ব্রিটেনের এক বেদনাদায়ক ভুল ব্রেক্সিট

(Last Updated On: January 7, 2021)

‘অতঃপর ফলাফলটা জানা গেল—আমরা বের হয়ে গেলাম।’ বিবিসির সাংবাদিক ডেভিড ডিম্বলেবি ব্রিটেনের ইইউ রেফারেন্ডামের ফল ঘোষণা করার পর সাড়ে চার বছর অতিবাহিত হয়েছে। গত ৩১ ডিসেম্বর রাত ১১টায় তাঁর সেই কথাগুলো অবশেষে নিদারুণভাবে সত্য হলো। অর্থাৎ যুক্তরাজ্য এখন আর ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশ নয় বা তার বিধি-বিধানের অধীন নয়। আমরা দরজা বন্ধ করে চলে এলাম। নিজেদের মধ্যে থাকলাম। ইইউ থেকে বের হয়ে গেলাম।

ব্রিটেনের অনেকের কাছেই এটা একটা গৌরবময় দিন। যারা ইইউ থেকে প্রস্থান চেয়েছিল, তাদের কাছে এটা হচ্ছে স্বাধীনতার পুনঃপ্রাপ্তি, সার্বভৌমত্বের পুনরুদ্ধার ও নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার একমুহূর্ত। তারা আশা করে, এটা ব্রিটিশদের জীবন থেকে ইউরোপীয় বিবাদ ঝেঁটিয়ে বিদায় করবে। তারা চায় এমনটা ঘটুক, যা প্রধানমন্ত্রীর কথায় উল্লেখ রয়েছে, ‘এটা আমাদের জাতীয় উপাখ্যানের এক নতুন অধ্যায়, ব্রিটিশ জনগণের নিজস্ব আইনের অধীনে বসবাসের সার্বভৌম ইচ্ছার পূরণ, যা তাদের নিজেদের নির্বাচিত পার্লামেন্টের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে।’

অন্যদের কাছে গত ১ জানুয়ারি দিনটি ছিল স্রেফ স্বস্তির মুহূর্ত। কারণ ব্রেক্সিট যুদ্ধ চলছিল দীর্ঘ আট বছর ধরে, যা শুরু হয়েছিল ডেভিড ক্যামেরনের ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে রক্ষণশীলদের গণভোটের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার মাধ্যমে। এমনকি ২০২০ সালে ব্রেক্সিটের ওপর কভিডগ্রাসও ইউরোপের সংবাদ শিরোনামে ফিরে আসা থামাতে পারেনি; বরং ২০২১ সাল যতই কাছাকাছি আসছিল, ততই ‘চুক্তিহীন প্রস্থানের’ আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। ফলে এ বিষয় নিয়ে বরিস জনসন ও কির স্টারমার উভয়কেই গত বুধবার অভিন্ন কথা বলতে দেখা গেল। তাঁরা দুজনই বলেছেন, এই বিবাদ শেষ।

এক অর্থে তাঁরা ঠিকই বলেছেন। রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই সামনের দিকে তাকাতে হয়, পেছনে নয়। অন্য অর্থে তাঁরা একেবারেই ভুল। এটা একটা দুঃখের দিন। ব্রিটেনের এই প্রস্থান একটি বিয়োগান্তক ভুল হিসেবে থেকে যাবে। আমরা এমন একটি ইউনিয়ন থেকে নিজেদের বহিষ্কার করলাম, যা এই দেশ ও বিশ্বের জন্য ভালো ছিল। এমন একটি ঘটনা ঘটাতে ইউরোপবিরোধী গণমাধ্যমের ভূমিকা ছিল নির্ণায়ক। তাই এ কথা বলা উপযুক্ত হবে যে সাংবাদিকদের নেতৃত্বে একটি সরকার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিল। তবে এটা ঠিক, আমাদের ক্রমাগত উত্তেজনা, অসাম্য ও শাসনের ব্যর্থতার জন্য অন্তত ইইউকে আর দোষারোপ করার সুযোগ থাকল না।

