বুধবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২২, ০৯:৫৭ পূর্বাহ্ন

কুমিল্লার দুঃখ-ইপিজেডের বিষাক্ত ময়লা পানি

মাসুক আলতাফ চৌধুরী:
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১৩ নভেম্বর, ২০২২
  • ২৪১ বার
পিপুলিয়া বাজারের সোনাইছড়ি নদীতে ইপজেডের বিষাক্ত পানি,এটি ইপিজেড থেকে ১০ কি.মি দূরের চিত্র। ছবি-দেশপ্রিয় নিউজ
মাসুক আলতাফ চৌধুরী: কুমিল্লার দুঃখ – ইপিজেডের বিষাক্ত ময়লা পানি, ফসল-মাছ- সাপ- ব্যাঙ সব হারিয়ে যাচ্ছে
কুমিল্লা ইপিজেডের ফেলে দেয়া বিষাক্ত রাসায়নিক পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ও প্রাণী জগত। এসমস্যা প্রকট হয়েছে ১৬ বছর ধরে। তার আগের ৫ বছর ফসলের ক্ষেত শুষে নিয়েছে নিজ নিয়মে। তাই এখন ফসল- সবজি কম হচ্ছে । সাপ- ব্যাঙ মরে সাফ। মাছ নেই জলাশয়ে। গ্রামবাসীর শরীরে খোঁসপাচড়া, রোগ-বালাই। কৃষক হয়ে পড়েছে বেকার। গ্রামবাসীর অভাব লেগেছে- ক্ষতিগ্রস্ত তারা। এরপরও বন্ধ হয় নি এ আগ্রাসন। আন্দোলন হয়েছে। নির্বাচন এলে আন্দোলন আরও চাঙা হয় । সুযোগে দাবী ওঠে। এভাবেই কেটে যাচ্ছে ২০-২২ বছর। ২০০০ সালে শুরু কুমিল্লা ইপিজেড- রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা। সমস্যার শুরুও তখন থেকেই। পুরোপুরি চালুর পর সমস্যা আরও বেড়েছে। দীর্ঘদিনে এখন পরিনত হয়েছে কুমিল্লার দুঃখ হিসেবে।
অভিযোগ পুরনো। শিল্পকারখানার বর্জ্য। মানুষ শোষণের আরেক হাতিয়ার। আজকের সভ্য মানবতায় এটা নিষিদ্ধ। ইপিজেডেও নিষিদ্ধ। ময়লা পানি বিষমুক্ত- নিরাপদ করে তবে ফেলতে হবে নালায়- ড্রেনে। নিয়ম বেশ সুন্দর। তাই কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারে(সিইটিপি) প্রথমে ফেলতে হয়। তারপর শোধন শেষে নিরাপদ পানি নালা দিয়ে বের করে দেয়ার নিয়ম। এতে অনেক টাকা গুণতে হয়। বাঁধা ওখানেই। টাকা বাঁচাতে ওই শোধনাগারে ‘কারিগরি ত্রুটি’ লেগেই থাকে। আটকে রাখা যায় না তরল বর্জ্য। তাই বিষাক্ত ওই পানি সরাসরি নালায় ফেলে দেয়া হয়, রাতের আঁধারে। আর এতেই সব শেষ হয়ে যাচ্ছে।
দক্ষিণ কুমিল্লার এ কান্না নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই ক্ষমতাসীন মন্ত্রী এমপিদের। একজন সাবেক (মনিরুল হক চৌধুরী)এমপি সোচ্চার। তিনি অবশ্য বিএনপির। ভোটের রাজনীতির রসায়নে এ সংসদীয় আসন সুবিধামতো বার বার পুর্নগঠনে ভেঙ্গেচুরে এখন একাকার। তাই গুরুত্ব মিলছে কম।
কুমিল্লা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শওকত আরা কলির গণমাধ্যমের ভাষ্য, ইপিজেডের তরল বর্জ্যে খালের পানিতে গন্ধ পাওয়া গেছে। পরীক্ষায়ও সত্যতা মিলেছে।
তবে কোন সমীক্ষা হয় নি। তাই পানির ক্ষতিকর রাসায়নিক বিশ্লেষণও হয় নি। মানবদেহ ও প্রানিজগতের ক্ষতি, রোগবালাইয়ের ঝুঁকি, প্রভাব- বিশদ জানা হয় নি। খালি চোখে যতটুকু বোঝা যাচ্ছে তা নিয়েই আলোচনা- দাবী উঠেছে। এও ব্যাপক ভয়াবহ। বিপজ্জনকও বটে। জনস্বাস্থ্যের মারাত্মক ঝঁকি। অনেকেই নানা রোগেও আক্রান্ত।
ইপিজেডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশল নুরুজ্জামান মিয়ার ভাষ্য, শুধু এই কারণে খাল, পুকুর ও টিউবওয়েলের পানি কালো হচ্ছে না। কুমিল্লা বিমান বন্দর রানওয়ের ভেতর গরুর খামার রয়েছে। গরুর মূত্রও খালে যাচ্ছে। আর শোধনাগার বিষয়ে তাঁর ভাষ্য, মাঝেমধ্যে টেকনিক্যাল কারণে ঝামেলা হয়।
এই ফাঁকিবাজি রোধ করা জরুরি। দাবী উঠেছে শোধনাগার সবসময় চালু থাকার। অনলাইন তদারকি করার। তদারকি কমিটিকে কার্যকর রাখার।
সাবেক এমপি মনিরুল হক চৌধুরীর ভাষ্য, এতে ৭১ গ্রামের ৫০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। ক্ষতির পরিমান তাঁর দাবি টাকায় ৫৯০ কোটি । ইপিজেডকেই এই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এখানকার পুকুর,নদী,খাল,জলাশয়, ডোবায় মাছের উৎপাদন হচ্ছে না। সবজি চাষ ব্যাহত হচ্ছে। ধান আগের মতো হচ্ছে না। দুর্গন্ধে মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয় নি।
কুমিল্লা বিমানবন্দর এলাকায় ২৬৭ একরে কুমিল্লা ইপিজেড। শিল্প প্লট আছে ২৪৩ টি। কর্মরত শ্রমিক ৪৭ হাজার, অধিকাংশই নারী।
এবার অবশ্য দাবী আদায়ে গড়ে উঠেছে ‘ কুমিল্লা জেলা কৃষক সমবায়ী ঐক্য পরিষদ।’ তাঁরা আলোচনায় বসেছেন কুমিল্লা জেলা প্রশাসকসহ ইপিজেড,পরিবেশ অধিদপ্তর, সিটি কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে। ১০ নভেম্বর জেলা প্রশাসক অফিসে ওই আলোচনা হয়। ঐক্য পরিষদের সভাপতি এডভোকেট আখতার হোসাইন জানান, ইপিজেডের বর্জ্য তদারকি কমিটিতে পরিবেশ অধিদপ্তরসহ ৮ সদস্য রাখা হয়েছে। কোন কৃষক প্রতিনিধি নেই। ক্ষতিগ্রস্থ পক্ষের কেউ নেই।
তাদের দাবী, ইপিজেডের ময়লা পানি সরাতে সিটি কর্পোরেশনের দু’টি নালা- ড্রেন রয়েছে। যার মাধ্যমে পরিশোধন না করেই বিষাক্ত পানি ছেড়ে দেয়া হয় গ্রামে। এই দু’টি নালা সরিয়ে ফেলতে হবে। শোধনাগার থেকে বিষমুক্ত পানি সরাতে বিমান বন্দর ও উনাইসার এলাকায় পৃথক খাল খনন করতে হবে। নিরাপদ ও সুরক্ষায় খালের দু’পাড়ে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করতে হবে। আর না হলে তারা আন্দোলন করবে। ক্ষতি পূরণও তাদের চাওয়া।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান ওই সভায় সিটি কর্পোরেশনকে খাল খননে এগিয়ে আসতে বলেছেন। এভাবে সমস্যার শেষ হবে না। খাল কাটতে হলে প্রকল্প লাগবে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রী কুমিল্লার। তাঁর মন্ত্রনালয়ের অংশগ্রহণ লাগবে। তাঁর কাছে সমস্যা তুলে ধরা জরুরি। এটা খুব বড় প্রকল্প নয়, তাই এই সময়েও সম্ভব।
আর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নতি তিনি সাত দিনে দেখতে চান। এই ধমকটা কাজে দেবে। তবে সবসময়ের হলে তদারকি লাগবে। ওই কমিটিতে কৃষক প্রতিনিধি না থাকলে সবাই একজোট হয়ে আগের মতো চুপচাপ বসে থাকবে। যাদের চাহিদা তাদের প্রতিনিধি থাকা দরকার। তারা জেগে থাকবে। সোচ্চার থাকবে। স্বার্থের বোঝাপড়ায় যে ক্রিয়াশীলতা তৈরি হবে তা কার্যকর হয় ও থাকে এ ভাবেই। এটাকে গুরুত্ব দেয়া দরকার।
লেখকঃ সাংবাদিক। সাবেক সভাপতি-কুমিল্লা প্রেসক্লাব

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2022 DeshPriyo News
Designed By SSD Networks Limited
error: Content is protected !!