বুধবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২২, ১০:২৫ পূর্বাহ্ন

মসজিদে পাঠাতে ভয়! ধর্মচর্চার অভিভাবকও হতে হবে পিতাকেই

মাসুক আলতাফ চৌধুরী
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১১ অক্টোবর, ২০২২
  • ২২৮ বার
মাসুক আলতাফ চৌধুরী: বলা চলে একটা সংকটসময় যাচ্ছে। স্কুল- কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া সন্তান মসজিদমুখি-এটাই স্বাভাবিক ধর্মচর্চা হবার কথা। কিন্তু না,এ ধারণা থেকে বেড়িয়ে আসতে হবে। কারণ দিন দিনই এ সংকট প্রকট হচ্ছে। যদিও ধর্ম নিজেই নিয়ম- শৃঙ্খল। তারপরও পাহারাদারী লাগবে কেন? অধর্ম আর কদাচার সেখানেও থাবা বিস্তার করেছে,তাই লাগবে। এসব আগেও ছিল। ধরণ বদলেছে শুধু। সঠিক পথ বা মূলধারা থাকলে পাশাপাশি বিভ্রান্তিও থাকে। বিভ্রান্তিই বিপদগ্রস্ত করে। ঠেকিয়ে-নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয় মূল-সঠিক চর্চা দিয়েই।
১ সেপ্টেম্বর ঢাকার কল্যাণপুর বাসা থেকে ‘হিজরত’- ঘর ছাড়ে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক করা শারতাজ ইসলাম নিলয়(২৫)। সঙ্গী আরও কয়েক তরুণ। ‘সামরিক প্রশিক্ষণ’- (বোমা তৈরি, সশস্ত্র হামলা) নিতে যান পটুয়াখালীতে। তবে ‘জঙ্গিবাদ’ ভুলপথ বুঝতে পেরে প্রশিক্ষণ অবস্থাতেই বাসায় ফিরে আসেন। গণমাধ্যমে দেওয়া তার ভাষ্য,সশস্ত্র প্রস্তুতির কথা বার বার শুনেছি। কিন্তু আমি সেই স্টেজ পর্যন্ত যাই নি। তার আগেই ভুল বুঝতে পেরে ফিরে আসি। যখন বাসা ছাড়ার বিষয় আসে তখনই এটা মেনে নিতে পারিনি। তারপরও গেছি। মন সায় না দেয়ায়,সুযোগ বুঝে বাসায় ফিরে আসি। ৬ অক্টোবর ঢাকায় ব্যাবের মিডিয়া সেন্টারে স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার সময় গণমাধ্যমকে এসব কথা জানান নিলয়। নিজে ফিরে আসায় আইনী জটিলতা থেকে বেঁচে যায় সে। হয়তো ‘দলের সবাইকে’ গ্রেফতার পর্যন্ত একটা কঠিন সময় পার করতে হয়েছে তার পরিবারকে। আপাততঃ মুক্তি।
হঠাৎ করেই কুমিল্লার ৬ যুবককে খুঁজে না পাওয়া নিয়ে হইচই পরে মধ্য সেপ্টেম্বরের দিকে। পরিবারের জিডি করা শুরু হলে গণমাধ্যম সরব হয়ে ওঠে। এরপরই ঢাকায় ব্যাব জানায় জঙ্গি তৎপরতায় ঘর ছেড়েছে ৭ যুবক। এদেরই একজন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী নিহাল আব্দুল্লাহ (১৭)। সে নিলয়ের খালাতো ভাই। তাহলে সংস্পর্শতা পাওয়া গেলো। এই সখ্যতাই ‘রোগের শুরু’। নিঁখোজ নিহালের বাবার গণমাধ্যমের ভাষ্য, আমরা আগে কুমিল্লার অশোকতলা এলাকায় ছিলাম। সেখান থেকে নজরুল এভিনিউয়ের কোবা মসজিদ অনেক দূরে। সম্প্রতি বাসা বদলে আমরা রানীরবাজার এলাকায় আসি। এখান থেকে কোবা মসজিদের দূরত্ব বেশি নয়। সেই মসজিদেই যেতো নিহাল। ঢাকার খালাতো ভাই নিলয় তার থেকে বয়সে বড় হলেও দু’ জনের ঘনিষ্ঠতা বেশ। এলাকার মসজিদ ছেড়ে দিয়ে কেন যেত কোবা মসজিদে?
