সাইবার অপরাধ :থাকুন বিপদমুক্ত

(Last Updated On: আগস্ট ১৬, ২০১৬)

ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী মাইশা সুলতানা। কিছুদিন আগে ক্যাম্পাসে যাওয়ার পর বন্ধুদের কাছে তিনি প্রথম জানতে পারেন ফেসবুকে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে পড়া ছাত্রীদের ছবি দিয়ে ‘বিবাহযোগ্য পাত্রী’ শিরোনামে একটি পেজ খোলা হয়েছে। সেখানে তারও ছবি রয়েছে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় মাইশা এরপর ফেসবুক কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেও কোনো ফল পাননি।

শুধু বিনা অনুমতিতে এ রকম একটি পেজ খোলা নয়, সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা, ই-মেইল ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা, ব্যক্তিগত আক্রমণ, আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও শেয়ারসহ বিভিন্ন ধরনের সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছেন নারী থেকে শুরু করে সব ধরনের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিকার তেমন পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ। অনেক ক্ষেত্রেই এসব অপরাধীর দক্ষতার সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গলদঘর্ম হচ্ছে।

সাইবার অপরাধের ধরন

স্প্যামিং বা জাঙ্ক মেইল :এটি ই-মেইলভিত্তিক প্রতারণার মাধ্যম। ভুয়া আইডি/ই-মেইল অ্যাড্রেস ব্যবহার করে নাম-ঠিকানা, ক্রেডিট কার্ড নম্বর এমনকি ফোন নম্বর নিয়ে মিষ্টি কথায় ভোলাতে চেষ্টা করবে অপরাধী চক্র। ফাঁদে পা দিলেই বিপদ! স্প্যাম ফোল্ডারে প্রায়ই এমন মেইল আসে।

পর্নোগ্রাফি :অশ্লীল সাইটগুলোতে অনেক সময় ওঁৎ পেতে থাকে অপরাধীরা। বেশ কিছু সাইটে থাকে ক্ষতিকর কম্পিউটার ভাইরাস। ক্লিক করতে থাকলে কিংবা এক পর্যায়ে ই-মেইল আইডি (ফ্রি সাবস্ক্রাইব) দিলেও তথ্য চুরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

মাদক ব্যবসা :ইন্টারনেটে মাদক ব্যবসায়ী চক্র সক্রিয় রয়েছে। তারা ওয়েবে মাদকদ্রব্যের তথ্যসংবলিত ডাটাবেজ (ক্রয়মূল্য, ডিস্ট্রিবিউশন প্রভৃতি) তৈরি করে এবং সারা বিশ্বের মানুষকে প্রদর্শিত করে।

পরিচয় চুরি :অনলাইনে কেনাকাটার জন্য নাম, ঠিকানা, ই-মেইল, ক্রেডিট কার্ডের তথ্য ইত্যাদি দিতে হয়। যেসব ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভালো নয়, সেখানে এই তথ্যগুলো দিলে তা অপরাধীর কাছে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেক্ষেত্রে অপরাধী আপনার তথ্য ব্যবহার করে আপনার ক্রেডিট কার্ড শূন্য করে দিতে পারে। কারণ আপনার যে পরিচয় চুরি হয়ে গেছে!

স্প্যাম ও ফিশিং :একদিন ই-মেইল খুলে দেখলেন আপনি অনেক টাকার লটারি জিতেছেন! সেটা পেতে আপনাকে কিছু তথ্য দিতে বলা হচ্ছে। হঠাৎ করে বড়লোক হওয়ার লোভে আপনি সেই তথ্যগুলো দিয়েও দিলেন। পরে দেখলেন টাকা পাওয়ার বদলে আপনার কাছে যা আছে সেটাও চলে যাচ্ছে! অর্থাৎ আপনি ফিশিংয়ের শিকার হয়েছেন।

ম্যালওয়্যার :উন্নত বিশ্বে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। অপরাধীরা ম্যালওয়্যার ঢুকিয়ে অন্যের কম্পিউটারের ফাইলগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। তারপর ওই কম্পিউটার ব্যবহারকারীকে বার্তা পাঠায় এই বলে যে, ফাইল ফেরত পেতে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিতে হবে।