অবশ্য এই উত্তেজনা উধাও হয়ে যেতে পারে না। স্কটল্যান্ড, উত্তর আয়ারল্যান্ড এবং লন্ডন ও অন্যান্য শহরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ব্রেক্সিটের বিরোধিতা করেছে। পাশাপাশি বেশির ভাগ তরুণ ও গ্র্যাজুয়েটরাও বিরোধিতা করেছেন। তাই ২০১৬ সালে সামগ্রিক সংখ্যাগরিষ্ঠ রায় যা-ই হোক না কেন এবং আমরা সবাই তর্কবিতর্ক করে যতই ক্লান্ত হয়ে পড়ি না কেন—এসব মানুষের কারো বিরোধিতাই পরিবর্তিত হবে না। এটা এমন এক দেশ, যে ইউরোপকে কেন্দ্র করে বিভক্ত হয়ে পড়ল। এ নিয়ে আমরা অতীতে বিভক্ত ছিলাম এবং ভবিষ্যতেও বিভক্ত থাকব।

২০১৬ সালে সবচেয়ে গোঁড়া ব্রেক্সিটপন্থীদের অনেকেই আশা করেছিলেন যুক্তরাজ্যের প্রস্থান ইইউর ভাঙনের সূচনা করবে। অথচ ওই গণভোটের সবচেয়ে লক্ষণীয় ফল ছিল ব্রেক্সিট ইস্যুকে কেন্দ্র করে ইউকে ফোরের (যুক্তরাজ্যের চার জাতির) ক্রমবর্ধমান অনৈক্যের তুলনায় ইইউ টোয়েন্টি সেভেন অধিকতর সংহতি অর্জন করে। বরং ব্রিটেনের বিচ্ছেদের সম্ভাবনাই এখন সবচেয়ে বেশি।

টোরিদের বেঞ্চ থেকে টেরিজা মে’র সতর্কবাণী অনেক বেশি বাস্তব প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের কখনোই নিজেদের এভাবে ভাবতে দেওয়া উচিত নয় যে সার্বভৌমত্ব মানে বিচ্ছিন্নতাবাদ বা ব্যতিক্রমবাদ।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা একটি আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে বসবাস করি। কোনো উপায়ে মি. জনসন সেটা বুঝতে পেরেছেন। তাঁর কমন্সসভায় বক্তৃতায় ব্রিটেনকে ইইউর সবচেয়ে ভালো বন্ধু ও মিত্র হিসেবে রাখার কথা এসেছে। এতে সম্ভবত তাঁর সুর পরিবর্তনের চিহ্ন দেখা গেছে। কিন্তু তিনি যে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তা মৈত্রী বা সমঝোতায় আগ্রহী নয়।’

বেক্সিট সম্পন্ন হয়েছে; কিন্তু এটা শেষ হয়ে যায়নি। ব্রিটিশ রাজনীতির জন্য ভবিষ্যৎ সংঘাতের সব ধরনের পথ খোলা রেখেছে। এর মধ্যে রয়েছে চুক্তিটির যাচাইহীন মুদ্রিত কপি, নতুন অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, নিয়ন্ত্রণসমন্বয় বজায় রাখা, সেবা শিল্পের অবস্থা, মাছ ধরা, ডাটাবেইসে প্রবেশাধিকার, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং সম্ভবত সর্বোপরি চুক্তিতে উল্লেখ থাকা উত্তর আয়ারল্যান্ডবিষয়ক অনিশ্চয়তা।

পর্তুগিজ লেখক হোসে সারামাগো তাঁর উপন্যাস ‘দ্য স্টোন র‌্যাফট’-এ (পাথরের ভেলা) একটি কল্পনা করেছেন এমন যে আইবেরীয় উপদ্বীপের ভূখণ্ডটি ইউরোপ থেকে বিচ্ছিন্ন পাইরেনি পর্বতমালার দিকে সরে যাচ্ছে এবং একটি নতুন ঠিকানার খোঁজে বিশ্বের মহাসাগরজুড়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। আজ ব্রিটেনও রূপক অর্থে পাথরের ভেলার মতো নিজেকে অনুভব করতে পারে। এটা বাদ দিলে প্রকৃত ব্রিটেন ইংলিশ চ্যানেলজুড়েই ইউরোপীয় মহাদেশ, এর জনগণ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি থেকে শুরু করে সর্বত্র নোঙর করা থাকবে। অতঃপর আমরা আশা করি, একদিন কোনো না কোনোভাবে ইউরোপে ফিরে আসবে।

সূত্র : সম্পাদকীয়, দ্য গার্ডিয়ান

ভাষান্তর : আফছার আহমেদ

Print Friendly, PDF & Email

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.