রবিবার, ১৩ জুন ২০২১, ০১:১৯ অপরাহ্ন

ইসলামের আলোকে চন্দ্র গ্রহণ, এ সময় করণীয়

গাজী জাহাঙ্গীর আলম জাবির
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৭ মে, ২০২১
  • ২১২ বার

চন্দ্রগ্রহণের সময় নামাজ ও করণীয়
মহান আল্লাহর কুদরতের অনন্য নির্দশন চন্দ্র -সূর্য। প্রতিদিনই মানুষ চন্দ্র সূর্য দেখে থাকে। সময়ের ব্যবধানে চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণ হয়ে থাকে। এই চন্দ্রগ্রহণ এবং সূর্যগ্রহণ আল্লাহ তায়ালার কুদরতের দুটি অন্যতম নিদর্শন। এসব নিয়ে রয়েছে ইসলামের সুস্পষ্ট নির্দেশনা ও করণীয়।

চন্দ্র গ্রহণ কী? চন্দ্রগ্রহণকে আরবিতে ‘খুসুফ’ বলা হয়। গ্রহণ লাগলে সূর্য যেমন অন্ধকার ছায়ার আবর্তে পতিত হয়ে অন্ধকার হয়ে যায়, তেমনি চন্দ্রও বছরে দুই বার স্বীয় কক্ষপথে পরিভ্রমণরত অবস্থায় অন্ধকারের ছায়ায় আচ্ছাদিত হয়ে থাকে। ইহার আংশিক রূপ কখনো দৃশ্যমান হয়। আবার কখনো সার্বিক রূপ পরিদৃষ্ট হয়। চন্দ্রের এ কালো রঙ বা অন্ধকারের হাতছানিকেই চন্দ্রগ্রহণরূপে আখ্যায়িত করা হয়।

কোরআনে পাকে আল্লাহ তায়ালা এ সম্পর্কে সুস্পষ্ট বর্ণনা দিয়েছেন। ইরশাদ হচ্ছে, ” যখন দৃষ্টি চমকে যাবে। চন্দ্র জ্যোতিহীন হয়ে যাবে। এবং সূর্য ও চন্দ্রকে একত্রিত করা হবে।’ (সুরা কিয়ামাহ : আয়াত ৭-৯) উল্লেখিত আয়াতে ‘চন্দ্র জ্যোতিহীন হয়ে পড়া’র বাস্তব রূপই হচ্ছে চন্দ্রগ্রহণ।

চন্দ্রগ্রহণ সম্পর্কে মহানবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নির্দেশনা জাহেলি যুগে চন্দ্র গ্রহণ কিংবা সূর্য গ্রহণ সম্পর্কে বিরূপ ধারণা ছিল। তারা মনে করত দুনিয়ায় বড় বড় ব্যক্তিত্বের অধিকারী লোকদের কোনো অঘটন ঘটলে এসব হয়। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ছেলে ইবরাহিম-এর মৃত্যুর দিনে সুর্য গ্রহণ হয়। তখন সাহাবায়ে কেরামগন বলাবলি করছিল। তা শুনে, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চন্দ্র গ্রহণ ও সূর্য গ্রহণ সম্পর্কে তাদের সুস্পষ্ট বর্ণনা দেন। হাদিসে এসেছে-

হযরত মুগিরা ইবনে শুবা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘সূর্য ও চন্দ্র আল্লাহর নিদর্শন সমূহের মধ্যে দু’টি নিদর্শন। কারো মৃত্যু বা জন্মের কারণে সূর্য গ্রহণ ও চন্দ্র গ্রহণ হয় না। কাজেই যখন তোমরা তা দেখবে তখন-১. তোমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করবে। ২. তাঁর মহত্ব ঘোষণা করবে আর ৩. নামাজ আদায় করবে এবং ৪. সাদকা প্রদান করবে।’ (বুখারি ও মুসলিম শরীফ)

হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ، ‘সূর্য ও চন্দ্র আল্লাহর কুদর (ক্ষমতার) বিশেষ নিদর্শন। কারো মৃত্যু বা জন্মের কারণে সূর্যগ্রহণ হয় না। অতঃপর যখন তোমরা চন্দ্রগ্রহণ বা সূর্যগ্রহণ দেখতে পাও, তখন- ১. তাকবির (আল্লাহু আকবার) বল; ২. আল্লাহর কাছে দোয়া কর; ৩. নামাজ আদায় কর এবং ৪. দান-সদকা কর।’ (মুসলিম)

হাদিসের নির্দেশনা থেকে এ কথা সুস্পষ্ট যে, চন্দ্র ও সূর্য মহান আল্লাহ তায়ালার নিদর্শনসমূহের মধ্যে দুটি নিদর্শন। আর তাতে গ্রহণ লাগা আল্লাহ তায়ালার হুকুমেই হয়। তাদের নিজস্ব কোনো শক্তি বা ক্ষমতা নেই। আল্লাহ তায়ালার হুকুমের অধীনেই তাদের চলাচল এবং কার্যক্রম।

তাতে গ্রহণ লাগলে মুমিন মুসলমানের করণীয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সুতরাং চন্দ্রগ্রহণের এ সময়ে বেশি বেশি দোয়া পড়া, তাসবিহ পড়া, তাওবাহ-ইসতেগফার করা, নামাজ পড়া এবং দান-সাদকার করা উচিত।

