সর্বশেষ সংবাদ

কুমিল্লার জলাশয়ে বিরল পদ্মফুল

(Last Updated On: September 12, 2020)

বুড়িচং উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ গ্রামের একটি জলাশয়ে রয়েছে বিরল প্রজাতির পদ্মফুল। ফুলগুলোর ছবি দেখে আকৃষ্ট হয়ে এগুলো নিয়ে গবেষণা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের একদল শিক্ষক। তারা বলছেন, পদ্মফুলের এই প্রজাতি দেশে তো বটেই, পুরো এশিয়াতেই বিরল। উত্তর আমেরিকার একটি প্রজাতির সঙ্গে এর কিছুটা মিল আছে বটে। তবে তার সঙ্গেও বুড়িচংয়ের পদ্মফুলের কিছু ক্ষেত্রে ভিন্নতাও রয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাবির গবেষকরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান রাখহরি সরকার বলেন, এ নতুন প্রকৃতির পদ্মফুল নিঃসন্দেহে ভিন্নতর। এমন পদ্ম আগে কোথাও পাওয়া যায়নি। আমাদের উদ্ভিদ জীববৈচিত্র্যে এটি একটি নতুন সংযোজন। এটা কীভাবে এখানে এলো তা সত্যিই আশ্চর্যের। ঢাবির উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের কয়েকজন শিক্ষক ও গবেষক ইতোমধ্যে পাঁচবার ওই এলাকায়.

গেছেন এবং পদ্মফুলের নমুনা সংগ্রহ করেছেন। গবেষণার মাধ্যমে এই বিশেষ পদ্মফুলটিকে যথাযথভাবে শনাক্ত করার কাজ এগিয়ে যাচ্ছে।

গবেষকরা বলেন, বিশ্বে পদ্মফুলের দুই প্রজাতি। এর একটি এশিয়ান পদ্ম (বৈজ্ঞানিক নাম-নিলাম্বো নুসিফেরা গেয়ার্টনার (ঘবষঁসনড় হঁপরভবৎধ এধবৎঃহবৎ)। এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এ পদ্ম জন্মে। এর রঙ হয় সাদা এবং হালকা বা গাঢ় গোলাপি। গোলাপি ও সাদা বর্ণের পদ্মফুল দেখতে আমরা অভ্যস্ত এবং আমাদের দেশের সর্বত্র এ পদ্মটিই বেশি পাওয়া যায়।

আরেক প্রজাতির পদ্মফুল হলো আমেরিকান লোটাস বা ইয়োলো লোটাস। (বৈজ্ঞানিক নাম ঘবষঁসনড় ষঁঃবধ ডরষষফ.। এ প্রজাতির পদ্ম শুধু উত্তর ও মধ্য আমেরিকায় জন্মে।

বুড়িচংয়ে পাওয়া পদ্মফুল আমেরিকান লোটাসের কাছাকাছি, অন্তত রঙের দিক থেকে। কিন্তু বুড়িচংয়ের পদ্মের সঙ্গে আমেরিকান লোটাসের কিছু ক্ষেত্রে ভিন্নতা আছে বলে জানান রাখহরি সরকার। তিনি বলেন, ‘আমেরিকান লোটাসের পাপড়ির সংখ্যা যেখানে ২০ থেকে ২৫টি হয়, সেখানে নতুন এ পদ্মের পাপড়ির সংখ্যা ৭০টির মতো। আবার এর পুংকেশরের গঠনও আমেরিকান লোটাস থেকে আলাদা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সঙ্গে গবেষণার কাজে আছে বেঙ্গল প্ল্যান্টস রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন। এর নির্বাহী পরিচালক শিকদার আবুল কাসেম শামসুদ্দীন শুধু পদ্মফুল নিয়ে গবেষণা করছেন পাঁচ বছর ধরে। তিনিও বুড়িচংয়ে যান কয়েকবার। শামসুদ্দিন সিকদার বলেন, সাধারণ পদ্মের সঙ্গে এর আরেক ভিন্নতা হলো এটি আকারে বড়। এর গঠনশৈলী এবং বর্ণবৈচিত্র্যময়। হালকা হলুদ বর্ণের এমন পদ্ম ইতিপূর্বে কোথাও পাওয়া যায়নি। কাজেই হলুদ বর্ণের পদ্মটি বাংলাদেশে পাওয়া সব পদ্মফুল থেকে ভিন্নতর এবং উদ্ভিদ জীববৈচিত্র্যের দৃষ্টিতে অত্যন্ত উৎসাহজনক।