ভিক্টোরিয়া কলেজের আরেক সহপাঠি নিঁখোজ ইমরান বিন রহমানের(১৭) বাবার গণমাধ্যমের ভাষ্য, আমার ছেলে ২৩ আগষ্ট থেকে নিঁখোজ। নিঁখোজ হওয়ার দেড়- দুই মাস আগে থেকে জুমার নামাজ সে কোবা মসজিদে পরতো। জিজ্ঞেস করলে বলতো,হুজুরের বয়ান তার ভালো লাগে। ছোটবেলা থেকেই সে ধার্মিক।
১০ বছর ধরে কোবার ইমাম হাবিবুল্লাহ। মসজিদের পাশের ভবনেই থাকতেন আরেক নিখোঁজ কুমিল্লা সরকারি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী হাসিবুল ইসলাম(ব্যাবের উদ্ধার হওয়া)। তার সাথেই ইমাম হাবিবুল্লাহট বেশ সখ্যতা ছিল। তারা মাঝে মাঝে ‘তালিম’-ধর্মীয় আসরে বসতেন। বিভ্রান্ত ইমাম হাবিবুল্লাহর রিক্রুটিং সোর্স নিজের অজান্তেই হয় এই হাসিব। আর ‘তালিম’ হচ্ছে সেই ‘মগজধোলাই’ বিভ্রান্তি- প্রস্তুতি পর্ব। পুরোপুরি দীক্ষিত কিনা তাদের অজান্তইে কয়েক ধাপে হয়ে যায় পরীক্ষা। ফুল কোর্স ও ‘তৈরী করা’ শেষেই আসে চরম আনুগত্যের আদেশ’হিজরত’। ইমাম হাবিবুল্লাহর নির্দেশেই তারা ‘হিজরত’-বাড়ি ছাড়ে। তাদের সংগঠনটির নামও নতুন- ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বিয়া’।
ব্যাবের ভাষ্য,ইমাম হাবিবুল্লাহ একজন দাওয়াতি ও অন্যতম অর্থ সরবরাহকারী। রোববার (৯ অক্টোবর) রাতে নিঁখোজ আরও ৩ তরুণ ও তাকেসহ ৫ জনকে ঢাকার যাত্রাবাড়ী ও কেরানীগঞ্জ থেকে গ্রেফতার করার ঘোষণা আজ সোমবার (১০ অক্টোবর) জানিয়েছে ব্যাব। তাহলে ইমামও ডাল-পালা। শেকড় আরও গভীরে। জানা তাহলে শেষ করা গেলো না।
সবাই পরিবারে- সমাজে ধার্মিক- নামাজি ও চুপ- চাপ থাকা মানুষ। সবাই সাধারণত যা পছন্দ করে। ধর্ম আর অধর্মের প্রবেশ পথ প্রায় একই- কাছাকাছি রাস্তা। প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত পার্থক্যটা বুঝা মুশকিল। অভিভাবক ও ইমামের সহকারির বক্তব্যে এসব উঠে এসেছে। তারাও টের পাননি সর্বনাশ হওয়ার আগ পর্যন্ত।
ইমাম হাবিবুল্লাহ কওমি শিক্ষিত। পাশাপাশি পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডের একটি মাদ্রাসায়ও পড়াতেন। তার বাবাও মাওলানা ছিলেন। কুমিল্লাতেই বাড়ি। তার জুম্মার বয়ান শুনতে ভীড় জমতো। বেশ নামও ছড়িয়েছিল।
তাহলে কি মসজিদে পাঠাতেও ভয়? এ অবস্থায় অভিভাবকদের করণীয় কি? কি হবে পেরেন্টিং?
জলের বিপদ কাটাতে মানে সুরক্ষায় যদি সাঁতারের ক্লাস লাগে তাতেওতো পিছপা হন না অভিভাবকরা। তবে এই সংকট মোকাবিলায় কি করবেন তাঁরা? ধর্ম চর্চায়ও অভিভাবক থাকবেন পিতা নিজেই। ‘সহবত’- সাহচার্য লাগলে সময়সঙ্গি হবেন পিতাই,অথবা পরিবারের বড় কেউ। পিতার দায়িত্ব দিন দিনই বাড়ছে। মাকেতো সবই সামলাতে হচ্ছে। এখন নতুন সংকটও সামলাতে হবে। ধর্ম,রাজনীতি- অর্থনীতি ও সামাজিক ঝুঁকির এ বিশ্বে সন্তানদের দক্ষ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার লড়াইটা দিন দিনই কঠিন হচ্ছে।
লেখকঃ মাসুক আলতাফ চৌধুরী,সাংবাদিক,সাবেক সভাপতি-কুমিল্লা প্রেসক্লাব। কুমিল্লা। ১০ অক্টোবর ২০২২ সোমবার।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2022 DeshPriyo News
Designed By SSD Networks Limited
error: Content is protected !!