এই প্রতারণার দায় কার?

(Last Updated On: August 13, 2020)

নাসির উদ্দিনঃ সরকারের ছায়ায় ছিলো বলেই প্রদীপ, সাহেদ, শামীম, সম্রাট, বরকতরা দেশ ও জনগনের সাথে প্রতারণা করেছে। কিন্তু সরকারও কি জনগণের সাথে এমন প্রতারণার পথ বেছে নিতে পারে? ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এই বিভাগের এমন প্রতারণার কথাও আমরা জেনেছি। যেখানে প্রধানমন্ত্রী নিজেই এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী। প্রথম আলো লিখেছে; ভুল নয়, কতৃপক্ষের সিদ্ধান্তেই পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী বিদ্যুতের ভুতুড়ে বিল দেয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য দুটি, বাড়তি রাজস্ব আদায় ও বিদ্যুৎ বিভাগের সিস্টেম লস কমানো।

ভাবা যায়, রাষ্ট্রের একটা অঙ্গ এই দুটি কারণে জনগণের সাথে এমন প্রতারণা করতে পারে? এমন হলে এই রাষ্ট্র কি আর জনগণের থাকে? সরকারের অত্যাধিক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিভাগ, জনগণের সাথে কি, এমন প্রতারণায় মেতে উঠতে পারে? এর দায় কি সরকারের উপর বর্তায় না? দেশের পৌনে ৪ কোটি গ্রাহকের মধ্যে অর্ধেক গ্রাহককেই দেয়া হয়েছে এমন ভুতুড়ে বিল। এই বিল এমনই ভুতুড়ে যে, ১ হাজার টাকার বিলের জায়গায় ১লাখ ৬০ হাজার টাকার বিলও দেয়া হয়েছে। ডিপিডিসি, আরইবি, ডেসকো, ওজোপাডিকোসহ দেশের ছয়টি বিতরণ সংস্থার গ্রাহকেরা করোনাকালে এমন প্রতারণামূলক ভুতুড়ে বিলের খপ্পরে পড়েছিলেন।

ভাগ্যিস খোদ বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদসহ বিদ্যুৎ বিভাগের বড় বড় কর্মকর্তার বাসা ও প্রতিষ্ঠানেও ‘ভুতুড়ে বিল’ দেয়া হয়েছিল। এতেই উপরমহল গোসসা করে বসে। যার সিদ্ধান্ত তাকেই শিকার? এই বেয়াদবির দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। টাস্কফোর্স গঠন করে এর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পাঁচ সংস্থার ৩শ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কার্যকর করা হচ্ছে। এতে আপাতত জনগণের কিছুটা ফায়দা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে মন্ত্রী ও আমলাদের ভুতুড়ে বিল না দিলে কি এই ব্যবস্থা হতো? মোটেও না। অতীতে এমন হয়েছে নজির নেই। বহু মানুষ এমন বিলের খপ্পরে পরে যারপরনাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আদালতে গিয়েও প্রতিকার পায়নি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সরকারও কেন জনগণের সাথে ভুতুড়ে বিলের প্রতারণা করবে? সহজ জবাব, সরকারের এই খাতের লুটপাট এবং তথাকথিত সিষ্টেম লসের দায় জনগণের ওপর চাপানো।

কি সেই লুটপাট? গত ১০ বছরে সরকার বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি দিয়েছে ৫২ হাজার ২৬০ কোটি টাকা। ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেই বেসরকারি কোম্পানিগুলো গত ১০ বছরে উঠিয়ে নিয়েছে ৫১ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা। অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে ভর্তুকির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের টাকা এভাবে তুলে দেওয়া হচ্ছে। এই লুটপাটে দুই দফায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। একবার ট্যাক্সের টাকা দিয়ে অপ্রয়োজনীয় ভর্তুকির খরচ প্রদান, আরেকবার বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান বিল পরিশোধ করে। এই লুটপাটের ভর্তুকি মেটাতে সরকার বারবার বিদ্যুতের দাম বাড়াচ্ছে।

দেশে বিদ্যুতের চাহিদা সর্বনিম্ন ৮ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১২ হাজার মেগাওয়াট। অথচ উৎপাদন যোগ্য বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে ১৯ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার। ফলে গড়ে ৮ থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস বসে থাকছে। শীতকালে অলস কেন্দ্রের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াটে।

পাওয়ার সেলের তথ্য বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ছয়টি সরকারি কোম্পানি, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, বেসরকারি কেন্দ্র ও বিদেশ থেকে আসবে ২৮ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এর সঙ্গে পিডিবির নিজস্ব ৯ হাজার মেগাওয়াট মিলে উৎপাদন ক্ষমতা হবে ৩৭ হাজার মেগাওয়াট। অথচ ২০৩০ সালে দেশের বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা দাঁড়াবে ২৮ হাজার মেগাওয়াট। তখনও উদ্বৃত্ত থাকবে ৯ থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ আগামী ২০৩০ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ জনগণের গলার কাটা হয়েই থাকবে। ভুতুড়ে বিলের প্রতারণার খেলাও চলবে, বিদ্যুতের দামও বাড়তেই থাকবে।

সরকার ঘনিষ্ট বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিকে অন্যায় সুবিধা ও দায়মুক্তি দিয়ে প্রতিযোগিতাহীন দরপত্রের মাধ্যমে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কারণে সরকারের এই বিশাল লস। অনিয়মের মাধ্যমে তেলচালিত এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন সরকারের লোকসানকে আকাশচুম্বী করেছে। বসিয়ে রেখে দিতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ। এই লুটপাটের দায় বর্তাচ্ছে জনগণের উপর। বিশ্বে এ ধরনের দ্বিতীয় নজীর আর পাওয়া যাবে না।

সরকারের সাথে এসব কোম্পানির চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জ্বালানি, কেন্দ্রভাড়া (ক্যাপাসিটি পেমেন্ট) ও বিদ্যুতের মূল্য দিতে হচ্ছে সরকারকে। সচল ও অলস উভয় কেন্দ্রের চুক্তির ক্ষেত্রেই এই অভিন্ন শর্ত। ১০০ মেগাওয়াট একটি অলস কেন্দ্রের শুধু কেন্দ্রভাড়াই দিতে হয় ৯০ কোটি টাকা। বসিয়ে রেখে বিদ্যুৎকেন্দ্রের কেন্দ্রভাড়া দিতে গিয়ে সরকারের লোকসান বাড়ছেই।

গত ১০ বছর এই অলস বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর মালিকদের যে টাকা দিতে হয়েছে, সে কারণে প্রতিবছর জনগনের কাছ থেকে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা অন্যায়ভাবে আদায় করা হয়েছে। লুটপাটের এই দায় ছাড়াও সিস্টেম লসের দায়ও জনগণের কাঁধে বর্তায়। বর্তমানে দেশের ৬টি বিতরণ প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুতে সিস্টেম লসের গড় ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ। টাকার অংকে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। প্রতি বছর কমপক্ষে দেড় কোটি গ্রাহকের কাছ থেকে ভুতুড়ে বিল আদায়ের পরও এই পরিমাণ সিস্টেম লস। অর্থাৎ প্রকৃত সিস্টেম লসের অংক আরও অনেক বেশী। বিশ্বে সর্বোচ্চ ২-৫ শতাংশ সিস্টেম লস অনুমোদন দেয়ার বিধান রয়েছে।

নাসির উদ্দিন, সাবেক সাধারন সম্পাদক , কুমিল্লা প্রেসক্লাব ।

Print Friendly, PDF & Email

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.