শুক্রবার, ২০ মে ২০২২, ১০:৪৫ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :

প্রতিমন্ত্রীর মন্তব্যে সমালোচনার ঝড়, গায়ে মাখছেন না মুরাদ

নিউজ বাংলা
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০২১
  • ৩১৬ বার

নারীর প্রতি ‘অবমাননাকর’ মন্তব্য করার অভিযোগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার মুখে পড়েছেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান। তার বিরুদ্ধে বর্ণবাদী শব্দ ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে।

প্রতিমন্ত্রীর এসব মন্তব্যকে ‘কুরুচিপূর্ণ’, ‘অশালীন’ ও ‘মর্যাদাহানিকর’ বলে নিন্দা জানিয়েছেন জেন্ডার বিশেষজ্ঞ ও অধিকারকর্মীরা। তবে এসব সমালোচনা পাত্তা দিচ্ছেন না প্রতিমন্ত্রী মুরাদ। আলোচিত ভিডিওটি নিজের ফেসবুক টাইমলাইন থেকে সরিয়ে নিলেও মুরাদ হাসান বলছেন, তিনি আগের অবস্থানেই আছেন।

গত ১ ডিসেম্বর রাতে ‘অসুস্থ খালেদা, বিকৃত বিএনপির নেতাকর্মী’ শিরোনামে এক ফেসবুক লাইভে যুক্ত হন মুরাদ হাসান। লাইভটির সঞ্চালক ছিলেন নাহিদ রেইনস নামে এক ইউটিউবার ও ফেসবুকার।

লাইভে বিএনপির রাজনীতি সমালোচনার এক পর্যায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি ও দলটির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমানকে নিয়ে তিনি বিভিন্ন মন্তব্য করেন। এ ছাড়া বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জন্ম ও পরিবার নিয়েও কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী।

প্রতিমন্ত্রীর এসব বক্তব্য ‘প্রচণ্ড আপত্তিকর’ উল্লেখ করে তীব্র সমালোচনা চলছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। আলোচিত লাইভটি শনিবার রাত পর্যন্ত প্রতিমন্ত্রীর ভেরিফায়েড পেজের টাইমলাইনে দেখা গেলেও সোমবার আর দেখা যাচ্ছে না। তবে টাইমলাইন থেকে সরিয়ে নিলেও প্রতিমন্ত্রীর ফেসবুক পেজের ভিডিও অংশে এটি দেখা গেছে।

বিষয়টি নিয়ে রোববার প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসানের অবস্থান জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যেহেতু আমি রাজনীতি করি, তাই আমি রাজনৈতিক কর্মী। সবকিছু সবাই ভালোভাবে নেবে, এ রকম তো কথা নেই। সমালোচনা করতেই পারে।’

সমালোচকদের অবশ্য বিরোধীপক্ষের সারিতে ফেলছেন মুরাদ হাসান। তিনি বলেন, ‘যারা সমালোচনা করেন, তারা আমাদের শত্রুপক্ষ বা বিরোধীপক্ষ বা বিরোধী দল বা ’৭১-এর স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি। এরা তো সমালোচনা করবেই। এগুলো দেখার সময় আসলে আমার নেই।’

নারীর প্রতি অবমাননাকর শব্দ ব্যবহারের অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘নারীর প্রতি অবমাননা বুঝলাম না! কোন নারীর প্রতি?’

নিজের কথায় কোনো নারীর প্রতি অবমাননা হয়নি দাবি করে তিনি বলেন, ‘প্রশ্নই ওঠে না। আমার মা আছে। আমি একজন মায়ের পেট থেকে জন্মগ্রহণ করেছি। আমার বোন আছে, স্ত্রী আছে, আমার সন্তান আছে, কন্যা আছে। আমি কাউকে অবমাননা করে কোনো কথা বলার মানসিকতা পোষণ করি না।

‘এটা সমালোচকদের, নিন্দুকদের… ওই যে বলে ‘‘পাছে লোকে কিছু বলে” ওই রকম হইছে আরকি। এসব নিয়ে মাথা ব্যথা দেখানোর মতো সময় আমার নেই।’

‘মক্ষীরানি’র মতো শব্দ ব্যবহারের যৌক্তিকতা জানতে চাইলে সরাসরি জবাব দেননি মুরাদ হাসান। তিনি বলেন, ‘জিয়াউর রহমান সাহেব কোথায় জন্মগ্রহণ করেছেন, বেগম জিয়া কোথায় জন্মগ্রহণ করেছেন, তারা কেউ কিন্তু বাংলার মাটিতে জন্মগ্রহণ করেননি। তাদের পরিবারের ইতিহাস আসলে খুব পজিটিভ না। এগুলো পজিটিভ কোনো বিষয় না।

‘এগুলো সবাই আমরা জানি। বাংলাদেশে কেউ জন্ম নেয়নি এরা। বাংলাদেশকে কেউ ধারণ করেন না। বাংলাদেশকে লালন করেন না। বাংলাদেশকে বহন করেন না। বাংলার মানুষকেও তারা ভালোবাসেন না। যার ফলে তারা হত্যার রাজনীতি করেছেন। ক্যু-এর রাজনীতি করেছেন। জিয়াউর রহমান হাজার হাজার বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈনিককে হত্যা করেছেন। এসব তো আপনারা জানেন সবই। খালেদা জিয়াও তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাই করেছেন।’

