বুধবার, ০৭ জুন ২০২৩, ০৯:০৩ পূর্বাহ্ন

বাজারের ইফতার, কি রঙ খাচ্ছি, কে জানে!

মাসুক আলতাফ চৌধুরী
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৭ মার্চ, ২০২৩
  • ২০১ বার

সমসাময়িক।। মাসুক আলতাফ চৌধুরী
সাতাইশ মার্চ। তেইশ। সোমবার। কুমিল্লা

বাজারের ইফতার, কি রঙ খাচ্ছি, কে জানে!

রমজান মাসে সাধারণ দোকান-শপ তো বটেই, দামি-ব্রান্ড শপ সুপারশপেও ভেজালের ভিড়ে আসল চেনা দায়। ভেজাল রোধে জেল-জরিমানা করেও কাজ হচ্ছে না। ইফতারির আইটেমে রঙ আর রাসায়নিক- কেমিক্যাল মেশানো থামানো যাচ্ছে না কোন ভাবেই। রঙ মেশানো খাবার দেখতে বেশ লাগে-আকর্ষনীয় হয়। ক্রেতাকে কাছে টানে।

সুস্বাদু জিলাপি। ইফতারের আইটেম হিসেবে বেশ জনপ্রিয়। মেশানো হয় রঙ আর রাসায়নিক- হাইড্রোজ। এতে রঙ ভালো হয় আর দীর্ঘক্ষণ মচমচে থাকে। ক্ষতিকর পোড়া মোবিলে ভাজলেও বেশ মচমচা হয়।

রঙ তো মেশানো হয় রঙ ফেরাতে। কি রঙ। খাবার রঙ না সাধারণ রঙ। সাধারণ রঙতো বিষাক্ত, তা কি খাওয়া যায়। খাচ্ছিতো। তাতে কি। সারাদিনইতো বিষ মেশানো খাবার খাই। বছরের পর বছর ধরেইতো খাবারে ভেজালসহ বিষ মেশানো চলছে।

রমজানে ভেজাল বিরোধী অভিযান তোড়জোড় হয়। ধরাও পড়ে। আবার বেরিয়েও যায়। স্বাভাবিক সময়েও আচমকা মোবাইল কোর্ট, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ হানা দেয়। কাজের কাজ কিছুই হয় না। কিছুই মানা হয় না, ফিরে আসে আগের অবস্থা। অপরাধীরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়।

কেন রঙ লাগে। রঙ দিয়ে খাবারের রঙ ফেরানো হয়। খাবার মিষ্টি ও সংরক্ষণ করা হয়। ঘন করা হয়। লাল, হলুদ, কমলা এই তিন রংয়ের মিশ্রণেই খাবার বর্ণিল করা যায়। দেখতেও লাগে আর্কষণীয়। নির্দিষ্ট রঙ নির্দিষ্ট পরিমান ব্যবহারের অনুমতিও আছে। তবে এই রঙ মানে ফুড কালার-আসল খাবার রঙ, খাদ্য রঞ্জক। এর ব্যবহার আছে। যদি ফুডকালারেও মানা হচ্ছে না অনুমোদিত নির্দিষ্ট রঙ ও পরিমান। দু’টোই কৃত্রিম। নির্দিষ্ট পরিমান মতো ফুডকালার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়। তবে প্রচলিত অধিক ক্ষতিকর সাধারণ রঙ, মানুষের খাবার জন্য নয় এমন বিষ-রঙের ব্যবহার দিন দিনই বাড়ছে।

খাবার মুখরোচক ও আকর্ষণীয় করতে কাপড় ও চামড়ায় দেওয়া রঙ ব্যবহৃত হচ্ছে আইসক্রিম, বিস্কুট, সেমাই, নুডলস, ফলের জুস, মিষ্টি তৈরিতে। মুড়ি সাদা করতে ব্যবহৃত হয় ইউরিয়া। আলুর চপ, পাকোড়া, পেয়াজু, বেগুনিতেও হরহামেশাই মেশানো হচ্ছে রঙ। বিরিয়ানি, পোলাও, জদ্দা-তে রঙ ব্যবহৃত হয়। তাছাড়া শরবত-স্কোয়াস, জ্যাম, জেলি, টম্যাটো সস, চকোলেট, ঠান্ডা পানীয় সব কিছুতেই রঙ লাগে। ইফতারের এসব আইটেম তো সাধারণ হোটেল- রেস্তোরাঁতেই বেশি তৈরি হয়। যেখানে ক্ষতিকর রঙের ব্যবহার বেশি। নামি ব্রান্ড দোকানের এসব আইটেমও কি নিরাপদ।

