্রয়োজনের সময় ঘরের আসবাবপত্র,ঘরের ফ্রিজ,এমনকি নিজের গহনা বিক্রি করে ছাত্রলীগের সম্মেলন ও আন্দোলনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের টাকা দিয়েছেন।শিক্ষার জন্য সহযোগিতা সবসময়ই করতেন। বঙ্গবন্ধু ব্যস্ত থাকতেন রাজনীতি নিয়ে সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগদান করা, ছেলেমেয়েদের দেখাশোনা, লেখাপড়ার সব দায়িত্বই তিনি নিজের হাতে নিয়েছিলেন। স্বামীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি সন্তানদের গড়ে তোলেন। আন্দোলন চলাকালীন সময়ে প্রতিটি ঘটনা জেলখানায় সাক্ষাৎকারের সময় বঙ্গবন্ধুকে জানাতেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও নির্দেশ নিয়ে আসতেন,আমৃত্যু স্বামীর পাশে থেকে দেশ ও জাতি গঠনে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন।
স্ত্রীর অনুপ্রেরণায় ১৯৬৬-১৯৬৯ সালে কারাগারে রাজবন্দি থাকাবস্থায় শেখ মুজিবুর রহমান আত্মজীবনী লিখেছেন।নিজের দেশের মানুষের মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্যে খুব কম নেতার স্ত্রীরাই এত ত্যাগ স্বীকার করেছেন । বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব যে আদর্শ ও দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, তা যুগে যুগে বাঙালি নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। এই মহান নারীর জীবনী চর্চার মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হবে। বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবন, বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অনেক অজানা অধ্যায় সম্পর্কে আজকের নতুন প্রজন্ম ধারণা পাবে।তাঁর চিন্তা-চেতনায় আদর্শ ও মূল্যবোধের স্থান ছিল সবার উপরে। তিনি ছিলেন চিরকালই প্রচার বিমুখ। যে কারণে তার সাহচর্যে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান বঙ্গবন্ধু হতে পেরেছেন। বঙ্গবন্ধু এবং ফজিলাতুন নেছা মুজিব একে অন্যের পরিপূরক।
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট কালরাতে স্বাধীনতা বিরোধী ঘাতকচক্র জাতির পিতার সঙ্গে নিরপরাধ বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা, শেখ কামাল,জামাল,শিশুরাসেল সহ বাড়ির সকলকে নির্মমভাবে ঘাতকরা হত্যা করে।ঘাতকের আঘাত হোক বা প্রতিবিপ্লব,তা সাময়িক। বাঙালির ইতিহাস কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অধ্যায় ব্যতীত অসম্পুর্ণ । বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের দীর্ঘ পথ ছিল কন্টকাকীর্ণ-বন্ধুর। বেগম মুজিব তাঁর কর্মচাঞ্চল্যে উত্তরোত্তর আমাদের চমৎকৃত করে চলেছেন।সময় যে মানুষকে কত বদলে দিতে পারে, মানুষের মধ্যে যে কত রকম প্রতিভা সুপ্ত থাকে, তার একটি জলজ্যান্ত নিদর্শন বেগম মুজিব। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর এ লড়াই-সংগ্রামের বন্ধুর পথকে মসৃণ করে দিয়েছিলেন তিনি।পর্দার অন্তরালে থেকে বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য কাজ করেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন,যথার্থ গভীর আকুলতা তীব্র সংবেগ এবং ঐকান্তিক সদিচ্ছা মানুষকে যে কোনো কবি নজরুলের ভাষায় “দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাপার”অতিক্রম করতে সাহায্য করে।এই মহিয়সী জীবনের বিভিন্ন স্তরের আলোকময় বর্ণনায় আমাদের মুগ্ধ করেছে।তিনি
তৎকালীন সমাজে সর্বাপেক্ষা উজ্জল জোতিষ্ক।যথার্থ জীবন সংগ্রামের কথা বলি,সামান্য গৃহবধু থেকে অসামান্য হওয়ার কথা বলি, উদাহরণ সহসা খুজে পাওয়া যায় না। দীর্ঘ অপেক্ষার পর হয়তো এমন কেউ আসেন যাঁর জীবনের দিকে তাকিয়ে স্তম্ভিত বিস্ময়ে আমরা বলতে পারি,রবীন্দ্রনাথের ভাষায় “তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহৎ,তাই তব জীবনের রথ/পশ্চাতে ফেলিয়া যায় কীর্তিরে তোমার বারম্বার” বা বলতে পারি, তোমার তুলনা তুমিই।
“বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণ কর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর”। নজরুলের এই কবিতার লাইন গুলিই বাঙালির গভীর দর্শন। সেটিও প্রমাণ করেছেন বঙ্গমাতা।সত্যিই বঙ্গবন্ধু তাঁর সম্পূর্ণ জীবন ব্যাপি যা যা করেছেন গভীর ভাবে ভাবলে সমস্ত কাজের প্রেরণাই বঙ্গমাতা।তাই শেষে লিখতে হয় “এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ, মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান” তাই তো তিনি তৎকালীন সমাজকে অতিক্রম করে ‘বঙ্গমাতা’ রূপে সর্বকালীন সমাজে স্থান করে নিয়েছেন।তাকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস রচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তাঁর ৯০তম জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।
লেখক:কলাম লেখক ও সংগঠক।সদস্য,সভাপরিচালনা,আমরা ক’জন মুজিব সেনা জাতীয় পরিচালনা পরিষদ।

Print Friendly, PDF & Email

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.