আলোচিত মূল ভিডিওটি ফেসবুক টাইমলাইন থেকে সরানোর কারণ জানতে চাইলে ব্যস্ততার কথা বলে তিনি ফোন রেখে দেন।

প্রতিমন্ত্রীর মন্তব্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা জানিয়েছেন জেন্ডার বিশেষজ্ঞ ও নারী অধিকারকর্মীরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. তানিয়া হক বলেন, ‘বক্তব্য প্রদানের সময় শব্দ চয়নে সবারই সচেতন থাকা উচিত। নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই অবমাননাকর মন্তব্য করা ঠিক নয়।’

তথ্য প্রতিমন্ত্রীর আরও দায়িত্ব নিয়ে কথা বলা উচিত বলে মনে করেন দেশের প্রথম নারী হিসেবে প্রধান তথ্য কমিশনারের দায়িত্ব পালন করা অধ্যাপক সাদেকা হালিম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন সাদেকা হালিম বলেন, ‘তথ্য প্রতিমন্ত্রী ফেসবুক লাইভে অংশগ্রহণ করে যে ধরনের মন্তব্য করেছেন, সেটি বাংলাদেশের একজন সুস্থ নাগরিক হিসেবে আমার কাছে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ মনে হয়েছে।

‘নারীকে হেয় করে কথা বলা ঠিক না। ভুলে গেলে চলবে না, আমাদের দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৫০ শতাংশই নারী, তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছেন। কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা কখনই কাম্য নয়।’

প্রতিমন্ত্রীর মন্তব্যে তীব্র ক্ষোভ জানিয়ে মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির বলেন, ‘আমি মনে করি এ বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি তার নিজের চিন্তা, অবস্থান, নৈতিকতা ও স্ট্যাটাস সবার কাছে পরিষ্কার করেছেন। প্রতিমন্ত্রী তার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে গোটা নারী জাতিকে অপমান আর অবমাননা করেছেন।’

খুশী কবির  বলেন, ‘উনি (মুরাদ হাসান) সবচেয়ে বেশি অপমান করেছেন ওনার নেত্রী, আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী সব জায়গায় নারীর অধিকার সম্পর্কে স্পষ্ট বক্তব্য রাখছেন।’

খুশী কবির বলেন, “তিনি (মুরাদ হাসান) নিজে যখন বলেন যে ‘আমার মুখ ভীষণ খারাপ’, তখন তিনি একজন মন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রিপরিষদে থাকেন কীভাবে সেটিই আমার বড় প্রশ্ন।”

প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসানের বক্তব্যে ভীষণ ক্ষুব্ধ আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোটের প্রধান নির্বাহী জিনাত আরা হক।

তিনি বলেন, ‘উনি (প্রতিমন্ত্রী) একটি শব্দ ব্যবহার করেছেন, জাইমা কৃষ্ণাঙ্গদের সঙ্গে থাকেন, এটার মানে কী? কৃষ্ণাঙ্গদের সঙ্গে থাকাটা কী অপরাধ? কৃষ্ণাঙ্গ বলতে উনি কী বুঝিয়েছেন? কৃষ্ণাঙ্গরা খুবই খারাপ? কৃষ্ণাঙ্গরা খুবই সেক্সিস্ট? ওদের সঙ্গে খারাপ মেয়েরা থাকে?

‘আমরা কিন্তু এখন কৃষ্ণাঙ্গ শব্দটাই ব্যবহার করি না। আমরা বলি আফ্রিকান-আমেরিকান। আমরা নিগ্রো বলি না। আমরা ব্ল্যাক বলার সময় চিন্তা করি, বলব কি না। কিন্তু উনি অবলীলায় বলে ফেললেন। এটা আমাদের জন্য খুবই দুঃখজনক, হতাশাজনক।

জিনাত আরা হক হতাশা জানিয়ে বলেন, ‘পার্লামেন্টে লেখাপড়া জানা মানুষ গেলে আমরা খুবই খুশি হই। কিন্তু এই যদি হয় লেখাপড়ার হাল, তাহলে আমাদের চিন্তা করতে হবে যে, আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া দিয়ে আমরা আসলে কী শিখছি।’

‘আমার কাছে মনে হয়েছে- ব্যক্তি, বিশেষ করে নারীদের উনি প্রচণ্ডভাবে হেয় করেছেন। তার কথাগুলো শুনতেই আমার কষ্ট হচ্ছিল।’

জিনাত আরা হক বলেন, “উনি (প্রতিমন্ত্রী) ‘মক্ষীরানির’ মতো শব্দ বলেছেন। এ ধরনের কথা বলার মধ্য দিয়ে যে নারীরা প্রান্তিক, যে নারীরা অনেক বেশি বিপর্যস্ত, তাদের আরও বিপর্যস্ত করছেন। এই শব্দগুলো আসলে কারা বলে? যারা লেম্যান, যাদের জানাশোনা কম, সমাজে যারা প্রথাগত আচরণ করে তারা বলে।’

নিউজ বাংলা

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2022 DeshPriyo News
Designed By SSD Networks Limited
error: Content is protected !!