এই পদ্ম এখানে এল কীভাবে সেই প্রশ্নটি এখন গবেষকদের ভাবাচ্ছে। তাদের ধারণা, হয়তো অনেক আগে এলাকার কেউ এ পদ্ম যেখানে পাওয়া যায় সেখান থেকে নিয়ে এসেছিলেন। অর্থাৎ কেউ হয়তো উত্তর বা মধ্য আমেরিকার কোনো দেশ থেকে নিয়ে এসেছিলেন। হয়তো দীর্ঘদিনের বিবর্তনে গঠন বৈচিত্র্যের দিক থেকে এ পদ্মে ভিন্নতা এসেছে।

বুড়িচংয়ের দক্ষিণ গ্রামের খুব বয়স্ক ব্যক্তিরা বলছেন, তারা ছোটবেলা থেকে এ পদ্ম দেখছেন। আর এ গ্রামের কোনো ব্যক্তি এখন বা অতীতেও ওসব দেশে গিয়েছিলেন, এর কোনো নজির নেই।

তবে একটি পদ্মের বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে দু’তিনশ বছর কোনো বিষয় না বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক রাখহরি সরকার। তার কথা, পদ্মের বীজ এক হাজার তিনশ বছর পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। তাই কয়েকশ বছর আগে এখানে এ বীজ এলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না।

তবে গবেষকরা বুড়িচংয়ের পদ্মের উৎপত্তি এবং এর বিকাশ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। এ নিয়ে শেষ কথা বলার সময় যে আসেনি, তা তারা জোর দিয়েই বলছেন। গবেষকেরা একটি বিষয় নিশ্চিত, এ পদ্ম একেবারে নতুন। আর দেশের উদ্ভিদ প্রজাতির পরিবারে এ এক নতুন সংযোজন। সঙ্গত কারণে, এটি গবেষণার একটি নতুন উপাদান।

জলাশয় কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে দেশের অনেক এলাকা থেকে পদ্ম হারিয়ে যাচ্ছে। গবেষকদের কথা, আট-দশ বছর আগে যেসব বিলে বা জলাশয়ে পদ্ম ছিল তা এখন পাওয়া যায় না। পদ্ম কেবল জলাশয়ে শোভা বৃদ্ধিকারী ফুল না, এটি অনেক ভেষজ গুণসম্পন্ন এবং পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে পদ্মের শিকড় চীন, জাপানসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশে স্বীকৃত ও সমাদৃত। এখন বুড়িচংয়ের এ পদ্মের যদি যথাযথ সংরক্ষণ হয়, এর বিস্তার হয় তবে আমাদের প্রকৃতির জন্য এ হবে এক বড় শুভ সংবাদ।

বুড়িচং উপজেলার দক্ষিণ গ্রামে বিলের যেসব পদ্ম ফোটে সেসব পদ্ম আকারে বেশ বড়। তিন রঙের পদ্ম বাংলাদেশে এটাই প্রথম। তবে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তা এখন হুমকির মুখে আছে। পদ্মবিল সংরক্ষণ করতে না পারলে অদূর ভবিষ্যতে তা হয়তো আর থাকবে না।

বিষয়টি নিয়ে কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মো. আবুল ফজল মীর বলেন, বুড়িচংয়ের পদ্মবিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক এসেছেন। তারা জানিয়েছেন আমেরিকাতে এমন পদ্মফুল ফুটে। আর বাংলাদেশে বুড়িচংয়ে রয়েছে এমন পদ্মফুল। তিনি বলেন, জেলা প্রশাসন এ বিলটি সংরক্ষণে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

Print Friendly, PDF & Email

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.