সাইবারবুলিং :হয়তো মজা করার জন্য কিংবা ইচ্ছে করে একজনকে কষ্ট দিতে তার বন্ধুরা একজোট হয়ে হয়রানি করে থাকে। বাস্তবে স্কুল-কলেজে এমনটা হয়ে থাকে। আজকাল ইন্টারনেট সহজলভ্য হয়ে ওঠায় ভার্চুয়াল জগতে এমন ঘটনা ঘটছে। কিন্তু অনেক সময় বিষয়টি আর মজার পর্যায়ে না থেকে ভয়ানক হয়ে ওঠে। ফলে যাকে নিয়ে মজা করা হচ্ছে সে হয়তো এমন কিছু করে ফেলে, যা কারও কাম্য থাকে না।

ম্যালভার্টাইজিং :ধরুন আপনি কোনো ওয়েবসাইটে আছেন। সেখানে একটি বিজ্ঞাপন দেখে ক্লিক করলেন। ব্যস আপনার কম্পিউটারে একটি কোড ডাউনলোড হয়ে গেল। এটি কোনো নিরীহ কোড নয়। অপরাধীরা এর মাধ্যমে আপনাকে হয়রানির পরিকল্পনা করবে।

ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড স্কিমিং :রেস্টুরেন্ট, সুপার মার্কেটের বিল পরিশোধ, এটিএম থেকে টাকা তোলা, অর্থাৎ এমন কোথাও যেখানে আপনার ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ডকে যন্ত্রের মধ্যে ঢোকাতে হয় সেখান থেকেও তথ্য চুরি হতে পারে। এটাই কার্ড স্কিমিং। স্কিমার যন্ত্রের মাধ্যমে এই তথ্য চুরি করা হয় বলে এর এমন নামকরণ হয়েছে।

ফোন ফ্রড :অচেনা কোনো নম্বর থেকে (বিশেষ করে বিদেশ থেকে) মিসড কল পেলে সঙ্গে সঙ্গে কলব্যাক না করাই ভালো। কারণ কে জানে হয়তো ফোন ফ্রড অপরাধীরা এই কলটি করেছিলেন। আর আপনি কলব্যাক করতে যে টাকা খরচ করলেন তার একটি অংশ পেয়ে গেল অপরাধীরা!

দেশের তথ্যপ্রযুক্তি আইন যা বলে

ক্রমাগত সাইবার সংক্রান্ত অপরাধ বাড়ার কারণে ‘তথ্য ও প্রযুক্তি আইন ২০০৬’ নামে আমাদের দেশে আইন পাস হয়, যা ২০১৩ সালে সংশোধিত হয়। তথ্যপ্রযুক্তি আইন ২০০৬-এর ৫৬ ধারায় বলা হয়েছে, (১) যদি কোনো ব্যক্তি জনসাধারণের বা কোনো ব্যক্তির ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে বা ক্ষতি হবে মর্মে জানা সত্ত্বেও এমন কোনো কাজ করেন, যার ফলে কোনো কম্পিউটার রিসোর্সের কোনো তথ্য বিনাশ, বাতিল বা পরিবর্তিত হয় বা তার মূল্য বা উপযোগিতা হ্রাস পায় বা অন্য কোনোভাবে একে ক্ষতিগ্রস্ত করে। (২) এমন কোনো কম্পিউটার সার্ভার, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক সিস্টেমে অবৈধভাবে প্রবেশ করার মাধ্যমে এর ক্ষতিসাধন করেন যাতে তিনি মালিক বা দখলদার নন, তাহলে তার এই কাজ হবে একটি হ্যাকিং অপরাধ। কোনো ব্যক্তি হ্যাকিং অপরাধ করলে তিনি অনূর্ধ্ব ১০ বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন বা উভয় দণ্ড দেওয়া যেতে পারে।

তথ্যপ্রযুক্তি আইন ২০০৬-এর ৫৭ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেউ পড়লে বা শুনলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হতে উদ্বুদ্ধ হতে পারে বা যার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র বা ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উস্কানি প্রদান করা হয়, তাহলে তার এই কাজ অপরাধ বলে গণ্য হবে।…http://bangla.samakal.net/

Print Friendly, PDF & Email

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.