বুধবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২২, ০৯:১৬ পূর্বাহ্ন

রেলপথে জন্ম, রেল কর্মকর্তার উদ্যোগে নিরাপদ মাতৃত্ব

মাসুক আলতাফ চৌধুরী:
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৭ নভেম্বর, ২০২২
  • ৪৮১ বার

।। মাসুক আলতাফ চৌধুরী, কুমিল্লা

পথে জন্ম, রেল কর্মকর্তার উদ্যোগে নিরাপদ মাতৃত্ব

পেটে বাচ্চা। সময়ও ঘনিয়ে এসেছে। স্বামী দরিদ্র রিক্সাচালক। থাকেন নরসিংদীর মাধবদী এলাকায়। লক্ষীপুরের রামগতি এলাকা থেকে মেয়ের বাবা এসেছেন নিয়ে যেতে। স্বামী ও বাবার সাথে নোয়াখালীগামী উপকূল ট্রেনে সন্তান সম্ভবা গৃহবধূ (১৯) উঠলেন নরসিংদী স্টেশন থেকে। তিন বছর হলো বিয়ে হয়েছে। অস্বচ্ছল হলেও সুখের সংসার। কিন্তু ঘটলো বিপত্তি। ছুটে চলা ট্রেনেই উঠেছে ওই মায়ের প্রসব বেদনা। শনিবার ৫ নভেম্বর। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত ঘনিয়েছে। আখাউড়া অতিক্রম করছে ট্রেন। নোয়াখালী তখনো অনেক পথ। ট্রেনের জুনিয়র পরিদর্শক আমিনুল ইসলাম উদ্যোগী হলেন। বগি খালি করলেন। যাত্রী ও রেল কর্মীরা মিলে প্রসব করালেন। তখন রাত সাড়ে ৭ টা। ট্রেন সদর রসুলপুর, সামনেই কুমিল্লা। জটিলতা ছাড়াই নিরাপদ প্রসব। হাতের কাছে যা মিলেছে তাই দিয়ে। ফুটফুটে পুত্র সন্তান। ততক্ষণে ট্রেন কুমিল্লা স্টেশনে। হাল ধরে আছেন আমিনুল, উর্ধতনদের জানিয়ে নিজের শক্তি বাড়িয়ে নিয়েছেন,সাথে সহকর্মীরাও । কুমিল্লা পৌঁছাতেই দ্রুত নামিয়ে স্টেশনের পাশের এক ক্লিনিকে শুরু করালেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা। পরদিন দুপুরেই তাদের ছেড়ে দেয়া হলো। প্রসূতি-মা ও বাচ্চা সুস্থ। সত্য গল্পটা একটা মানবজীবনের। এক বিপন্ন মায়ের। একটা অনাগত শিশুর- সম্ভাবনার। একটি অসহায় দরিদ্র পরিবারের।

জনঅংশগ্রহনের একটি সফল অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। এর নেতা রেল কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম। সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্যতম ব্যক্তি তিনি। আর অংশ নেয়া যাত্রী-রেল কর্মী এরা বীর জনতা। নিরাপদ মাতৃত্বের অনুসরণীয় মানুষ। রিসোর্সকে এভাবেই বিপদে সংগঠিত করতে হয়। এরজন্য নেতা লাগে। মিলেছিলও সময়মতো।

পুত্র সন্তান পেয়ে বেজায় খুশি বাবা- পরিবার। এটিই সমাজ বাস্তবতা। পুরুষ মাতব্বরির হুক্কাহুয়া। বাচ্চা সুস্থ।শুরু এবার আরেক আধিপত্যবাদের। উত্তরাধিকার। নাম রাখা। প্রভাবশালীরাই জয়ী সেখানেও। ঢাকা-কোলকাতা রুটে আন্তঃ নগর বন্ধন এক্সপ্রেস ট্রেনের নামে নবজাতকদের নাম রাখা হয় বন্ধন। না জোরজবরদস্তি হয়নি। আপসেআপই হয়েছে সব। চট্টগ্রাম রেলের উর্ধতন কর্মকর্তারা প্রসূতি ও পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে ও পরিবারের সম্মতিতেই খুশিতে শরীক হয়েছেন নাম রেখে। দাদাগিরিটা তাদের দেয়া হয়েছে।

অবদানের ওখানেই শেষ ছিল না। ক্লিনিকের শুধুমাত্র ওষুধ আর সামান্য চিকিৎসা ব্যয়ের ব্যবস্থা ও তা পরিশোধও করেন রেলওয়ে। শুধু তাই নয় তাদের বাড়ি লক্ষীপুর পৌঁছে দিতে এ্যাম্বুলেন্স ভাড়াও পরিশোধ করেন তারা। তাই ওই নাম রাখার অধিকার এমনিতেই চলে আসে তাদের কাছে। এটা স্বীকৃতি হিসাবে,বিপদে বন্ধুত্বের।

অশিক্ষা ও দারিদ্র্যের কাছে দায়িত্বজ্ঞানের প্রশ্ন অমূলক। নিরাপদ মাতৃত্বের অধিকার- সেবা ও মাতৃস্বাস্থ্য পরিচর্যা পৌঁছাতে হবে- এটাই রাষ্ট্রীয় নীতি। সেভাবেই কাজ চলছে। কতটুকু এগুলো এটা আজকের আলোচ্য নয়। জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই সেবা নিশ্চিত করতে হবে। এটিই আলোচ্য। হয়েছেও তাই। কিভাবে হতে হয় এটা উদাহরণ হলো। অনুসরণীয় উদাহরণ নিঃসন্দেহে।

নেতা হয়ে উঠেন জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনে,গোষ্ঠী থেকেই। নেতৃত্বের সোল এজেন্ট শুধুমাত্র বিদ্যমান রাজনীতিবিদরা- এ ধারনা ভাংতে হবে। তবে তারা প্রধান ওই স্বীকৃতিও অস্বীকার করা যায় না। তবে জনগনকেই নেতা হতে হবে যার যার প্রয়োজনে। নেতা আরসিসি’র মতো ফিক্সড হয়ে থাকলে জায়গাটা সীমিত হয়ে থাকে। আধিপত্যের শুরু ওখানেই। এতে স্বাভাবিক বিকাশ আর হয়ে ওঠে না। পথ রুদ্ধ হয়ে পরে। দীর্ঘদিন হলে বন্ধ্যাত্ব দেখা দেয়। সমাজ অক্রিয়াশীল হয়ে পরে। সব কিছুতেই চুপ মেরে যায়। সমাজ আবার এভাবেই জেগে উঠুক। জয় হোক সাধারণের।

লেখকঃ সাংবাদিক।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2022 DeshPriyo News
Designed By SSD Networks Limited
error: Content is protected !!