অসাধু ব্যবসায়ীরা খাদ্যে হলুদ রঙ আনতে আলকাতরা থেকে তৈরি মেটানিল ইয়েলো-কিশোরী রঙ মেশান। কিশোরী রঙের প্যাকেটের গায়েই লেখা আছে -মানুষের খাবার জন্য নয়, শুধুমাত্র শিল্পে ব্যবহারের জন্য। অথচ এই রঙ ব্যবহার হচ্ছে -মিহিদানা, ছানাপোলাও, জিলাপী, লাড্ডু, সন্দেশ, অমৃতি, ঘুগনি, আলুর চপ, মোগলাই, বিরিয়ানি, পোলাওয়ে। এর স্বাস্থ্যক্ষতি অনেক। এর মারাত্মক ক্ষতি পুরুষের সন্তান উৎপাদন অক্ষমতার একটা বড় কারণ। হতে পারে মেয়েদের ব্রেস্ট টিউমারও। হতে পারে শ্বাসকষ্ট, ক্যান্সার, ক্রোমোজোমের পরিবর্তন। লাল, কমলা, সবুজ, হলুূদ বাহারী এমন ক্ষতিকর বহু রঙের ব্যবহার হরহামেশাই বাড়ছে। আশ্চর্য হলো এরপরও আমরা বেঁচে আছি। তবে অসুস্থ হচ্ছি, স্বাস্থ্য ঝুঁকি বিপজ্জনক মাত্রায় গিয়ে ঠেকেছে।

আসল খাবার রঙ-ফুড কালার ব্যবহৃত হলেই কি রেহাই মিলবে, নিরাপদ। খাদ্য বিশেষজ্ঞদের এ নিয়ে রয়েছে নানা মতামত,পরস্পর বিরোধী গবেষণা। আমাদের দেশে ১১ টি রঙ আইনগত স্বীকৃত। ব্যবহারে বাঁধা নেই। অবশ্য এর ক্ষতিকর প্রভাবের জন্য পৃথিবীর অনেক দেশে এর অনেকগুলোই নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। ভারতে ছাড়পত্র আছে ৮ টি রঙয়ের।

তবে অনুমোদিত রঙ বলেই সেগুলো কিন্তু পুরো নিরাপদ নয়। যেমন খুশি ব্যবহার করা যাবে না। কোন খাবারে কোন রঙ, সর্বোচ্চ কতটুকু পরিমান ব্যবহার করা যাবে তারও পরিষ্কার গাইড লাইন দেওয়া আছে। কম-বেশি বা ভিন্ন হলেই বিপদ। আমরা ফুডকালার ব্যবহারেও বিপদের মধ্যেই আছি।

এখন প্রশ্ন হলো আমরা বাজারের ইফতার কমবেশি খাচ্ছি। এতে রঙ আছে। আমরা কি রঙ খাচ্ছি। ফুড কালার নাকি বিষাক্ত রঙ। এসব দেখার দায়িত্ব কাদের। তারা কি দেখছেন। তদারকির কি ব্যবস্থা আছে। খোলা খাবার বাজারের মান কারা তদারকি করেন। এমন ব্যবস্থা কি গড়ে উঠেছে।

একটা জরিপ ধারণা দিচ্ছে, ভেজাল খাবার খেয়ে প্রতিবছর তিল লাখের বেশি মানুষ ক্যান্সার, দেড় লাখ ডায়াবেটিস, দুই লাখ কিডনি রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ভেজাল খাদ্য গ্রহণ মৃত্যুর কারণও হয়।

উন্নত দেশগুলোতে খাদ্যে ভেজাল নেই বললে চলে। ভারতেও ভোক্তা অধিকার আইন খুবই কার্যকর। কোনো খাদ্যে ভেজাল প্রমাণিত হলে সাথে সাথে বাজার থেকে উঠিয়ে নেয়া হয়। হয় কঠোর শাস্তি। বাংলাদেশেও আইন আছে, সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। নিয়ম কানুন বিধিবিধান সবই আছে। নেই আইনের কঠোর প্রয়োগ, শাস্তির নজির । তাই ভয়ও নেই।

ভারতসহ যারা খাদ্যে ভেজাল কমিয়ে আনতে পেরেছে, তারা আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে পেরেছে। অপরাধীকে শাস্তি দিয়ে নজির স্থাপন করেছে। ভেজাল মেশানোর অপরাধের বিচার হচ্ছে, কঠোরতায়। তাই তারা নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছে।

লেখকঃ মাসুক আলতাফ চৌধুরী, সাংবাদিক।সাবেক সভাপতি, কুমিল্লা প্রেসক্লাব।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2023 DeshPriyo News
Designed By SSD Networks Limited
error: Content is protected !!