বৃহস্পতিবার, ২৬ মে ২০২২, ০৮:৪১ পূর্বাহ্ন

ভাষা অবহেলিত কিন্তু ভাষা দিবস পালিত হচ্ছে

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২২
  • ২২১ বার
আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

বিদেশে রোগশয্যায় শুয়ে একুশের পদধ্বনি শুনছি। আমি যেন সত্তর বছর আগে ফিরে গেছি। জনমানুষের কণ্ঠে শুনছি আকাশ প্রকম্পিত স্লোগান ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। দেশ রাষ্ট্রভাষাকে গ্রহণ করেছে, কিন্তু তার ব্যবহার গ্রহণ করেনি। সত্তর বছর ধরে একুশের জয়ধ্বনি শুনছি। কিন্তু বাংলা ভাষার, যে ভাষার জন্য বাংলার তরুণেরা প্রাণদান করেছেন, সেই ভাষার উন্নতি কোথায় যেন বাধাগ্রস্ত হয়ে আছে। শহিদেরা প্রাণদান করেছিলেন ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। এখন শহিদদের নিয়েই একুশে উদ্যাপিত হয়, কিন্তু তাদের আদর্শ ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের কোনো লক্ষ্য নেই। আমার একুশের গানেরও সত্তর বছর পূর্তি হলো। গানটি শুনে আমি গর্ববোধ করি বটে এবং সেই সঙ্গে ভাবি, এই গান মানুষকে উদ্দীপ্ত করে, কিন্তু ভাষাকে কতটা এগিয়ে দিয়েছে? আজ জীবনের শেষ পর্বে এসে এই প্রশ্ন আমাকে দহন করে।

বাংলা আজ একটি স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রভাষা। কিন্তু বাংলাদেশের যেমন সামাজিক বিপর্যয় ঘটেছে, তেমনি বাংলা ভাষারও ক্রমশ বিপর্যয় ঘটছে। স্বাধীনতার আগে বাংলা ভাষাকে বিদ্যাসাগর থেকে সবুজপত্র গোষ্ঠীর সম্পাদক প্রমথ চৌধুরী (কলকাতা) পর্যন্ত যে একটি সুষ্ঠু রূপ দান করেছিলেন, তা বাংলাদেশে সংস্কৃতির প্রভাবমুক্ত আরো সুষ্ঠু রূপ ধারণ করবে, এটাই ছিল আমাদের আশা। পঞ্চাশের সাহিত্যিক গোষ্ঠী যেমন কবি শামসুর রাহমান, আলাউদ্দিন আল-আজাদ, হাসান হাফিজুর রহমান কলকাতার বাংলা ভাষায় পূর্ব বাংলার মানুষের মুখের ভাষার কিছু কথাকে ঢুকিয়ে দিয়ে ভাষাকে আরো প্রাণবন্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। ভাষা আন্দোলনের পর শহিদ মুনীর চৌধুরীর সভাপতিত্বে একটি ভাষা সংস্কার কমিটি গঠিত হয়েছিল। মুনীর চৌধুরী ছিলেন সেই কমিটির প্রধান। মুনীর চৌধুরী যেমন বাংলায় টাইপরাইটার প্রবর্তন করেন, তেমনি আধুনিক বাংলা ভাষার গদ্যরীতি কী হবে তা নিয়ে গবেষণা করে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে বাংলা একাডেমি এই পুস্তিকা প্রকাশ করে এবং মুনীর চৌধুরীর দ্বারা সংশোধিত বাংলা ভাষা সবাইকে ব্যবহারের জন্য অনুরোধ জানায়। কিন্তু আজ পর্যন্ত সেই সংশোধিত ভাষা কেউ ব্যবহার করেনি, করছে না।

এখন বাংলা ভাষা ব্যবহারে চলছে যথেচ্ছাচারিতা। আমাদের কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ এখন প্রয়াত। তার গল্প-উপন্যাস বাংলা সাহিত্যকে এগিয়ে নিয়েছে। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলব, ভাষার সর্বনাশ করেছে। তার লেখার জনপ্রিয়তা দেখে তরুণ প্রজন্মের লেখকেরা তা অনুসরণ করছেন। এর ফলে যে ‘ঢাকাইয়া’ বাংলার আবির্ভাব ঘটেছে, তা বাংলা ভাষার উন্নতির পক্ষে একটি বড় বাধা। এই ‘ঢাকাইয়া’ বাংলা হুমায়ূন আহমেদ তার নাটকের ভৃত্যদের মুখে ব্যবহার করেছেন। আবার নায়ক-নায়িকারাও একই ভাষায় কথা বলেছেন। বাংলাদেশের তরুণ সাহিত্যিকেরা তা অনুসরণ করতে গিয়ে বাংলা ভাষার ক্ষতি করছেন।

ইংরেজি ভাষার যেমন একটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ব্যবহারবিধি আছে, বাংলা ভাষায় সেই ব্যবহারবিধি ভেঙে গেছে। যার যেমন খুশি বাংলা লিখছেন। আশা ছিল কলকাতায় সঠিক বাংলা টিকে থাকবে। কিন্তু সেখানেও বাংলা ভাষার ওপর চলছে হিন্দির অত্যাচার। কলকাতার বাংলা ছবি দেখলে মনে দুঃখ হয়। বাংলা ছবিতে হিন্দি ডায়ালগ ও গান এসে ঢুকেছে। কত দিন সেখানেও প্রমিত বাংলা টিকে থাকবে তা আমি জানি না।

