সময়ের কাঠগড়ায় মনুষত্ব

(Last Updated On: November 13, 2016)

ইকরামুল হক : এক জীবনে অনেক জ্ঞান অর্জন করা, অনেক সম্পদশালী হওয়া পৃথিবীর বৃহৎ প্রাপ্তি নয় । মানবিকতা,মনুষত্ববোধ লালন করা, একে অপরের মনে জায়গা করে নেওয়া, এমন মানসিকতা তৈরি করাটাই পৃথিবীর বড় অর্জন । জগতের বিশৃংখলার মূল কারণ হচ্ছে মনুষত্ববোধ, শিষ্টাচারের চরম অভাব । সমাজে ছোটদের অনুকরণের, অনুসরণের পথপ্রদর্শক হলো বয়সে বড়রা ।

বড়দের স্নেহ, ভালোবাসায়, শাসনে ছোটরা বিপথগামী ও কলুষমুক্ত হওয়া থেকে বিরত থাকে ; হয়ে উঠে ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক ও সমাজের একজন দায়িত্বশীল অভিভাবক ।

তরুন প্রজন্ম তাদের বড়দের দিকে তাকিয়ে যখন দেখে যে, তাঁরা সমাজ, মানুষ, দেশের কল্যাণের চেষ্টায় ব্রত, অন্যের অকল্যাণ করা থেকে বিরত এবং তরুন প্রজন্মর প্রতি স্নেহশীল, সৌহার্দ্যপূর্ন, তখন তারাও এ ইতিবাচক গুনগুলো নিজের চরিত্রে ফুটিয়ে তোলে এবং নিজেকে সাজিয়ে তুলতে উদ্ধুদ্ধ হয় । অন্যদিকে তরুন প্রজন্ম যখন দেখে বড়রা নিজেদের স্বার্থ নিয়েই মহা ব্যস্ত অন্যের কল্যাণ-অকল্যাণ নিয়ে তাঁদের মাথাব্যাথা নেই, নতুন প্রজন্মের প্রতি সৌহার্দ্যের তুলনায় কর্তৃত্ব ও ভয় প্রতিষ্ঠায় বেশী আগ্রহী; তখন তারা ভাবে এটাই বুঝি জীবনের কর্তব্য, এটাকেই তারা আদর্শ মেনে চলতে থাকে ।

আমাদের সমাজে অনেক বড়রাই আফসোস করেন, আজকালকার নতুন প্রজন্মের কিশোর-যুবকেরা বড়দের সম্মান করে না, অবাধ্য হয় । তখন বড়দের কাছে আমার খুব জানতে ইচ্ছে হয় আপনারা নিজেদেরকে প্রশ্ন করুন, কেন নতুন প্রজন্ম আপনাদের কথা মানে না আর নেপথ্যের কারণটাইবা কি ? যথাযথ কারন এই নয় কি যে,আপনারা তাদের কাছ থেকে যা চাচ্ছেন তা আপনাদের মধ্যেই নেই ! নতুবা প্রজন্মের নতুন সারথিদের আপনারা সঠিক প্রশিক্ষণ দিতে ব্যার্থ হয়েছেন ? শিল্পীর হাতের কাঁদা মাটি তো বিভিন্ন রুপ ধারণ করে । তবে কি আপনারা কাঁদা মাটিকে শৈল্পিক রুপ দিতে ব্যর্থ হয়েছেন ? বর্তমানে নতুন প্রজন্মরাও এ কথা ভুলতে বসেছে যে, সেও একদিন বড়দের স্থলাভিষিক্ত হবে; তখন তাহাদের অধীনস্থ, নিম্নস্থ অনেকই থাকবে । সেও কি তখন চাইবে না যে, আমাদের নতুন প্রজন্মের ধারক-বাহকেরা আমাদের সম্মান ও শ্রদ্ধা করুক ! কিন্তুু এটা কিভাবে সম্ভব যে, আপনি কাউকে সম্মান দেখাবেন না আর অন্যদের কাছ থেকে সম্মান আশা করবেন ।

সমাজের বড়রা ও উচু ব্যক্তিরা এখন আগ বাড়িয়ে সালাম না দিয়ে মুখিয়ে থাকে সালাম পাওয়ার জন্য ; আর অপরদিকে নতুন প্রজন্ম তো বড়দের বদৌলতে একথা ভুলতেই বসেছে যে, সালাম দিতে হয় ! স্নেহ-ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা একটির সাথে আরেকটি ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত ,একে অপরকে সেটা না দিলে তাহা পাওয়ার প্রত্যাশা করা বোকামী । আন্তরিকতা ও ভালোবাসা বলতে শুধু ক্ষণিকের আবেগ বুঝায় না, ইহা এক স্বর্গীয় অনুভূতি যার বদৌলতে ধনী-গরীব, ছোট বড়, ইতর-ভদ্র সকলে একাকার হয়ে যায়। একে অপরের প্রতি সৌহার্দ্য এবং ভালোবাসা থাকলেই নিজের উপার্জিত সম্পদ অপরের জন্য ব্যয় করা যায়, নিজের খাবারে অন্যকে অংশীদার করা যায়, নিজের বাড়তি কাপড়টা দিয়ে বস্ত্রহীনের সম্মান রক্ষা করা যায় । কনকনে ঠান্ডা শীত থেকে অন্যকে বাঁচাতে নিজের কাপড় দেয়া অথবা শীত থেকে বাঁচার উপকরন কেনার টাকা দেয়া যায় এই ভালোবাসা-সহানুভূতির কারণেই।

আধুনিক সমাজ ব্যবস্থা হয়ে গেছে নিজেকে বাঁচাও, নিজের আখের গোছাও । ওরে ভাই, আমার পাশে যে অভাবে আছে, বিপদের সম্মুখীন, সমস্যায় জর্জরিত তার দিকে তাকানো কি আমাদের কর্তব্য নয় ? আমি যদি তার দিকে লক্ষ না করি, আপনিও যদি ঠিক একই কাজ করেন তবে এটা আশা করা কি ঠিক হবে যে, অন্য কেউ আমার, আপনার বিপদে পাশে দাঁড়াবে ? আমার নিকট কেউ খাবার চাইবে, আমি তাকে তাড়িয়ে দেব; কেউ অর্থসংকটে আছে, আর আমার সাহায্য চাইল, সামর্থ্য থাকা স্বত্বেও তাঁকে সাহায্য করলাম না; শীতের প্রচন্ড ঠান্ডায় নিজের আরামের ব্যবস্থা করলাম, কিন্তুু চোখের সামনের অসহায় মানুষ গুলোর প্রতি সামান্য সহানুভূতির দৃষ্টি দিলাম না । তবে জেনে রাখো আমাদের বিপদের সময় একাকীত্বের ভয়ংকর অসহায় অবস্থা যখন তৈরি হবে , যখন আমার আপনার পাশে কেউ সহানুভূতির হাত বাড়াবেনা তখন অনাগত সেই বেদনাদায়ক খারাপ সময় মেনে নেওয়ার মানসিকতাও আমাদের তৈরি করে নিতে হবে ।

লেখক ঃ ইকরামুল হক, সাংগঠনিক সম্পাদক, আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি.

Print Friendly, PDF & Email

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.