”অন্ধকার হতে আলোর পথে যাত্রা ‘

(Last Updated On: January 11, 2021)

 হাসিব চৌধুরী: বাঙালি জাতির প্রাণের মানুষ, মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মুক্তি যুদ্ধের দীর্ঘ ৯ মাস যিনি বন্দি ছিলেন পাকিস্তানের নির্জন কারাগারে, যে নামটি মুখে নিয়ে লক্ষ মানুষ আত্মহুতি দিয়েছিলো মুক্তির প্রত্যাশায়। সেই বঙ্গবন্ধু নামের প্রাণের মানুষটি ৮ ই জানুয়ারী, ১৯৭২পাকিস্তান জেল থেকে মুক্তি পান। একটি বিশেষ বিমানে বঙ্গবন্ধু সকাল সাড়ে ৬ টায় পৌঁছান লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে (সহ যাত্রী ছিলেন ড: কামাল হোসেন )। বিশ্রাম নেন ৪ ঘন্টা হোটেল ক্লারিজে , সকাল ১০টার পর থেকে তিনি প্রথমে কথা বলেন, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধান মন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ ও ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্ৰীমতী ইন্দিরা গান্ধী সহ আরো অনেকের সঙ্গে । এর পর বঙ্গবন্ধুকে আমন্ত্রণ জানানো হয় ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিট ,ব্রিটিশ প্রধান মন্ত্রীর অফিসিয়াল বাসভবনে , আলোচনা করেন ব্রিটিশ প্রধান মন্ত্রী এওয়ার্ড হিথ এর সঙ্গে।

এভাবেই সূচিত হয় উন্নত শক্তিধর রাষ্ট্রের স্বীকৃতি। সেখান থেকে বেরিয়ে এসে বঙ্গবন্ধু বলেন “I have talked to Mr Heath. I have talked to Mr Wilson. And I am happy.”। একই দিন লন্ডনে অবস্থান রত প্রবাসী বাঙালি ও সংবাদিকদের সাথেও সাক্ষাৎ করেন এবং বলেন “Today I am free to share the unbounded joy of freedom with my fellow countrymen, who have won their freedom in an epic liberation struggle. The ultimate achievement of this struggle is the creation of an independent, sovereign People’s Republic of Bangladesh, of which my people declared me as their president while I was a prisoner in the condemned cell, awaiting the execution of a sentence for hanging.” হোটেলের বাহিরে অবস্থান রাত হাজার হাজার প্রবাসী বাঙালি ও ব্রিটিশ নাগরিক যার বঙ্গবন্ধুকে এক নজর দেখার জন্য অধীর হয়ে অপেক্ষা করছিলো , বঙ্গবন্ধু হোটেলের জানালায় এসে হাত নেড়ে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা প্রকাশ করেন। ১০ তারিখ সকালে তিনি প্রথমে দিল্লীতে যাত্রা বিরতি করেন , ভারতের রাষ্ট্রপতি ভিভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী, ভারতীয় মন্ত্রিসভা, ভারতীয় নেতৃবৃন্দ,ভারতের তিন বাহিনীর প্রধান এবং অন্যান্য অতিথি ও সেদেশের জনগণের কাছ থেকে উষ্ণ সংবর্ধনা লাভ করেন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের অকৃত্তিম বন্ধু , বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।ভারতীয় জনগণের অকৃত্তিম ভালোবাসার প্রতি সম্মান জানাতে ”বঙ্গবন্ধু” ভারতের মাটিতে এক বিশাল জনসভা করেন , তখন উন্মুক্ত মাঠে লক্ষ লক্ষ ভারতীয় জনতার মুখে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে উচ্চারিত হচ্ছিলো ”জয় বাংলা ,জয় বঙ্গবন্ধু ” বঙ্গবন্ধু ভারতের জনগণ ও নেতৃবৃন্দর কাছে তাদের অকৃপণ ভালোবাসা ও সাহায্যের জন্য গভীর ভাবে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন । একই সাথে তিনি শ্ৰীমতী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনী ফিরিয়ে নেয়ার জন্য অনুরোধ করেন এবং তাঁর নিকট থেকে সম্মতি আদায় করেন ,যা ছিল বাংলার মুক্তি কামী মানুষের পক্ষে তাৎপর্য ময় অনন্য প্রাপ্তি । বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে আখ্যায়িত করা হয়েছিল ”অন্ধকার হতে আলোর পথে যাত্রা ”। জননন্দিত বাঙ্গালী জাতীর নয়নের মনি ”বঙ্গবন্ধু” জাতির জনক হয়ে ঢাকা এসে পদর্পন করেন ১০ই জানুয়ারি, ১৯৭২ ।