লন্ডনে আশির দশকে টাওয়ার হ্যামলেট কাউন্সিল স্কুলে বাংলা ভাষা শিক্ষাদানের জন্য অর্থ মঞ্জুর করেছিলেন। এই মঞ্জুরি এখন তারা বাতিল করে দিয়েছেন। কারণ বাংলায় শিক্ষালাভের জন্য কোনো ছাত্র পাওয়া যায় না। এই ছাত্র না পাওয়ার একটা বড় কারণ বাংলা ব্যাবহারিক ভাষা নয়। এ সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতালব্ধ একটি গল্প বলি। লন্ডনের একটি স্কুলে কিছুদিন বাংলার শিক্ষকতা করেছি। ঐ স্কুলের ১৫-১৬ বছরের এক ইংরেজ ছাত্রী আমাকে এসে গোপনে ধরল, তাকে তার বাঙালি প্রেমিকের কাছে বাংলায় চিঠি লিখে দিতে হবে। তার প্রেমিক বাংলাদেশি। এখন সে বাংলাদেশে আছে। মেয়েটি তার কাছে বাংলায় প্রেমপত্র লিখে সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখতে চায়। আমি তার অনুরোধে তাকে কয়েকটা প্রেমপত্র লিখে দিয়েছি। কয়েক দিন পর সে আর আসে না। একদিন রাস্তায় দেখা পেয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি আসো না কেন? সে বলল, এখন সে ইংরেজিতে তার প্রেমিকের কাছে চিঠি লেখে। কারণ আমি যে বাংলায় তাকে চিঠি লিখি, তার সবটা সে বোঝে না। ইংরেজি লেখা চিঠি সে ভালো বোঝে। কারণ এই বাংলাদেশি তরুণ বহুদিন লন্ডনে ছিল। পরে আমি ভেবে দেখলাম, ইংরেজি ভাষায় প্রেমপত্র লেখা যতটা সহজ, বর্তমান বাংলা ভাষায় লেখা ততটা সহজ নয়।

আমরা ভাষা দিবস নিয়ে উৎসব করি। ভাষা সংস্কারে মন দিইনি। বাংলা ভাষার আগে টার্কিশ, পতু‌র্গিজ, ইংলিশ ভাষা থেকে দেদার শব্দ গ্রহণ করা হয়েছে। তাতে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধ হয়েছে। বাংলা ভাষার গ্রহণী শক্তি এই নবপ্রযুক্তির যুগেও অব্যাহত আছে। দরকার মুনীর চৌধুরী কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী পাঠ্যপুস্তকে তার ব্যবহার এবং জনজীবনেও তার ব্যবহার নিশ্চিত করা। পশ্চিমবঙ্গের বাংলার সঙ্গে তার সমন্বয় দরকার। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে নয়। ইংরেজি ভাষা বিশ্বের সর্বাধিক প্রচলিত ভাষা। ইংল্যান্ড, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডসহ বহু দেশেই এই ভাষা প্রচলিত। কিন্তু তার চেহারা বদলে গেছে। আমেরিকান ইংরেজি বা অস্ট্রেলিয়ান ইংরেজি বহু ক্ষেত্রেই শব্দ ব্যবহার ও তার উচ্চারণে ইংরেজি ভাষা থেকে পৃথক। কিন্তু তার মৌলিক ভিত্তি একই।

বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষার ব্যবহারে একটু পার্থক্য থাকবেই। সেটা মুখ্য বিষয় নয়। মুখ্য বিষয়, ভাষার ভিত্তি যেন একই থাকে। বাংলাদেশে বিএনপি-জামায়াতের শাসনকালে একেবারে প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তক থেকে বাংলা ভাষাকে ইসলামীকরণের নামে বাংলা ভাষার বিকৃতি সাধন আরম্ভ হয়েছিল। দুঃখের বিষয়, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর হেফাজতিদের সঙ্গে আপস করে সেই বিকৃতি আরো বাড়িয়ে তুলেছে। আমাদের শিক্ষামন্ত্রী আগে ছিলেন একজন সাবেক বামপন্থি নেতা। তিনিও এই ভাষার বিকৃতি সাধন ঠেকাতে পারেননি। যেমন পারছেন না বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি। কারণ ওপরের আদেশ। এই আদেশ রাজনৈতিক স্বার্থ দ্বারা চালিত হয়।

বাংলাদেশে যদি বাংলা ভাষার একটা সুষ্ঠু রূপ তৈরি করা হয়, তাহলে আমার ধারণা, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরায়ও সেই ভাষার প্রভাব বিস্তৃত হবে। ইংরেজির মতো বাংলা ভাষারও একটা আন্তর্জাতিক বিস্তৃতি ঘটা শুরু হবে। আমি সেই দিনের অপেক্ষায় আছি, যেদিন বাংলাদেশের সরকার ও জনগণ শুধু ভাষা দিবস পালন নয়, ভাষার সংস্কার ও উন্নয়নে এগিয়ে যাবে।

ইত্তেফাক

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2022 DeshPriyo News
Designed By SSD Networks Limited
error: Content is protected !!