এ সময় অযথা অনর্থক গল্প-গুজব, হাসি-তামাশায় সময় অতিবাহিত না করে অন্তরে মহান আল্লাহর প্রতি ভয় রাখা জরুরি। কেননা এসবই মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য সতর্কতা। অনেক হাদিসে চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণকে বিশেষ বিপদের সময় বা ক্রান্তিকাল বলে গণ্য করা হয়েছে।

চন্দ্রগ্রহণের নামাজ হাদিসে পাকে সূর্যগ্রহণের নামাজের মতো চন্দ্রগ্রহণের নামাজও প্রমাণিত এবং সুন্নাত। তবে এ নামাজ জামাআতে ও একাকি পড়া নিয়ে মতভেদ রয়েছে। হানাফি অনুসারীরা এ নামাজ একাকি নিজ নিজ ঘরে পড়ার ওপর তাগিদ দিয়েছেন। এ সম্পর্কে ফিকহের বিখ্যাত গ্রন্থ বাদায়েউস সানাঈ-তে এসেছে, ‘চন্দ্রগ্রহণের সময় ঘরে নামাজ আদায় করা হবে। কেননা সুন্নাহ হচ্ছে, তখন একাকি নামাজ পড়া।’ (বাদায়েউস সানাঈ : ১/২৮২)

চন্দ্রগ্রহণের সময় নারীরাও অনুরূপ ঘরে একাকি নামাজ আদায় করবেন। গ্রহণ চলাকালীন সময়ে জিকির-আজকার ও তাসবিহ-তাহলিল, দোয়া এবং তাওবাহ-ইসতেগফারে নিয়োজিত থাকবেন।

কুসংস্কারে বিশ্বাস না করা জরুরি। চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণ নিয়ে সমাজে ব্যাপক কুসংস্কার, বিভ্রান্তি ও অমূলক ধারণা রয়েছে। বিশেষ করে গর্ভবর্তী ও কুমারী নারীদের ক্ষেত্রে বেশি। সমাজে প্রচলিত কুসংস্কারগুলো হলো-১. এ সময় কোনো কিছু খেতে নেই। বলা হয়- চন্দ্রগ্রহণের ৯ ঘণ্টা আগে এবং সূর্যগ্রহণের ১২ ঘণ্টা আগে থেকে খাবার গ্রহণ করা নিষেধ! ২. এ সময় তৈরি করা খাবার ফেলে দিতে হবে !৷ ৩. এ সময় যৌন সম্ভোগ করা যাবে না! ৪. গর্ভবতী মায়েরা এ সময় যা করে, তার প্রভাব গর্ভের সন্তানের ওপর পড়বে! ৫. গ্রহণের সময় গর্ভবতী মায়েদের কাত হয়ে শোয়া নিষেধ; কারণ এভাবে শোয়ার ফলে নাকি গর্ভের শিশু বিকলাঙ্গ হয়! ৬. চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণের সময় জন্ম নেওয়া শিশুদের ব্যাপারে দুই ধরনের গপ্প শুনতে পাওয়া যায়। প্রথমত : শিশুটি অসুস্থ হবে এবং দ্বিতীয়ত : শিশুটি চালাক হবে! ৭. প্রসূতি মা চন্দ্রগ্রহণ বা সূর্যগ্রহণ দেখলে তার অনাগত সন্তানের বিকলঙ্গ হবে! ৮. চন্দ্র বা সূর্যগ্রহণের সময় যদি গর্ভবতী নারী কিছু কাটাকাটি করেন, তাহলে গর্ভস্থ সন্তানের ক্ষতি হয়। ৯. এ সময় কোনো নারীকে ঘুম বা পানাহার থেকে বারণ করাও অন্যায়। ১০. চলা-ফেরায় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এ রকম অনেক কুসংস্কারমূলক কথা প্রচলিত রয়েছে। এ সবই কুসংস্কার ও ভুল বিশ্বাস। ইসলামের এ সবের কোনো অস্তিত্ব নেই। বরং এ সবে বিশ্বাস করা ঈমানহানির শামিল।

মূল কথা হলো, চন্দ্র গ্রহণ বা সূর্য গ্রহণের সময় কুমারী কিংবা গর্ভবতী মায়েদের ভয় কিংবা আশঙ্কার কিছু নেই। অন্যান্য দিনের মতো তারা স্বাভাবিক জীবন-যাপন করবে।

মুমিন -মুসলমানের উচিত, চন্দ্রগ্রহণের সময় হাদিসে ঘোষিত আমলগুলো যথাযথভাবে আদায় করা। সমাজে প্রচলিত কুসংস্কারে বিশ্বাস না করা। কেননা এসব কুসংস্কারে বিশ্বাস করা ঈমানের জন্য ক্ষতিকারক।

আল্লাহ তায়ালা মুসলিম উম্মাহকে চন্দ্রগ্রহণের সময় দোয়া, তাসবিহ, তাওবাহ, ইসতেগয়ার নামাজ ও দান-সাদকা করার তাওফিক দান এবং দুনিয়ার যাবতীয় অনিষ্টতা থেকে রক্ষা করুন। আমিন।।

★গাজী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাবির, ধর্মীয় লেখক, উপস্থাপক, সংগঠক ও আহবায়ক – আদর্শ কলম সৈনিক (আ.ক.স), কুমিল্লা। 01718-228446

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2021 DeshPriyo News
Designed By SSD Networks Limited
error: Content is protected !!