আমাদের বিজয় হয়েছিল ১৬ই ডিসেম্বর, কিন্তু মানুষের মনে ছিল উৎকণ্ঠা শুধু বঙ্গবন্ধু জন্যে ,বঙ্গবন্ধু কে আমরা কি ফিরে পাবো ? বঙ্গবন্ধু কি বেঁচে আছেন ? কবে আসবেন বঙ্গবন্ধু ? কি এক উৎকণ্ঠা , তাঁকে ছাড়া সমস্ত বাঙালি জাতির বিজয়ের আনন্দ কেমন জানি ম্লান হয়ে যাচ্ছিলো । টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া সারা বাংলার মানুষ অপেক্ষায় ছিল শুধুই বঙ্গবন্ধুর জন্যে , কারো পরনে কাপড় নাই , পেটে খাবার নাই , কারো হাত নাই ,পা নাই , কারো আপন জনের সন্ধান নাই সকল কষ্ট, দুঃখ ভুলে বঙ্গবন্ধুকে এক নজর দেখার জন্য কি যে আকুতি তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয় । অবশেষে জাতির জনক সকল জল্পনা কল্পলার অবসান ঘটিয়ে নব্য স্বাধীন বাংলার রাজধানী ঢাকা বিমান বন্দরে অবতরণ করেন , মহা আনন্দে আত্মহারা লক্ষ লক্ষ আবেগে উদ্বেলিত মানুষ আনন্দ -অশ্রু চোখে নিয়ে ঢাকা বিমান বন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দান পর্যন্ত তাঁকে স্বতঃস্ফূর্ত সংবর্ধনা জানান। বিকাল পাঁচটায় রেসকোর্স ময়দানে জাতির পিত বঙ্গবন্ধু নামে এক নুতন সূর্য ১০ লক্ষাদিক লোকের উপস্থিতিতে আবেগঘন ভাষণ দেন। হিমালয়-সম, জননন্দিত ,বাঙালি জাতির প্রাণ প্রিয় নেতা , বঙ্গবন্ধু মুজিব সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঐতিহাসিক মঞ্চের যেখানে দাঁড়িয়ে তিনি ৭ই মার্চ ১৯৭১ বলেছিলেন ”রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দিবো, এদেশের মানুষ কে মুক্ত করে ছাড়বো ” ইতিহাসের বাস্তবতায় , সেই একই মঞ্চে আবেগঘন বজ্র কণ্ঠ ভাষণে বিজয়ী বেশে সকল শহীদদের প্রতি সশ্রদ্ধ চিত্তে অশ্রু সজল নয়নে তিনি সবার ত্যাগের কথা স্মরণ করে বলেন, ”আমার বাংলাদেশ আজ স্বাধীন হয়েছে ,আমার জীবনের স্বাদ আজ পূর্ণ হয়েছে । যে মাটিকে আমি এত ভালবাসি, যে মানুষকে আমি এত ভালবাসি, যে জাতিকে আমি এত ভালবাসি, আমি জানতাম না সে বাংলায় আমি ফিরে যেতে পারবো কিনা ? আজ আমি বাংলায় ফিরে এসেছি বাংলার ভাইয়েদের কাছে, মায়েদের কাছে, বোনদের কাছে। বাংলাদেশ আজ স্বাধীন সার্ভভৌম ,বাংলাদেশ চিরদিন স্বাধীন থাকবে ।” হাজার বছর ধরে নির্যাতিত শত ,হাজার , লক্ষ মানুষের আত্ম ত্যাগের বিনিময়ে যে স্বপ্নের আকাঙ্খা ” স্বাধীনতা ” শব্দটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল , ১০ ই জানুয়ারীর এই দিবসে, মহাকালের সেই সংগ্রামী প্রতিবাদী, স্বাধীনতাকামী তিতুমীর, নুরুলদ্দীন, মাস্টার দা সূর্যসেন ,ক্ষুদিরাম সহ তিরিশ লক্ষ শহীদের আত্মা এক যোগে আনন্দে আপ্লত আবেগে স্বস্থির নিশ্বাস ফেলে বঙ্গবন্ধুরই কণ্ঠে যেন বলে উঠছে ”আজ আমার দেশ স্বাধীন ,আমি আজ মুক্ত , আমার আত্ম ত্যাগ বিফলে যায়নি , আমার স্বপ্ন আজ পূরণ হয়েছে ।”

Print Friendly, PDF & Email

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.